গ ল্প
সংস্কৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়
এস আই আর ও শ্মশানপাড়ার বাসিন্দারা
নিশুতি রাত। গোটা এলাকা ঘুমিয়ে। কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দিচ্ছে মাঝে মাঝে।
এদিকে শ্মশানপাড়ার বটগাছে জরুরি সভা বসেছে আজ। কারোর চোখে ঘুম নেই। সবার চোখে একরাশ দুঃশ্চিন্তা। এজেন্ডা একটাই— SIR। কয়েকদশক ধরে যারা নিয়মিত ‘ভোটদাতা’ ছিল, এই SIR-এর পর নতুন করে তৈরী হওয়া ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম গায়েব! কদিন আগে BLO সাহেব হারুবাবু যখন গভীর রাতে ল্যাপটপে বসে ফাইনাল লিস্ট-এ চোখ বোলাচ্ছিলেন তখনই এক ছোকরা ভূত জানালার এক চিলতে ফাঁক দিয়ে নিজের বায়বীয় শরীরটাকে গলিয়ে সেই নতুন তালিকা নিজের চোখে দেখে এসেছে। না, শ্মশানপাড়ার বাসিন্দাদের নাম কোথাও নেই। আর তারপরেই ব্রহ্মদৈত্য, মামদো, পেত্নীদিদের কপালে ভাঁজ। স্কন্ধকাটার তো কপাল নেই, তার ধড় থেকে সে কেবলই একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে যাচ্ছে।
সভাপতি ব্রহ্মদৈত্য পৈতে ঠিক করতে গলা খাঁকারি দিল, ‘সাথী ভূতগণ, এটা অন্যায়! আমি মরেছি ১৯৫০ সালে। তারপর থেকে বিধানসভা ও লোকসভা মিলিয়ে প্রায় ৩৫ টা ইলেকশনে ভোট দিয়েছি। দল-মত নির্বিশেষে যে যখন ক্ষমতায় এসেছে— সবাইকে সমান সুযোগ দিয়েছি। কোনো বাছ-বিচার রাখিনি। কোনো দাবি-দাওয়া। কোনো ভাতাও নেইনি। এটাকে একটা গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য বলেই মেনে নিয়েছি! কত নেতা-মন্ত্রীকে এই আমরা, শ্মশানপাড়ার বাসিন্দারাই, গদিতেই বসিয়েছি আবার কারোর গদি উলটেও দিয়েছি। আর এখন এই BLO-বাবু, কি যেন নাম হারুবাবু নাকি নাড়ুবাবু, বলছেন, আমাদের ভোট দানের কোনো অধিকারই নেই। এ কেমনতর ব্যাপার? একটা বিহিত আমাদের করতে হবেই।
মামদো লুঙ্গির খুঁটে চোখ মুছল। খুক-খুক করে কাশতে কাশতে বলল, ‘দাদা, আমার তো আরও দুঃখ। তখন আমি শাহাজাহান মণ্ডল। ১৯৬৪-তে কলেরায় মরেছি। মরার পর আমার নামে ভোটার কার্ডও হয়েছে। বেশ ভালোই লেগেছিল। নেই অথচ আছি। আমার ছেলে তখন পাড়ার নেতা। আমার নামে সেই ভোট দিয়ে দিয়েছিল। সেই শুরু। এখন তার ছেলে বড়ো নেতা। নেতার ছেলে তো নেতাই হয়। দল বদল হয় কিন্তু নেতা বদল হয় না। গত পঞ্চায়েতে আমার নামে তিনটে বুথে ভোট পড়েছে একসাথে। একেবারে ‘মাল্টি-লোকেশন ভোটিং’! কোয়ান্টাম ফিজিক্স ফেল। আর আজ সেই আমি বাতিল? আমি তো ‘মাল্টিপল আইডেন্টিটি’র আইকন ছিলাম!’
পেত্নীদি খ্যাঁক করে উঠল, ‘আর আমার বেলা? দেড়শো বছর ধরে এই বটগাছে আছি। এক ফুটো জমিদারের ছেলে অত্যাচার করে খুন করল আমায়। জমি-জমা না থাক বাপের রক্ত গায়ে ছিল। কে বলে সাদা চামড়ার ব্রিটিশগুলো শুধু খারাপ ছিল। কিন্তু এলাকার লোকেরা আমায় খুব ভালোবাসতো। তারাই এই বটগাছের নীচে দুটো সিঁদুর মাখানো পাথর থেকে আমার নামে থান করে দিল। তারাই কেউ হয়তো সেই প্রথম নির্বাচন থেকে ভোটার তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বেশ ভালোই লেগেছিল। সবাই কত ভালোবাসে আমায়। আমিও কিন্তু কাউকে কখনো ভয় দেখাইনি। কারোর ঘাড় মটাকাইনি। শুধু সেই সব দুষ্টু বাচ্চা যারা স্কুল না গিয়ে এই সামনের মাঠে এসে খেলা করত তাদের ভয় দেখিয়ে স্কুল পাঠিয়েছি। তারপর তারা যখন বড়ো হয়ে শহরের স্কুলে পড়তে যেত, আমার আনন্দে চোখে জল এসে যেত। আস্তে আস্তে আমার মহিমা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আস্তে আস্তে এলাকার নেতারাও ভোটের আগে আসতে লাগল। এসে আমার পা ধরে যায়— ‘মা, একটু আশীর্বাদ করো, এই ইলেকশানটা যেন উতরে যাই।’ আমার নামে, আমার ভোটার কার্ড নিয়ে ওদের ডাকুবুকো মেয়েগুলো যখন একাধিক ছাপ্পা দিত ওরা কী ভেবেছে আমারও কেরামতি থাকত না, সবই ওদের কেরামতি। ‘ঘোস্ট বেনিফিশিয়ারি’ হিসেবে ফ্রি সার্ভিস দিয়েছি আমি। বিনিময়ে শুধু একটা আগরবাতি আর কটা কাচা মাছের ভোগ। কেউ তাও দেয়নি, ওই নেতারা যেমন হয় আর কি, ভোট মিটে গেলে সব ভুলে যায়। তাই বলে কি আমি কারোর ঘাড় মটকেছি? এখন কোথাকার কে এই বাচ্চা BLO-বাবু এসে বলছে আমি ‘ভেরিফায়েড’ না। আমি তো এই এলাকার ‘ইনফ্লুয়েন্সার’! আমার ক্যারিশ্মা যানে ও?’
ওদিকে সাদা শাড়ি আর কপালে একটা বড়ো লাল টিপ পড়া শাঁকচুন্নি রাগে আরও সাদা হয়ে বলল ‘বুঝলে দাদা, আমরা ডিজিটাল ইন্ডিয়া-র আগেই এই ইন্ডিয়াতে ‘ভার্চুয়াল ভোটিং সিস্টেম’ চালু করেছিলাম। ফিজিক্যালি বুথে না গিয়েও ভোট দিতাম। আর এখন BLO বাবু বলছে ‘বায়োমেট্রিক’ লাগবে?’
স্কন্ধকাটার ধড় থেকে একটা রাগী ঘড়ঘড় আওয়ায়জ উঠল। সে কথা বলত পারল না তার হয়ে অনুবাদ করে দিল মেছোভূত। ‘আমার তো ফেস নেই। তাও আমার নামে ভোট পড়ত। ফেসলেস ভোটিং-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলাম আমি। এখন বলছে ‘ফেস রেকগনিশন’ লাগবে। এ তো দিনে-দুপুরে ডাকাতি!’
ওদিকে গেছোভূত সবচেয়ে ক্ষেপে গেল। গলার বটগাছের মতো ঝুরি নাড়িয়ে বলল, ‘চুপ! অনেক হয়েছে। আমরা মরে গিয়েও “অ্যাক্টিভ ভোটার” ছিলাম। গণতন্ত্রকে “সাপোর্ট” দিয়েছি। “স্টেবিলিটি” দিয়েছি। কতজনকে গদিতে বসিয়েছি, কত গদি উলটে দিয়েছি। যেখানে ৪০% জীবিত মানুষ ভোট দেয় না, সেখানে আমরা ১০০% টার্নআউট দিতাম! চলো সবাই, হারুবাবুর কাছে “ডেপুটেশন” দিই।’
এতক্ষণ সভাপতি মশাই ব্রহ্মদৈত্য চুপ করে সব শুনছিলেন। এবার নীরবতা ভেঙে তিনি বললেন, ‘হুমম, চলো সবাই। এর একটা বিহিত চাই।’
ছোকরা ভুতেরা খনা গলায় হৈ হৈ করে উঠল— ‘চলো, চলো, চলো… বিহিত চাই, বিহিত চাই…’
হঠাৎই নিশুতি রাতে শ্মশানপাড়ার বটগাছে যেন দারুণ ঝড় উঠল । আস্তে আস্তে সেই ঝড় এগিয়ে চলল BLO অফিসার হরিবাবুর বাড়ির দিকে।
হরিবাবুর পুরো নাম হারাধন মুখোপাধ্যায়। এলাকার প্রাইমারী স্কুলের জাঁদরেল অঙ্কের মাস্টারমশাই তিনি। তিনি আর প্রমথেশ মিলে অনেক রাত অব্দি কাজ করেছেন। বার বার ভালো করে মিলিয়ে নিয়েছেন সবকিছু। কালই এলাকার এই নতুন ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। প্রমথেশ তার স্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসাবে কদিন আগেই জয়েন করেছে। কবিতা লেখে। জাঁদরেল হারাধনবাবুর ভারি ভালো লাগে ছেলেটিকে। ভরসাও করেন। পরিশ্রমী, উদ্যমী, মুক্তমনা, আদর্শবান। প্রমথেশও খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছে সব। নাহ, কোনো ভুতুড়ে ভোটার আর ঢুকে নেই। একটু আগে প্রায় দুটো নাগাদা প্রমথেশ বাড়ি গেল। এক গ্লাস জল খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন হারুবাবু। একটু যেন চিন্তিত তিনি। নেতাদের হুমকি টুমকি পাত্তা দেন না তিনি, তবু…।
এদিকে সেই ঝড়টা গিয়ে আস্তে আস্তে হরিবাবুর বাড়ি ঘিরে ধরল। সামনের সারিতে ব্রহ্মদৈত্য, মামদো, পেত্নীদি, গেছোভূত, স্কন্ধকাটারা… পেছনে ছোকরা ভূতের দল। স্লোগান উঠল: ‘আমরা আছি, আমরা থাকব! ভোটার লিস্টে নাম রাখব! SIR মানি না, মানব না!’
ব্রহ্মদৈত্য গলা উঁচিয়ে বলল, ‘স্যার, আমরা এই এলাকার রেগুলার ভোটার। আমাদের নাম কাটছেন কেন?’ ছোকরা ভূতেরা চেঁচিয়ে, জবাব দিন, জবাব দিন।
মামদো লাফিয়ে উঠে বলল, ‘স্যার, আমরা “ডেথ সার্টিফিকেটেড” হলেও “ভোট সার্টিফায়েড”! এই যে শেষ পৌরসভা ভোটে আপনার এলাকার কাউন্সিলার তো আমাদের ভোটেই জিতে ক্ষমতায় এলেন, তখন তো বলেননি আমরা মৃত? এ কেমন ডুয়াল স্ট্যান্ডার্ড?’
হরিবাবুর ইচ্ছে করছিল ঠাটিয়ে একটা চড় মারেন। কিন্তু পারলেন না। আসলে তিনিও ভূতেদের একটু ভয় পান। তাঁর গোটা শরীর আড়ষ্ট হয়ে এল। ঢোঁক গিলে বললেন, ‘আইন… আইন বলছে মৃত ব্যক্তির নাম থাকবে না, ডেড পার্সন ডিলিট করতেই হবে খুঁজে খুঁজে। আপনারা ডেথ সার্টিফিকেটেড। ভুতুড়ে ভোটার আর রাখা যাবে না।’
পেত্নীদি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘আমরা তো ভাতা চাই না, চাকরি চাই না, কিছুই চাই না আমাদের…’
হারুবাবুও শিউরে উঠে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, ‘আমি কী করব বলুন? উপর থেকে অর্ডার। ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন লাগবে। আপনারা প্রোডিউস হবেন কী করে? “সিস্টেম” মানবে না।’
শাঁকচুন্নি হৈ হৈ করে বলল, ‘আঙুলের ছাপ লাগলে ওই যে, আপনার বাড়ির থেকে চারটে বাড়ি পরে, ওই মালতি মাসিকে ডাকুন না। মালতি মাসিই তো আমার নামে শেষ ১০ বছর ধরে ভোট দিচ্ছে। ওর আঙুলই আমার আঙুল। আমাদের সবারই অথরাইজড সিগনেটরি আছে।’
ছোকরা ভূতেরা হৈ হৈ করে উঠল। হারুবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
কাতর গলায় বললেন, ‘আপনারা বুঝছেন না। আপনারা “ঘোস্ট ভোটার”। আপনাদের জন্যই তো SIR হচ্ছে। আমাদের ক্লিন ভোটার লিস্ট তৈরী করতে হবে।’
গেছোভূত গর্জে উঠল, ‘ক্লিন লিস্ট মানে? আমরাই তো আপনাদের গণতন্ত্রের ‘ব্যাকবোন’। আমরা ‘সাইলেন্ট কন্ট্রিবিউটর’! আজ আমরা নোংরা? আমরা বোগাস? আমরা যদি বোগাস হই, তাহলে গত ৭৩ বছরের সব ইলেকশন বোগাস! সব MLA, MP, সব জনপ্রতিনিধিরা বোগাস! পারবেন তো সেটা ডিক্লেয়ার করতে?’
হারুবাবু ঘামতে লাগলেন। কথা তো সত্য। ছোকরা ভূতেরা আবার হৈ হৈ করে উঠল। এবার বোধহয় তাদের সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। তারা হারুবাবুর ঘরের দরজায় এলোপাথারি ধাক্কা দিতে শুরু করল।
আর পারলেন না হারুবাবু। চোখ খুলে ফেললেন। প্রথমেই দরজার দিকে তাকালেন। না দরজা ঠিক আছে। প্রমথেশের গলা ভেসে এল, ‘ও হারাধনবাবু… উঠুন এবার… বেলা ৮টা বাজে। আমাদের ১০টার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অফিসে পৌঁছোতে হবে।’ কথা শেষ করেই প্রমথেশ আবার দরজায় ধাক্কা দিল। এবার কিছুটা অধৈর্য ভাবেই।
ধাতস্থ হতে একটু সময় নিলেন হারাধনবাবু। ও আচ্ছা ভূতেরা নয় প্রমথেশই তবে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। দেখলেন কাচের জানলা দিয়ে এক ফালি রোদ এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন তিনি। আজ অনেক কাজ।
অঙ্কের মাস্টারমশাই তিনি। গান-টান বিশেষ তাঁর ধাতে আসে না। কেবল একটি গানই মাঝে মাঝে নিজের মনে গুণ-গুণ করেন, ‘We shall overcome, We shall overcome, We shall overcome, someday… আমরা করবো জয় নিশ্চয়, একদিন।’ গানটা গুনগুন করতে করতে হারাধনবাবু দরজা খুলে দিতেই প্রমথেশ হুড়মুড়িয়ে ঢুকে এল ঘরের ভেতর। হাতে তার সামনের দোকান থেকে কিনে আনা গরম গরম কচুরি আর জিলেপি।