গ ল্প
তী র্থ ঙ্ক র  ন ন্দী
কারা যেন হিংস্র হয়ে উঠেছিল
সূর্যটি হারিয়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে। তামা আকাশ ভারি সুন্দর। অবর্ণনীয়। কবিতায় হয়ত এই আকাশ বর্ণনা করা যেতে পারে। তামা আকাশের নিচে পল ও পলা। ওরা এসেছে গতকাল এই গণ্ডগ্রামে। সপ্তাহান্তের ভ্রমণে। প্রতি সপ্তাহের শেষেই দুজনে গণ্ডগ্রামের খোঁজ করে। আর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরে।
যেমন আজ সন্ধ্যায় দুজনে ঘুরছে অলকানন্দা গ্রামে। গ্রামটি অদ্ভুত। এই গ্রামে মোট দুশো পরিবার আছে। জীবিকা চাষবাষ। এরা সর্বক্ষণ পায়ে হেঁটে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাফেরা করে। কোনো গাড়ি এই গ্রামে নেই এমনকি সাইকেলও নয়। ফলে গ্রামটি এক চুপচাপ স্বপ্নের ভিতর দিয়ে যেন এগিয়ে যায়। আর এই মারাত্মক চুপচাপের জন্যই পল আর পলার আসা। দুজনে সব সময় বৈচিত্র চায়। দুজনের প্রেমও বেশ অন্যরকম। একসঙ্গে বেশ কাটাতে পারে বিয়ে ছাড়াই। দুজনে শুধু ঘোরে। অন্যরকম পর্যটন কেন্দ্রর খোঁজ খবর নেয়। সুযোগ বুঝে চলেও যায়।
রাতের নিঝুম অলকানন্দা গ্রামে পল ও পলার গাঢ় ঘুম হয়। সকালে হোম স্টে-র বারান্দায় বসে দূরের বহু দূরের ছায়া ছায়া টিলা দেখে। এই গ্রামে কিন্তু কাক নেই। আছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কোনো পাখি সবুজ। কোনোটা আবার হলুদ, মেরুন ইত্যাদি। গতকাল সকাল থেকে কোনো মন্দির মসজিদ চোখে পরেনি। এখানকার মানুষদের ঈশ্বর দেবতার সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই। তারা উলটে বিশ্বাস করে মানবধর্ম। মানুষের সেবাই এদের প্রধান কাজ। মানুষই মানুষকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। ভালবাসে। শ্রদ্ধা করে। ভক্তি করে। এছাড়া অন্য কিছু এখানে নেই। চা খেতে খেতে পল আর পলা ভাবে এই গ্রামটি কেমন নিখুঁত। পরিচ্ছন্ন। শান্ত।
গতকাল সন্ধ্যাতেও পলার সঙ্গে পলের এক প্রস্থ ঠান্ডা লড়াই হয়। লড়াইয়ের কারণটি এমন বিশেষ কিছু না। বিয়ে নিয়ে ডিনারের আগে পল পলাকে জিজ্ঞাসা করে বিয়েটা কবে সারবে! পলা উত্তর দেয় বছর খানকে বাদে। ব্যস সেই শুরু। বাক্যালাপ বন্ধ। ডাইনিং টেবিলে চুপচাপ খেয়ে ওঠা। শুয়ে পড়া। নির্জন রাতে পল-এর ঘুম আসে দেরিতে। শুয়ে শুয়ে ভাবে পলা কি নিষ্ঠুর! স্বার্থপর। আমার কাছ থেকে সব সুখ পেয়ে কি অন্যপুরুষের গলায় মালা দেবে! যদি তাইই হয় তবে আমাকে নাচানো কেন! মুখ ফুটে বলতেই পারে! যত দুশ্চিন্তা করে ততই পলা ধীরে ধীরে হিংস্র হয়ে ওঠে। মনে হচ্ছিল ঘুমের ভিতরেই ঘুষি মেরে পলার টিকালো নাক ভেঙ্গে দেয়। চোখের কালো মনি জোড়া খুবলে বার করে আনে! যাইহোক এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। রাত গভীর থেকে আরও গভীর হয়।
বারান্দার গ্রীলে একটি সবুজ পাখি। একটি মেরুন পাখি। চুপচাপ দুটি পাখি বসে। কোনো শব্দ নেই। ছায়া ছায়া টিলায় গা ঘেঁষে ছোটো ছোটো মানুষজন। হয়ত চাষবাসে ব্যস্ত। ভোরের নরম রোদ গ্রীল ফুটো করে মেঝেতে। পল মুখ ঘুরিয়ে প্রকৃতি দেখছে। গতকাল রাতের কথা মনে হতেই আবার ফুসছে। দু চোখের কোণে জমাট রক্তবিন্দু। ডান হাতের আঙুলে তাজা রক্তের রেখা। চটচটে রক্ত। পল এত হিংস্র হয়ে উঠবে ভাবেনি। মানুষরা কি সত্যিই এত হিংস্র হতে পারে!
২
পুরনো নাম রাজারহাট। পুরনো কিছু মানুষজন এখনও সেখানে বর্তমান। সরকার বহু জমিই নিয়ে নিয়েছে। দাম দিয়েছে পুরনো মূল্যে। সেই অর্থেই অনেকে নতুন ফ্ল্যাট নিয়েছে। গ্রাম্য চেহারাটি অদৃশ্য হয়ে আলোচিত ঝকঝকে। এক নতুন শহর। নতুন শহর আমাদের পুরনো ঘিঞ্জি শহরের থেকে অনেক পরিচ্ছন্ন। আলোকিত। যত্রতত্র আই. টি অফিস। রঙিন রাতের এই শহর বিজ্ঞাপনের বোর্ডে আরও নেশা ধরায়। মেট্রোপথ ও উড়ালপুলে বেশ মায়াবী মায়াবী লাগে। গাড়িগুলি চলাফেরা করে হুশ হাশ করে।
রাজারহাটে কখনও কোনো রাজা থাকে কিনা জানা নেই। তবে জায়গাটি চাষবাসের জন্য। দু-তিন ফসলের জমিও কিছু কিছু ছিল। সাধারণ মানুষরা গবাদি পশু হাঁস মুরগী পুষত। কিছু কিছু শান্ত পুকুর ছিল। মাঝে মাঝে জাল হত। জালে উঠত কত কাতলা মৃগেল রূপচাঁদ ইত্যাদি। রাজারহাট পালটে যায় সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। নাম হয় নিউ টাউন। কিন্তু এতসব পালটে যাওয়ার ভিতরে আনন্দের বাবা নিজেকে পালটাতে পারে না।
রাজারহাট যখন প্রাচীন তখন আনন্দের বয়স তিন। শৈশবের চোখ জোড়া দিয়ে দেখত বাবা কিভাবে লোক জনের সঙ্গে রোদে চাষ করে। ধানগাছ কাটে। গামছার ভিতর রুই, কাতলা বাড়িতে আনে। আনন্দ দিনের বেলার বাবাকে খুব ভালই চেনে। বাবার কাছে গিয়ে আদর খায়। স্নান করে। দুপুরে ভাত খায়। মটকা মেরে শুয়েও পড়ে। এই বাবা অনেক আপন। পরিচিত। অথচ রাত হলে আনন্দ অন্যবাবাকে দেখে। রাতে বাবা দুলতে দুলতে বাড়িতে ঢোকে। কারণে অকারণে চিৎকার করে। মাকে চেঁচিয়ে ডাকে। বকে। দু চোখ কেমন বড় বড় করে বলে খেতে দাও। খাওয়া দিতে একটু দেরি হলেই থালা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। রাগে গড়গড় করে। নিজে না খেয়ে শুয়ে পড়ে। আনন্দ শৈশব থেকেই রাতের বাবাকে ভয় পায়। রাতের বাবাকে অচেনা লাগে। রাতের বাবার জন্য রাগ হয়। অভিমান হয়। চোখে দেখতেও চায় না।
আনন্দ বড় হয়। ছড়ানো জমিজমা টিনের চালের বাড়িটি উধাও। পুকুর উধাও। গবাদি পশু নেই। হাঁস-মুরগী বিক্রি হয়ে গেছে। তারা এখন দু কামরার ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকে। বড় গরম ফ্ল্যাটে। খোলা মাঠ নেই। খোলা হাওয়া নেই। আকাশ ভরা তারা নেই। কিছুই নেই। শুধু একটা ছোট দোকান আছে। তাও বাড়ি থেকে বহুদূরে। পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। দোকানে বসে বাবা। আনন্দ বাস ধরে কলেজে যায়। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে। আনন্দের শৈশবে পুষে রাখা রাগ অভিমানও আনন্দের সঙ্গে বড় হয়। শৈশবে বাবাকে রাতের বেলায় দেখলে যেভাবে রাগে অভিমানে গড়গড় করে এখন সেই গড়গড় পালটে যায়। আনন্দ এখন প্রাপ্তবয়স্ক যুবক। ভোট দেয়। সিগারেট টানে। নিত্য বাবার বেচাল অবস্থা রাতে দেখলে শরীর যেন গরম হয়ে যায়। কাউকে কিছু বলে না। শুধু ভাবে মানুষটি কি চিরকাল নেশা করে পয়সা ধ্বংস করবে। একটুও পালটাবে না নিজেকে! অথচ রাজারহাট কত পালটে গেল!
এক শীতের সকাল। আনন্দ বারান্দায় চা খায়। একটু দূরে বাবাও চা খায়। আনন্দ ভাবে বাবার সঙ্গে একটু বোঝাপড়া করে নেবে। আনন্দ প্রশ্ন করে বাবা তুমি কি একদম নিজেকে পালটাবে না! কী ব্যাপার বলত? বাবা চা খেতে খেতে উত্তর দেয়। আনন্দ বলে আমি তোমাকে যা জিজ্ঞাসা করছি সেটা তো তুমি ভালই বুঝতে পারছ। ওহ! ওই জিনিসটা! আনন্দের চোখে চোখ না রেখে তার বাবা উত্তর দেয়। আবার বলে ওঠে এখনত প্রায় ছেড়েই দিয়েছি! এই কথা শুনে আনন্দ আরও রেগে ওঠে। বলে না একদম ছাড়নি। রক্তমাখা জোড়া চোখে আনন্দ বাবার দিকে তাকায়। মিথ্যা কথা বলবে না। এই বলেই আনন্দ হাতের কাপ সজোড়ে বাবার কপালে ছুঁড়ে মারে। বাবার কপাল ফেটে ঝরঝর করে কাঁচা রক্ত বেরিয়ে আসে। মানুষটি বাঁ হাত দিয়ে কপাল চেপে ঘরে ঢুকে পড়ে।
৩
আর কারা হিংস্র হয়ে উঠেছিল?
অনেকে। যেমন বিডন স্ট্রিটের ফুটপাতে একদিন দুটো রাস্তার কুকুর খুব ঝগড়া করছিল। সাদা কুকুরটি হলুদটাকে প্রায় একটি বাড়ির কানাগলিতে চেপে এমনভাবে সামনের লম্বা লম্বা দাঁতে কান ধরে টানাটানি করে যে হলুদটার কান কেটে ঝুলে যায়। গলগল করে কাঁচা রক্ত ফুটপাতে ছড়িয়ে পড়ে। শেষে হলুদটা চিৎকার করতে করতে হেদুয়ার দিকে চলে যায়।
বসন্তের এক ভোরের ময়দান। একদিকে সারি সারি অফিস বাড়ি। উলটো দিকে রেসকোর্স। তারও বেশ পিছনে দ্বিতীয় হুগলি সেতু। গঙ্গা। ভোরে ময়দানে হালকা হাওয়ায় অনেকেই শরীর চর্চা করে। ঘোড়ারা ঘাস খায় না। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে। ঘোড়ার মালিকরা গাছের ছায়ায় জমিয়ে গল্প করে। দেশের গল্প করে। একদিন হালকা ঠান্ডা ভোরে কি থেকে যেন কোথা থেকে যেন একটি কালো ঘোড়া সাদা ঘোড়াকে তাড়া করতে শুরু করে। এক সময় কালো ঘোড়াটি পিছনের পা দিয়ে সাদাটিকে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। করতেই থাকে। আত্মরক্ষার জন্য সাদাটি পালাবার চেষ্টা করলেও পালাতে পারে না। কালোটি সর্বক্ষণ সাদাটির সামনে এসে পথ আটকায়। আর পিছনের পা দুটি দিয়ে মারতেই থাকে। একসময় পিছনের পায়ের নালে সাদাটির পেট ছড়ে রক্ত ঝরতে শুরু করে। ঠিক তখনই সাদার মালিক গাছের ছায়া থেকে দৌড়ে রক্তাক্ত সাদা ঘোড়াটির কাছে এসে থামে।
আর কারা হিংস্র হয়ে উঠেছিল!
অনেকে। অনেকে।