নিশিকান্তর সবথেকে বেশি খ্যাতি তাঁর ‘টুকরি’-র জন্য বোধ করি। বাংলা কবিতার অন্ত্যমিল ও ছন্দের বাঁধনকে আলগা করে এক নতুন পথে তাকে প্রবাহিত করে দেন কবি। অনুভূতির গাঢ়তা তাতে এতটুকু কম ছিল না। কালের বিচারে অভিনব চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন তিনি ‘টুকরি’গুলোতে। বাস্তবের চেনা জগৎ এই লেখাগুলিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তারা যেন স্বপ্নলোকের কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন এক পথের সন্ধানে বার হয়ে পড়ে।
১
দেরী করে তুমি এসেছ এখন
যাও ভাই প্রজাপতি।
একটু আগেই মল্লিকা ছিল
ঝরে গেছে ঐ নদীপথে।
(মল্লিকা)
২
হায়রে অসাবধানী,
কালকে বিকেলে এখানে বেড়াতে এসে
পড়ে গেছে বুঝি তোমার কানের লাল পাথরের দুল।
বাদামি রঙের বালির উপরে সবুজ ঘাসের পাশে
ঐ রাঙা রঙ জ্বল জ্বল করে আজ!
যেই কাছে যাই— সব ভুল ভেঙ্গে যায়,
দেখি— পড়ে আছে লাল ‘ভেলবেট পোকা’।
(রক্ত কুন্তল)
৩
যতদূর চাই
সরস সবুজ মাঠ;
তারি মাঝে চরে অলস পাটল গরু,
দাঁড়কাক তার পিঠে বসে আছে
চিকন কালো।
(তিন রঙা ছবি)
যখন যেমন ঘটনা তিনি দেখতেন তাকেই কলমের শক্তিতে স্থায়ী আসন দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন নিশিকান্ত। শ্রাবণ পূর্ণিমার চাঁদকে দেখে তাঁর আকুল প্রশ্ন— ‘আকাশ ভরে জমে আছে / শ্রাবণ মাসের কাজল-কালো জল; / সেই জলেতেই বারেক ডুবে, / বারেক ভেসে উঠে / কোন রূপসী পঞ্চদশী / সাঁতার কাটে আজ।’ ( শ্রাবণ পূর্ণিমা )।
শান্তিনিকেতনের প্রতিমুহূর্তের জীবনকে ধরে রাখতেই যেন তাঁর কলম ধরা। এই ‘টুকরি’-গুলোতে কীভাবে তারা ধরা পড়েছে, সেটি একবার দেখতে চাই বিভিন্ন কবিতার পঙক্তি ধরে। যেমন— ‘মেসের ছেলেরা সকলেই ওকে ঠাট্টা করে’, ‘কলেজের ক্লাসে হয়েছিল দুটো কথা, / সে কথার শেষ গাজনতলায় / এঁদো পুকুরের পাড়ে’ ইত্যাদি। শান্তিনিকেতনের জীবন যাত্রার সঙ্গে নিশিকান্তের এই সতত সঞ্চরমাণ জীবনকে মেলানো খুবই কঠিন। আমার কেন জানি না মনে হয়, সে-ই হয়তো কবির মানসপুত্র পঞ্চক। যার কণ্ঠ বাঁধ ভাঙার গান গাইবার জন্য সর্বদা তৈরি। একবার বন্ধুকে নিয়ে সাঁওতাল পল্লীতে গিয়ে ঘোর বিপদে পড়েন নিশিকান্ত। সর্দারের হুকুম তাদের একটি মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু ভয় পাওয়ার ছেলে নয় নিশিকান্ত। বাইরের কাজ সেরে এসে বিয়ে করবেন বলে তিনি নেশাগ্রস্ত সর্দারকে ফাঁকি দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলেন। বিয়ে না করলেও সেই পাত্রীর কথা চিন্তা করে বেরিয়ে এল একটি টুকরি—
“পরনে রঙিন গামছার মতো কাপড়খানি,
কপালে উল্কী আঁকা; কালো সুতো
বাঁধা রূপোর হাঁসুলি গলায় দোলে;
এক হাতে ওঁর আঁচলে ঝোলানো
আলুর পুঁটুলি; আর এক হাতে
কাঁকুড় শশায় সাজানো মাটির হাঁড়ি।
তারই থেকে দুটো লকলকে কচি পাতা
গুঁজে নিল তার কালো খোঁপাটির চুলে।”
(সাঁওতালী)
বাংলা সাহিত্যে এই টুকরিগুলো উচ্চ আসন লাভ না করলেও এর নতুনত্ব কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। যদিও রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় ‘চাঁদকবি’-র এই টুকরিগুলোকে সংশোধন করার দায়িত্ব নেন, তবু এই বিষয়টি নিশিকান্তকে কতটা খুশি করেছিল তা বলতে পারা মুস্কিল। আসলে নিরাভরণ এই টুকরিগুলোর প্রাণশক্তি তার রচনাকর্তার মতোই ছিল উচ্ছল উদ্দাম। সৃষ্টির এই স্বকীয় সংকেত ধরতে তাই গুরুদেবের দেরি হয়নি। তবে টুকরি সংশোধন নিয়ে শেষ বয়সে কবি কিছুটা অপরাধে ভুগতেন হয়তো! তাই বুদ্ধদেব বসুকে একটি চিঠিতে জানাচ্ছেন তাঁর মতামত— “নিশিকান্তের লেখাগুলো আমি নির্দয় ভাবে সংশোধন করেছিলুম— একেবারেই ভালো করিনি। সেগুলি তার মূলের বিশুদ্ধ মূল্যেই রক্ষনীয়।” (২৮।০৩।৪০)
বাংলা কবিতার ইতিহাসে নিশিকান্ত এক আলাদা পথের দিশারি। তিনি তাঁর বর্ণসম্পদ নিয়ে আমাদের প্রাত্যহিক ছবি এঁকে চলেন নিরবধি কাল।
তথ্যসূত্র
১। দেশ, রবীন্দ্রজন্ম শতবর্ষ সংখ্যা
২। ‘কবি নিশিকান্ত’— ডালিয়া সরকার