Hello Testing

ফি চা র

কৌশিক ব্যানার্জী

kaushik

নবর্ষের বাংলা গানের স্বর্ণালী ইতিহাস

দেখতে দেখতে আমরা পা রাখলাম ১৪৩১ বঙ্গাব্দে। আর এই বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে দেদার খাওদাওয়া, মিষ্টিমুখ, প্রভাতফেরী, ময়দানের বারপুজো আর সঙ্গীতানুষ্ঠান বাঙালীর বহুদিনের ঐতিহ্য। এই লেখায় উস্কে দেওয়ার চেষ্টা নববর্ষকে কেন্দ্র করে যে গানবাজনার আসর বসত এক সময় তার স্বর্ণালী ইতিহাস। শুধু গানবাজনার আসরই নয় রচনা হত কত না নতুন বাংলা গান। ঠিক কবে থেকে যে নববর্ষকে কেন্দ্র করে এই গানবাজনার সূচনা ঘটে তা এখন আর সঠিকভাবে নির্ধারণ করা না গেলেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আঙ্গিকে এই সব সঙ্গীত অনুষ্ঠানের ধারা অব্যাহত ছিল। আর সেই সব গান তো শুধু গান নয় সেই সময়ের এক দলিলও বটে।

নিধু বাবু

রামপ্রসাদ সেনের পরে যিনি সেযুগে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় গান রচনা করেছিলেন তিনি হলেন নিধু বাবু অর্থাৎ রামনিধি গুপ্ত (১৭৪১-১৮৩৯)। মূলতঃ টপ্পা অঙ্গে মানব প্রেমের উপরে গান রচনা করায় নিধুবাবুকে একঘরে করা হয়। কিন্তু এতে নিধুবাবুকে থামানো যায়নি। নববর্ষকে নিয়েও নিধুবাবু একটি চমৎকার গান রচনা করেন যা সেযুগে প্রবল জনপ্রিয় হয়—

হায় কি সুখের আগমন

বয়স হরস আনে  রসল্লাসে ভরা ভুবন

দুঃখ তম দূরে গেল সুখ সূর্য উদয় হল

করে গান সুমঙ্গল যত পুরজন

সম্মিলিত আপন-পর আনন্দেতে হয়ে মুখর

ওগো প্রেম সুখে হাসে কাঁদে পরিয়া নববসন

হায় কি সুখের আগমন।

দাশরথি রায়ের পাঁচালী

নিধুবাবুর পরে বাংলা গানের স্টাইলকে যিনি পাল্টান তিনি দাশরথী রায় (১৮০৬-১৮৫৭)। এর আগে আমরা ভারত চন্দ্র রায়গুনাকরের কবিতায় দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যবহার দেখলেও তা ছিল মূলতঃ মৈথিলি মেশানো বাংলা। বাংলা গানে দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহারের জনক ছিলেন এই দাশরথী রায়। নববর্ষ নিয়ে তিনিও একটি বিখ্যাত গান লেখেন, যদিও দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যবহার এতে পাওয়া যায় না। দাশরথী বাবুর কথায়—

পুরাতন হলো গত আসে নবাগত দিন

স্মৃতিপটে আঁকা ছবি ঝরা পাতা সমুদিন

আগত নব বরোষে নতুন প্রেম প্রদোষে

কামনা করি সরোষে থাকো চির অনুদিন।

গোপাল উড়ে

দাশরথী রায়ের পরে যিনি নিজস্ব শৈলী দিয়ে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি হলেন গোপাল উড়ে। জন্মসূত্রে উড়িষ্যার কটক জেলার জাজপুরের এক দরিদ্র চাষী পরিবারে জন্মান গোপাল কলকাতায় এসে কলা ফেরি করতেন। একদিন তার সুরেলা কণ্ঠে ‘কলা চাই কলা’ শুনে ‘বিদ্যাসুন্দর’ যাত্রা দলের কর্ণধার বিশ্বনাথ মতিলাল তাকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনেন এবং বলেন যে ‘তোমায় আর কলা বেচতে হবে না। তুমি আমার বাড়িতে থেকে হরিকিষাণ মিশ্রের কাছে গান শেখ আর আমার দলে অভিনয় কর।’ পরবর্তীতে ভালো করে বাংলা শিখে তিনি মঞ্চে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং সেই সঙ্গে সৃষ্টি করেন একের পর এক কালজয়ী বাংলা গান। নববর্ষকে নিয়ে গোপালের একটি গান সেই যুগে তুমুল জনপ্রিয় হয়—

নতুন বরষ জাগায় হরষ সরস করে মন

বৈশাখের এই সম্মেলনে বিশেষ আয়োজন

ফুরফুরে ওই বইছে মলয় ইয়ার বন্ধু আড্ডা জমায়

বলে মারবো টেক্কা আজ দেখে নাও ধনুক ভাঙা পণ

আবার বনেদি চাল ভাতে বাড়ে দেখুক সর্বজন।z

গহরজান

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঘোড়ায় টানা ট্রাম ও গ্যাসের বাতির যুগে কলকাতার বিখ্যাত বাবুরা পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বৈঠকী গানের আসর বসাতেন আর সেই আসর দাদরা, গজল আর ঠুমরি দিয়ে ইত্যাদি দিয়ে মাতিয়ে রাখতেন কলকাতার বিখ্যাত বাঈজিরা। আর এইসব বাঈজিদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতনামা ছিলেন গহরজান। ভারতবর্ষে গহরজানই প্রথম মহিলা শিল্পী যার গান গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ড করে। এরকমই এক পয়লা বৈশাখে শোভাবাজার রাজবাড়ীর বৈঠকী আসরে গহরজান পরিবেশন করেন টপ্পা আঙ্গিকে এক অসাধারণ গান—

যখন প্রাণ ছিল প্রাণে, কত মশলা দিতাম পানে

এখন কাছে গেলে শুধু বলো ওগো সরো সরো মানে মানে

যখন ছিলাম দারচিনি, আমি সেদিন হতে তোমায় চিনি

এখন আমি বালি আর তুমি চিনি

চেনাচিনি নেই দুজনে

যখন ছিল দেহের বাহার দিয়ে সাজতাম কতই বাহার

গুন গুন গেয়ে বাহার আমি উড়ে বসতাম মধু পানে।

ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নববর্ষের প্রথমার্ধে হালখাতার অনুষ্ঠান কেমন হত তার পরিচয় পাওয়া যায় ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত একটি গানে—

আজকে যাবো নতুন খাতার নিমন্ত্রনে মোরা

মন্ডা মিঠাই আনবো হাতে ক্যালেন্ডার জোড়া

বাবা ভাইয়ের হাতটি ধরে নতুন জামা পড়ে

আর আনন্দেতে মন মাতিয়ে খুশিতে বুক ভরে

দোকানেতে বসবো গিয়ে দেবে গোলাপজলের ছড়া।

দাদা ঠাকুর শরৎ পন্ডিত

আবার এই পয়লা তারিখ নিয়ে নিজস্ব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় গান রচনা করেছিলেন দাদা ঠাকুর শরৎ পন্ডিত—

আজকে মাসের পয়লা

ভোর হতে মুদি তাগাদায় আসেআর

দুয়ারে দাঁড়ায়ে গয়লা

ছেলে বলে ওগো দিতে হবে মোরে বই কিনিবার দাম গো

আর মেয়ে বলে মাহিনা না দিলে স্কুলে কেটে দেবে নাম গো

আর গিন্নি বলেন আনগো সাবান

আমার রঙ হয়ে গেল ময়লা।

গত শতকের সত্তর দশকে দক্ষিণ কলকাতার ‘বসুশ্রী’ সিনেমা হলের কর্ণধার মন্টু বসুর উদ্যোগে নববর্ষের সকালে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত তা আজকের প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও অক্ষত। বাংলা ও ভারতের এমন কোনো প্রথিতযশা শিল্পী ছিলেন না যিনি এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি। এমনকী লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলেরাও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য তৎকালীন বম্বে থেকে কলকাতায় আসতেন। এই অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল উত্তম কুমারের গান। এইদিন উত্তম কুমার ধুতি-পাঞ্জাবী পরে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন।

বিগত শতকের আশির দশকের শুরুতে প্রাক-মোবাইল যুগে এত স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না। ছিল শুধুমাত্র দূরদর্শনের দুটি চ্যানেল। স্যাটেলাইট চ্যানেলের রমরমা শুরু হয় মূলতঃ নব্বই দশকে। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে দূরদর্শনে আশির দশকের শুরুতে ‘নববর্ষের বৈঠক’ নামে একটি অনুষ্ঠান দর্শকমহলে ভীষণভাবে সমাদৃত হয়। দূরদর্শনের স্টেশন ডিরেক্টর পঙ্কজ সাহার অনবদ্য সঞ্চালনা ছিল এই অনুষ্ঠানের ইউ. এস. পি। প্রত্যেক বছর নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হত দূরদর্শন কর্তৃপক্ষ। কখনো চলন্ত মেট্রো রেল, কখনো গঙ্গাবক্ষে নৌকায় আড্ডার আঙ্গিকে এই অনুষ্ঠান হত। দূরদর্শন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য থাকত একটি ভালো অনুষ্ঠান দর্শকদের উপহার দেওয়া। স্যাটেলাইট চ্যানেলের আবির্ভাবের পরে বিভিন্ন বাংলা চ্যানেলে এইধরনের অনুষ্ঠান হলেও তা কখনোই ‘নববর্ষের বৈঠক’ অনুষ্ঠানের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি যে কথা হলফ করে বলা যায়।

বাঙালীর প্রাণাধিক প্রিয় নববর্ষকে কেন্দ্র করে এই ভাবে গীতিকারের গান রচনার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল নববর্ষের হালখাতা ও অন্যান্য প্রথাগুলো এখনো চললেও নববর্ষকে কেন্দ্র করে গানের অনুষ্ঠানের স্বর্ণালী ইতিহাস আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আজকালকার প্রজন্ম প্রায় জানেই না যে নববর্ষকে কেন্দ্র করে কি অসাধারণ সব গানের অনুষ্ঠান হতো সেই সময়।