বাঙালির তেরো পার্বণের সেরা পার্বণ দুর্গা পুজো।
তো এই পুজো নিয়ে কী ভাবছেন তাঁরা?
পুজো তাঁদের কাছে কীভাবে ধরা দেয় অথবা পুজোর ভেতর
তাঁরা ধরা পড়েন কীভাবে...
কলম ধরলেন
স্বা গ তা দা শ গু প্ত
নীল আকাশের অধীশ্বর
এত্তটা নীলের মধ্যে জ্বলজ্বলে সাদা মেঘগুলো যখন দেখা যায়, বছরের সেই সময়টাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। ছোট্টবেলা থেকেই। এই সময়েই আসে ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব’। ইস্কুলে পড়ার সময় রচনা লিখতে হত। রচনা-বইতে পড়েছি, লিখেওছি। পরে জেনেছি একটি বিশেষ বাঙালি সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ উৎসব এটা। আরও অন্য সম্প্রদায়ের বাঙালি আছেন। তাঁদের অন্য অন্য উৎসব আছে। গাঢ় নীলের মধ্যে জ্বলজ্বলে মেঘের যে-আকাশ মনটাকে অকারণ আনন্দে ভরিয়ে দেয়, যার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই কেটে যায় বেলা, সেই আকাশের অধীশ্বর কে?
কৈলাসবাসিনী সেই আর্য দেবী? ত্রিভুবনের সমস্ত অশুভের দমন যাঁর হাতে! নাকি তাঁর পায়ের তলায় শুয়ে থাকা তাঁর ত্রিশূলবিদ্ধ ‘প্রেমিক’? যাঁকে প্রেমে ভুলিয়ে ছলনার আশ্রয়ে হত্যা করেন দেবী!
এই ঘন নীলের সমারোহে তাঁর কথাই মনে পড়ে আজ। তিনি বীর। আদিবাসীদের রাজা। প্রজা পালক। চাইচম্পা নগরে তাঁর বাস। লোহা গলিয়ে অস্ত্র বানানোর কাজ করতেন তিনি আর তাঁর সহনাগরিকেরা। মহিলাদের সম্মান করতেন। আজও তাঁর জনজাতির মধ্যে মহিলাদের ওপর অত্যাচারের নিদর্শন তুলনায় অনেক কম। ত্রিভুবনে কেউ যখন তাঁকে পরাস্ত করতে পারছিলেন না, দেবতারা পাঠালেন এক অসামান্যা রমণীকে। কারণ মহিলাদের আঘাত করা অসুরের ধর্মে নেই। সেই রমণীর কপট-প্রেমে ভুলে একে একে নিজের সব অস্ত্র মাটিতে পুঁতে ফেললেন তিনি। চামুন্ডি পাহাড়ে দেবী তখন তাঁর ওপরে চড়ে খুন করলেন নিরস্ত্র মহিষ-রাজাকে।
আমাদের আখ্যান, কাব্য, পুরাণ, লোককথায় চিরকালের জন্য তিনি হয়ে রইলেন অশুভ শক্তির প্রতীক– মহিষাসুর। তাঁর উত্তরাধিকারীরা আজও তাঁদের শহিদ-রাজার স্মরণে শোকদিবস পালন করেন। দুর্গা পুজোয় তাঁরা অংশ নেন না। কোথাও কোথাও দুর্গা পুজোর সময়ে অসুর পুজো করা হয়। কোথাও কোথাও তাঁর মন্দির আছে। আর কারো কারো মনে আকাশের এই অফুরন্ত নীল আর উজ্জ্বল সাদার উন্মত্ততা এনে দেয় কতবছর আগের সেই আদিবাসী রাজার স্মৃতি। তাঁর বীরত্ব, দক্ষতা, অসম্মান, অপ্রাপ্তি যেন তীব্র করেছে এই আকাশের রং, তাঁর পৌরুষ যেন উজ্জ্বল করেছে। যতদূর দেখা যায় এই দিগন্তকে ভরিয়ে দিয়েছে এক রাজার বেদনা, আমাদের অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া জনজাতির ইতিহাসের কান্না।
আমার কাছে এই নীল আকাশের অধীশ্বর তিনিই, এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আমার বর্তমান হৃদয়ের।