Hello Testing

চি ত্র ক লা

সৌমেন পাল

soumen_paul

প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ম্যুরাল শিল্প

ম্যুরাল পেন্টিং বা দেয়ালচিত্র একটি প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ শিল্পমাধ্যম, যা মানব সভ্যতার শৈল্পিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অভিব্যক্তির অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। ‘ম্যুরাল’ শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন, ‘murus’ অর্থাৎ ‘দেয়াল’ শব্দ থেকে। অর্থাৎ, ম্যুরাল হল দেয়ালের উপর একটা নির্দিষ্ট পন্থায় গড়ে তোলা ছবি বা চিত্রকলা যা সেই স্থায়ী কাঠামোর অংশ হয়ে যায়। এই প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে শিল্পী তার ভাবনা, সামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সেই সময়টাকে ধরে রাখে কালের আখরে।

ম্যুরাল পেন্টিং বা দেয়ালচিত্র ইউরোপীয় শিল্পধারার এক অনন্য ও চিরায়ত শাখা। প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় চিত্রকলা, রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত ফ্রেস্কো এবং আধুনিক ওয়ালস্ট্রিট-আর্ট ইউরোপের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা, রাজনৈতিক বাঁক-বদল আর বৈপ্লবিক অধ্যায়কে তুলে ধরেছে দৃশ্যশিল্পের মাধ্যমে। ম্যুরাল আঁকা হয়েছে কখনও সরাসরি বাস্তবের চোখে চোখ রেখে। কখনও রূপকধর্মীতায়। ইউরোপে রেনেসাঁ যুগে ম্যুরাল পেন্টিং নতুন উচ্চতায় পৌঁয়। মাইকেলেঞ্জেলো-র আঁকা সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদচিত্র বিশ্বখ্যাত। মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ডিয়েগো রিভেরা, ডেভিড সিকেইরোস ও জোসে ওরোজকো সমাজবাদী বার্তাবাহী ম্যুরালের মাধ্যমে বিপ্লবী শিল্পধারার পথিকৃৎ হন। এঁদের কাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকায় সমাজ-সংগ্রামী ম্যুরালধারার উত্থান ঘটায়।

ইউরোপে ম্যুরাল চিত্রকলার ইতিহাস শুরু হয় প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র দিয়ে। ফ্রান্সের লাসকো গুহা এবং স্পেনের আলতামিরা গুহায় দেখা গিয়েছে প্রায় ১৭,০০০ বছর পুরনো বন্যপ্রাণী ও শিকারের দৃশ্য। এসব ম্যুরালের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় বা প্রতীকী বিশ্বাস। এরপর গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় ম্যুরাল পেন্টিং বিকশিত হয় নবরূপে। রোমের পম্পেই নগরীতে পাওয়া দেয়ালচিত্রে দেখা যায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, প্রকৃতি ও পৌরাণিক কাহিনির চিত্র। এই সময় ম্যুরাল একদিকে আলঙ্কারিক, অন্যদিকে ন্যারেটিভ মাধ্যম হয়ে ওঠে। ফ্রান্স, ইতালি ও ইংল্যান্ডের বহু গির্জায় এখনও মধ্যযুগীয় ফ্রেস্কো পাওয়া যায়, যা এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। আবার ১৪০০ থেকে ১৬০০ শতকের মধ্যে ইউরোপের মাটিতে নবজাগরণের ঝড় উঠলে শিল্পে ঘটে আমূল পরিবর্তন। এই সময়ের ম্যুরাল চিত্রে মানুষের শরীর, আবেগ, সৌন্দর্য আরও নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়। ম্যুরাল তখন আর কেবল ধর্মীয় অনুষঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিজ্ঞান, দার্শনিক ভাবনা, রাজনীতি আর মানবতাবাদে উঠে আসে।

১৯শ শতকের শেষে ও ২০শ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় ম্যুরাল শিল্প রাজপ্রাসাদ বা গির্জার আড়াল থেকে বেরিয়ে জনমানবের কাছে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক শিল্পী ম্যুরালের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা, সমাজতান্ত্রিক চেতনা বা শিল্পে বিপ্লবের চিত্র তুলে ধরেন। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে শ্রমিক আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী বার্তা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত ম্যুরালচিত্র এ-সময়ে জনপ্রিয়তা পায়। অর্থাৎ যা কিনা এতদিন ছিল শুধুই নান্দনিক বিলাসচর্চা, এবারে তা এসে দাঁড়ায় দেশকালের দরবারে। হয়ে ওঠে প্রতিবাদ প্রতিরোধ প্রশ্ন তোলার ভাষ্য। হয়ে ওঠে জীর্ণ জাতির পক্ষে ও রাষ্ট্রের বিপক্ষে জেগে থাকা বিবেক। এরই হাত ধরে আসে স্ট্রিট আর্ট বা গ্রাফিতি, যা আজকের ম্যুরাল শিল্পকে আরও গতিশীল ও বাস্তবতার কাছাকাছি এনে দেয়।

ম্যুরাল পেন্টিং সাধারণত দুটো পদ্ধতিতে করা হয়— ফ্রেস্কো আর টেম্পেরা। ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে কাঁচা প্লাস্টারের দেয়ালে রঙ প্রয়োগ করা হয়, ফলে রঙ দেওয়ালের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে চিরস্থায়ী হয়। টেম্পেরা, এতে শুকনো দেওয়ালে রঙ প্রয়োগ করা হয়। রঙ তৈরি হত প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন: খনিজ, গাছের রস বা প্রাণিজ রঙ ব্যবহার করে। পরবর্তী সময়ে অ্যাক্রিলিক, স্প্রে-পেইন্ট ও ডিজিটাল প্রজেকশন প্রযুক্তিও ম্যুরালশিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। আজকের দিনে ম্যুরাল পেন্টিং শুধু গ্যালারিতে নয়, বরং শহরের রাস্তাঘাট, স্কুলের দেয়াল, পার্ক, মেট্রো স্টেশন এমনকি সরকারি ভবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এটি শহরের রূপবদলে ভূমিকা রাখে, নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ায় আর তরুণ শিল্পীদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেয়। স্ট্রিট আর্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ম্যুরাল এখন আক্ষরিকঅর্থেই জনশিল্প।

ভারতে ম্যুরাল চিত্রকলার ইতিহাসও অত্যন্ত প্রাচীন। অজন্তা, ইলোরার গুহাচিত্র, বাঘ গুহাচিত্র (মধ্যপ্রদেশ), সিত্তানবসাল (তামিলনাড়ু) এসব জায়গায় খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দী থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত অসাধারণ দেয়ালচিত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়। এই চিত্রকলা বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন ধর্মীয় কাহিনি, দেব-দেবীর প্রতিকৃতি ও জীবনদর্শনের প্রতিফলন ঘটায়। ম্যুরাল শুধুমাত্র নান্দনিকতার বাহক নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তার মাধ্যম। সাম্প্রতিককালে, দেশের প্রধান শহরগুলোর রাস্তায় ম্যুরাল পেন্টিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা, লিঙ্গ সমতা, রাজনৈতিক প্রতিবাদ, আদিবাসী সংস্কৃতির জাগরণ, বা জনসচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরা হয়। মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতা বা চেন্নাইয়ের অলিগলিতে এমন অনেক ম্যুরাল এখন শহুরে সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ।

বাংলার চিত্রকলার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন এবং বহুবর্ণময়। এর মধ্যে ম্যুরাল পেন্টিং বা দেয়ালচিত্র একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বাংলায় ম্যুরাল চিত্রের প্রাচীনতম রূপ পাওয়া যায় মাটির ঘরের গায়ে আঁকা প্রতীকী ও অলঙ্করণমূলক চিত্রে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের রাঢ়, বরেন্দ্র ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই চিত্রকলার প্রাচীন ধারা দেখা যায়। বিয়েবাড়ি, পুজো, ফসল কাটার সময় বা বসন্ত উৎসবের মতো বিশেষ সময়ে মেয়েরা দলবদ্ধভাবে দেয়ালে আলপনা আঁকে।গ্রামবাংলার ম্যুরাল ছবির বিষয় হিসেবে উঠে আসে ধর্মীয় কাহিনি, লোককথা, প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের চিত্র। রং হিসেবে ব্যবহৃত হয় প্রাকৃতিক উপাদান। লালচে রঙের জন্য লাল মাটি, সাদা রঙের জন্য চুন, কালির জন্য কয়লার গুঁড়ো বা পোড়া কাঠ। এইসব রঙে মাটি ও জীবনের ঘ্রাণ থাকে, যা কৃত্রিম রঙে ধরা পড়ে না। শুধু গ্রামবাংলা নয়, খোদ কলকাতার শহরে শিল্পীদের আঁকা বহু ম্যুরাল রয়েছে, যা শহরকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত ও চিন্তাশীল। এইসব কাজের পেছনে অনেক সময় সরকারি উদ্যোগ বা বেসরকারি শিল্প সংগঠনের সহযোগিতা আছে। এছাড়া আছে আমাদের প্রাণের শান্তিনিকেতন। বিশ্বভারতীর কলাভবনের উল্লেখ ব্যতীত বাংলার ম্যুরাল অসম্পূর্ণ। রামকিংকর বিনোদবিহারী আরও দিকপাল শিল্পী তথা মাস্টারমশাইদের যত্নশীল ম্যুরালের কাজ আজও তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। সাক্ষ্য দিচ্ছে এক বর্ধিষ্ণু পরম্পরার। নানা প্রান্ত থেকে দেখতে আসছে শিল্পরসিক। দেখতে আসবে ভাবীকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *