স্বা স্থ্য

ডঃ সংহিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

sanhita

বড়োদের টিকা টিপ্পনি । পর্ব ১

বড়োদের টিকাকরণ বললেই, একটু মিইয়ে যাওয়া অতিমারির স্মৃতির পাতায়, কোভিডে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রতিষেধক টিকাকরণের কথা সর্বগ্রে মনে পড়ে, যদিও জলাতঙ্ক রোগের টিকা, টিটেনাস এবং ডিপথেরিয়ার মিলিত টিকা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোমিয়া প্রভৃতি রোগের টিকা এবং বিগত কয়েক বছরে আবিষ্কৃত এইচ পি ভি নামক জরায়ুর কর্কট রোগ প্রতিরোধক টিকা এই আলোচনায় অগ্রগণ্য হওয়ার দাবী রাখে, তবু এই নিবন্ধে পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলির বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আপাতত, যখন কোভিড নাইটিনের টিকার বিভিন্ন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে মেতে উঠেছে পৃথিবীর বিজ্ঞানী মহল, মানুষের মনেও, সেই টিকার ইতিহাস এখন ক্রমশ খলনায়কের চরিত্রে অবতীর্ণ প্রায়, এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে, আসুন আজ একবার চটজলদি দেখে নেওয়া যাক কোভিড টিকা নিয়ে এই মুহূর্তে বিজ্ঞান কী বলছে।

এ যাবত এই বিষয়ে বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, সব ক’টি প্রকারের টিকার প্রত্যাশিত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক ভাবে যা জানা গিয়েছিল তা হল, টিকা করণের স্থানে ব্যথা, সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বোধ, সামান্য জ্বর ইত্যাদি। যদিও কিছু কিছু প্রাপকের ক্ষেত্রে, কয়েকটি বিশেষ গুরুতর প্রতিক্রিয়ার ঘটনা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটতে দেখা গেছে।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, যে কোনও টিকার ক্ষেত্রে, কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া যে কোনও সময় মানুষের শরীরে ঘটতে পারে, যখন শরীরের কোষগুলি টিকার জীবাণু বা তার দেহাংশকে অকস্মাৎ শত্রু হিসেবে ঠিক করে নেয়। এই ধরণের আকস্মিক প্রতিক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় এনাফাইল্যাক্সিস বলা হয়। এই পরিস্থিতি আপদকালীন অত্যন্ত দ্রুত সংঘটিত হয় এবং টিকাকরণের পূর্বে এর সম্ভাবনা সাধারণত জানা যায় না, এমনকি একই টিকা প্রদানের সময় পূর্বে নাও ঘটে থাকতে পারে। তৎক্ষণাৎ প্রতিরোধকারি ওষুধ প্রয়োগ না করলে এই পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হতে পারে। বলা বাহুল্য, এই সম্ভাবনা অন্য যে কোনও টিকার মত কোভিডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

যাই হোক কোভিড টিকার বিষয়ে বিগত কয়েক বছরে গবেষনা লব্ধ তথ্য বলছে, এই টিকার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ হৃদযন্ত্রের পেশীতে ও তার চারিপাশের কলায় সাধারণত অপেক্ষাকৃত তরুণ, অনূর্ধ ত্রিশ বছর বয়সের পুরুষদের মধ্যে প্রদাহ জনিত কারণে মায়োকার্ডাইটিস বা পেরিকারডাইটইস অর্থাৎ হৃদযন্ত্র বা তার বাইরের মোড়কের পেশীতে কঠিন রোগ হতে পারে। পরিসংখ্যান বলে টিকার কারণে এই রোগের হার দশ লক্ষ মানুষের মধ্যে তেরো জন।

এছাড়া, টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, বিশেষ ক্ষেত্রে রক্ত নালীতে রক্ত অকস্মাৎ জমাট বাঁধার কারণে থ্রম্বোসিস, বা শরীরে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকা নামক রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়ায় থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া জাতীয় রোগের কারণ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, মানুষের হৃদযন্ত্রে বা মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে, অথবা রক্তক্ষরণ হয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে জানা গেছে। এস্ট্রা জেনেকা, বা জনসন কোম্পানীর টিকার ওপর গবেষনা লব্ধ ফল অনুসারে এই রোগের পরিসংখ্যান এখনও পর্যন্ত এক লাখের মধ্যে এক জনের।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, গর্ভাবস্থায় প্রথম কুড়ি সপ্তাহে কোভিডের টিকা নিলে, মা বা শিশুর শরীরে পরবর্তীকালেও কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর সারা পৃথিবীতে এখনও পাওয়া যায় নি তাই এই টিকা গর্ভাবস্থায় নিরাপদ হিসাবেই ধরা হয়েছে।

এই সব সত্ত্বেও, পৃথিবী জুড়ে অতিমারির পরবর্তী সময়ে মানুষের টীকাকরণ কর্মসূচীর প্রতি অনাস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে এ কথা অনস্বীকার্য অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে এর প্রভাবে সাধারণ কর্মসূচি অনুসারে টিকাকরণের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে।

এবার, ভারতবর্ষে উৎপাদিত তথা প্রভূত পরিমাণে অতিমারি কালীন সারা পৃথিবীতে ব্যবহৃত দুটি কোভিড টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোকপাত করা যাক।

কোভিশিল্ড এবং কোভ্যাক্সিন, যথাক্রমে সেই সময় ভারতবর্ষে বহূল ব্যবহৃত টিকা যে গুলি সরকারি ভাবে বিনা মূল্যেও প্রদান করা হয়েছে। কোভিশিল্ড টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে, সামান্য জ্বর, গা ব্যথা, দুর্বলতা, মাথা ব্যথা, গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা, বমি ভাব ইত্যাদি সম্পর্কে প্রাথমিক ভাবে মানুষ অবহিত ছিলেন। পরবর্তীকালে কিছু সংখ্যক প্রাপকের ক্ষেত্রে পূর্বে আলোচিত থ্রম্বোসিস বা থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া জনিত অসুস্থতার খবর পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক কালে লক্ষ্ণৌ শহরে গবেষনা লব্ধ তথ্য অনুসারে, ১৮.৪ শতাংশ প্রাপকের মধ্যে স্নায়বিক অসুস্থতা এবং মনরোগ জনিত সমস্যার নিদর্শন পাওয়া যায়, এরা অসুখের আগে এই টিকা নিয়েছিলেন, কিন্তু বলা বাহুল্য এই অসুস্থতা সরাসরি টিকা জনিত কারণে হয়েছে এই সত্য এখনও প্রমাণ সাপেক্ষ।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, বিখ্যাত বৃটিশ মেডিকেল জার্নালে এ বছর প্রকাশিত গবেষনার ফল অনুসারে খুব অল্প সংখ্যক কোভিড টিকার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিভিন্ন দেশে সুষুম্নাকাণ্ড-এর প্রদাহ জনিত ট্রান্সভার্স মায়ালাইটিস, এবং একিউট ডিসসেমিনেটেড এ্নকেফেলোমায়ালাইটিস জাতীয় ভয়ঙ্কর দুরারোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

আবার বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনা লব্ধ ফলে জানা গেছে কোভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জটিল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার পরিসংখ্যান অনেক কম।

এই সব সত্ত্বেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ এবং তৎপরবর্তী দীর্ঘ কোভিড বা লং কোভিডের বিভিন্ন উপসর্গ থেকে মানুষ রক্ষা পেয়েছেন টিকার দ্বারাই, আর অতিমারির মুখোমুখি লড়াইয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যুর সম্ভাবনা কমানোর একমাত্র হাতিয়ার ছিল কোভিড নাইন্টিনের টিকাগুলি।

মনে রাখতে হবে, অন্যান্য টিকা আবিষ্কারের পর যেমন হয়, তার পরীক্ষামূলক গবেষণা বা ট্রায়াল জাতীয় ব্যবস্থাপনার তখন উপায় নেই, ফলে টিকা আবিষ্কারের পরেই তা সরাসরি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছ। তার পরিশোধিত বা উন্নততর সংস্করণ তৈরির সময় ছিল না। সর্বোপরি এই বয়স নির্বিশেষে ব্যবহার যোগ্য বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত টিকাগুলি, এম আর এন এ জাতীয় বা ভাইরাসের প্রোটিনজাত যাই হোক না কেন, জীবনদায়ী ছিল। টিকা সংক্রান্ত এই আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ কয়েকটি টিকা যা জাতীয় কর্মসূচির অন্তর্গত আছে এবং অদূর ভবিষ্যতে যে সব টিকা অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে, সেগুলির বিষয়ে আলোচনা করা যাবে।

ক্রমশ