ভ্র ম ণ
রাহুল পাত্র
কোন্নগরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বাগানবাড়ি
ছোটোবেলায় এই জায়গাটায় খেলতে খেলতে মাঝে মধ্যে যেতাম তবে কোনোদিনও জানতে পারিনি এটাই ছিল সেই বিখ্যাত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বাগানবাড়ি। জানতে পেরেছি আজ। আমার বাড়ি থেকে হেঁটে মাত্র ২-৩ মিনিটের পথ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীরামপুর লোকসভার সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপাড়া ভূতপূর্ব বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল এবং কোন্নগর পৌরসভার ভূতপূর্ব পৌরপ্রধান এবং বর্তমান বোর্ড অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায় মহাশয়-এর ঐকান্তিক হস্তক্ষেপে দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই বাগানবাড়িটি প্রোমোটারি চক্র থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৯ সালের ৫ ই ফেব্রুয়ারি বাগানবাড়িটি কোন্নগর পৌরসভার নামে রেজিস্ট্রিকৃত হয়। বর্তমান পৌরপিতা শ্রী স্বপন দাস মহোদয়ও খুব সুন্দর করেই সাজিয়ে দিয়েছেন এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিকে। আসলে বর্তমানে শহর হলেও পূর্বে কোন্নগর ছিল একটি ছায়াঘেরা গ্রাম। এই ছায়াঘেরা প্রকৃতিতেই গড়ে উঠেছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগানবাড়িটি। এই বাড়িটি ছিল অবনীন্দ্রনাথের পিতা গুণেন্দ্রনাথ-এর। কোন্নগরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন ফিটন গাড়িতে করে। ছিলেন মা, পিসিমারা। সাথে এসেছিলেন ভাই-বোনেরাও। এই বাগানবাড়িতে বসেই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রজাপতিকে সুতা দিয়ে বেঁধে খেলা করতেন, কখনও বাগানবাড়ির সিঁড়িতে বসে দেখতেন প্রবহমান গঙ্গা, ভাসমান নৌকা। কোন্নগরের বাড়িতেই একসময় সাঁতার কাটা, নৌকা বাওয়া, শিকার ধরা ইত্যাদি স্বপ্নের মতো কেটেছে অবন ঠাকুরের ছেলেবেলার কিছুটা পর্ব।
শোনা যায়, এখানে ছিল একটা কাঁঠালগাছ। এই কাঁঠালগাছকে কেন্দ্র করে আছে অনেক স্মৃতি। বাগানবাড়ির দায়িত্বে থাকা চাটুজ্জে মহাশয় বালক অবনীন্দ্রনাথকে মজা করে বলতেন- এই কাঁঠালগাছের তলায় কাঠবিড়ালির সাথে তার বিয়ে হবে। এই বাগানবাড়িতে একসময় বহুরূপীর দল নাচ দেখাতে আসতো। কোন্নগরে বসবাসকালে অবনীন্দ্রনাথ প্রথম গান গাইতে শিখেছিলেন, ছবি আঁকতে শিখেছিলেন। এঁকেছিলেন কুঁড়েঘরের ছবি। তাঁর চিত্রচর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল কোন্নগরে বসেই আর আমরা জানি আজ ভুবনবিজয়ী চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ সর্বজনবিদিত। সুতরাং কোন্নগরকে কেন্দ্র করে তাঁর এই চিত্রনির্মাণের ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শোনা যায়, এই বাড়িতেই নাকি একটা সময় ছোটখাটো একটি চিড়িয়াখানাও ছিল এবং নানারকম অচেনা অজানা গাছপালাও ছিল। অবনীন্দ্রনাথের ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ বইতে ছড়িয়ে আছে কোন্নগরকে কেন্দ্র করে এরকম অজস্র নানান স্মৃতির টুকরো কথা। একটা সময় এই বাগানবাড়ি বেহাত হয়ে গিয়েছিল এবং এক বিরাট বহুতল হবে এই বাড়ি ভেঙে – এই খবর শোনা গিয়েছিল। তবে আমাদের পৌরপ্রধান সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আজ এই বাড়িটিকে এ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। হেরিটেজ কমিশন একে ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’ তকমা দিয়েছে।
বর্তমানে এই বাড়িটিকে সংস্কার করে পুরো নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে এবং এর গঙ্গার পাড় বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গার পাড়টি অত্যন্ত চমৎকার এবং দেখবার মতো। এইভাবে অবনীন্দ্রস্মৃতি আজও অক্ষত হয়ে আছে কোন্নগরের বুকে। কোন্নগরে এলে অবশ্যই একবার এই স্মৃতিবিজড়িত বাগানবাড়িটি ঘুরে যান। এই বাগানবাড়িতে একসময় রবীন্দ্রনাথের আসা-যাওয়া ছিল। বাড়ির সামনেই রয়েছে একটি গঙ্গার ঘাট আর তার উল্টো দিকেই পানিহাটি। সেখানে ছিল ঠাকুরদের আরেকটি বাড়ি, যার নাম ‘পেনেটির বাগানবাড়ি’। রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’তে এই পেনেটির বাগানবাড়ির কথা বলেছেন। সুতরাং আসা-যাওয়া চলতই। অনেক অচেনা-অজানা ইতিহাস ছড়িয়ে আছে এই বাড়ির আনাচে-কানাচে। সেই সকল ইতিহাসের সর্বোপরি সেই সময়কার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হবেন আপনারা।