Hello Testing

মু ক্ত গ দ্য

অলভ্য ঘোষ

Allabhya_Ghosh

কিচ্ছু বোঝেন না, আপনি

দেখুন, মূল্যবোধ-টুল্যবোধ— এখন এইসব একটা বুলি মাত্র। কোন নেতা কত চুরি করল, কোন নেতার বাড়িতে ইডি-সিবিআই রেড করল, কত কোটি টাকা তার প্রেমিকার খাটের তলায় পাওয়া গেল, তার কয়টি প্রেমিকা, কয়টি পত্নী, কয়টি উপপত্নী— এসব নিয়ে জনসাধারণ ফেসবুকে একটু-আধটু ট্রোল-ঠ্রোল করলেও আদতে তাদের কোনো মাথা-ব্যথা নেই। তারা নির্বিকার। যারা ট্রোল করে তারাও নির্বিকার। তারা Viewer-এর জন্য করে। তাদের ভাবনা ওখানেই শেষ। উলটে আপনার যদি বেশি ভাবনা আসে, আপনাকেই শুনতে হবে, আরে দাদা, হিংসে করবেন না তো। ওনার মতো পজিশন, ওনার মতো সুযোগ পেলে আপনিও ছেড়ে দেবেন না। আসলে এই যারা একটু বেশি ভাবেন তারা হলেন তৃতীয় দলভুক্ত, এবং তারা সংখ্যালঘুও বটে।  

দ্বিতীয় দলভুক্তদের সংখ্যা বেশি এবং তাদের যুক্তির ভাড়ারও কানায় কানায় পূর্ণ থাকে সর্বদা। কথায় কথায় তারা বিছিয়ে দেন যুক্তির মায়া জাল। এই যেমন ধরুন, তারা প্রথমেই টেনে নামাবেন সিনেমার পরিচালক, প্রযোজক, নায়ক-নায়িকাদের— এরা একাধিক প্রেম করে না, একাধিক বিয়ে করেননি? অথবা কে কার সঙ্গে কতবার শুয়ে হিরোইন-এর রোলটা বাগিয়ে নিল অথবা কত টাকায় বিক্রি হল হিরোর রোল। এসবের আসল কারণ আত্মপক্ষ সমর্থন। কারণ আপনি ভালো করে জানেন, অফিসে বসের সঙ্গে গায়ে ঢলাঢলি না করলে প্রমোশন হয় না। বাড়ির পরিচারিকা কিংবা পাশের বাড়ির বৌদির সঙ্গে একটু ইনটুপিংটু নতুন নাকি? ওসব না করলে জীবন তো পুরো নিরামিষ। আরে, এইসব ঘরোয়া কাহিনী! পাড়ায় পাড়ায় চলছে এবং চলবে। তাই তো এই আত্মপক্ষ সমর্থন। একটু বুকে হাত দিয়ে ভালো করে বলুন তো, আপনার পাড়ায় কটা ডিভোর্স কেস, কটা দ্বিতীয়, তৃতীয় বিবাহ হচ্ছে? হ্যাঁ, উত্তর হবে বেড়েই চলেছে, অস্বীকার করতে পারবেন কি? আর অনৈতিকতা? সে তো তৃতীয় দলভুক্ত সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত। আপনি কেবল আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যুক্তির মায়াজাল বিছিয়ে যাবেন।

কারণ রেলের টিকিট রিজার্ভেশন কনফার্ম করতে গিয়ে আপনিই টিটি-কে ঘুষ দেন, কি দেননি? আপনার বাড়িতে যে ছেলেটি রান্নার গ্যাস পৌঁছে দেয়, তাকে বড়ো রকম বকশিশ করেননি, যাতে এই দুর্দিনেও আপনার গ্যাসের সাপ্লাইটা ঠিক থাকে। যদিও আপনার বাড়ির গ্যাস প্রাপ্তি নির্ভর করছে ওই হরমুজ না তরমুজের ওপর, কিন্তু আপনি ঘুষ ওই ছেলেটাকেই দেবেন, কারণ অত ভাবেনই না আপনি। আপনি ভাবেন প্রথমে নিজের কথা, তারপর পরিবারের কথা, তারপর আত্মীয়-স্বজন, তারপর বন্ধুবান্ধব। আরে বাবা, এটাই এই সময়ের কালচার, সংস্কৃতি! আপনি তো দেখছি মশাই সংস্কৃতিটাও বোঝেন না!

তারপর ধরুন কর্পোরেশনের প্ল্যান বার করতে গিয়ে কিংবা স্যাংশন পাস করাতে গিয়ে, কিংবা ধরুন আপনার বিদ্যুতের লাইন আনতে গিয়ে অথবা টেন্ডার ধরতে গিয়ে আপনি দালাল ধরেননি? ধরেছেন— না ধরে যাবেনই বা কোথায়। সোনাগাছির দালালদের মতো এখন সর্বত্রই দালালি প্রথার রমরমা। এই প্রফেশনটাই তো একমাত্র ফাঁকা আছে এখন।

উহু, এত লজ্জা পাচ্ছেন কেন! লজ্জায় যে একেবারে রাঙা বউ হয়ে উঠলেন। হ্যাঁ, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আমরা কেউ বিশুদ্ধ? ঘুষ যিনি নিচ্ছেন তিনি যেমন নির্লজ্জ, যিনি দিচ্ছেন তিনিও। আর যত দোষ নন্দ ঘোষ বলে শুধু নেতাদের দিকে আঙুল তুললেই হবে?

নেতা যদি ভোটে টাকা দিয়ে টিকিট নেয়, যে টাকাটা সে ইনভেস্ট করল, (সে তো আর দান করতে আসেনি।) সেই টাকাটা যদি সে এই বাজার থেকে তোলে… সেটা তার অপরাধ? রাজনীতি এখন একটা ব্যবসা। যে টাকা সে ইনভেস্ট করেছে তা তো তাকে তুলতেই হবে। সে তোলাবাজি করে হোক আর কয়লা, বালি, রেশন খেয়ে ফেলে হোক। আর খেয়ে তাদের বদহজমই বা হবে কেন?

এই যে ডাক্তার মোটা টাকা খরচ করে ডাক্তারি পড়ার পর সে কি কখনো ফ্রি-তে রোগী দেখে? যে টাকা সে ইনভেস্ট করেছে তা তো তাকে তুলতেই হবে। সে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মল-মূত্রের ওপর কমিশন খায়। প্রেসক্রিপশনে সেই সব কোম্পানিরই ওষুধ লেখে সে, যেসব কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা তাকে উপহার দেয় বা বিদেশ ঘুরিয়ে আনে। ঠিক তেমনি নেতারাও সেই কাগজেই সই করে, যেখান দিয়ে তার টু-পাইস আসে। এতে আর অন্যায় কোথায়? তাদের খিদে পায়। আপনাদের থেকে তাদের বৌ-বাচ্চার সংখ্যা বেশি। তারপর আছে দলীয় কর্মীরা। এদের না খাওয়ালে প্রতিটি ইলেকশনে লড়বে কারা? কোথা থেকে এরা এত জোর পাবে? ধোঁয়া তুলসী পাতা কে? পাঁক খায় সব মাছ, শুধু একটি মাছেরই নাম হয় পাঁকাল মাছ।

আসলে গোটা সিস্টেমটাই করাপ্ট। নেতা তো আর ভিন গ্রহ থেকে আসছেন না— তারা আমার-আপনারই পাড়ার লোক, আপনার ঘরেরই দাদা-ভাই-বোন বা আপনারই ছেলে-মেয়ে। এখন কথা হল, প্রথম দলভুক্ত এই  এরা সংখ্যাগুরু না হলেও এদের প্রতিপত্তি আকাশচুম্বী। সিবিআই-টিবিআই মাঝে মাঝে বাড়িতে হানা দেয়। (তারা তো আর যার-তার বাড়িতে যায় না। তার জন্য এলেম থাকতে হয়।) পুলিশ তুলে নিয়ে যায় না। এতে তাদের সম্মান বাড়ে বই কমে না। যারা চিনত না, তারাও চিনে নেয়। জেল থেকে ফিরে আসার পর এদের আরও অনুগামী জোটে। কেন জেলে নেতাজি, গান্ধীজি— এঁরা যাননি?

যেখানে গোটা কোম্পানিটাই (সময়) জাল, সেখানে প্রোডাক্টে (প্রজন্ম) জালিয়াতি হবেই— এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয় দলভুক্তরা সারাক্ষণ ক্যামেরা চালিয়ে লুঙ্গি ড্যান্স নাচবে। তাতেই তারা ভাইরাল। বাপের টাকা ঢেলে,  টুকে পাস করা পাস করা ডাক্তারও এখন চেম্বারে না গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হেলথ টিপস নিয়ে। তাতেই ভাইরাল। তাতেই টাকা। টাকার ঝড় উঠেছে। শুধু টাকা আর টাকা। কোথা থেকে আসে এত টাকা?

ছাগলের তৃতীয় সন্তান সংখ্যালঘু তৃতীয় দলভুক্তরা, যারা বেশি ভাবেন, যুক্তি-তক্কো-গপ্পো জোড়েন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লব ছড়াতে (হাগতে) গেলেই পোস্টের রিচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কমিউনিটি গাইডলাইন দেখিয়ে অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সাইবার ক্রাইম— সোজা বাড়িতে হাজির হয়ে যায় পুলিশ। আপনি তৃতীয় দলভুক্ত, বাড়িতে পুলিশ এলে সম্মান-টম্মান কিচ্ছু বাড়ে না আপনার।   

কী বলছেন? লেখার অধিকার, কথা বলার রাইটস— ওসব অধিকার-টধিকার, হিউম্যান রাইটস সব কাঁচকলা। দেখছেন না, অভয়ার মা ভোটে দাঁড়িয়েছেন আইন পাবেন বলে। হ্যাঁ, আইন-কানুন বিচার-টিচার— সবকিছুই নেতাদের জন্য। ওরাই তো হর্তাকর্তা বিধাতা। আসুন, আপনিও আসুন, পার্টি করুন। না হলে ‘না ঘরকা না ঘাটকা’— ভাগাড়ের মড়ার মতো দশা হবে আপনার। সত্যি, কিচ্ছু বোঝেন না আপনি।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *