গ ল্প
অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
যুদ্ধ
অতঃপর রবীন্দ্র মালাকার গঙ্গার ঘাটে এসে বসল। নদী বয়ে যাচ্ছে ধীর গতিতে। পরিষ্কার, স্বচ্ছ জল। মাঝে মাঝে কিছু কচুরিপানা নামছে বটে, তবে সেটা তেমন কিছু নয়। শান্ত, নির্জন একটি ঘাট। ঘাট ঘিরে নানান গাছপালা— ফলের, ফুলের। সেখানে পাখি উড়ে এসে বসে, ডাকে, ফল খায় আবার ফিরে যায়।
এমনি এক পাখি ফিরে যাবার সময় কদমগাছের ডালটা এমন করে কাঁপিয়ে দিল যে সেই ডাল থেকে এই এত্ত বড় একটা কদমফুল খসে ফটাস করে পড়ল রবীন্দ্রর মাথায়। ভাগ্যিস কাউবয় টুপিটা মাথায় ছিল। টুপিটি খুলে রবীন্দ্র পাশে রাখল। উপর দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই সময়ে কদম ধরে গেল গাছে? আজ সবে চৈত্রের পাঁচ তারিখ। এরই মধ্যে! কিন্তু উপরে তাকিয়ে সে কেবল পাতা দেখল আর দেখল দুটি কোকিল— একটি পুরুষ ও একটি নারী। ওরা ডাকছে না। চুপ করে এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
অতঃপর রবীন্দ্র মালাকার গঙ্গার ঘাটে এসে বসল। নদী বয়ে যাচ্ছে ধীর গতিতে। পরিষ্কার, স্বচ্ছ জল। মাঝে মাঝে কিছু কচুরিপানা নামছে বটে, তবে সেটা তেমন কিছু নয়। শান্ত, নির্জন একটি ঘাট। ঘাট ঘিরে নানান গাছপালা— ফলের, ফুলের। সেখানে পাখি উড়ে এসে বসে, ডাকে, ফল খায় আবার ফিরে যায়।
এমনি এক পাখি ফিরে যাবার সময় কদমগাছের ডালটা এমন করে কাঁপিয়ে দিল যে সেই ডাল থেকে এই এত্ত বড় একটা কদমফুল খসে ফটাস করে পড়ল রবীন্দ্রর মাথায়। ভাগ্যিস কাউবয় টুপিটা মাথায় ছিল। টুপিটি খুলে রবীন্দ্র পাশে রাখল। উপর দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই সময়ে কদম ধরে গেল গাছে? আজ সবে চৈত্রের পাঁচ তারিখ। এরই মধ্যে! কিন্তু উপরে তাকিয়ে সে কেবল পাতা দেখল আর দেখল দুটি কোকিল— একটি পুরুষ ও একটি নারী। ওরা ডাকছে না। চুপ করে এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
ঘাটের সামনেই একটা নৌকা ভাসছে। নদীর খানিকটা অংশ জুড়ে জাল ফেলে নৌকাটা ঘাটের কাছে এসে নোঙর ফেলল। নৌকাতে একটাই লোক আছে। সে একবার পিছু ফিরে রবীন্দ্রকে দেখল। তারপরে গায়ের গেঞ্জিটা খুলে ফেলে নৌকার মাথায় বসে একটা বিড়ি ধরাল। নৌকার ছইয়ের মধ্যে রাখা কুড়ি লিটারের জলের ক্যান।
এই সময়ে এই নির্জন ঘাটে এক বুড়ি এসে গান করতে শুরু করল। রাধাকৃষ্ণের গান। সে কাছেই এক বাদাম কারখানায় কাজ করে। খোলা থেকে বাদাম ছাড়ানোর কাজ। ঘন্টা দুই কাজ করলে একশো টাকা কামাই। এক কেজি বাদাম ছাড়ালে পাঁচ টাকা মজুরি। আর ছাড়াতে গিয়ে বাদাম যদি ভেঙে যায়, তার মূল্য কেজি প্রতি তিন টাকা। বুড়ির নাম তাপসী। বয়স ষাট। সে রবীন্দ্রর পাশে এসে বসল। বসে, দুলে-দুলে গঙ্গার দিকে চেয়ে গান করতে থাকল। বুড়ির গান শেষ হলে রবীন্দ্র বলে, তোমার বাড়ি কোথায়?
এই তো সামনেই। তোমার?
সে অনেক দূর গো। বলে রবীন্দ্র রং করা সরু গোঁফের ফাঁকে ফিক করে একবার হাসে। তার ঠোঁটে লেগে গুটকার গুঁড়ো।
অনেক দূর? তা সেখান থেকে এলে কিভাবে?
হেঁটেই এসেছি। হেঁটে হেঁটে নদীর ধার দিয়ে ঘুরতে আমার ভালো লাগে।
আমিও হাঁটি, বুঝলে। আমারও ভালো লাগে হাঁটতে। নদীর ধার দিয়ে যখন হাঁটি তখন কত মানুষ দেখা যায়। শ্মশান চোখে পরে। আর দেখি মন্দির। মনে হয় হেঁটে হেঁটেই একদিন চলে যাই সুন্দরবন।
রবীন্দ্র বলে, তোমার ঘরে গ্যাস আছে?
আছে। তোমার?
নেই।
হ্যাঁ, যুদ্ধের কাল, তাই নাকি গ্যাস মিলছে না। আচ্ছা, যুদ্ধটা কোথায় যেন হচ্ছে?
হচ্ছে, দূরে কোথাও হচ্ছে, আমি ঠিক ধরতে পারছি না। পারলে যুদ্ধে যেতাম।
ওমা! তুমি যুদ্ধে গিয়ে কী করবে?
কেন? যুদ্ধু-যুদ্ধু খেলব।
তোমায় নেবে? বুড়ি হাসে। বয়স তো তোমার কম নয়। বুড়োদের যুদ্ধে নেয়?
কেন নেবে না? যুদ্ধে সবারই দরকার আছে। আর আমাকে বুড়ো বলো না। আমার চুল কালো।
সে তো রং করা।
যাই হোক, কালো কিনা বলো?
বুড়ি এবার হা হা করে হাসে। হাসতে হাসতে দু-দিকে মাথা নাড়ে। গান ধরে। কৃষ্ণের গান। কিছুক্ষণ পর গান থামিয়ে বলে, কিন্তু তুমি যাবে কোথায়? যুদ্ধ কোথায় হচ্ছে তাই তো জানো না।
রবীন্দ্র ভালো করে দেখে বুড়িটিকে। রোগা, লম্বা, কালো। প্রায় তারই মতো বয়স হবে। মুখে কালো কালো ছোপ… গাঢ়। হাতের দুটি আঙ্গুলের চামড়া কুঁচকে গিয়ে মোটা হয়েছে। বুড়ি কিন্তু দিলখোলা মানুষ। যে শাড়িটি পড়েছে সেটি মলিন হলেও নোংরা নয়। সিমেন্টের বেঞ্চে রবীন্দ্রর পাশে বসে নিজের মনে পা দোলাচ্ছে।
রবীন্দ্র কথা ঘোরায়। রবীন্দ্র বলে, সুন্দরবনে কে আছে তোমার? সেখানে হেঁটে হেঁটে যাবে কেন?
সেখেনেই তো আমার বাড়ি গো।
এই যে বললে সামনেই।
বুড়ি হেঁয়ালি করে বলে, সামনেও আমার বাড়ি, ওখানেও আমার বাড়ি।
আর ছেলেপুলেরা?
নেই।
রবীন্দ্র অবাক হয়ে বলে, মানে? কোথায় গেল সব?
আমি বিয়েই করিনি!
করনি কেন?
কেউ করল না যে।
কেন, করল না কেন?
একজন বেশ্যাকে কে বিয়ে করবে?
মানে?
হ্যাঁ গো, যা শুনলে তাই।
একটু থেমে আবার বলা শুরু করল বুড়ি, আমি একজন বেশ্যা। তবে এখন বয়স হয়েছে, সেসব কাজ ছেড়ে দিয়েছি প্রায় দশ বছর। প্রথেমে লোকের বাড়ি কাজ করতুম। বাসন মাজার কাজ। অনেকে আমার পরিচয় জেনে কাজে নিত না। তারপর রেলপাড়ের হোটেলে কাজ নিই। কুটনো কোটা, কড়াই মাজা… সেও বেশি দিন করা হল না। আসলে আগে সুখী ছিলুম, মদ-মাংসের উপর দিয়ে গেছি, শরীর বিক্রি করেছি কিন্তু শরীর খাটাইনি— সইবে কেন বল অমন ধকল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে অসুস্থ হয়ে পড়লুম। শেষে এই কাজ। বাদাম ভাঙা। এটি বেশ। এক-দু-মুঠো বাদাম ভেঙে খেলে মহাজন কিছু বলে না।
তুমি তাহলে এখন থাকো কোথায়?
ওই যে, ওই বাদাম কারখানার মেয়েরা সবাই যেখানে থাকে…
তাহলে সুন্দরবন যাবে কেন?
আমি তো সুন্দরবনেরই মেয়ে। অল্প বয়সে বাপ-মা মরল। কাকা ধরে এনে বেঁচে দিলে। তখন বয়স কম, দেখতে সুন্দর, প্রচুর কাস্টমার আসত। কিন্তু যা টাকা পেতুম সবই মাসি নিয়ে নিত। মাসি আমাকে দালালের হাত থেকে কিনেছিল। সেই টাকা তোলবার জন্যে আমাকে প্রচুর খাটাতে। মাসির লাভ, আমার লবডঙ্কা! তারপরে সেখান থেকে এখানে।
বুড়ি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। রবীন্দ্রও। একটু অবসাদগ্রস্ত লাগল রবীন্দ্রর। যতই চুলে রং করুক সে, মাঝেমাঝেই শরীর-মন জানান দেয় সে বুড়ো হচ্ছে।
আমার গান শুনলে? কেমন লাগল?
সুন্দর। তোমার নিজের লেখা?
হ্যাঁ। তবে আমি লেখাপড়া জানি না। তাই লিখতে পারিনি। মুখে মুখে বানাই। মুখে মুখেই গাই।
একটু থেমে রবীন্দ্রর দিকে একবার তালিয়ে সে আবার বলা শুরু করল, সেদিন পাশের পাড়ায় কারখানার মেয়েদের সঙ্গে নামগান শুনতে গিয়ে সে এক কাণ্ড। দু-বাহু তুলে রাধে-কৃষ্ণ বলে নাচতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি নাচছি তখন, একমনে… দেখি সবাই নাচ থামিয়ে দিয়ে আমার নাচ দেখছে। আমি তো আত্মভোলা। নাচ আর গৌর নিয়ে থাকি। মনে মনে ভাবি কবে পাথেয় পাব, বৃন্দাবনে যাব। তো হল কি… সকলে নাচ থামিয়ে আমাকে দেখছে, উঠোনময় লোক, সবাই, মেয়ে-পুরুষ, সকলে আমাকে বলে, তুমি ভগবানের মতো নাচছ। আমি তো অবাক। আমি তো বেশ্যা। ভগবান হওয়ার কে আমি?
কপালে তিলক কই তোমার?
উঠে গেছে।
তুলসির মালা?
ছিঁড়ে গেছে।
তা তুমি সুন্দরবন যাবে না?
যাব তো ভেবেছিলাম। নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে একটি ঠিক সুন্দরবনে পৌঁছে যাব। সে তো নদীর দেশ। কত ছোটো-বড়ো নদী আর খাঁড়ি। গতজন্মের স্বপ্নের মতো আবছা মনে পড়ে সব।
ভেবেছিলাম, সেখানে গিয়ে বনের ধারে জমি কিনে একটা মন্দির বানাব। রাধাকৃষ্ণের মন্দির। লোকজন আসবে, গান গাইবে, নাম করবে, প্রসাদ পাবে। কেউ আসবে দু-দণ্ড জিরুতে। কিন্তু তা যে হওয়ার নয়। আমার টাকা কই। যৌবনের টাকা যেমন হাতে পাইনি, আর যা পেয়েছি, তা রাখতে পারিনি।
আসলে তখন তো ভাবিনি গোপাল নিয়ে আমার শেষ বয়স কাটবে। কেউই ভাবে না। যৌবন চলে গেলে, যাদের বাড়িঘর নেই, ফেরার কোন জায়গা নেই, স্বামী-পুত্র নেই— তারা শেষ বয়সে কোথায় যায় জানি না। তাই ভাবছি… ভাবছি যুদ্ধেই চলে যাব, যুদ্ধে, তোমার সঙ্গে…।
রবীন্দ্র হাসে, আমি তোমার কে হই যে তুমি আমার সঙ্গে যুদ্ধে যাবে?
কেউ নয় বলেই তো যাব। কেউ হলে তো আঁচলে বেঁধে রাখতুম।
শুনে ভালো লাগল, বুঝলে। তোমার কেউ নেই, আমার সকল থেকেও কেউ নেই। আমিও একা তোমার মতো। এই নদীর ধারে বসি। নদী দেখি। কোনোদিন ইচ্ছে হলে রান্না করে খাই, না ইচ্ছে হলে উপোস। আর এখন গ্যাস নেই, ভাবনাও নেই।
গান করো না?
না। আমি এমনি করেই সেজেগুজে ঘুরি। বাহারি জামা পড়ি, টুপি পড়ি। এমনি করেই আমার শেষ বয়স কাটছে। বয়স ফেরাতে চুলে রঙ করি।
গোপাল রাখ না ঘরে?
না।
তবে তুমি কী কর?
যুদ্ধে মানুষের কী করে?
যুদ্ধ করে। একজন জয়ী হয়, অপরজন হারে।
আমাকে তোমার জয়ী মনে হয়, না পরাজিত?
সেটা বলা মুশকিল। যুদ্ধ কোথায় নেই? ঘরে-বাইরে সর্বক্ষণ যুদ্ধ চলছে। বাঁচতে গেলেও যুদ্ধ, মরতে গেলেও যুদ্ধ। যুদ্ধ ছাড়া মানুষের নিস্তার নেই। মানুষের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ নিজের সঙ্গে। নিজের কাছে তুমি জয়ী না তুমি পরাজিত— এই দ্বন্ধই তো মারাত্মক এক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কে জয়ী আর কে জয়ী নয়, সে বলা ভারি মুশকিল।
ঠিকই বললে।
আসলে তুমি সেজে-গুজে, বাহারি জামা-টুপি পড়ে ভাব তুমি জিতে গেছ আর আমিও কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর হয়ে, নেচে-গেয়ে ভাবি জিতে গেছি। কিন্তু সত্যিই কি জিতেছি আমরা? আবার হেরেও কি গেছি? টিকে তো আছি… এই থেকে যাওয়াটাই তো এই জগৎ-সংসারের সার কথা। তোমার তো গ্যাস নেই আবার। খাচ্ছ কী?
রবীন্দ্র এক পরাজিত সৈনিকের মতো বলে, খাচ্ছি না।
আমার সঙ্গে যাবে?
তাহলে যুদ্ধে যাওয়ার কী হবে?
আমরা তো যুদ্ধেই যাচ্ছি।
নীচু হয়ে কদমফুলটা কুড়িয়ে নেয় রবীন্দ্র মালাকার। অসময়ের ফুল, অসময়ের প্রেমের মতো— তাকে উপেক্ষা করতে নেই।