সি নে দু নি য়া
অভিষেক ঘোষ
'আনটিল দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড': একটি প্রায় অনালোচিত বিস্ময়
কোনো কোনো চলচ্চিত্র দেখে ফেলার পর মনের মধ্যে নানান ভাবনা ঘুরপাক খেতে শুরু করে । তখন কোথা থেকে আলোচনা শুরু করা যায়, সেটাই স্থির করা সবচেয়ে মুশকিল হয়ে ওঠে । চারটে মহাদেশের, সাতটা দেশের, মোট পনেরোটা শহরের, বিচিত্র সব লোকেশনে শ্যুট করে; চৌদ্দ বছর ধরে, তিলে তিলে বানানো এই ছবির ‘ডিরেক্টরস্ কাট্’ না দেখলে, দেখাই বৃথা । সহজ করে বোঝালে, ব্যাপারটা অনেকটা ‘জাস্টিস লিগ’-এর দুটো ভার্সানের (স্নাইডার কাট্ নিয়ে কিছুদিন আগে খুব হইচই হল) যে তফাৎ, সে’রকমই । সত্যি বলতে, কোনোভাবেই এমন তুলনা চলতে পারে না – নেহাৎ কথার কথা বলতে হল, বিষয়টা সহজবোধ্য করে তুলতে । আনকাট্ ‘ট্রিলজি’ ভার্সন-টা (ডিরেক্টর্স কাট্) আসলে অপূর্ব ! কীভাবে প্রেমের গল্প মেশে একটা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির শরীরে, তারপর উদয় হয় নৈতিকতার চিরকেলে প্রশ্নগুলি, জীবন-মৃত্যু, পরিবার-পরিজন বনাম বিজ্ঞানের বৃহত্তর প্রয়োজন – পূর্ণ দৈর্ঘ্যের আনকাট্ ভার্সন আসলে এই সব কিছুকে রোমহর্ষক ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে, সঙ্গীত যার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । আমেরিকায় ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, ‘Until the End of the World’ আসলে মোটে ২ ঘন্টা ৩৮ মিনিটের ফিল্ম ছিল এবং তাও বিশ্রীভাবে এডিট করা । সেদিক থেকে এই ছবির ডিরেক্টর্স কাট্ (২৮৭ মিনিটের) যেমন আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে, ঠিক তেমনি প্রমাণ করবে সেই আপ্তবাক্য- ‘সবুরে মেওয়া ফলে’!
ছবিটা নিয়ে ভাবতে বসলে প্রথমেই মনে হয়, কিছু কিছু ছবির কপাল খারাপ । একেকজন পরিচালক নিজের ছবির নিজস্ব ঘরানা নির্মাণ করেন কয়েক দশকের চেষ্টায় । আর দর্শকও সাধারণত ছবি দেখার আগে থেকেই ধারণা করে নেয় সেই পরিচালকের নতুন ছবি সম্পর্কে । এক্ষেত্রেও বোধহয় তাই হয় । এই ছবিটা প্রথমত পুরোদস্তুর ‘রোড মুভি’ নয় । এটি একটি ‘সায়েন্স ফিকশন’ এবং কোনোভাবেই ‘সায়েন্স ফ্যান্টাসি’ নয় । অর্থাৎ এই ছবিটা নিজের সম্পর্কে খুব নিশ্চিত । প্রথমেই বলি, আমার মতো অনেকেরই ধারণা, সায়েন্স ফিকশন্ ছবির শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠে, হয় এক অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিকতা, নয়তো নিষিদ্ধ অজানাকে জেনে ফেলার বিস্ময়-মথিত আতঙ্ক । আশ্চর্য এই যে, এই ছবিটা উপরোক্ত দুটি মেরুকেই নির্মোহ আলস্যে স্পর্শ করেছে । এবং তাও প্রযুক্তিগত দেখনদারিকে প্রায় অগ্রাহ্য করে ! ছবিটার শুরু থেকেই আমরা দেখি, রঙের অলীক ব্যবহার, যেটা কোথাও কোথাও ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয় বোধহয় ! কিন্তু তা হয় না আদপেই । ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমায় অদূর ভবিষ্যতের যে পৃথিবীর কল্পনা করা হয়েছে, সেটি ১৯৯৯ সাল । ইতিমধ্যেই যে সময়টা আমরা পেরিয়ে এসেছি । অদ্ভুত অদ্ভুত সব গাড়ি, স্মার্ট ফোন বুথ, কাল্পনিক কিছু ভিডিও কলিং-এর দৃশ্য, সরাসরি গাড়ি-চালকের নাম ধরে কথা বলা GPS, মজার মজার ট্র্যাকিং ডিভাইস্ ইত্যাদি দেখে সেসময় হয়তো অনেকেরই হাসি পেয়েছিল, কিন্তু আজ তা মোটেও অসম্ভব লাগে না । কিন্তু সিনেমাতে এগুলো আপনার দৃষ্টিকে প্রক্ষিপ্ত করতে পারে, তাই সতর্ক থাকতে হবে । সিনেমায় আপনার উচিত হবে, চরিত্রগুলোকে বুঝতে চাওয়া, কারণ তবেই আপনি অতিরিক্ত বিজ্ঞাননির্ভরতায় চরিত্রগুলির অন্তিম ট্র্যাজেডি অনুভব করতে পারবেন । সিনেমাতে বাহ্যিকভাবে যে আঘাত প্রথম আসে, তা হল একটা খবর – কোনো একটি ভারতীয় নিউক্লিয়ার স্যাটেলাইট আমেরিকান গর্ভমেন্ট দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে । সেটি ক্রমশ ভেঙে পড়ছে এবং ‘NEMP’ (Nuclear Electro-Magnetic Pulse) তৈরি করেছে পৃথিবীজুড়ে । তাই সহসা দুনিয়ার সর্বত্র, সমস্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস্ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই, ছবির ক্লাইম্যাক্স ঘনীভূত হয় দীর্ঘ সময় ধরে । অস্ট্রেলিয়ান আউটব্যাকে নির্জন মরুভূমির মধ্যে রয়েছে কাহিনির নায়ক স্যাম ফার্বার-এর বাবা, বিজ্ঞানী হেনরী ফার্বারের নিজস্ব আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবরেটরী । সেখানে গল্পের নায়ক স্যাম তার বান্ধবী ক্লেয়ার-কে নিয়ে পৌঁছায় । তাদের পিছু ধাওয়া করে আসে গল্পের আরো অসংখ্য চরিত্র । স্বভাবতই তখন তারা একটা মহাজাগতিক বিপদের আশঙ্কায় রয়েছে । স্যামের বাবা হেনরী, একখানা টেলি-কমিউনিকেশন ডিভাইস আবিষ্কার করেছেন, যাতে তাঁর অন্ধ স্ত্রী এডিথ (অভিনয়ে প্রবাদ-প্রতিম অভিনেত্রী Jeanne Moreau) বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতিতে পুনরায় বাস্তব পৃথিবী ও পরিচিতদের মুখ দেখতে পান । সেই যন্ত্রে রেকর্ডেড ইমেজগুলি হাই-লেভেল কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর সাহায্যে প্রসেস করা হবে ! একজন অন্ধ মানুষও সেগুলি মাথার মধ্যে অনুভব করবেন এবং স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে পারবেন । আমাদের স্মৃতিতে যে সমস্ত দৃশ্য সংরক্ষিত থাকে, সেগুলি আমরা চোখের সাহায্য ছাড়াই, কেবল মনঃসংযোগের মাধ্যমেই দেখতে পাই । কারণ সেগুলি তখন মাথার মধ্যে ঘটতে থাকে । এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয় । কিন্তু সমস্যা তখনই হয় যখন, স্যাম ও হেনরী – দুজনেই এই প্রযুক্তিটির বিষয়ে অতিরিক্ত অবসেসড্ হয়ে পড়ে ! এডিথের সাথে হেনরীর আলাপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে । দীর্ঘ দাম্পত্য পেরিয়ে এসেও এডিথ স্বামীকে অসম্ভব ভালোবাসতো । অথচ তার প্ররোচনায় এডিথ এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে ক্রমশ অবসন্ন ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং প্রাণ হারায় । কিন্তু বিস্ময়কর এই যে… মা-কে হারিয়ে স্যাম ও স্ত্রী-কে হারিয়ে হেনরী কয়েকবার চোখের জল ফেললেও, দ্রুত তাদের অবসেসনে ফিরৎ চলে যায় । তাদের সেই ঘোর স্বপ্ন-তৃষার শিকার হয় ক্লেয়ারও । ভিডিও গেমের নেশার মতোই সেই যান্ত্রিক প্রযুক্তি ও তার ডিজিটাল-ভার্চুয়াল বাস্তবতা গ্রাস করে তাদের ।
এই ছবির কাহিনি যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় সে হল, গল্পের নায়িকা, Claire Tourneur (অভিনয়ে Solveig Dommartin, হ্যাঁ ইনিই ‘Wings of Desire’-এর আইকনিক চরিত্র ‘Marion’) । ক্লেয়ার তার একগুঁয়ে, নাছোড় প্রেমিক, লেখক ইউজিন-কে (অভিনয়ে Sam Neill) ছেড়ে, জীবনের যাবতীয় সাংসারিক একঘেয়েমি ভুলতে, বেরিয়ে পড়েছিল । বিপুল পার্টি, একের পর এক ব্যর্থ নৈশ অভিযান (ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডও বলতে পারেন) ক্লেয়ারকে যখন ক্রমাগত আরো ক্লান্ত, উদ্দেশ্যহীন আর উদাসীন করে তুলছে, ঠিক তখনই তার গাড়ির একটা ‘Wrong Turn’ ক্লেয়ারের জীবন ও একইসাথে গল্পের আরো অনেকের জীবন বদলে দেয় । সেই যে বলে না, এ মহাবিশ্বে কোথায় একটা সামান্য ফুঁ, অন্য কোথাও তোলে তুফান; আকাশগঙ্গার ও’পারের একটা স্ফুলিঙ্গ এ’পারে আগুন লাগায় । ক্লেয়ারের ব্যাপারটা সে’রকমই । ক্লেয়ার তার গাড়ি নিয়ে দুই ব্যাঙ্ক ডাকাতের (চিকো আর এডি) চক্করে পড়ে । তারা খুব সেয়ানা, ক্লেয়ারকে তারা একটা দুর্লভ সুযোগ দেয় – তাদের টাকা প্যারিসে স্থলপথে-জলপথে যেভাবেই হোক পৌঁছে দিতে হবে, বিনিময়ে ক্লেয়ার পাবে লভ্যাংশ । সেই যে মেয়েটা বিপথে গেল, তারপর আর ফিরতে পারল না ! তার সাথে দেখা হয়ে গেল আরেক বিপথগামী, ধনী, সায়েন্টিস্ট বাপের নাছোড়বান্দা ছেলে, ছদ্মনামী ট্রেভর ম্যাকেফী-র । ক্লেয়ারের সাহায্য নিয়ে (কারণ ট্রেভরের পিছু নিয়েছিল এক গান-ম্যান, বার্ট) ট্রেভর পরে তারই চালান-এর কিছুটা টাকা ঝেঁপে দিয়ে পালায় । ইতিপূর্বে ট্রেভর কোনো এক গবেষণা কেন্দ্র থেকে কিছু চুরি করেছে, বোঝা যায় । প্রকৃত সত্য জানা যায় অনেক পরে । ততক্ষণে প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার (এক্সটেন্ডেড কাট্) সুদীর্ঘ সিনেমার প্রথম দুই ঘন্টা জুড়ে ক্লেয়ার এই এক-নাগাড়ে ভাগনেওয়ালা, দৌড়বাজ, ধূর্ত, ছদ্মনামী, ট্রেভরের পিছন পিছন ছুটে চলেছে দুনিয়ার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত । কেন ? কারণ ‘ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী… ?’ হ্যাঁ ক্লেয়ার কখন যেন ট্রেভরকে ভালোবেসে ফেলে, তাকে খুঁজে বের করার জন্য কখনও সাহায্য নেয় ‘মিসিং পার্সন’ সন্ধানে বিশেষজ্ঞ ডিটেকটিভ ফিলিপ উইন্টারের (অভিনয়ে Rüdiger Vogler), আবার কখনও প্রাক্তন প্রেমিক ইউজিনের । আর হতচ্ছাড়া ট্রেভর ততক্ষণ ক্লেয়ারকে ব্যবহার করে, যতক্ষণ না, একখানা কদাকার হাই-টেক মেশিন চোখে আটকিয়ে যত্রতত্র ভিডিও রেকর্ডিং করতে গিয়ে, বেচারা প্রায় অন্ধ হয়ে যায় ! এরপর জাপানে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে ট্রেভর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় । কৃতজ্ঞ ট্রেভর তার দুরবস্থায় সাহায্যকারী ক্লেয়ারকে, সত্যি কথাটা অবশেষে জানায় । কারণ এ’যাবৎকাল তার ব্যবহারের জন্য লজ্জিত বোধ করে সে । সত্যিটা হল, ট্রেভরের আসল নাম – স্যাম ফার্বার । তার পিতা বিখ্যাত ভিশনারী গবেষক, হেনরী ফার্বার (অভিনয়ে প্রয়াত, প্রবাদপ্রতিম Max von Sydow) একটি আশ্চর্য যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, যাতে দৃষ্টিহীন মানুষও দেখতে পাবে । সেই যন্ত্র আদতে মস্তিষ্কের অনুভূতির স্পন্দনগুলি রেকর্ড করে ও অনুবাদ করে, যাতে অন্ধ ব্যক্তির মস্তিষ্কে সেই দৃশ্যাবলির প্রতিরূপ গঠিত হয় এবং তিনি দেখতে পান । এই দেখার মানে, একরকম ‘গ্রাফিক্স ইমেজ’ দেখা, যা আসলে একরকমের ‘বায়ো-কেমিক্যাল প্রসেস’ । হেনরী ফার্বার চাইছিলেন, তাঁর দৃষ্টিশক্তিহীন স্ত্রী এডিথের চোখে দৃশ্য-বর্ণ ও স্মৃতির জগৎ ফিরিয়ে দিতে । তারই জন্য এই আবিষ্কার, যা আদতে অপরিণামদর্শী । হেনরী ফার্বারের স্বপ্নের সেই যন্ত্রটি, এক গুপ্ত গবেষণা কেন্দ্র থেকে হাতিয়ে পালাচ্ছে স্যাম ওরফে ট্রেভর । আমেরিকা সহ অনেক দেশই সেই আশ্চর্য যন্ত্রের দখল নিতে চায় । স্যামের পেছনে তাই ভাড়াটে হানাদার, বাউন্টি হান্টাররা ঘুরতে থাকে । শেষমেষ স্যাম আর ক্লেয়ার অনেক গোলকধাঁধা পেরিয়ে পৌঁছয় অস্ট্রেলিয়ার এক নির্জন স্থানে । সঙ্গে সেই ভিডিও রেকর্ডার যন্ত্র ও অজস্র রেকর্ডিং । এই পর্যন্ত গল্প এগোয় একটা ছুটে চলার ভঙ্গিতে, একটা জার্নি – যেটা বাহ্যিক… রোড মুভি গোত্রের ছবির সঙ্গে হাল্কা রোমান্টিক থ্রিলার পাঞ্চ করলে যা হয় । এবার শুরু হয় আভ্যন্তরীণ জার্নি, মনের ভিতর মহলের যাত্রা, ছবির শেষ অংশটুকু জুড়ে ।
ছবিতে ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয় স্বপ্ন-ধরার অপচেষ্টাকে কেন্দ্র করে । আপনি-আমি যেসব স্বপ্ন দেখি, সেগুলো কিন্তু আপনার বা, আমার ব্যক্তিগত । আপনি-আমি না চাইলে, সেই স্বপ্নে প্রবেশের অধিকার কারো নেই । তার চেয়েও বড়ো কথা, স্বপ্নের সত্যতা ঘুমের মধ্যে, বাস্তবে নয় । স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু স্বপ্ন ধরে রাখতে নেই, তাহলে বাস্তুবচ্যুত হতে হয় । কিন্তু হেনরী, স্যাম আর ক্লেয়ার ঠিক সেই ভুলটাই করে । ওদের তখন একে একে ছেড়ে চলে যায় এডিথ, ল্যাবের কর্মচারীরা, হেনরীর আশ্রয়ে আশ্রিত ‘Aboriginal’ আদিবাসীরা । ওরা তিনজন শুধু ওদের ‘Dream-Recording Chair’ -এ বসে স্বপ্ন রেকর্ড করে চলে, আর অনন্তবার সেই স্বপ্নগুলো দেখতে থাকে আর ভাবতে থাকে তাই নিয়ে । এ যেন বাস্তব জগত থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন । পিতা-পুত্রের ইগোর লড়াই, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভালোবাসা-শ্রদ্ধা সব যেমন তাদের কাছে সহসা মূল্যহীন হয়ে যায়, তেমনি এই ভার্চুয়াল নির্বাসনে স্যাম আর ক্লেয়ারের উথাল-পাথাল প্রেমের সিন্ধুও যেন শুকিয়ে যায় ! একমাত্র ইউজিন তখনও ক্লেয়ারের পাশে থাকে । কারণ, ইউজিন তাকে সত্যিই ভালোবাসে !
ছবিতে এক জায়গায় সংলাপ আছে হেনরীর এক সর্বক্ষণের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের মুখে, “The potential for this device is awesome. It can take visual information straight from the brain. Once they do that, you can suck out our dreams and look at them like television.” তো এই হচ্ছে স্বপ্ন-ধরার যন্ত্র । স্যাম, হেনরী আর ক্লেয়ার যেন একই সঙ্গে এক স্বপ্নের দ্বীপে অবতরণ করেছিল আর মুহূর্তে তাদের মধ্যেকার সবরকম মানবিক রসায়ন মুছে গিয়ে তৈরি হয়, সমুদ্রের দূরত্ব । তারা যেন তাদের নৈশকালীন স্বপ্নের অনন্ত দৃশ্যাবলিতে ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছিল – এক্কেবারে স্বখাত-সলিলে সমাধি । ভোরে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে যে সব স্বপ্ন আলোর জোয়ারে ভেসে যায়, মুছে যায় স্মৃতি থেকে, সেই স্বপ্নগুলোই যেন তিনটি চরিত্রের প্রধান খাদ্যে পরিণত হয় । একেকজন যেন একেকটি চেতনাহীন স্বপ্নভুক হয়ে ওঠে ! অনুভূতি আর শব্দের প্রয়োজন হারিয়ে ফেলে তারা । বিস্মৃত অতীত থেকে তারা তাদের স্বপ্ন, দৃশ্য ও স্মৃতি তুলে আনে । তাদের স্বপ্নগুলি যেন বিচ্ছিন্নতার কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় আর এই ভয়ংকর ‘The Disease of Images’-এ আক্রান্ত হয়ে তারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবের বোধই হারিয়ে ফেলে – ‘Complete Loss of Reality’ ! এই জায়গায় গল্পটা কোথাও যেন লাভক্রাফট-এর দর্শনকে স্পর্শ করে ! ক্লেয়ার ইউজিন-কে বিচ্ছেদের পর থেকে তার ‘ব্রোকেন ল্যাডার’ বলেই ভাবতো । আর সেই ইউজিন যখন তার প্রাক্তন প্রেমিকা, ক্লেয়ারকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে, ইউজিনের তখন কেবলমাত্র গোটা দুই ভালো ব্যাটারি চাই, ছোট্ট মনিটরে স্বপ্ন দেখবে বলে । ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে । অবশেষে CIA এসে হেনরীকে তুলে নিয়ে যায় বহু সন্ধানের পরে । অবশ্য তাঁর আবিষ্কারের রহস্য উদঘাটনের পূর্বেই ক্লান্ত হেনরী ইহলোক ত্যাগ করেন ।
এই ছবির বৈশিষ্ট্য হল, সিনেমাটা একটা বিরাট দেশ-জাতি-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল নিয়ে একের পর এক ছবি আঁকতে থাকে । অসাধারণ সব ফ্রেম আর কম্পোজিশনের মতোই ছবিতে মিউজিক নিয়েও অসম্ভব স্মরণীয় নিরীক্ষা রয়েছে । অনেকগুলি জ্যাম সেশন আছে ছবিতে । তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে থাকে, অস্ট্রেলিয়ার উপজাতিদের Didgeridoo, Bullroarer, Gum-leaf প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে জ্যাম সেশনের দৃশ্যটি । মানবিক অনুভূতি নিয়ে তুঙ্গ মুহূর্ত নির্মাণে পরিচালক Wim Wenders কতটা দক্ষ, তার প্রমাণ ‘Paris, Texas’, ‘Alice in the Cities’ এর মতো ছবিগুলি । ‘The American Friend’ ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘Neo-Noir’ গোত্রেও তিনি কতটা সাবলীল । ‘Wings of Desire’ -ছবিটি আবার তাঁর আধ্যাত্মিক বোধের পরিচায়ক । সেদিক থেকে দেখতে গেলে, এই ছবি উপরোক্ত সব কিছুর মিশেল । একাধারে জমজমাট একটা ‘রোড-মুভি’ (প্রথমার্ধে), আবার বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় নিষ্পেষিত মানবতার ক্রন্দন নিয়ে অপূর্ব একটি ‘সায়েন্স ফিকশন’ (দ্বিতীয়ার্ধে) এই ছবিটি । সম্পাদনায় ‘ডিরেক্টর্স কাট্’ আমার মতে এক্কেবারে অমোঘ । এই ছবিটা মনে হয় না, এর চেয়ে ভালো আর হতে পারতো ! সুন্দর মন্থরতায় এই ছবি, চরিত্র ও তার পারিপার্শ্বিক, সময় ও সমকালকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে । আবার চেজ সিকোয়েন্সে মজার মোড়কে (চ্যাপলিনের ছবির মতো না হলেও) কখনও সখনও গতিশীল হয়ে ওঠে নিজের শর্তে, নিজস্ব ছন্দে । অথচ ছন্দপতন হয় না । ‘স্লো-সিনেমা’-র সৌন্দর্য ও সার্থকতা এই ছবিতে চমৎকার বোঝা যায়, সিরিয়াস বিষয় নিয়েও ছবিটি তাই বিস্ময়কর সরলতায় কখনও মিশে যায় ‘Aborigine’-জনজাতির আদিম সুরে, আবার কখনও হারিয়ে যায় আধুনিক সিম্ফোনিতে !
ছবিটা সম্পর্কে দু-ধরণের অভিযোগ আছে । একদল আছেন যাঁদের মতে ছবিটা শেষদিকে মেলোড্রামাটিক, আরেকদল আছেন যাঁরা ছবির প্রাথমিক স্তরে লম্বা ভ্যানতারার তাৎপর্য খুঁজে পান না ! যদিও সহসা পৃথিবীর রূপ-রস-স্পর্শ, অদেখা প্রিয়জনের মুখ দেখার পর অন্ধ এডিথের অভিব্যক্তি, আনন্দাশ্রু বড়ো ভালো লাগে । আবার তেমনই মন ছুঁয়ে যায় এডিথের মৃত্যুর পর উপজাতি-প্রথায় সমাধিদানের মুহূর্তটিও । আরেকটা ব্যাপার হল, ছবিতে এমন অসংখ্য চরিত্র রয়েছে যারা অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় । অথচ সেই অর্থে তাদের করার কিছুই নেই ! নায়িকা ক্লেয়ারের পোশাক পরিকল্পনা এই ছবির এক মনকাড়া দিক, ছবিটা দেখলেই বুঝবেন । সাইবার-পাঙ্ক নন্দনতত্ত্ব এই ছবিতে কোনো কোনো জায়গায় এলেও গুরুত্ব পায় নি, এটা অবশ্যই চোখে পড়ে । ক্লেয়ার কী ভাবছে, তার ব্যাখ্যা ক্রমাগত ইউজিনের মুখে শোনা বা, এতগুলো শহরে এত্তগুলো লোকেশনে শ্যুটিং-এর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজন নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন । আমার যদিও সেগুলো ভালোই লেগেছে বিনোদনের নিরিখে । তবে ক্লেয়ার ও স্যামের প্রাইভেট প্লেনে যাওয়ার দৃশ্যে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও গ্লাইড করে সারফেসে নেমে এসে সফল ল্যান্ডিং – যুক্তিহীন । যাই হোক্, ইউজিন কি শেষপর্যন্ত ক্লেয়ার-কে কাছে পায়, নাকি ক্লেয়ার ফিরে যায় তার বর্তমান প্রেমিক, স্বপ্নভুক স্যাম-এর কাছে ? কী পরিণতি হয় স্যাম ফার্বারের ? যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ জয়ী হয়, নাকি জিতে যায় মানুষ ? সে-সব প্রশ্নের উত্তর না হয় উহ্যই থাক্, তোলা থাক্ আন্তর্জাতিক সিনেমা-প্রেমীর সময় ও সমর্পণের কাছে ।
ফিল্ম : Until the End of the World (1991) – ডিরেক্টরস্ কাট্
পরিচালক : Wim Wenders
অভিনয়ে : উইলিয়াম হার্ট, সলভেগ ডোম্মার্টিন, স্যাম নিল, ম্যাক্স ভন্ সিডো, জাঁ মোরু প্রমুখ
সিনেমাটোগ্রাফি : Robby Müller
সঙ্গীত : Graeme Revell
গোত্র : সায়েন্স ফিকশন
দৈর্ঘ্য : ২৮৭ মিনিট
দেশ : জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র