Hello Testing

খে লা ই ডো স্কো প

হ্যালো টেস্টিং টিম

ইডেন গার্ডেনন্স: শহরকে দেওয়া এক কবির উপহার

১৮৩৬ সাল। আজ যা কলকাতা ময়দান নামে পরিচিত সেখানে তখন ছিল ঘন জঙ্গল। ইতিউতি কয়েক ঘর তাঁতির বাস। জঙ্গলময় অঞ্চলের পাশ দিয়ে বইছে হুগলি নদী। জলপথে হানা দেয় দস্যুর দল। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে ব্যাপারির নৌকো, ঔপনিবেশিকদের জাহাজ। এলাকার প্রধান ঘাট তখন ‘চাঁদপাল ঘাট’। জনৈক চন্দ্র নাথ পালের নামে নামকরণ হয়েছিল এই ঘাটের। মাঝিমাল্লা ও পথিকদের জন্য একটা মুদির দোকান বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘাটে এসেই মার্চ মাসের এক সকালে ভিড়েছিল নব-নির্বাচিত গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড-এর জাহাজ। পোশাকি ভারী পরিচয় ‘ফার্স্ট আর্ল অব অকল্যান্ড’-এর আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল তাঁর   প্রকৃত নাম, জর্জ ইডেন। সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর দুই বোন ফ্যানি ইডেন ও এমিলি ইডেন। এমিলি ইডেন ছিলেন কবি ও ঔপন্যাসিক। তাঁর দুটি সফল উপন্যাস: The Semi-Detached House (1859) এবং The Semi-Atached Couple (1860)।

তাঁদের বাসস্থান ছিল বর্তমান রাজভবন। রাজভবন চত্বরে বহু পশু-পাখি পোষা শুরু করলেন তাঁরা। তৈরি করলেন সুদৃশ্য এক বাগান। বিভিন্ন রকমের ফুল ও ফলের গাছ ছিল সেখানে। ছিল সুন্দর একটি পুকুরও। পুকুরের পাড়ে ছিল বসার জায়গা। বাগানের মধ্যে ছিল একটি বিশাল প্যাগোডা। বর্তমান মায়ানমারের প্রোম থেকে ভাগে ভাগে জাহাজে করে এনে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিল প্যাগোডাটি। সুসজ্জিত এই বাগানে শুধু দুই বোন ফ্যানি ইডেন ও এমিলি ইডেন নন সকাল-সন্ধ্যায় হাঁটতে আসতেন অভিজাত ইংরেজরা। তখন মুখে মুখে এর নাম ছিল ‘লেডি বাগান’। পোশাকি নাম ছিল ‘অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন’। ১৮৫৬ সালে দুই বোন ফ্যানি ইডেন ও এমিলি ইডেন-এর নাম থেকেই এই বাগানের নাম দেওয়া হয় ‘ইডেন গার্ডেনন্স’।

গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড

কবি ও ঔপন্যাসিক এমিলি ইডেন

১৮৬৪ সালে বাগানের কিছু অংশ আর বাগান সংলগ্ন খেলার মাঠ, সেই সময় যার নাম ছিল ‘লর্ড অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন’, নিয়ে তৈরি হল দেশের প্রথম এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম ‘ইডেন গার্ডেনস’। স্টেডিয়াম থেকে গঙ্গার দিকে হাঁটলে সেই বাগানের অবশিষ্ট খুব অল্প অংশ এখনও দেখতে পাওয়া যায়। সেই বার্মিজ প্যাগোডা আজও দাঁড়িয়ে আছে বাগানের এক প্রান্তে। অনেকেই ভুলে গেছেন এই বাগানের কথা। অনেকে জানেনও না এইসব ইতিহাস।

স্টেডিয়াম ছাড়াও ইডেন উদ্যানের বড় অংশ নিয়ে পরবর্তীকালে তৈরি হয় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম এবং আকাশবাণীর কার্যালয়। বাকি অংশ পড়ে থাকে লর্ড অকল্যান্ডের দুই বোনের স্মৃতি নিয়ে। খাতা কলমে ১৮৬৪ সালে স্টেডিয়ামের গোড়াপত্তনের অনেক আগে থেকে ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকেই এখানে ক্রিকেট খেলত ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে এই ক্লাবটি অবস্থিত। এই ক্লাবে ক্রিকেট ও ফুটবল ছাড়াও রাগবি, হকি, সাঁতার ও টেনিস বিভাগও রয়েছে। ১৭৯২ সালে ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’ নামে ব্রিটিশরা এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব ও বালিগঞ্জ ক্লাব এই ক্লাবের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব’ নাম ধারণ করে। এই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চুনী গোস্বামী, সুভাষ ভৌমিক, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, পি গাঙ্গুলি, শ্যাম থাপা, শান্ত মিত্র প্রমুখ ফুটবলার; কেশবচন্দ্র দত্ত, গুরবক্স সিং, ড. ভেস পেজ, আনন্দ মণ্ডপকা প্রমুখ হকি খেলোয়াড়; পূণ্য বি. ভুটিয়া, দিলীপ দোশী, এ গঙ্গোত্র, দেবাঙ্গ গান্ধী, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, সাবা করিম, অরুণ লাল, প্রণব রায়, বিশ্বজিৎ ভৌমিক প্রমুখ ক্রিকেটার এবং চিরদীপ মুখোপাধ্যায়, এনরিকো পিপারনো, লিয়েন্ডার পেজ প্রমুখ টেনিস খেলোয়াড়।

প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট ম্যাচ ইডেন গার্ডেনন্স-এ প্রথমবার খেলা হয় ১৯১৭-১৮ সালে। প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়েছিল ১৯৩৪ সালে, ৫ থেকে ৮ই জানুয়ারি। ভারত বনাম ইংল্যান্ড। ফলাফল ছিল ড্র। আর প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয় ১৯৮৭ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে। ১৯৮৩ সাল অব্দি ক্রিকেট বিশ্বকাপ শুধু ইংল্যান্ডে আয়োজিত হত। ১৯৮৭ সালে প্রথমবার ইংল্যান্ডের বাইরে আয়োজিত হয়েছিল আর তার ফাইনাল খেলা হয়েছিল ইডেন গার্ডেনন্স-এ।

বর্তমানে এই স্টেডিয়ামের মোট দর্শক ধারণক্ষমতা ৬৬,০০০ জন। এখনও পর্যন্ত এখানে সর্বমোট ৩৯টি টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে আর ২৮টি ওয়ান ডে ম্যাচ। হাল হামলের টি টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬ টি। ইডেন গার্ডেনন্স-এ সর্বোচ্চ রানের অধিকারী ভিভিএস লক্ষ্মণ (১২১৭ রান)। ১৯৯৬-২০১১ সময়ে সর্বমোট ১০ টি টেস্ট খেলেছেন। ৫ টি শতরান ও ৩ টি অর্ধশতরান রয়েছে। আর সর্বোচ্চ উইকেট লাভ করেছেন হরভজন সিং (৪৬ উইকেট), ১৯৯৯-২০১০ সময়ে সর্বমোট ৭ টি টেস্ট খেলেছেন। ১ টি ১০-উইকেট ও ৬ টি ৫-উইকেট শিকার রয়েছে। ২০১৪ সালের ১৩ই নভেম্বর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে রোহিত শর্মার ২৬৪ রান, ওয়ান ডে ক্রিকেটে এই মাঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। এখনও পর্যন্ত এই মাঠে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সংখ্যা ৭৭টি আর ওয়ান ডে ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সংখ্যা ১৫টি। ৫০একর জমির উপর অবস্থিত প্রাকৃতিক সবুজ ঘাস যুক্ত দেশের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়ামটির মালিকানা বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে আর এর পরিচালক ক্রিকেট এসোসিয়েশন অব বেঙ্গল। ভারতীয় ক্রিকেটের মক্কা নামে পরিচিত এই ইডেন গার্ডেনন্স পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়াম।