ফি চা র স্টো রি
তন্ময় কবিরাজ
কেমন ছিলেন অনুবাদক শক্তি চট্টোপাধ্যায়?
কবিপত্নী মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘ডিসিপ্লিন শক্তির কবিতায় থাকলেও জীবনের কোনো পর্যায়ে তা ছিল না।’ কারণ হিসাবে কবি নিজেই বলেছেন, ‘আমার নিজের কাছে একাকীর কাছে কবিতা অবলম্বন। নিজেকে নিজের মতো করে দেখার জলজ দর্পণ এক।’ কবি হিসাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘বাউন্ডুলে, ছোটো ছোটো বিষয়ে চূড়ান্ত অনাগ্রহী দার্শনিক’ হলেও অনুবাদক শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিন্তু ছিলেন ঠিক তার উলটো।
প্রাবন্ধিক শেখর বসু তাঁর ‘গল্পের অনুবাদে কবি’-তে লিখেছিলেন, শক্তিদাকে একদিন ধরে বললাম, ‘পাজের খুব সুন্দর একটা গল্প পেয়েছি। আকারে খুব একটা বড়ো নয়। আমার মনে হয় গল্পটা পড়ে আপনার খুব ভালো লাগবে। এই গল্পটা আমার একটা সংকলন গ্রন্থের জন্য অনুবাদ করে দিতে হবে।’ শক্তিদা এককথায় রাজি হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, দাও।’ গল্পের জেরক্স কপি দিয়ে বললাম, ‘কবে দেবেন?’ শক্তিদার চটপট উত্তর, ‘হয়ে গেলেই দিয়ে দেব।’ উত্তরটা বিপদজ্জনক। একটু বেশিই সময় দিয়ে বললাম, ‘এই তারিখের মধ্যে চাই, মাঝখানে একবার তাগাদা দেব।’ অভয় দিয়েছিলেন শক্তিদা, ‘ঠিক আছে।’ সামান্য কয়েকজন অনুবাদক লেখকের জন্য আমি গল্পের দুটি করে জেরক্স কপি করিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য একটি কপি হারালে যাতে সঙ্গে সঙ্গে আর একটির যোগান দিতে পারি। আমার ওই লুকোনো তালিকায় উপরের দিকেই ছিলেন শক্তিদা। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে নির্দিষ্ট তারিখের আগেই গল্পের অনুবাদ দিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে। গল্পটি ওঁর ভালো লেগেছিল, আর জানিয়েছিলেন অনুবাদ করেও আনন্দ পেয়েছেন। ‘দি ব্লু বুকে’ শক্তিদার অনুবাদে হয়েছিল ‘নীলরঙের ফুলের তোড়া’। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ সহজ সরল। অনুবাদে তাঁর ভাষা ছিল, ‘আমি ঘেমে জেগে উঠলাম। লাল ইটের মেঝে থেকে এক রকম গরম হাওয়া বইছিল। একটা ধূসর রঙের প্রজাপতি হলুদ আলোর চতুর্দিকে …’।
গল্পটির অনুবাদ সম্পর্কে শেখর বসু বলেছিলেন, ‘গল্পটির অনুবাদ চমৎকার । মূলানুগ কিন্তু অনুবাদের গন্ধ কোথাও নেই।’ বলা বাহুল্য, ‘অসমাপ্ত বা অর্ধসমাপ্ত লেখা নিয়ে কী করা হচ্ছে, থাকছে কি ফেলে দেওয়া হচ্ছে— কোনোদিন ফিরেও তাকাননি’ সেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন মনোযোগ সহযোগে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ও তা সম্পন্ন করেন তখন তাঁর কবি প্রতিভার আর একটা বিরল প্রতিভার দিক সকলের সামনে উঠে আসে।
তাঁর অনুবাদের তালিকায় ছিলেন ওমর খৈয়াম, মেঘদূত, কুমারসম্ভব, মির্জা গালিব,পাবলো নেরুদা, হাইনে, লোরকা। ষাটের দশকে গীতার অনুবাদ শুরু করলেও সে কাজের ইতি ঘটেনি। তাঁর অনুবাদে নিজের জগতই বেশি করে প্রকট হয় উঠেছে। তিনি সেই সব লেখাই অনুবাদ করতে শুরু করেছিলেন যেখানে তাঁর জীবনের রঙের ছোঁয়া থাকে। তিনি অন্ধ অনুবাদক নন। বরং অনুবাদের সার্থকতার জন্য তিনি মূলভাষা জানা লোকের সন্ধান করতেন। ওমর খৈয়ামের অনুবাদের সময় পারস্যের এক ভাষাবিদের সাহায্য নিয়েছিলেন। মির্জা গালিব অনুবাদের সময় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন আয়ান রশিদ খান।
‘দিল আপকা কে দিলমে হ্যায় জো কুছ সো আপকা/ দিল লিজিয়ে মগর মেরে আরমা নিকালকে।’
‘হৃদয় তোমার হৃদয় মাঝে যাহা কিছু আছে সকলি তোমার/ এ হৃদয় নাও কিন্তু হৃদয় বাসনাকে দাও বাহির করে।’
অথবা
‘কয়ি বিরানী সি বিরানী হ্যায়/ দশতোক দেখকে ঘর ইয়াদ আয়া।’
‘নির্জনতা ভীষণ নির্জনতা প্রচন্ড/ বাড়ি দেখলে মনে পড়ছে পোড়ামাটির খোয়াই কথা।’
অনুবাদক হিসাবে তিনি মূলভাষার উপর এতটাই জোর দিয়েছেন যে দু-ভাষার মধ্যে থাকা সাহিত্য রসে কখনও কখনও ভাটা পড়েছে। তবে এ বিষয়ে কবির দায়িত্বশীলতাকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করালে ভুল হবে। কারণ তিনি দুটি ভাষা যথার্থ জেনে সুন্দর উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেও ভাষা বৈচিত্র্যর কাছে আর পাঁচ জনের মত তাঁর হার অনিবার্য। গিলবার্ট হাইয়েতের কথায়, ‘অনুবাদক নিজে মহৎ রচনা সৃষ্টি করতে পারে না তবে মহৎ রচনা সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।’ অনুবাদে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে অনুপ্রাণিত করেছিল বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।
রিলকের কবিতায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন কাব্যের স্বাদ, নেরুদা তাঁকে উপহার দেন এক অস্থির সময়। জীবনের স্রোতে শুধু শান্তির প্রয়োজনে যখন যাকে প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে তখন তিনি তাঁকে গ্রহণ করেছেন। অনুবাদে তাঁর কলম বলেছে, ‘তাই আমি ঢেকে রাখি আমার হৃদয়/ আর গভীর গভীরতম তলদেশ থেকে/ উঠে আসা মরণ ডাক আমায় হজম করতে হয়।’
হাইনের কবিতা অনুবাদ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘নষ্ট হতে বসেছিলাম হতাশা নৈরাশ্যময়/ এর চেয়ে আর কষ্ট কোথায়?’ নীলরতন সরকার হাসপাতালের একাকী কেবিনে হাইনের কবিতা তাঁকে নাটোরের বনলতা সেনের মত দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল।
তিনি চেনা ভাষার চেয়ে অজানা রোমান্টিক সুখের মাদকতায় ডুব দিলেন অন্য ভাষায়। সুখের তৃপ্তি, বাঁচার স্বপ্ন— সবই প্রকট হয়ে অমরত্ব লাভ করল তাঁর অনুবাদের শব্দ। সুতপা বন্দোপাধ্যায় এক আলোচনায় লিখেছিলেন, ‘কবিতার অনুবাদ জন্ম দেয় নতুন কবিতার নাকি কবিতার অনুবাদ। সেই বিতর্ক চলতেই থাকে। কিন্তু কবিতার অনুবাদ থেমে থাকে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কবিতাকে পদ্য বলতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তাই তাঁর অনূদিত কবিতাগুলি হয়ে উঠেছে অনুবাদিত পদ্য। পদ্য অনুবাদে তাঁর চলাচল অনেক বিস্তৃত।’ সব্যসাচী মজুমদার বলেছিলেন, ‘এ কথা আমার অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনুবাদ সবসময় সুপরিবাহী নয়।’ অনুবাদক হিসাবে তিনি হয়ত ঈশ্বরের বুক থেকে দ্রাক্ষামোচনকারী এক তীর্থঙ্কর হয়ে উঠতে পারেননি। তথাপি তাঁর সৎ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আংশিক বিশ্বের প্রবেশদ্বারের চাবিকাঠি উপহার দিয়েছিলেন তাঁর সাহিত্য অনুরাগী স্নেহের পাঠকদের। তাঁর দর্শন বলে, ‘পরিস্রুত হৃদয়ে জড়ো অনেক দৃশ্য, অনেক অভিজ্ঞতা।’ অনুবাদক হিসাবে তাঁকে নিয়ে সংশয় থাকতেই পারে তবে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি যে রসদ সংগ্রহ করেছিলেন তা পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টিকে আরও ধারালো করে তুলেছিল। তিনি প্রেরণার পিছনে ছুটেছেন। জীবন যখন তাঁকে সৃষ্টির রসদ সরবরাহ করতে ক্লান্ত তখনই অনুবাদের আয়নার চোখ রেখেছেন কবি। নিজের অব্যক্তকে সাবলীলভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার ছায়া আমায় করে আঘাত/ ভেতরে যাই বাইরে যাই তখন করে আঘাত।’
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সৃষ্টির মূলে প্রেরণা থাকবেই।’ প্রেরণা এক ধরনের ক্ষমতা। সাধারণ জিনিস থেকেই উঠে আসে সৃষ্টি। একজন অনুবাদক হিসাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় বহুমুখী অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করতে গিয়ে ভাষা, দেশ, কাল অতিক্রম করেছেন। তিনি অনুবাদক হিসাবে যে বৈচিত্র্য দেখিয়েছিলেন তা তাঁর সমকক্ষদের মধ্যে তেমন নজরে আসে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটি ভাবের নাম, কবিতা যাঁর কাছে স্থির জলে আয়নার মতো। শুধু কবিতার কাছেই তাঁর শৃঙ্খলা ছিল। তিনি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর দর্শন পুরুষ কারণ তিনিই তো সেই কবি— ‘কবি যদি লোভী হয়/ তা হলে সে কবি নয়।’ তাঁর অনুবাদে পাঠক পেতে পারে ভেসে থাকার আনন্দ। মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘সে কবিতা ছাড়া কখনও নিজের কথা বলেনি, তার কোনো কাজকর্মের কৈফিয়ত দেয়নি, তার চাওয়া-পাওয়ার কথাও কবিতা, তাও আবার স্ববিরোধী লেখা।’ আমরা শুধু রামধনু উপভোগ করতে পারি, রামধুন চুরি করে ভালোবাসাকে উপহার দিতে পারি না। কারণ সে সৌন্দর্য মৌলিক।