Hello Testing

উ প ন্যা স  পর্ব ৪

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

যাইহোক সিলি সাসানের কথায় উল্লাসে ফেটে ওঠে। কবে কখন কোন ট্রেনে কিভাবে গুজরাত যাওয়া যাবে সেই নিয়ে লবকে বাসর রাত থেকেই তাড়া মারে।

কোনো এক গ্রীষ্মের ভোর। কেয়াতলার গাছ-গাছালির ফুটপাত ধরে ধীরেন ধর হাঁটতে হাঁটতে গড়িয়াহাটের মাছ বাজারে উপস্থিত। অবশ্য এই মাছ বাজার ধীরেন ধরের কাছে মোটেই নতুন নয়। গত পঞ্চাশ বছর ধরেই এই বাজারেই এসে বিভিন্ন রকম মাছের সংবাদ পায়। আসলে কোনো বাজার যদি স্টেশনের কাছে বসে তা হলে সেই সব বাজারে মাছের প্রচুর আমদানি হয়। যেমন বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে বলে গড়িয়াহাট মাছ বাজারে আসে ক্যানিং-এর লোকেরা। সুন্দরবনের লোকেরা। এরা অত্যন্ত ফ্রেশ মাছ আনে। এদের মাছের চোখ দেখলেই বোঝা যায় মাছগুলি অত্যন্ত ফ্রেশ। সতেজ।

শৈশবে বড়ো পুত্রকে নিয়ে ধীরেন ধর এই বাজারেই বাজার করতে শেখায়। মানে এখানেই লবের বাজারের হাতেখড়ি। ফলে গড়িয়াহাট মার্কেট ধীরেন ধর আর লবের এক নাড়ি কেন্দ্র। ধীরেন ধর লবকে শেখায় কারা ভালো বাগদা চিংড়ি আনে, কোন মহিলার ঝুড়িতে থাকে ছটফটে মোরলা মাছ অথবা জ্যন্ত খলসে মাছ। অত্যন্ত সুস্বাদু চিতল মাছ কার কাছে পাওয়া যায়। কচি পাঁঠার মাংস দীর্ঘদিন ধরে কে বিক্রি করে। ইত্যাদি সব। এমনকি সবজি বাজারও ধীরেন ধরের মুখস্থ। কোন মহিলার মোচা মিষ্টি। কোন মহিলার সজনে ফুলে শুধু পরিষ্কার ফুলই থাকে! কোন ছেলেটির ইচর দারুন! কোন বৃদ্ধের কাছে বকফুল ভালো পাওয়া যায়! ধীরেন ধর বকফুল ভাঁজা খুবই পছন্দ করে। লবও পছন্দ করে। কুশ অতটা নয়।

ধীরেন ধর বাজার করতে খুবই ভালোবাসেন। শুধু গ্রীষ্মের ভোর নয়। এমন কি বাজারে সকালে ছাতা মাথায় দিয়ে গড়িয়াহাট আসেন। গড়িয়াহাট থেকে বাজার না করলে ধরবাবুর শান্তি নেই। খাওয়ায় রুচি আসে না। লব কিন্তু পিতৃদেবের সঙ্গে বাজার করা শিখতে গিয়ে টের পায় যে গড়িয়াহাটের মাছ না কিনলে খাওয়া জমে না। অথবা প্রতি রবিবার কচি পাঁঠার মাংস না কিনলে ভাত হজম হয় না। পিতার কাছে শৈশবের হাতেখড়ি কেউ কি ভুলতে পারে! চরম শত্রু পুত্রও ভুলতে পারে না। এই ভোলা মানে ইতিহাসকে ভোলা। মনুষ্য প্রজন্মকেই ভোলা। অর্থাৎ জড় পদার্থকে নয় প্রাণজন্মকেই ভোলা। প্রাণ বেঁচে থাকে। বেঁচেই চলে। প্রাণ বহমান। সে থামতে জানে না। কিন্তু জড় পদার্থ থেমে যায়। ক্ষয় হয়। শেষ হয়ে যায়। প্রাণ চলতে থাকে। প্রাণ অন্য প্রাণে স্থানান্তরিত হয়। প্রাণের শেষ নেই। ক্ষয় নেই। সে অবিচল। প্রাণ নষ্ট হয় না। প্রাণের ক্ষয় আছে। ক্ষরণও আছে তবুও প্রাণ জীবন্ত। মায়াময়। প্রাণ বিস্ময়কর। বহু আধারে আধারিত। প্রাণ যেন বায়ু। বাতাস। অথবা উচ্চ হিমালয়ের চলন্ত বায়ুমণ্ডলে। প্রাণ নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি! বৈজ্ঞানিকরা প্রাণ খোঁজে গ্রহ-বিগ্রহে। আকাশে-পাতালে। কেন না প্রাণ এক রোমাঞ্চকর জিনিস। মনুষ্য জাতির প্রাণ থাকলে কি আর কোনো জিনিসের প্রাণ থাকতে পারে না! যদি অন্য কোনো প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায় তবে হয়ত ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা লেখাটাই জেনে যাবে। উ‍‌ন্নত কোনো প্রাণের খোঁজ পেলে এই সাদামাটা লেখা বদলে যাবে। সেখানে শুধু মানুষের উন্নতি আর উন্নতি। মানুষ সেখানে অন্য প্রাণ নিয়ে জীবন্ত। মিছিল নেই। বেকারত্ব নেই। হোম স্টে নেই। ব্রেক আপ নেই। কিছুই নেই। মানে সেখানে নেগেটিভ শূন্য। শুধুই সেই প্রাণে আছে প্লাস। মানে জীবন। জীবন্ত।

                          

লব আর সিলি ভেরাভল স্টেশনে নেমে হোম স্টে-তে যখন গাড়িতে যায় তখন প্রায় বিকাল। দুর্গাপুজোর দশদিন বাদে এখানকার ওয়েদার বেশ মনোরম। বিকালে গরম থাকে না। এক ধরনের উলটো ঠান্ডা হাওয়া মৃদুমন্দ বয়। এই মৃদুমন্দ হাওয়া নামে চোখে ঘাড়ে মুখে মিনমিনে স্পর্শে। শরীর মন আনন্দে ভরে ওঠে। লব সিলি এই আনন্দে সম্পূর্ণ ডুবে যেতে চায়। ডুবে যেতে চায় আশপাশ থেকে এক ধরনের বুনো গাছের গন্ধে পাগল করা প্রকৃতি ও আকাশের চিত্র-বিচিত্র রূপ দেখে।

রাতে বুনো হাঁসের স্ট্রু। পাতলা চার-পাঁচটা আটা-ময়দা মেলান হাতরুটি। সঙ্গে মিক্সড ভেজিটেবলের তরকারি। আর ঘুমতে যাওয়ার আগে দরজায় টোকা মেরে একটি বালিশ নিয়ে এল আর দু-কাপ কালো কফি। সিলির নতুন জায়গায় ঘুম আসে দেরিতে। লবের তা নয়। বিছানায় শরীর এলালেই চোখ জোড়ায় পাতা ভারী হয়ে যায়। সিলি না ঘুমিয়ে কাঁচের জানলা দিয়ে দেখে দূরে দূরে এক আধটি টিলা। অন্ধকার টিলাগুলি ছায়া-টিলা হয়ে ভেসে আসে। বেশ রাত পর্যন্ত কানে বাজে ঘুনপোকার ক-র্-র্ ক-র্-র্ শব্দ। সিলি উপলব্ধি করতে চায় এই শব্দ কোথা থেকে আসে। ঘরের তো সব দরজা-জানলা বন্ধ। পোকা-মাকড়ের জন্য সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ রাখতে হয়। তবুও একনাগাড়ে ঘুনপোকার একধরনের মাথা ধরানোর শব্দ কানে আসে। বুঝতে পারে না কতগুলি ঘুন পোকা ডাকে। একটা না দুটো না তিনটে! যদি দুটো হয় তবে কি জন্য এত শব্দযাত্রা! মাথা ধরানোর কারণই বা কি! এই একনাগাড়ে শব্দ স্রোতের ভিতর কেউ কি ঘুমতে পারে! লব পারে। কিন্তু সিলি পারে না। সিলি বেশ রাত পর্যন্ত জানলা দিয়ে ছায়াটিলা, ছায়াগাছ, ছায়াপথ, ছায়াভ্যালি দেখতে দেখতে ঘুনপোকার বিরক্তিকর শব্দ শুনে চলে। এক সময়ভাবে কী নিয়ে পোকাগুলি এত ডাকে! এই শব্দ তরঙ্গ কি শুধুই ডেকে যাওয়া! না তারা মনের কোনো দুঃখে বা ব্যথায় কেঁদে চলে। অবশ্য এদের ভিতরেও তো ক্ষয় আছে। সুখ আছে। দুঃখ আছে। অশান্তি আছে। এদেরও তো ক্ষয় আছে। ক্ষরণ আছে। এদেরও তো কথামালা থাকতে পারে।

                       

পশ্চিমবঙ্গে আজ কালিপুজো। গুজরাতে কাল দীপাবলি। সাসানের প্রেমে লব আর সিলি কালিপুজো থেকে অনেক দূরে। এখানে আলো নেই, বাজির শব্দ নেই। রং-মশালের রোশনাই নেই। তুবড়ির ঝিলিক নেই। না থাক! তবুও তো মন-ভোলানো এক পাহাড়ি জঙ্গল আছে। রাজকীয় পশুরাজ আছে। বয়ে চলা ঝর্নার স্রোত আছে। দু-দিন আগে থেকে বুক করা সাফারি জিপে আজ সকাল থেকেই চলে সামান গিরের জঙ্গলে সাহসের সঙ্গে ঘোরাঘুরি। উঁচু-নীচু টিলা পথে যেতে যেতে চোখে ভাসে প্রকৃতির অপরূপ শোভাচিত্রমালা। নাম না জানা কতরকমের গাছ। বুনো শুয়োর। জাত পশুরাজ। ব্যক্তিত্বপূর্ণ পশুরাজ। একসময় একটু দূরে চোখে ভেসে ওঠে দুটি ব্যক্তিত্বপূর্ণ সিংহ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেউই এক চুলও নড়ে না। যেন কেউই কারোর ব্যক্তিত্বকে ছোটো করে দেখে না। লবের মনে হয় যেন বাবার সামনে এইভাবে নিজে দাঁড়িয়ে। এই ব্যক্তিত্বর জন্যই কতদিন বাবার সঙ্গে কথা হয় না! কত বছর হবে! পাঁচ! ছয়! সাত! সাফারি জিপের হাতল ধরে খুব বাবার কথা মনে হয়। বাবার শরীর কেমন আছে! ঠিকমতন খাওয়া-দাওয়া করে তো! লবের মন ডুকরে ওঠে। যেন ভেতরটা খণ্ড-বিখণ্ড হতে শুরু করে। আজকাল লবের প্রায়ই বাবার কথা মনে পড়ে।

বাবারও কি লবের কথা মনে পড়ে! কত দিন কত রাত বাবা লবের জন্য ঘুমোতে পারে না! গড়িয়াহাট বাজারে এলে আজও কি ধীরেন ধরের বুকে মোচড় মারে না! কতদিন কতকাল ধীরেন ধর আর লব একা একা নিঃস্ব হতে থাকবে! এই ক্ষয়ের শেষ কোথায়! কত বছর বাদে এই ক্ষরণ বন্ধ হবে! কথামালাও শেষ হবে! না এই ক্ষয় চলমান। ক্ষরণও চলমান! কথামালাও মনে হয় শেষ হয়েও শেষ হওয়ার নয়। দুপুরের দিকে সাফারি জিপটি একটি টিলার ঢালে দাঁড়ায়। পাশেই এক বিশাল বটগাছ। আকাশ ঢেকে থমকে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মুখোমুখি রাশভারি পুরুষ সিংহজোড়া। একচুলও কেউ নড়ে না। না সামনে, না পিছনে, না পাশে। স্থির চার জোড়া গোলাকার অ্যাম্বার রঙের অর্থাৎ খয়েরি হলুদ চোখ অত্যন্ত তীক্ষ্ন। জেদি। আভিজাত্যপূর্ণ। রাতে এই চোখের সামনের পর্দা সরে যায়। চোখ হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। হিংস্র। শিকারী। একটি পাহাড়ি বিড়াও পালাতে পারে না। ধরা পড়বেই।

                       

অহঙ্কার জেদ এই জিনিস কখনও ভালো না। পতনের সূত্রপাত। এই পতন বাহ্যিক ধরা পড়ে না। মনের ভিতরে চাপ তৈরি করে। দুটি বলবান ব্যক্তিত্বপূর্ণ স্বাধীন সিংহদ্বয় যেভাবে একে অপরের রাস্তা আটকে রাখে তা সেই দৃশ্যে যতই দম্ভ বা ব্যক্তিত্ব থাকুক না কেন দুজনেরই মনের ভিতরে এক চাপ তৈরি হয়। পতনের গন্ধ পায়। হেরে যাওয়ার ভয় থাকে। একজন একটু নরম হলে মহাভারত মোটেও অশুদ্ধ হয় না। বরং শুদ্ধ হয়। নরমের ভিতরেই আসল জয় লুকিয়ে থাকে।

লব ভাবে গুজরাত থেকে ফিরেই একবার ধীরেন ধরের সঙ্গে যোগ করবে! দেখা হলেই কি বাবা আগের মতো আনন্দে নেচে উঠবে! বুকে জড়িয়ে ধরবে! না রাশভারি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষটির ঘাড় মাস জোড়া চোখে এক ধরনের অবজ্ঞা অবহেলা নিয়ে দৃঢ়ভাবে তাকিয়ে থাকবে! মুখে কথা নেই। মুখমণ্ডলের চেহারায় কোনো মায়া-মমতা-স্নেহ নেই। সিংহের মতো চোখ জোড়ায় শুধুই বিরক্তি। যেন এখনি ধমকে উঠবে, না-জানিয়ে বিয়ে কেন করলি! একবারও কি বাবাকে মনে পড়ল না! এতদিন কেন সম্পর্ক রাখলি না! এখন কেন আমার কাছে আসা! ইত্যাদি, ইত্যাদি…।

এই উদ্ভট অদ্ভুত পরিস্থিতিতে কী করবে লব! ধীরেন ধরের সঙ্গে কি সমান দাপট দেখিয়ে সিংহের চাউনিতে তাকিয়ে থাকবে! তারও জোড়া চোখ ধীরে ধীরে বাদামী হলুদ হয়ে উঠবে! ফুটে উঠবে সমান ঘৃণা! বা দন্ত! বা ব্যক্তিত্বময় পুরুষালি চেহারা! নাকি নিজেদের আর ক্ষয় হতে না দিয়ে একটু নরম হয়ে উঠবে! দু-চোখে মায়া-মমতা মেখে বাবাকে জড়িয়ে বলে উঠবে, স্যরি বাবা! তোমার সঙ্গে এতদিন কথা না বলে, সম্পর্ক না রেখে আমি অনেক নিজের ক্ষয় করেছি। সঙ্গে তুমিও আমার জন্য নিজেকে শেষ করে দিয়েছ। তোমার ক্ষরণ আমি বেশ উপলব্ধি করতে পারতাম। খালি মনে হত তুমি ভেতরে ভেতরে কত লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছ।

আজ থেকে আর নয়। আর কোনো ক্ষরণ আমরা হতে দেব না। আজ দুপুরে বেশ জামিয়ে আনন্দে লাঞ্চ করি। মা আর সিলি দু-জনে মিলে আমাদের খাওয়ার পরিবেশন করবে।

      

আজ ভোরে সাসান গিরি জঙ্গলে এক পশলা আষাঢ়ের মতো সাদা বৃষ্টি হয়ে চড়া মিষ্টি রোদ ওঠে। বৃষ্টির জলে সাসান গিরকে অন্তত সুন্দর, নরম আর পরিষ্কার লাগে। ছোটো-খাটো টিলাগুলি বৃষ্টির জলে ধুয়ে কেমন চকচকে। গাছ-গাছালিরা কত সবুজ! মনে হয় সবুজের ওপর সবুজ রং করা আছে। দূরে বনবিড়াল, কাঠবিড়ালেরা খেলা করে। একটি মোটা নাম না জানা গাছের কোটরে কাঠঠোকরা ঠক্-ঠক্ করে গাছটিকে ফুটো না করে শান্তি পায় না। কাঠঠোকরা কি জানে না গাছেরও প্রাণ আছে! সেও জীবন্ত বস্তু। তারও শরীরে ব্যথা লাগে, কষ্ট হয়। এই ক্রমাগত ঠকঠক শব্দে তারও শরীরে ক্ষমা হয়। ক্ষরণও হয়!

এইখানে আজ দীপাবলি। জঙ্গলের কাছাকাছি হোম স্টে-তে থাকার কারণে খুব একটা আলোর রোশনাই চোখে পড়ে না। তবুও টিলার খাঁজে খাঁজে ঘর-বাড়িতে প্রদীপের আলো দেখা যায়। বিন্দু-বিন্দু আলোক মালা সন্ধ্যার সময় জঙ্গলের পরিবেশকে বেশ মনোরম করে তোলে। একবার ঠিক করে সাফারি জিপে আজ সারারাত ঘুরলে কেমন হয়! কিন্তু অনুমতি পাওয়ার কোনো উপায় নেই বলে রাতের জঙ্গল মানে গভীর রাতের জঙ্গলের শোভা কি চমৎকার কত বীভৎস হতে পারে সেই দৃশ্য থেকেও বঞ্চিত হওয়ার জন্য লব আর সিলের মন খারাপ। জানতে ইচ্ছা করে গভীর রাতে সিংহরাজের চোখ জোড়ায় পাতলা পর্দা সরে গিয়ে সেই চোখ কতখানি হিংস্র হয়ে ওঠে! বাদামী হলুদ রঙে কেমন ভাবে পশুরাজ শিকার করে! কেমনভাবে শিকার করে পেটে খিদে না থাকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃত শিকারিকে ঝোপঝাড়ে ফেলে রাখে!

(চলবে)

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *