মু ক্ত গ দ্য
আ ভা স র কা র ম ণ্ড ল
জোৎস্না রাতে মোহময়ী মায়ার ঝরনায়
ঘুমোতে যাবার আগে শোবার ঘরের পর্দা সরিয়ে জানলাটা খুলে দিতেই জ্যোৎস্নার ঢল যেন আছড়ে পড়ল ঘরে। অবাক হলাম। জানালাটা না খুললে জানতামই না প্রকৃতির এই আয়োজনের কথা। আজ পূর্ণিমা। চারদিক স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। ঘরের আলো বন্ধ করে বারান্দায় এসে বসলাম। বারান্দার পাশের নিম গাছের পাতাগুলো জ্যোৎস্নালোকিত হওয়ার সুখে ঝিকমিক করছে। আমার আওয়াজ পেয়েই কিনা জানি না পাখিরা ডানা ঝাপটে নড়েচড়ে বসল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বড় গোলাকার চাঁদটা দেখা যাচ্ছে। পূর্ণিমার চাঁদ দেখলেই মনে পড়ে যায় কবি সুকান্তকে! মনে পড়ে ঝলসানো রুটির কথা। একটু দূরে তাকাতেই দেখতে পেলাম আমাদের বাড়ির একটু দূর বয়ে চলা ছোটো নদীটাকে। রাতটা বড়ো মায়াবী মনে হচ্ছে। আমি যেন ডুবে যাচ্ছি সেই মোহময়ী মায়ার ঝরনায়।
আমাদের পাড়ার পরান পাগলা প্রতিদিনের মতোই গান করতে করতে বিজ্ঞের মতো হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। পৃথিবীর সব জ্ঞান যেন তার ঝোলায় ভরা! তার সারা শরীরে কার আস্কারা যেন জ্যোৎস্না হয়ে হাত বুলাচ্ছে।
ভেসে আসছে কামিনী ফুলের তীব্র গন্ধ। জ্যোৎস্না প্লাবিত আকাশে তারার মেলা। কোন তারাটা যে কার আপনজন— যদি সত্যি জানা যেত সেকথা! এই সময় মন ভারী হয়ে আসে!
এ সময়টা ঘরে থাকার নয়— কে যেন বলে যায় কানে কানে… শুনশান রাস্তা দিয়ে নদীর দিকে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছে মনে জাগতেই, পায়ে পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলাম নীচে। পথে নামতেই সঙ্গ পেলাম ঝির ঝিরে মিষ্টি হাওয়ার। কত রকম খসখস, সড়সড় শব্দ চারিদিকে! নিস্তব্ধ রাতটাকে যেন মাতিয়ে রেখেছে তারা— নিস্তব্ধতার আলাদা এক ভাষা হয়ে। থেকে থেকে কোথাও ডেকে উঠছে রাতচরা পাখি। চাঁদের আলোয় পিছল হচ্ছে পথঘাট। পূর্ণ যুবতী রাতের পিছু পিছু মোহাবিষ্টের মত চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম অভীষ্ট লক্ষ্যে। বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলাম— উপচে পড়া চাঁদের আলো বাঁধ ভেঙে নদীর ছোটো ছোটো ঢেউগুলোর সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলায় মত্ত! কি অপরূপ তার শোভা। এমন নীল জোছনায় ভিজতে ভিজতে কারও অপেক্ষাতেই শুধু কাটিয়ে দেওয়া যায় গোটা জীবন !
একেই কি বলে চন্দ্রাহত হওয়া? চন্দ্রাহত হলে কি মানুষের মন ভারী হয়ে আসে? ব্যথায়, বিচ্ছেদে? না, সুখে, আনন্দে? কোন অনুভূতি মনকে উদাস করে রাখে— বুঝতে চেয়ে, দুপুর রাতের স্তব্ধতাকে বুকে জড়িয়ে, মুগ্ধ আবেশে জোৎস্না-স্নাত, তন্দ্রা-হারা, ভয়-হীন, ভাষাহীন আমি বসে রইলাম নদীর পাড়ে— একা!