গ ল্প

দি লী প &nbspকু মা র &nbspঘো ষ

dilip

কলপ

নমিতার টিকটিকানির শেষ নেই। ‘অ্যাঁ, লোকে বাহাত্তরে কলপ করছে আর তুমি বিয়াল্লিশেই কিনা লজ্জা পাচ্ছ! আদিখ্যেতা দেখলে বাঁচি না! তোমার সঙ্গে বেরলে এমনভাবে লোকে তাকায়!’

‘ভাবে বোধহয়, সঙ্গের আধবুড়োটা কে?… কিন্তু নমিতা, এতে তো তোমার প্রাউড ফিল করা উচিত। তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন?’

‘লজ্জা পাচ্ছি কেন, সে তুমি আর কী বুঝবে! করতে যদি গার্লস স্কুলে চাকরি, তো বুঝতে। শাড়ি-গয়না-সাজগোজের মতো বরও যে একটা দেখানোর জিনিস, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি তোমার ঘটে আছে!’

‘বর তো লোকে বিয়ের সময় দেখতে আসে! বিয়ের পনেরো বছর পরও বর দেখাতে হবে? কী দিনকাল এল!’

‘বাজে বোকো না। কান খুলে শুনে রাখো। চুলে কলপ না-করা অবস্থায় তুমি কক্ষনও আমার কোনও কলিগের মুখোমুখি হবে না।’

অবিনাশ আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলেন, ‘তোমার কলিগদের মুখোমুখি হতে না বলে তুমি আমাকে বাঁচালে নমিতা।’

আত্মবিশ্বাস দেখাতে গিয়ে অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে ফ্যাসাদে পড়লেন অবিনাশ। কয়েকদিন ধরে নমিতা বার বার অবিনাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন আর যেন কিছু বুঝে নিচ্ছেন সেইভাবে ঘাড় নাড়ছিলেন। অবিনাশ বুঝতে পারছিলেন না ব্যাপারটা কী! এক রাতে আদিম ইচ্ছা এবং অধুনাতম চিন্তা নমিতাকে পেড়ে ফেলল। অবিনাশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে— হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো— তিনি অবিনাশকে ধরে টানা-হ্যাঁচড়া শুরু করলেন। ঝাঁকুনি দিতে দিতে ফুঁপিয়ে উঠলেন, ‘তুমি আমাকে আর ভালবাস না, অন্য কাউকে ভালবাস। তুমি নিশ্চয়ই অন্য কোনও মেয়ের প্রেমে পড়েছ।… তোমার লজ্জা করে না এই বয়সে প্রেম করে বেড়াতে! কিন্তু… কিন্তু, এত সহজে তুমি আমার হাত থেকে ছাড়া পাবে না। আমি তোমাকে ছাড়ব না। আমি… আমি তোমাদের দু’জনেরই পিন্ডি চটকাব…’

পরদিন সকালে খাওয়ার টেবিলে নমিতা কথাটা আবার পাড়লেন। এবার অবশ্য অন্য অ্যাঙ্গেলে। ‘আমি এখন বুঝতে পারছি তুমি কেন চুলে কলপ করছ না।’

খাওয়া থামিয়ে অবিনাশ নমিতার মুখের দিকে তাকালেন। ‘… যে আধবুড়ি ডাইনিটার তুমি প্রেমে পড়েছ, সেই ডাইনিটাই তোমাকে চুলে কলপ করতে বারণ করেছে।’

অবিনাশ না-হেসে পারলেন না। মেলাবেন, তিনি মেলাবেন! ‘আচ্ছা নমিতা, সত্যিই যদি এমন হত, তা হলে সেই পাকা চুলের মহিলা কলপ করলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।’

‘দেখো অবিনাশ, ভাল হবে না কিন্তু! ভেবো না এত সহজে আমাকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে। কোথাও কিছু করলে আমার হাতে ঠিক ধরা পড়বেই। দেখব, তখন কোথায় থাকে তোমার এই ডায়লগবাজি!’

ধর্মপত্নীদের সন্দেহ যে কী মারাত্মক হতে পারে অবিনাশ তা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন! যখন তখন ফোন করে জানতে চাওয়া— কোথায় আছ, কী করছ, ফোন বিজি পেলে গোয়েন্দার মতো জেরা, ফিরতে একটু দেরি হলে সন্দিগ্ধ চোখে তাকানো, নতুন প্যান্ট-শার্ট-শ্যু পরলে ভুরু কোঁচকানো, কোনও দিন টিফিন নিয়ে যেতে না-চাইলে একরাশ জিজ্ঞাসাবাদ। নমিতার সন্দেহের ঠেলায় অবিনাশ জেরবার হয়ে যেতে লাগলেন।

একরাতে অনিন্দিতা টিউটোরিয়াল থেকে বাড়ি ফিরে বলল, ‘বাবা, তুমি আর আমাকে আনতে যেও না, আমি একাই চলে আসব।’

নমিতা জানতে চাইলেন, ‘বাবাকে যেতে বারণ করছিস কেন?’

‘রিমিরা বাবাকে নিয়ে লেগ পুল করে। আজ স্যারকে রিয়া বলল, “স্যার, তাড়াতাড়ি ছুটি দিন। অনির বুড়ো-বাবা নিতে এসে গেছে।” আমার এসব একদম ভাল লাগছে না, মা!’

‘সেটা তোমার আদরের বাবাকে বুঝিয়ে বলো।…  কলপ করতে বলেছিলাম বলে তুমিই একদিন বলেছিলে না, বাবাকে জোর করছ কেন? তোমার তো চুল নয়।… এখন বুঝছ নিশ্চয়ই, কেন বলেছিলাম!’

এবার অবিনাশের দিকে ফিরে তোপ দাগলেন নমিতা, ‘শেষবারের মতো তোমাকে বলছি, তোমার এই ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা না-ভাঙলে আমি কিন্তু কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ছাড়ব!’

নমিতার কথায় পাত্তা না-দিয়ে অবিনাশ মেয়েকে বললেন, ‘অনি, আমি কলপ করলে ওরা আর তোর পিছনে লাগবে না বলছিস?’

‘জানি না। কিন্তু তোমার নামে কেউ কিছু বললে আমার সহ্য হয় না, বাবা।’

‘ধর, আমার একটা পা ভেঙে গেল, তখন আমাকে ওরা তোর খোঁড়া-বাবা বলবে নিশ্চয়ই। কলপ করলে না-হয় বুড়ো থেকে ছোঁড়া বনে যাব, কিন্তু এই বয়সে পা ভাঙলে তো সারাজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হবে। তখন তাহলে তুই আমাকে কী করতে বলবি?’

অনিন্দিতা মুখ খোলার আগেই নমিতা ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, ‘দেখো, দেড়-দু’বছর ধরে তোমার অনেক ধানাই-পানাই শুনেছি। আর কিচ্ছু শুনব না।… তোমার আসলে ব্যাপারটা কী বলো তো? তুমি চুলে কলপ করবে না কেন?’

‘কেন করব, সেটাই আমার কাছে পরিষ্কার নয়। এই বিয়াল্লিশেই স্বাভাবিক ক্ষয়ের নিয়মে শরীরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি শুরু হয়েছে। তার কোনও কিছুকেই আটকানোর জন্য কিছু না-করে, চুলটা শুধু বাইরে থেকে দেখা যায় বলে সেটাকে নিয়েই পড়তে হবে?’

‘সবাই কলপ করছে কেন?’

‘সবাই করছে বলে আমাকেও করতে হবে? আমার ইচ্ছা হয়নি, আমি করিনি। নিজের শরীর নিয়ে নিজের ইচ্ছার কোনও দাম নেই?’

‘থাকো তুমি তোমার ওই ইচ্ছা নিয়ে। আর আমি শুনে মরি, তোর বরটা ওরকম বুড়িয়ে যাচ্ছে কেন রে? নজর দিচ্ছিস না বুঝি? মেয়েকে শুনতে হোক, বুড়ো-বাবা। যত্তসব!’

অবিনাশের মনে পড়ল কয়েক দিন আগে সুমিত দত্ত কেমন একটা চাপা অহঙ্কারের সঙ্গে বলছিলেন, ‘জানো অবিনাশ, আমার মেয়ের বন্ধুরা আমাকেই ওর বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে দিয়েছে! সুমিকে একদিন কলেজের সামনে থেকে বাইকে তুলে নিয়েছিলাম। পরদিন কলেজে যেতেই সবাই নাকি ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ‘‘এমন ইয়াং-হ্যান্ডসাম-স্মার্ট ড্যুড জোটালি কোত্থেকে?’’ সুমির মুখে এটা শুনে মিসেসের হাসি আর থামে না।’

সেদিন আবার অমরেশ চ্যাটার্জি গজগজ করছিলেন, ‘বুঝলে অবিনাশ, মিসেসকে নিয়ে আর পার্টি-লাইফ লিড করা যাচ্ছে না। মিড-থার্টিতেই এমন মুটিয়ে গেছে যে, আমার সঙ্গে একদম ম্যাচ করে না। কী হবে নিজে এমন ছিপছিপে-ম্যাচো থেকে, যদি পার্টনারের ফিগার স্লিম-সেক্সি না-থাকে!’

মাঝে মাঝে অবিনাশ অবিশ্যি মজা পান যখন তাঁর থেকে দশ-পনেরো বছরেরও বেশি বয়সি চুলে কলপ-করা নারী-পুরুষ তাঁকে ‘দাদা’ সম্বোধন করে বলেন, ‘আপনি আমার থেকে নিশ্চয়ই দু-তিন বছরের বেশি বড় হবেন না, বলুন?’ কিংবা ‘আপনার চুল পেকে গেলে কী হবে, আপনাকে দেখলে কিন্তু চল্লিশ-বিয়াল্লিশের বেশি একদম মনে হয় না।’

বয়স নিয়ে মানুষ কী অদ্ভুত কমপ্লেক্সে ভোগে! আগে তবু মেয়েদের বয়স একুশের পর বাড়ত না। এখন তো ছেলেদের বয়সও আর তিরিশের এপাশে আসে না। তাঁর অফিসের সুকুমারেরই তো বয়স ছ’বছরে আঠাশ থেকে ঊনতিরিশ হয়েছে, আর পল্লবের বয়স পাঁচ বছর ধরে তিরিশেই আটকে আছে।

অথচ… মনগুলো সব কেমন কুড়িতেই বুড়িয়ে যাচ্ছে। সেদিকে খেয়াল থাকলে তো!

অবিনাশের সাধনা মনটাকে চিরতরুণ রাখা। সেটা রাখতে পারলেই যথেষ্ট। তিনি বুঝে নিয়েছেন শরীর স্বাভাবিক নিয়মে যেমন বয়ে যাওয়ার বয়ে যাবে। চুলে কলপ করে তাকে আটকাতে যাওয়া অর্থহীন ।

একদিন অনিন্দিতা জানতে চাইল, ‘বাবা, সপ্তর্ষির বাবা তোমার থেকে বড়, না ছোট?’

‘কেন রে?’

‘না, আজকে দেখলাম কিনা। চুল সব তোমার থেকেও বেশি পেকে গেছে।’

চমকে উঠলেন অবিনাশ! এই তো মাস দুয়েক আগে অমিতাভের সঙ্গে বাজারে দেখা হল, কই তিনি কিছু খেয়াল করেননি তো! অমিতাভ বছরখানেক বড় হবে বোধহয়। এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত। মাধ্যমিকে ডিস্ট্রিক্টে ফার্স্ট হয়েছিল। এখন অমিতাভ নাম-করা এমএনসি-তে চাকরি করে। মস্ত ইঞ্জিনিয়ার, সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু… কিন্তু কর্পোরেট লাইফস্টাইলও অমিতাভের চুলে কালি লাগাতে পারেনি! অনেককেই তিনি বলতে শুনেছেন, তাঁদের পেশাই এমন যে চুলে কলপ না-করলে চলে না। হবে হয়তো! মানুষই তো মিথ তৈরি করে। অবিনাশের হঠাৎই অমিতাভকে একবার খুব দেখতে ইচ্ছা করল।