ফি চা র স্টো রি
চন্দন চৌধুরী
পৃথিবীর ‘গণতন্ত্র’— মার্কিন সাম্রাজ্যবাদনীতির একটি হাতিয়ার মাত্র
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক গণতন্ত্রের ওপর তাদের প্রভাব। অনেকে মনে করেন, ‘গণতন্ত্র’ আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রকে যখন বলা হয় আধুনিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, তখন এই ব্যবস্থার আড়ালে ভূ-রাজনীতির যে জটিল খেলা চলছে, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত প্রবল। রাজনৈতিক সমালোচকদের একটি বড়ো অংশ দাবি করেন, বর্তমান বিশ্বের গণতন্ত্র মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পায়ের তলায়’ বা তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। যখনই কোনো দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তখনই সেখানে নানাভাবে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ একটি স্লোগান মাত্র। বাস্তব চিত্র অনেক সময় ভিন্ন কথা বলে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার গভীর সখ্য এবং অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকা বা এশিয়ার কোনো কোনো গণতান্ত্রিক দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরওপ— এই বৈপরীত্য মার্কিন গণতন্ত্রের প্রচারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো দেশে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ কথা বলে হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িত ছিল। তেল সম্পদ রক্ষা বা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারই অনেক ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা বা একনায়কদের সমর্থন দিয়েছে।
চিলি (১৯৭৩): নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদর আলেন্দেকে সরিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অগাস্টো পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে সিআইএ-র ভূমিকা আজ সর্বজনবিদিত।
ইরান (১৯৫৩): মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে শাহ-র শাসন কায়েম করা হয়েছিল মূলত তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে।
ইরাক ও লিবিয়া: গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে এই দেশগুলোতে সামরিক অভিযান চালানো হলেও, আজ সেই দেশগুলো চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইরান, ভেনেজুয়েলা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এই নীতিগুলো মূলত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ এবং সরাসরি হস্তক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতি অত্যন্ত নিন্দাজনক এবং সরাসরি গর্হিত। ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে যুক্তরাষ্ট্র ‘অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা’ নেবে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরওপের প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে ইরান পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে যে, ইরান যদি পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে, তবে সামরিক হামলা চালানো হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে (হামাস, হিজবুল্লাহ) নিরস্ত্র করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। আর এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে সবচেয়ে বড়ো ও বিস্ময়কর মোড় এসেছে।
অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজলভ: ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। মার্কিন নীতি এখন দেশটিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে।
তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি শুরু করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে যে, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এবং প্রশাসনিক তদারকি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
অভিবাসন ও ড্রাগ ট্রাফিকিং: মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ড্রাগ পাচার এবং অভিবাসন সংকটের অভিযোগ তুলে এই হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
ফিলিস্তিন এবং গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি নতুন শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। ১৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করেছে। এর অধীনে একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক কমিটি’ বা ‘ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে। মার্কিন নীতির প্রধান শর্ত হল, হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে হবে এবং গাজার নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’-র কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বললেও, বর্তমানে তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সংস্কার করে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করছে। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিই তাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘নিষেধাজ্ঞা’-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর তাদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনেক দেশের অর্থনীতিকে চাপে রাখা হয়। যদি কোনো দেশ মার্কিন নীতি অনুসরণে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের অভাবের অজুহাতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরওপ করা হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, যা প্রকারান্তরে ওই দেশের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে।
‘সামিট ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের সম্মেলনের কথা বলা যাক। সমালোচকরা মনে করেন, এটি আসলে বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করার একটি কৌশল। যেসব দেশ মার্কিন বলয়ে থাকতে চায়, তাদের ‘গণতান্ত্রিক’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, আর যারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপসহীন, তাদের ‘স্বৈরাচারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে চীন ও রাশিয়ার উত্থান মার্কিন একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আর তখনই যুক্তরাষ্ট্র শুল্কযুদ্ধের আশ্রয় নিয়েছে। পাশাপাশি এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা তার ‘গণতান্ত্রিক মিত্র’ তৈরির প্রচেষ্টাকে আরও জোরালো করেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্রের প্রসারে আগ্রহী হত, তবে তাদের নীতিতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকত। ভারতের মতো বড়ো গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল বা অস্ত্র কেনে, তখন আমেরিকার অবস্থান বেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এতে প্রমাণিত হয়, গণতন্ত্রের চেয়েও ওয়াশিংটনের কাছে তাদের কৌশলগত মিত্রতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীর গণতন্ত্র বর্তমানে একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বাস্তবতা হল, গণতন্ত্র আজ মার্কিন স্বার্থ রক্ষার একটি মোড়ক মাত্র। তারা যে সাম্রাজ্যবাদীর জ্বলন্ত প্রতীক, তা তারা ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থায় একক মেরুকরণ বজায় থাকবে, ততক্ষণ ছোটো ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই বৃহৎ শক্তির মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপে না গিয়ে, সে দেশের জনগণের ইচ্ছায় পরিচালিত হবে।
(লেখক বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশক।)