মু ক্ত গ দ্য
অ য় ন ঘো ষ
ঠিকানা বিভ্রাট ও নকশী কাঁথার মাঠ
সরকার বলছে সব কিছুরই বায়োমেট্রিক চাই। না হলে জীবনের ষোলো-আনাই ফাঁকি। আর আমরা আম-জনগন মানে সাধারণ পাবলিক কাজকর্ম বাদ দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছি। এখন বোধহয় কেবল শ্মশানেই বায়োমেট্রিক লাগছে না। কিছুদিন পরে হয়ত ওটাও লাগবে, বলবে বায়োমেট্রিক ম্যাচ না করলে চুল্লিতে ওঠানো যাবে না। তখন যে কি কেলোর কীর্তি হবে তাই ভেবে শিউরে উঠি মাঝে মাঝেই। যাই হোক গিন্নীর গুঁতোয় পড়ে আজকে গ্যাস অফিসের পানে রওনা দেওয়া। তিনি জানালেন ৩১ শে ডিসেম্বরের মধ্যে আঙুলের ছাপ না দিলে আঙুল চেটেপুটে দুবেলা খাওয়া নাকি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একতলার বোসবাবু, তিনতলার সেনবাবু সবারই হয়ে গেছে। কেবল আমিই নাকি এবিষয়ে পিছিয়ে আছি (আসলে এবিপি আনন্দ তো বেশি দেখা হয় না, তাই বোধহয়)। কিন্তু আমি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছি আগে খেলে বাঘে খায়, এক্ষেত্রে আগে গেলে! খবর পেয়েছি করোনার টীকা নেওয়ার সময় যেমন ভিড় হচ্ছিল তেমনই নাকি ভিড় হচ্ছে। অবশেষে আজকে সকাল দশটার কিছু পরে ধনিয়াখালি ভারত গ্যাস অফিসের পানে ভিড়ের ভয় মাথায় নিয়েই দুগ্গা দুগ্গা বলে যাত্রা শুরু করা গেল গায়ে একখান হুডি তার ওপর জ্যাকেট মাফলার চাপিয়ে। ঠান্ডাটা ভালোই পড়েছে। পৌঁছে দেখি লোকজনের লাইন নেই, বিলকুল ফাঁকা। ভাবলাম আজকে বন্ধ নাকি! অফিসে উঁকি দিতে দেখি কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে দুজন বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতে জানালেন, বায়োমেট্রিক হচ্ছে। মুখ দেখে মনে হল এইসব উটকো কাজ করতে করতে ভীষণ বিরক্ত। তাঁদের একজনের নির্দেশ মতো মেশিনের ওপর আঙুল রাখতেই এক মিনিটের মধ্যেই মিটে গেল কাজ। ও বাবা, এইটুকু ব্যাপার! তার মানে আমার বৃহস্পতি আজকে তুঙ্গে। অফিস থেকে বেরিয়ে ভাবলাম একটা সাপ্তাহিক ডিয়ার লটারির টিকিট কেটে নিলে কোটি খানেক লেগে যেতে পারে। যখন স্কুলে পড়তাম পাড়ার মুদিখানার দোকানে লটারি আসত। দশ পয়সায় একটা টিকিট ছিঁড়ে নং মিলিয়ে তেঁতুলের চাটনি ছাড়া আর কিছুই জোটেনি কোনোদিন। এত ভালো ভাগ্য! অথচ লটারির বোর্ডের মাঝে জ্বলজ্বল করত একটা বড় ঘড়ি, ভাগ্যবানের ঘর আলো করবে বলে। আমি তো হতভাগ্যদের দলে পড়ি, তাই সে আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি কোনোদিন। একেকবার ভাবতাম সব টিকিটগুলো কেটে নিই, তাহলেই ঘড়িটা আমার। কিন্তু পকেটে তো সর্বসাকুল্যে দশ পয়সাই থাকতো। তাই সেই ঘড়ি আর ঘরে আসেনি, পঁয়তাল্লিশ বছর কাটল। কিন্তু এখনও মনে তার নিত্য যাওয়া আসা।
তাড়াতাড়ি কাজ মিটে গেছে। এবার বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে এই জমাটি ঠান্ডায় কম্বল চড়িয়ে সুখে দিবা নিদ্রা যাব, এটা ভাবতেই দিল গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল। ভারত গ্যাসের অফিস থেকে বেরিয়ে বাইক চড়তে যাব, এমন সময় অচেনা নং থেকে একটা ফোন এল। ফোনের ওপারে যিনি ছিলেন তিনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে নাম জানতে চাইলেন। পরিচয় পর্ব মিটতেই তিনি জানালেন তিনি ভারতীয় ডাক-বিভাগের একজন কর্মী। আখরি-শ্রীরামপুর নামের একটি গ্রামীণ ডাকঘরে বর্তমানে কর্মরত। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন বিভাগের তরফ থেকে আমার নামের একটি চিঠি ওনার ডাকঘরে এসে পৌঁছেছে। আমি তো অবাক! জায়গাটার নাম শুনলেও সেটি আমার পরিচিত নয়। পশ্চিমবঙ্গে শ্রীরামপুর নামটি বহুল প্রচলিত। আমাদের হুগলি জেলাতেই অনেকগুলি শ্রীরামপুর। সেই বিভ্রাটে আমার বাড়ি বাসলা-শ্রীরামপুর থেকে সেই চিঠি প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের আখরি-শ্রীরামপুরে পৌঁছেছে যদিও পিনকোড আলাদা। মনে পড়ে গেলো ঝুম্পা লাহিড়ীর সেই গল্প ‘ব্যাধির ব্যাখ্যাকার’- এর কথা (Interpreter of Malafies)। যেখানে কাপাসি মিসেস দাসকে অতি যত্নে নিজের ঠিকানা লিখে দিয়েও বারবার ভয় পাচ্ছিলেন যদি কিছু ভুল হয়ে যায় তাহলে চিঠি হয়ত ওড়িশা পৌঁছাবে কিন্তু কাপাসির ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে খুব কাছের-দূর হয়ে রয়ে যাবে। এই যে আমরা এত মানুষের ফোন নং যত্ন করে সংরক্ষণ করি। ভাবুন তো একটা সংখ্যার এদিক ওদিক আর সেই মানুষটা আমাদের থেকে কত দূরে! তা ওনারা তো এত দূরে আমার কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন না। ভাগ্যিস ফোন নং ছিল, তাই ফোন করে জানাচ্ছেন। অনথ্যায় উনি চিঠিটি আমার ঠিকানায় পাঠানোর চেষ্টা করবেন কিন্তু কবে পাব তার কোন ঠিক নেই! এদিকে চিঠির বিষয়বস্তুটি খুবই জরুরি। আমি সেটি আসার অপেক্ষাতেই ছিলাম। তাই ওনার কাছ থেকে পথের হদিস জেনে নিয়ে রওনা দিলাম। ভাতঘুম মাথায় উঠল। বলেছিলেন চাঁপাডাঙ্গা পৌঁছে সামন্ত রোড ধরে কিছুটা এগোলেই সেই ডাকঘর। সামন্ত নামটা শুনেই মনের মধ্যে বেশ একটা জোশ এসে গেলো। রাস্তাটি দামোদরের পশ্চিম পাড়ে। নামের ইতিহাস সঠিক জানি না। কিন্তু ভেবে নিতে দোষ কী যে কোনো রাজার সৈন্য-সামন্ত হয়ত একদিন এই পথ ধরেই যুদ্ধে গিয়েছিল অথবা কোনো বিখ্যাত সামন্ত প্রভু নিজের রাজপাট সমেত এখানে বাস করে গেছেন, সেই থেকে এমন নাম। এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন আমাদের অমিতাভ হালদার দাদা। তিনি আঞ্চলিক ইতিহাসের লব্ধ-গবেষক। ঘুরে ঘুরে ক্ষেত্র-সমীক্ষা করে কাজ করেন। ওই অঞ্চলেই তাঁর ভদ্রাসন। যাই হোক চাঁপাডাঙা হয়ে দামোদরের উপর ব্রীজ পেরিয়ে পৌছালাম পুরশুরা। আরামবাগ থেকে চাঁপাডাঙা হয়ে অহল্যাবাই রোড সোজা চলে গেছে ডানকুনি। সেই রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ চলছে জোর কদমে। তাই চারিদিকে ভাঙাচোরা ও যানজট। সেইসব এড়িয়েই পুরশুরা থেকে আরো একটু এগিয়ে বাঁদিকে পড়ল সামন্ত রোড। রাস্তার অবস্থা ভালো না। কিন্তু রাস্তার দু-পাশে প্রসারিত মাঠ দিগন্ত রেখায় গিয়ে মিশেছে। গত বৃষ্টিতে আলু চাষের যেটুকু ক্ষতি হয়েছিল চাষীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একটু জ্যাঠো আলু যে ক্ষেতগুলোতে বসানো হয়েছিল, সেগুলোতে নধর চারা মাথা তুলে অবাক বিস্ময়ে পৃথিবী দেখছে। ভাবতেই কেমন একটা লাগছিল সেই কোন দু-হাজার কিলোমিটার দূর পাঞ্জাব থেকে কত পথ পাড়ি দিয়ে এইসব আলুর দল এসে উপস্থিত হয়েছে এই বাংলার জল হাওয়ায়। এসেছে পাঞ্জাবের কৃষকের যত্নে এক জীবন পেয়ে বাংলার চাষীর আদরে দ্বিতীয় জীবন ফলাতে। বাংলার মাটির গর্ভ আগামী দু-তিন মাসের জন্য এদের আশ্রয়। মাটি তো মানুষের মতো ভেদাভেদ করে না। সে আশ্রয় দিয়েই খুশি। তারপর কে যেন ওদের ডেকে বলবে ‘তরুণী ফিরাও নাবিক বন্দরের কাল হল শেষ’! তারপর আবার সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই পরিযায়ী জীবন। আচ্ছা কে বলে শুধু মানুষই অভিবাসী হয়? এদের জীবন কি এক ধরেনের অভিবাসী জীবন নয়! ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম একটা ঝাঁকড়া কাগজ ফুলের ছায়ায় এক কামরার ছোট্ট সেই ডাকঘরে। সব মিলিয়ে দুটি কর্মী। সেই দাদা, যিনি আমাকে ফোন করেছিলেন ও এক বয়স্কা দিদি। এই গতির যুগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সময় যেন এখানে থমকে গেছে। দু-চারটি চিঠি টেবিলের ওপর রোদ মেখে শুয়ে আছে। ঠিকানায় পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই। ওরা যেন Prufrock এর মতো বলছে, ‘এখনও অনেক সময় আছে হাতে। কি দরকার পৃথিবীকে বিরক্ত করে!’ আমার চিঠিটি ওদের মধ্যেই ছিল। তা সে বাকিদের বিদায় জানিয়ে আমার ব্যাগের মধ্যে সেঁধোলো।
ফিরতি পথে সেই দাদাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আখরি-শ্রীরামপুরের মধ্যে দিয়ে গাঁয়ের রাস্তা ধরলাম দামোদরের একবারে কোল ঘেঁষে যে বাঁধ সেই বাঁধে উঠব বলে। জীবন এখানে শীতের দামোদরের মতোই নিস্তরঙ্গ। অনেকেই দুপুরের খাওয়া সেরে বাড়ির সামনে রোদ পিঠ করে গল্পে মেতেছেন। ছায়া-ছায়া পুকুরঘাটে মা মাসিমার দল বাসনকোসন নিয়ে ব্যস্ত। জলে হাত ঢেউ উঠছে তিরতির করে। কাঁপছে আম জাম হিজলের নিভু নিভু ছায়া। আমার ডান হাতে বয়ে চলেছে দামোদর। শীতের দামোদর একটু সবজে রঙের। বেলা শেষের আদুরে রোদ শান্ত জলের বুকে পা ছড়িয়ে বসেছে। বাঁধের এই রাস্তা এসে উঠেছে পুরশুরা স্টপেজে। ফাইভ জি-র জেটযুগে এখানে জীবন এখনও কত সহজ কত সাবলীল। আমাদের গাঁ-গুলো এখনও এমনই। বাঁধের গায়ে ফাঁকা জায়গায় বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে। মাঝে মাঝে পেরিয়ে যাচ্ছে এক আধটা বাস ট্রেকার, মোটর বাইক, ভটভটি ও সাইকেল। বেশকিছু দোকান-দানি রয়েছে বাঁধের দু-পাশেই। একটা দোকানের নাম ‘রুপাই ফার্নিচার’। কোনো আসবাবের দোকানের এত সুন্দর নাম আমি দেখিনি। মনে পড়ল জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ আর তার সাজু ও রুপাইকে। কে জানে দোকানের মালিকের কার নাম রুপাই! দোকানের পিছনেই আদরের নকশী কাঁথা বিছিয়ে রেখেছে দামোদর। ভূগোলে কারা যেন বলে এ নাকি দুঃখের নদ! আমরা যারা দামোদরের দু-চরে বাস করি তারা জানি এর পলিতেই নরম হয়েছে আমাদের জীবন। সে কিছু নিলেও ফিরিয়ে দিয়েছে তার দ্বিগুণ। পথে দেখি একটা বাসের সামনে লেখা ‘বন্দর যাইবে’। এক পেট মানুষ নিয়ে সে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পৌঁছে দেয়। চলমান এই জীবনে তার যোগদানও কিছু কম নয়। মনে মনে ধন্যবাদ দিই ডাক-বিভাগকে। ভাগ্যিস এই ঠিকানা বিভ্রাট সে ঘটিয়েছিল। না হলে কি পেতাম দুচোখ মেলে এই নকশী কাঁথার যাপন দেখার সুযোগ!