ভ্র ম ণ
ঈশানী রায়চৌধুরী
মাউন্ট টিটলিস— সুইৎজারল্যান্ডে অন্যতম সেরা আকর্ষণ
উরি আল্পসের এক পর্বতের নাম টিটলিস (Titlis)। পর্যটকদের কাছে সুইৎজারল্যান্ডে অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই টিটলিস। উচ্চতায়, গরিমায় তুলনাবিহীন এই শৃঙ্গ সারা বছরই তুষারাচ্ছাদিত থাকে। অল্পদিনের প্যাকেজ ট্যুরেও যারা ইওরোপ বেড়াতে আসেন, জুংফ্রাউ আর টিটলিস— এদেশের সেরা দুই শৃঙ্গ না দেখে ফেরেন না। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৩২৩৮ মিটার বা ১০৬২৩ ফিট । ওবওয়াল্ডেন আর বার্ন সেনানিবাসের সীমান্তে অবস্থিত। মধ্য সুইৎজারল্যান্ডে সুসটেন পাসের উত্তরের সর্বোচ্চ শীর্ষ এই টিটলিস।
আমাদের সেবারের ইওরোপ ট্যুরে, বড় দিনের ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর (২০১৯) অনেক কৌতুহল আর আগ্রহ নিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম টিটলিস দেখতে। চারিদিকে ছুটির আবহাওয়া। জুরিখ স্টেশন থেকে আমরা যাচ্ছি এঙ্গেলবার্গ, প্রায় দু-ঘন্টার রেলসফর। মাউন্ট টিটলিসের বেস স্টেশন হল এঙ্গেলবার্গ। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাসের জন্যে লাইন দিতে হল… সময়টা যেহেতু ক্রীসমাসের তাই পর্যটকদের বাড়াবাড়ি। লাইনে একটু সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতেই খপ করে ধরে ফেলল ছেলে। ব্যস শুরু হয়ে গেল কবে কলকাতা বইমেলায় আমি একে পাশ কাটিয়ে ওকে টপকে আনন্দ পাবলিশার্সের দোকানে ঢুকে পড়েছিলাম সেই গল্প। উফ্ যার ঘরেই এত কড়া নজরদারি তার কি আর শান্তি আছে! অতঃপর না শোনার ভান করেই পৌঁছে গেলাম বাসে।
বাস নিয়ে এল কেবলকার স্টেশনে। এখানে বর্ষাতি, বরফে হাঁটার জুতো সবই ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে। যদিও আমরা টোট্যালি ইকুইপ্ট। শুধু আমার কত্তামশাই হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তিনি মাঙ্কিক্যাপ আনেননি ওপরে মাইনাস কত ডিগ্রী কে জানে! অতএব তিনি ওখানেই দোকানে ঢুকলেন টুপি কিনতে। আমরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাদের লাইন দিয়ে টিকেট কিনতে হবে না… সেসসব অনলাইনেই কাটা আছে। পাঁচ মিনিট… দশ মিনিট… পনেরো মিনিট কত্তামশাই-এর দেখা নেই। কি হল রে বাবা! ছেলে বলল মা তুমি এখানে চুপ করে দাঁড়াও আমি বাবাকে খুঁজে আনি। একটু পরে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বীরদর্পে ফিরলেন তিনি। আমরা গেট পেরিয়ে কেবলকারের লাইনে ঢুকলাম এবার। বাপরে আজকেই এত লোককে এখানে আসতে হল! ক্রাচ নিয়ে মানুষও যাচ্ছেন আবার এক্বেবারে ল্যাপবেবি নিয়েও দম্পতি লাইনে সঙ্গে পেরাম্বুলেটর। আসলে এত সহজ এই জার্নি যে যাত্রীদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। ছেলে একটু চিন্তিত, বিকেল চারটের মধ্যে নিচে নেমে আসতেই হবে তারপর শৃঙ্গের আবহাওয়া বদল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সামিট স্টেশন থেকে সম্ভবত বিকেল সাড়ে চারটেয় লাস্ট গন্ডোলা। এখন ভরা শীতকাল তাই সন্ধেও তাড়াতাড়ি হবে।
অবশেষে আমাদের টার্ন এল। আমরা কেবলকারে বসলাম। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উঠছি, ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে নীচের ঘরবাড়ি দৃশ্যপট। এত উল্লম্ব কেবলকারে কোনোদিন ট্রাভেল করিনি। ওপর থেকে যেগুলো নামছে তার গতি দেখে বুকটা দুরদুর করছে। চোখ সরিয়ে নিলাম… কঠিন পাথুরে অবয়ব এখন ধীরে ধীরে এখানে ওখানে বরফের ক্রীম মাখছে। কোথাও পাথরের ফাঁকে মাথা তুলে আছে গুল্ম। যত ওপরে উঠছি ক্রমশ বরফের মধ্যে আত্মসমর্পণ করছে পর্বত। আমরা এলাম ট্রুপসে। অসাধারণ অভিজ্ঞত। বরফের প্লেট মনে হচ্ছে। আর আমরা খেলনার মত সেখানে হেঁটে বেড়াচ্ছি। কোথাও একটা ছাউনি থেকে ক্রিস্টাল ঝালর ঝুলছে কোথাও বরফের বল নিয়ে খেলছে হঠাৎ ছোটো হয়ে যাওয়া বড়োরা। না, বরফ বলতে আমরা যা বুঝি এ একেবারেই তা নয়। একে হিমানী বা তুষার বলা যায়। এর ননীর মত কোমল লুকে চোখ আটকে রাখে। চতুর্দিকে ক্লিফ ওয়াক চলছে। দূর থেকে কাছে এসেই আবার দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে স্কীয়াররা। মন ডানা ঝাপটাচ্ছে ; পায়ের শেকল ছিঁড়তে পারছে না। তবু এই অসীম নীল আকাশের তলায় তুষারের নরম আলিঙ্গনে এই যে দাঁড়িয়ে আছি… আমার জন্যে তাই বা কম কি। যতই ছেলেকে বলি আমাদের দেশ কোনো অংশে কম সুন্দর নয়, তবু সুইৎজারল্যান্ডের এই অনায়াস ভ্রমণ দশহাজার ফুটের নিভৃত তুষার আলয়ে… সারা জীবন ভুলতে পারব না। আমাদের হিমালয় দেবতাত্মা। তার ঐশ্বরিক মহিমা তাকে পৃথিবীর সব পর্বত থেকে বিশিষ্ট করেছে। আর দেবতা বলেই হয়তো তিনি সবাইকে কাছে আসতে দেন না।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্ট্যান্ড। এরিয়াল ট্রামওয়ে/রিভার্সেবল রোপওয়ে, টিটলিস। টিটলিস রোটায়ার বিশ্বের প্রথম রিভলভিং এরিয়াল কেবলওয়ে। আমরা যদি এই বায়ুযাত্রায় একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি তবু ৩৬০ ডিগ্রী অতুলনীয় প্যানোরমা উপভোগ করতে পারব! এই রোটায়ার তুষারাচ্ছাদিত টিটলিস চূড়ার কাছে খুব কাছে নিয়ে যায় চোখ। সর্বোচ্চ চূড়ায় টিটলিস গ্লেসিয়ারের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া যায় আইস ফ্লায়ারের সাহায্যে। থাক পরজন্মের জন্য তোলা থাক সেই সুখ!
রোটায়ারে আগেই জায়গা নিলাম স্বচ্ছ বেষ্টনীর গায়ে… একটুও দৃশ্য যেন বাদ না পড়ে। ক্যামেরার চোখে খুলে যাচ্ছে স্বপ্নের দেশ। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছি স্থির হয়ে। ধীরে ধীরে রোটায়ার ঘুরছে আর পর্বতের নিজস্ব ঐশ্বর্য ভেসে উঠছে চোখের ওপর। কেউ কথা বলছে না… একমনে অনুভব করছে। ওটা… ওটা কি গুহা? কেশর ফোলানো সিংহের মত কে বসে ওখানে! নিরবচ্ছিন্ন তুষারের একটা জাদু আছে। কোথাও কোনো মালিন্য নেই, শান্ত শুভ্র রঙের স্বর্গের ঠিকানা।
অবশেষে রোটায়ার নিয়ে এল সামিট স্টেশনে। চতুর্দিকে কাঁচ বা ভিজিবল কোনো মেটিরিয়ালের বেষ্টনী। বহু মানুষের সঙ্গে আমার কত্তামশাইও ওখান থেকেই দেখবেন বলে ঠিক করলেন। বেরিয়ে পড়লাম আমি আর ছেলে। সামনে রেলিং দিয়ে ঘেরা বাঁধানো চত্বর। নানা জাতের ক্যামেরা নিয়ে নানারকম মানুষ ভয়ানক ব্যস্ত। আমি খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম… তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে ক্যামেরা নিয়ে রেলিংয়ের ধারে যেতেই তীব্র হাওয়ায় আমার মাথার টুপি খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ত হাওয়ায় আমার কান মনে হল খুলে পড়ে যাবে। মাথা মুখ অসাড়। এই ঠান্ডার তীব্রতা বোঝানো আমার অসাধ্য। কোনোরকমে ক্যামেরা কাঁধে ফেলে দু-হাতে টুপি আঁকড়ে আবার মাথা মুখ ঢেকে মাফলার দিয়ে কষে বাঁধলাম। ঘোষণা হয়ে গেল যুদ্ধ। নে এবার ওড়া দেখি!
এবার মোবাইল বার করলাম ছবি তুলব আর চটজলদি বন্ধুদের পাঠাব এই ভেবে। তবে গ্লাভস পরা হাতে মোবাইল অপারেট করা যাচ্ছে না বলে ডানহাতের গ্লাভস খুলে ফেললাম… দু-সেকেন্ডও লাগল না আঙুল স্টিফ হয়ে যেতে। একি এই হাতটা কার? আমার কি জন্ম থেকে ডানহাতের পাতা নেই! জয় বাবা টিটলিস বলে উলেন গারমেন্টে প্রাণপনে হাত ঘষতে লাগলাম। তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ছবি তুলছি আর দাঁত ঠকঠক করতে করতে বলে চলেছি এটা সেটা কথা। আমার ছেলে প্রায় আধঘন্টা বরফের মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে এল। এবার তাঁর অভিজ্ঞতা মাকে না দেখালেই নয়! বৃথা আপত্তি করার চেষ্টা করলাম না। একটা সরু শৈলশিরার মত রাস্তা দিয়ে সে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। এইরে আমার তো ভার্টিগো আছে। ঝপাস করে চোখ বন্ধ করে নিলাম। আর কোনো ভয় নেই। রাস্তাটা পেরিয়ে বরফের ঢালু মাথায় পৌঁছে ছেলে বলল, ‘একি মা চোখ খোলো।‘ আমি চোখ খুলে চারদিকে তাকিয়ে দেখি আকাশটা প্রায় আমার মাথায় ঠেকে যাচ্ছে! নৈসর্গিক অনুভূতি। আর পায়ের তলায় বরফের ছাদটা ক্রমশ ঢালু হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে খাদে। আমার হঠাৎ মনে হল মাধ্যাকর্ষণ এখানে কাজ করবে তো? হাসবেন না প্লীজ! খপ করে চেপে ধরলাম ছেলের হাত… ধারে যেও না, আর যাবে না। হাওয়ার ঝাপটায় আমি বেসামাল হলে তুমি বিপদে পড়বে। ছবি তোলার কোনো চেষ্টার কথা কল্পনাতেও এল না। আস্তে আস্তে ফেরার পথ ধরলাম… বাঁধানো চত্বরটায় পৌঁছে দম নিলাম। তারপর ঘড়ি দেখে ফেরার লাইনে।
কেমন লেগেছে? ওসব পরে ভাবব হোটেলের গরম ঘরে বসে। এখন কেবলকারে চড়ে বসেছি লাস্ট ল্যাপ কভার করব বলে হঠাৎ একজন ভিনদেশী উঠলেন, সঙ্গে একটা নেকড়ে। হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন চেহারা দেখলে নেকড়ে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারবেন না। এটি নিশ্চয়ই তাঁর পোষা। যাই হোক গরম পোষাকের নীচে আমি কুলকুল করে ঘামছি। সেই অতি ভদ্র পোষ্য অবশ্য শান্তভাবে পায়ের কাছে বসে রইল। অবশেষে পৌঁছলাম গন্তব্যে। শেষ হল আমাদের জার্নি। সুইৎজারল্যান্ডে আজই আমাদের শেষ রাত। আগামীকাল থেকে প্যারাডাইস লস্ট।