লাহোর, সাল ২০১২। অল পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্সের বার্ষিক সম্মেলন।
সেই মিউজিক সার্কেল, ১৯৫৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, শিক্ষাবিদ জনাব হায়াত আহমেদ খান ও মুষ্ঠিমেয় কিছু গানপাগল মানুষ লাহোরের বিখ্যাত কফি হাউসে বসে যার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। হায়াত আহমেদ নিজে ছিলেন গান্ধর্ব সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তনী।
পাঁচের দশকে তখন এক অস্থির সময় যখন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে পাকিস্তানের সাঙ্গীতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়। শরিয়াতি ধ্যানধারণায় সম্পৃক্ত ও দেশে সমঝদার শ্রোতার অভাবে যখন চিরতরে রেওয়াজ, অনুষ্ঠান করা বন্ধ করার কথা ভাবছেন ‘মালিকা ই মৌসিকী’ রোশনারা বেগম।
পাকিস্তানে কট্টরপন্থী মানসিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাতারাতি পাক মিট্টি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান। যখন ‘মৌসিকী’ মানেই ‘হারাম’, ‘গানা-বাজানা’র কথা শুনলে লোকে ‘তওবা তওবা’ করে, চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে রক্তচক্ষু মৌলবাদীদের ‘না-পাক’ দাপট। পাকিস্তান একটু একটু করে যখন তলিয়ে যাচ্ছে অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি ও ধর্মান্ধতার অন্ধকারে… হায়াত আহমেদ পরে জানিয়েছিলেন— “We were submissive by force, not by choice. We need to find a way out.” [সূত্রঃ দ্য ডন নিউজপেপার] সেই ক্ষোভই পরে আমরা ধ্বনিত হতে শুনি বিখ্যাত এক বলিউডি থ্রিলারে।
এই মানুষ গুলিই তখন দেখিয়ে ছিলেন ‘নিশান’, দিয়েছেন ‘আলোর সন্ধান’। সরকারি শাসনতন্ত্র, স্বেচ্ছাচারিতা ও কট্টরপন্থীদের হুমকি উপেক্ষা করে ১৯৬০ সালে ১৯-২৩ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত করেন ছ’দিনের সেই মিউজিক কনফারেন্স। গোটা পাকিস্তান ভেঙে পড়েছিল সেই সঙ্গীত সম্মেলনে। সেই কনফারেন্স পরবর্তী কালে ‘রৌশন’ করেছেন রোশনারা বেগম, মিঁয়া কাদের বক্স পাখোয়াজি, উস্তাদ বড়ে গুলাম, শরিফ খান পুঁছওয়ালে সহ নজাকৎ-সলামৎ, তুফৈল নিয়াজি, আমানত আলী, বড়ে ফতেহ আলী বা নাসিম বেগমের মত বিখ্যাত কলাকারেরা। বাকিটা ইতিহাস। পাকিস্তানে খুলে যায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার নয়া দিগন্ত।
ফিরে আসা যাক প্রায় দশ বছর আগের সেই ঘটনায়। পাঁচদিনের মিউজিক কনফারেন্সের শেষদিনে ছিল তালবাদ্যের প্রতিযোগীতা। ছ’জন ফাইনালিস্টের পাঁচ জন ইতিমধ্যেই পারফর্ম করেছেন। মাইকে যার নাম ঘোষণা করা হল তা শুনে চমকে গেলেন বিচারক-উপস্থিত দর্শকেরা।
মঞ্চে এলেন বছর বাইশের এক সদ্য তরুণী। সাথে তাঁর ‘ওয়ালিদ’ ওয়ারিশ উমেইদ ও ‘গুরু’ পঞ্জাব ঘরানার বিখ্যাত তবলিয়া উস্তাদ কাসিফ আলী দানি। বিচারকদের মধ্যে তখন শুরু হয়েছে জল্পনা যে এক ‘খওয়াতিন’ (মহিলা) বাজাবে তবলা! এ যে অবিশ্বাস্য! তাও এই রোগাপাতলা মেয়ে, যার মাথায় ‘হিজাব’, শরীর ঢাকা পাতলা লাহোরি কামিজে, চোখ দুটি উজ্জ্বল…তাঁদের বিস্ময় যেন কিছুতেই কাটতে চায় না। এই তরুণীরই নাম ছিল সুমেইরা ওয়ারিশ।
পাকিস্তানে পূর্বে তবলায় নিজ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন আরেক মহিলা— আমিনা চিশতি। মার্কিন নাগরিক আমিনা ২০০১ সালে গাণ্ডা বেঁধে ছিলেন পঞ্জাব ঘরানার প্রথিতযশা তবলিয়া উস্তাদ দিলদার হুসেইনের কাছে যিনি একসময় নুসরত ফতেহ আলী খানের সাথে সঙ্গত করে বিশেষ খ্যাতি কুড়িয়ে ছিলেন। পরবর্তী কালে পাকিস্তানে শাস্ত্রীয় তবলাবাদনে ঝড় তুলেছিলেন চিশতি, তবু পাকিস্তানের ‘ডটার অফ দ্য সয়েল’ সুমেইরা ওয়ারিশ-কে প্রথম পেশাদার ‘মহিলা’ তবলিয়া রূপেই এগিয়ে রাখেন সে দেশের ‘ফনকার’ ও ‘সমঝদারে’রা।