মু ক্ত গ দ্য
মৌমিতা চ্যাটার্জী
একটা সূর্যাস্ত ও পোশাকী অসুখ
আজকাল বেঁচে থাকাকালীন এই দিনাতিপাতের এঁদোগলির চিলতে ঝাঁ চকচকে ভাবখানাকেও বড্ড কালচে লাগে। যত সময় যায় হারিয়ে যাওয়া সাবেকি রাত দুপুরগুলোর প্রতি লোভটা গগনচুম্বী হতে থাকে।
মনে হয় অন্তরাত্মায় একখানা পেল্লাই ভারী পর্দা টেনে অতীত সাঁতরাই। মনের ফাঁকফোকরে ওই যেটুকু আলো নড়াচড়া করছে ওটুকুকে বাইরের নেশা থেকে যতক্ষণ আড়াল করা যায় আর কী!
মনবাগানে গোলাপচারার চাষ হয়, ছোটো-ছোটো সূর্যমুখী, ডালিয়া, বোগেনভেলিয়াগুলোর পাঁপড়িতে আঙুল ঠেকালেই ফিনকি দিয়ে হাসির ফোয়ারা ছোটে। একমুঠো নিষ্পাপ সবজে ঘাস দু-হাতের তালুতে নিলেই ঢেলে দেয় মেঠো আতর। সমস্ত বিষভাবগুলো কোনো এক অদৃশ্য যাদুমন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী প্রভাবে হয়ে যায় মন্থিত অমৃত। আহা! মানসপটে কল্পিত জীবন যেন কুলুকুলু খামখেয়ালী সুরধুনি। এখানে রাত আসে মোলায়েম বেলকুঁড়ি আর জ্যোৎস্না কুড়িয়ে মোতিমালা গাঁথার জন্য।
চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই পাঁচ কি ছয় বছরের একটা দু-বেণীর ছোট্ট নাদুসনুদুস গালফোলা মেয়ে আর ওর মাকে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর বাপ ঘরে ফিরল একথলি মুড়ি-মুড়কির সুখ নিয়ে একটু আগে…
মায়ের হলুদ মাখা সুগন্ধী অন্নপূর্ণা হাত আর একছিটে সর্ষের তেলের আদরে একথালা গরম ভাত নিমেষেই হয়ে যাচ্ছে স্বর্গীয় ইন্দ্রহার।
উনুনের ঢিমি আঁচে মা ভাতে-ভাত চড়িয়ে ডালে কাঁটা দিচ্ছে। মেয়ে পড়ছে… এক এক্কে এক… দুই এক্কে দুই… তিন দু-গুণে ছয়… চার দু-গুণে আট…
পঁচিশে বৈশাখের সকালে মা রবির আলোয় ঘর সাজায়। বাবা আনে জুঁই-রজনীর হাসি। লালপেড়ে সাদা শাড়ির ছোটো মেয়েটা হাতা-পা নেড়ে, মুখ নেড়ে গলা ফাটিয়ে বৈশাখকে ডাকে। ‘আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকেবাঁকে…/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ আওড়েই যায়… শেষ আর হয় না।
দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। আষাঢ়ের গর্বিতধারায় ডানা মেলছে এলোকেশী জল। উঠোনের অনাথ ফুটি-ফাটা মাটিগুলো পায়ে পায়ে নতুন ঘর খুঁজছে। উঠোন বারান্দার জল ঝেঁটিয়ে একটু শুখা জায়গা দেখে একখানা মলিন মাদুর পেতে মা বসে টেনে নিল ‘সঞ্চয়িতা’। তারপর ভিজে চুপচুপে অক্ষরগুলোয় আঁচল বুলিয়ে একের পর এক… আফ্রিকা, সোনার তরী… উচ্চারণের বজ্রপাত হচ্ছে। কচি মেয়েটা অত কী বোঝে? শুধু শুনছে আর বাটি থেকে দুটো তিনটে মুড়ি তুলে মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। জলের কোলাজে কেমন ভেসে যাচ্ছে… দুধসাদা সারিবদ্ধ পানসি।
দুগ্গা-দশমী থেকে কোজাগরীর সাঁঝ! মায়ের কপালে গোলপানা সূর্য দেখতে দেখতে ছোটো মেয়েটা ডুবছে আসন্ন ভবিষ্যতের বাসনায়।
তারপর একদিন তার সূর্য ডুবল আচমকা। মা হাসতে হাসতে মিশে গেল বেনীয়াসহকলায়… দু-বেণীর আদুরে মেয়েটার গতিপথে এরপর থেকে শুধুই অকাল বার্ধক্য।
‘ওম জয় জগদীশ হরে… প্লিজ ওপেন দ্য ডোর।’ যান্ত্রিক বেলের জগদীশের কর্কশ হাসিতে চোখ খুলতেই পর্দাটা সরে গেল। আর অমনি হুড়মুড়িয়ে ঢুকে এল দামাল আর অবাঞ্ছিত উত্তুরে হাওয়ার মতো কঠিন বাস্তব। ইদানিং অসুখ হলেও মাসকাবারি ওষুধে আরোগ্য আসে না। কাঠামোটুকুই যা চাঙ্গা হয়।
খবর পেয়েছি, জ্বরের ঘোরে ছোটো বেলায় মাথার চুলে বিলিকাটা হাত দুটো অকালে বুড়িয়ে যাওয়া সেই মেয়েটার কপাল ছুঁতে আসে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ভেঙে পড়ে বোবা কান্নায় যার দু-চার ফোঁটা ঝরে পড়ে গনগনে কপালে। শুভাকাঙ্খীরা স্বস্তির শ্বাস ফেলে… যাক্, ঘাম দিয়ে জ্বরটা ছাড়ল তবে।
খুব সুন্দর লেখা