Hello Testing

বি শে ষ  র চ না

রাজদীপ পুরী

rajdeep

ফিরে দেখা: স্বাধীন ভারতে বাংলার প্রথম বিধানসভা নির্বাচন

অষ্টাদশতম বিধানসভা নির্বাচনে এই রাজ্যের দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রাককালে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকানো যাক ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া ব্রিটিশ মুক্ত স্বাধীন ভারতের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনের দিকে। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এক বাঙালী আইসিএস কর্মকর্তা সুকুমার সেন (১৮৯৮-১৯৬৩)। তিনি দু-দুটি সাধারণ নির্বাচন (১৯৫১-৫২ ও ১৯৫৭) সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। তবে এখনকার মতো কাঠফাটা গরমে নয় সেইবার সেই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল শীতকালে, হাড় কাঁপানো জানুয়ারী মাসে।

বাংলার প্রথম বিধানসভা নির্বাচন-- India Today Archive

সেই নির্বাচনে এই রাজ্যের মোট আসন সংখ্যা ছিল ২৩৮টি আর অংশ নিয়েছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC), ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (CPI), ভারতীয় জনসংঘ (BJS) ছাড়াও কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি (KMPP), হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক, রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (RSP), শিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশন-এর মতো বিভিন্ন ছোটো আঞ্চলিক দলগুলি সহ বহু স্বতন্ত্র (Independent) প্রার্থী। জাতীয় কংগ্রেস (INC) ১৫১টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে সরকার গঠন করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ড: বিধানচন্দ্র রায়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ২৮টি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয় প্রধান বিরোধী দল হিসাবে। তরুণ বাম নেতা জ্যোতি বসু বরাহনগর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে হয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। আর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভারতীয় জনসংঘ পেয়েছিল ৯টি আসন।

বাংলার প্রথম বিধানসভা নির্বাচন-- India Today Archive

উল্লেখ্য ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভারতীয় জনসংঘ’-ই ছিল বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-র মূল ভিত্তি। ১৯৭৭ সালে ভারতীয় জনসংঘ অন্যান্য দলের সাথে মিলে ‘জনতা পার্টি’ গঠন করেছিল। পরে মতবিরোধের কারণে ১৯৮০ সালে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ বা BJP আলাদা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, ভৈরন সিং শেখাওয়াত, নানাজি দেশমুখ সহ কয়েকজন নেতার যৌথ উদ্যোগে।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদি নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার জিরাট-বলাগড় গ্রামে৷ পরে গ্রাম ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন কলকাতার ভবানীপুরে৷ তিনি কিন্তু ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে ক‌ংগ্রেসের টিকিটেই বাংলার বিধানসভায় প্রথম পা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে জওহরলাল নেহরু ও লিয়াকতের পাকিস্তান চুক্তি মনঃপুত না হওয়ায় তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে পৃথক দল ‘ভারতীয় জনসংঘ’ গঠন করেন। যার মূল আদর্শ ছিল জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ব।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খাদ্য সমস্যা, কর্মসংস্থান ও অর্থাভাবে জর্জরিত সেই সময়েও কিন্তু এই প্রথম বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পরস্পরবিরোধী প্রচার ছিল তুঙ্গে। জাতীয় কংগ্রেসের মূল এজেন্ডা ছিল ‘দেশের স্বধীনতা’। দেশ স্বাধীনের পুরো কৃতিত্ব দাবি করে যেমন প্রচার চালিয়েছিল তাঁরা সেই সঙ্গে ছিল সমবায়মূলক কৃষি ব্যবস্থার প্রসার, কুটির শিল্পের বিকাশ, আবাদী জমি বন্টন, কর্ম সংস্থান, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার ব্যবস্থা প্রসার, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, শরণার্থীদের পুনর্বাসন প্রভৃতি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস। আর জ্যোতি বসু সহ বিভিন্ন বামদলের নেতারা স্লোগান তুলেছিলেন, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়।’ তাঁরা ব্যক্তি স্বাধীনতা, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কৃষকদের ঋণ মকুব এবং তাদের সরকারি ঋণ এবং সেচের ব্যবস্থা করে দেওয়া, কর্ম সংস্থান, দ্রব্য মূল্য হ্রাস, দুর্নীতি, কালোবাজারি, এবং চোরাবাজারী দমন, শিল্পায়ন, এবং বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের দাবি তোলে তাঁদের ইস্তাহারে। অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু ও লিয়াকতের পাকিস্তান চুক্তিতে না-খুশ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে পৃথক দল (ভারতীয় জনসংঘ) গড়ে উস্কে দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদের রাজনীতি।

সময় বহিয়া যায় নদীর মতো। আজ এই অষ্টাদশতম বিধানসভা নির্বাচনেও সমস্যাগুলি থেকে গেছে কিন্তু সেই তিমিরেই বদলে গেছে শুধু মুখ আর রাজনৈতিক দলের নাম আর ক্যালেন্ডারের পাতা। কম-বেশি দুর্নীতি আর কালোবাজারির অবাধ আখড়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি। কিছু ব্যতিক্রম কি নেই? আছে। সেই ব্যতিক্রমীদের মুখের দিকে তাকিয়েই আশায় বুক বাঁধা। একদিন ঠিক আমরা সবাই খুব ভালো থাকব, এই আশাটুকু নিয়েই দিনশেষে ঘুমোতে যাওয়া। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইজরায়েল— এই তিন শক্তির মধ্যে ক্রমাগত চলতে থাকা উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও যুদ্ধের সংবাদ তো বাড়তি দুঃস্বপ্ন হিসাবে জায়গা করেই নিয়েছে মনের মণিকোটায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *