৩
সন্ধ্যা নেমেছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝায় ভারী হয়ে আছে উপকূলীয় বাতাস। পাতা উল্টে চোখে পড়ল দুটি পংক্তি―
দেখেছি আমার ঠোঁটে ও নখের কোণে লাল এক অচেনা ফলের দাগ
মাংসফলের বনে ঘন হয়ে উঠেছিল ছায়া
(ছায়া)
চুপ করে থাকি। পাতা ওল্টাই। দু’ফর্মার কবিতার বই। সন্তাপ ও সিজার টেবিল। কবি পার্থজিৎ চন্দ। তাঁর কবিতা ঘন, মেঘময়। তাঁর কবিতায় মিশেল চলছে। ইংরেজি, হিন্দি শব্দ মিশ্রণ করছেন আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে। যেমন―
‘ফলসার বনে কোবাল্ট-প্রহর ঘনিয়ে উঠেছে
এক রাক্ষস-শিশুর দাঁতে ছিঁড়ে নেওয়া স্তনবৃন্ত কোবাল্ট-রঙের’
(বিষ)
অথবা
‘একদিন অচানক হেমন্তের বিকেলবেলায় পড়ন্ত সূর্যের আলো
ঢলে পড়ে আমলকি-বনে।’
(শ্ব-দাঁত)
শহর ভিজছে। গাড়ির সংখ্যা কমে আসছে। পৃথিবী ফাঁকা হচ্ছে ক্রমশ। এমন সময় পড়ছি ‘সন্তাপ’ ও ‘ছিন্নমস্তা ২’ কবিতাটি। একটা গাঢ় ভাবনা গ্ৰাস করছে। গঠনশৈলীর কারণে উদ্ধৃত করা যাবে না কবিতা দুটি। পড়ে নিতে হবে।
রাজনৈতিক হিংসার কথা মনে আসে। খবর বলছে, রাজ্যে দেশে পৃথিবীতে শুধু হিংসা। আমি পড়ছি―
‘দূরে গুলির শব্দে ধড়ফড় করে উঠে, হ্যাট ঠিক করে
খুলি-ওড়া পশু কাঁধে ঘরে ফিরছে নিহত শিকারি’
(শিকার)
ইমেজটা মনের ভেতর ঘুরপাক খায়। উত্তরের দরজাটা খুলি। বাতাস জোলো, ঠাণ্ডা। কোনও নদীর কথা মনে আসে―
‘ভাষা-নদীটির জন্য তুমি কুড়িয়ে এনেছ গ্ৰহান্তরের জাদুঝাঁপি’
(লেখা)
তারপর পড়ি
‘হরিণ-চোখের মতো এ-বিকেল সুন্দর
যার হাতে রক্ত লেগে আছে সে আমায় হত্যা করেনি
যে আমায় হত্যা করেছিল
তাকে আমি চিনি। . . . ‘
(দোতারা)
সন্ধ্যে রাতের দিকে ঢলে আসে। বিপুল এক জলীয় ছায়ায় ঢেকে যায় শহর, মসস্বল ও গ্ৰামের চোখ। আমাদের ব্যক্তিগত অস্তিত্বের কথা ভাবি। দিশেহারা করে দেয় দুটি লাইন―
‘আমিই সে অকৃত্রিম যোনি
নিজেকে প্রসব করে সারারাত একা একা রক্ত মুছেছি’
(যতটা শূন্য ধরে)
কবি পার্থজিৎ চন্দর কবিতা বিপন্ন করে আমাদের। আক্রমণ করে। সন্তাপ শিল্প হয়ে ওঠে।
রাতের অস্পষ্টতায় ঢেকে যায় শব্দের চারপাশ।