Skip to main content

Hello Testing

গ ল্প

সত্যজিৎ কর

satayjit

নীল খামের চিঠি

শহরের ৪২ তলার এই অ্যাপার্টমেন্টে বাতাস বইলে শব্দ হয় না, কারণ এটি সম্পূর্ণ এয়ার-টাইট এবং সেন্ট্রালি নিয়ন্ত্রিত। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, কিন্তু কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে সেই বৃষ্টির শব্দ ভেতরে আসার উপায় নেই। এই অ্যাপার্টমেন্টটি যেন এক মহাকাশযান— সবকিছু নিয়ন্ত্রিত, সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা আছে। অনির্বাণ তার বসার ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের লাইটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাইরের আলোর সাথে তাল মিলিয়ে মৃদু নীল আভায় জ্বলছে। তার অ্যাপার্টমেন্টের এ-আই অ্যাসিস্ট্যান্ট আরিয়া মৃদু যান্ত্রিক স্বরে বলল, ‘অনির্বাণ, তোমার হার্টরেট স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি। গত দুই ঘণ্টা তুমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছ। আমি কি কোনো শান্ত মিউজিক প্লে করব? নাকি তোমার আজকের শিডিউল অনুযায়ী কোনো ডাটা অ্যানালাইসিস শুরু করবে?’

অনির্বাণ কোনো উত্তর দিল না। তার জীবনে এখন সব কিছুই প্রোগ্রাম করা। কবে সে ঘুমাবে, কবে খাবে, এমনকি তার মুড কেমন থাকা উচিত— সবই ঠিক করে দেয় অ্যালগরিদম। সে একজন সফল ডেটা অ্যানালিস্ট। তার চোখের সামনে সারাক্ষণ ভেসে ওঠে বিমূর্ত সব গ্রাফ, চার্ট আর জটিল গাণিতিক বিন্যাস। কিন্তু এই ৪২ তলার উপরে সে যেন এক দ্বীপের বাসিন্দা। এখানে সাফল্য আছে, নিরাপত্তা আছে, কিন্তু জীবনের কোনো ছন্দ নেই। তার স্মার্টফোনে ক্রমাগত নোটিফিকেশন আসছে— স্টক মার্কেট, মিটিং রিমাইন্ডার, হেলথ আপডেট। সব মিলিয়ে মনে হয়, সে নিজেই একটা সফটওয়্যারের অংশ হয়ে গেছে।

হঠাৎ করেই তার নজর গেল কর্নারে রাখা সেই পুরনো বাক্সটার দিকে। নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করার পর থেকে ওটা এক কোণায় পড়ে ছিল, যেন কোনো পরিত্যক্ত স্মৃতির সমাধি। অনির্বাণ এগিয়ে গেল। বাক্সটার ওপর জমে থাকা ধুলোবালি তার আঙুলে লেগে ধূসর হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে ডালাটা খুলল।

ভিতরে কী নেই! পুরনো একটা এনালগ ঘড়ি, যার কাঁচটা ফেটে গেছে। একটা জীর্ণ ডায়েরি, যার পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। আর একদম নীচে পড়ে আছে নীল রঙের একটা খাম। খামের কোণায় কিছুটা কালচে ছোপ লেগে আছে, যেন সময়ের আর্দ্রতা তাকে গ্রাস করেছে। অনির্বাণ জানে এই খামটি কার। নীলিমার।

দশ বছর আগে, এই শহরেই তারা দু-জনে এক চিলতে স্বপ্ন বুনছিল। নীলিমা ছিল আঁকাআঁকির নেশায় মগ্ন এক মেয়ে, আর অনির্বাণ ছিল ভবিষ্যতের সিইও হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নীলিমা পছন্দ করত বৃষ্টিতে ভিজতে, পছন্দ করত রাস্তার ধারের ঝালমুড়ি। অনির্বাণের কাছে তখন এসব ছিল সময়ের অপচয়।

স্মৃতিটা তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল। সেই দিনটা ছিল প্রচণ্ড গরম। তারা একটা ছোটো রেস্টুরেন্টে বসেছিল। নীলিমা তার নতুন আঁকা একটা ছবির কথা বলছিল, যেখানে সে আকাশটাকে নীল নয়, বেগুনি রঙে এঁকেছিল। নীলিমা বলেছিল, ‘জানিস, মানুষ যেটা দেখতে চায়, আমি সেটা আঁকতে চাই না। আমি আঁকতে চাই মানুষ যেটা অনুভব করে।’ অনির্বাণ তখন ল্যাপটপে মগ্ন ছিল। একটা বড়ো প্রজেক্টের ডেডলাইন ছিল তার। সে মাথা না তুলেই বলেছিল, ‘প্লিজ নীলিমা, খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই প্রজেক্টটা শেষ হলে আমাদের লাইফ বদলে যাবে। একটু বোঝার চেষ্টা করো।’

নীলিমা হেসেছিল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। সে বলেছিল, ‘আমরা লাইফ বদলানোর চেষ্টায় জীবনটাকেই হারিয়ে ফেলছি না তো?’ অনির্বাণ তখন সেই কথার গভীরতা বুঝতে পারেনি। সে ভেবেছিল, এটা হয়তো আবেগের বাড়াবাড়ি। কিন্তু দিনশেষে নীলিমা যখন তার ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেল, তখনও অনির্বাণ তার ল্যাপটপটা বন্ধ করেনি। সে ভেবেছিল, সে ঠিকই আছে। তার কাছে ক্যারিয়ার আছে, অর্থ আছে।

আজ দশ বছর পর, সেই চিঠির নীল খামটা হাতে নিয়ে অনির্বাণ কাঁপতে শুরু করল। সে চিঠিটা খুলল। ভেতরে একটিই পাতা…

‘অনির্বাণ, তুমি সবসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে বাঁচ। কাল কী হবে, পরশু কী হবে— এই চিন্তায় তুমি আজকের দিনটাকে খুন করছ। তুমি একদিন বড়ো হবে, অনেক টাকা আয় করবে, এই ফ্ল্যাট আরও বড়ো হবে, কিন্তু তোমার চারপাশের মানুষগুলো ছোটো হতে হতে একদিন হারিয়ে যাবে। আমি আজ যাচ্ছি, কারণ আমি আর সেই মৃত মানুষটার পাশে বসে থাকতে পারছি না, যে কি না নিজেকে জীবিত বলে দাবি করে। যেদিন যখন খুব একা লাগবে, যখন সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে দেখবে নীচে কোনো মানুষ নেই, শুধু সারি সারি ডেটা আর লজিক আছে, সেদিন এই চিঠিটা পড়ো। মনে রেখ, আমরা কোনো ডেটা সেট নই, আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ। আমাদের বেঁচে থাকাটা কোনো ক্যালকুলেশনের অংক নয়।’

চিঠিটা পড়ার সময় বাইরে মেঘ গর্জে উঠল। অনির্বাণ অনুভব করল, তার চোখের কোণ ভিজে উঠছে। এটা কি অনুশোচনা? নাকি এতদিন ধরে যে শূন্যতা সে নিজের ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছিল, তার নাম আজ খুঁজে পেল? সে তার স্মার্টফোনের দিকে তাকাল। সেখানে শত শত আনরিড মেসেজ। সবই কাজের। সবই ‘urgent’। কিন্তু তার কোনো মানেই আজ আর খুঁজে পাচ্ছে না সে। সে বুঝতে পারল, সে একটা ডিজিটাল জ্যান্ত লাশের মতো বেঁচে আছে।

সে একটা গ্লাস হাউসে বন্দি, যেখানে সব দেখা যায় কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। অনির্বাণ ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। ফোনটা ছুড়ে ফেলল সোফার ওপর। এই সময় আরিয়া আবার বলে উঠল, ‘অনির্বাণ, তোমার স্ট্রেস লেভেল খুব বেশি। আমি কি তোমার জন্য কোনো মিটিং শিডিউল করব?’ অনির্বাণ চিৎকার করে বলল, ‘শাট আপ!’

সে জানালার কাঁচটা খুলল। এতক্ষণের নিস্তব্ধতা ভেঙে বৃষ্টির শব্দ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। সেই শব্দের মধ্যে একটা আদিম সুর আছে, যা অ্যালগরিদমের তৈরি করা মিউজিক ট্র্যাকে পাওয়া অসম্ভব। সোঁদা মাটির গন্ধ। ঝোড়ো হাওয়ায় ঘরের পর্দা উড়ছে। সে জানালার কার্নিশে হাত রাখল। বৃষ্টির ঝাপটা তার মুখে এসে লাগছে— ঠান্ডা, কিন্তু তীব্রভাবে বাস্তব। সে আজ আর কোনো অ্যালগরিদম দেখছে না। সে শুধু দেখছে অন্ধকার আকাশটাকে।

পরদিন সকালে অনির্বাণ অফিসে গেল না। তার টিমলিড ফোন করল, ইমেইল করল, এমনকি তার বাসায় সিকিউরিটি চেক করতেও পাঠানো হল। কিন্তু অনির্বাণ সেসব গ্রাহ্য করল না। সে বেরিয়ে পড়ল শহরের বাইরের সেই পুরনো বাসস্ট্যান্ডটার দিকে, যেখানে নীলিমা আর সে শেষবার দাঁড়িয়েছিল। জায়গাটা এখন আর আগের মতো নেই। একটা বড়ো শপিং মল হয়েছে সেখানে। সেই পুরনো চায়ের দোকানটা বোধহয় আর নেই।

সে যখন নীচে নামল, লবিতে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডটি তাকে দেখে কিছুটা অবাকই হল। সবসময় স্যুট-টাই পরা, ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে ঝোলানো অনির্বাণকে আজ সাধারণ টি-শার্ট আর জিন্সে দেখে গার্ডটি চিনতে পারল না। কিন্তু অনির্বাণের তাতে কিছু যায় আসে না। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত ছক থেকে বেরিয়ে আসার এই প্রথম পদক্ষেপটি তাকে এক অন্যরকম শিহরণ দিল। ফুটপাতে নামতেই বাতাসের ঝাপটা তাকে স্বাগত জানাল। কোনো এয়ারকন্ডিশনারের নিয়ন্ত্রিত হাওয়া নয়, বরং শহরের ধুলো আর বৃষ্টির ভেজা মাটির গন্ধ মেশানো মুক্ত বাতাস। তার মনে হল, এত বছর ধরে সে যে বদ্ধ কাঁচের দেওয়ালে নিজেকে বন্দী রেখেছিল, তা ছিল এক ধরনের স্বেচ্ছামৃত্যু। এই যে মানুষ, রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা— প্রত্যেকেই এক একটা গল্পের চরিত্র। সে আজ কোনো ডেটা অ্যানালিস্ট নয়, সে সাধারণের মাঝে মিশে যাওয়া এক পথিক। তার চারপাশের শব্দগুলো এখন আর নয়েজ মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে জীবনের এক অবিরাম সুর।

শহরের রাস্তায় যখন সে হাঁটতে শুরু করল, তার কাছে সবকিছু অদ্ভুত মনে হতে লাগল। বছরের পর বছর সে লিফটের ভেতরে, এসি-র শীতল হাওয়া আর কাঁচের দেওয়ালের ভেতর জীবন কাটিয়েছে। আজ বাইরের আর্দ্রতা, ট্রাফিকের হর্ন, পথচারীদের তাড়াহুড়ো— সবকিছুকে তার কাছে অগোছালো মনে হলেও, এক অদ্ভুত জীবন্ত মনে হচ্ছিল। সে লক্ষ্য করল, মানুষ একে অপরের সাথে কথা বলছে না, কিন্তু তাদের চোখের ভাষা আলাদা। কেউ বাসে ওঠার জন্য দৌড়োচ্ছে, কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে আলতো পায়ে হাঁটছে। এই অগোছালো জীবনের মধ্যেই সে একধরনের মুক্তি খুঁজে পেল। শপিং মলের ঝকঝকে কাঁচের দেয়াল দেখে সে আর নিজেকে ওই কৃত্রিম অরণ্যের সাথে মেলাতে পারল না। সে বুঝতে পারল, সে এতদিন যা অর্জন করেছে তা হল ‘সফলতা’, কিন্তু যা হারিয়েছে তা হল ‘জীবন’।

সে শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে তাকাতে লাগল। প্রতিটি মানুষ ছুটছে। কেউ কারওর দিকে তাকাচ্ছে না। সবার হাতেই ফোন। সবার চোখই স্ক্রিনে। অনির্বাণ অনুভব করল, সে এই ভিড়ের অংশ হয়েও কতটা আলাদা। তার বুক পকেটে রাখা সেই চিঠিটা এখন তার একমাত্র সঙ্গী। সে একটি ফুটপাথের চায়ের দোকানে বসল। দোকানদার বুড়ো মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, কী খাবে?’ অনির্বাণ হাসল। অনেকদিন পর প্রাণখুলে হাসল সে। বলল, ‘চা দিন, এক কাপ। খুব কড়া করে।’

চায়ে চুমুক দিয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ কেটে রোদ উঠছে। কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে পৃথিবীটা এতক্ষণ খুব ঝাপসা ছিল, এবার তা হঠাৎ করেই স্বচ্ছ হয়ে উঠল। অনির্বাণ জানত, নীলিমা হয়তো আর ফিরে আসবে না। হয়তো সে এখন অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো জীবনে সুখী। কিন্তু সে আজ নিজেকে ফিরে পেয়েছে। আধুনিকতার এই যান্ত্রিক অরণ্যে সে আজ আর একা নয়, কারণ সে আজ মানুষের ভিড়ে মিশে মানুষ হতে শিখেছে।

গল্পের শেষটা হয়তো ট্র্যাজিক, কিন্তু অনির্বাণের কাছে এটাই নতুন শুরুর দিন। সে ফোনটা পকেট থেকে বের করল। সুইচ অফ করার বাটনটা চেপে ধরে রাখল বেশ কিছুক্ষণ। স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে গেল। কালো স্ক্রিনে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল অনির্বাণ। এবার সে দেখল, চোখের কোণে জমে থাকা জল শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

সে বুঝে গেল, মুক্তি মানেই সবকিছু ত্যাগ করা নয়, মুক্তি মানে হল সেই দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলা, যা আমাদের নিজেদের হৃদয়ের চারপাশে নিজেরাই তৈরি করি। আজকের এই বৃষ্টিস্নাত দিনে, যখন শহরটা ভিজে একাকার, অনির্বাণ দাঁড়িয়ে আছে একদম মাঝখানে। সে কোনো ডেটা অ্যানালিস্ট নয়, সে কোনো কর্পোরেট রোবট নয়। সে মানুষ— যে বৃষ্টিতে ভিজতে জানে, যে নীলিমার কথা ভেবে হাসতে জানে এবং যে নিজের জীবনের অংকটা আজ নিজেই মেলাতে শুরু করেছে।

সে উঠে দাঁড়াল। পকেটে রাখা চিঠিটা আলতো করে ছুঁয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। সামনেই বাসস্ট্যান্ড। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, কোনো ডেডলাইন নেই। শুধু আছে স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতার পথে সে একাই হেঁটে চলল, পেছনে ফেলে রেখে গেল তার জীবনের সেই কাঁচের দেয়াল, যা তাকে এতদিন আগলে রাখার নামে আসলে বন্দি করে রেখেছিল। এখন আর আকাশটা কোনো গ্রাফের অংশ নয়, এখন আকাশটা শুধুই আকাশ। বিশাল, অসীম এবং মুক্ত। অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকে জমে থাকা পাথরটা যেন বৃষ্টির সাথে ধুয়ে মুছে গেছে। আজকের এই সকালটা তার কাছে কোনো প্রজেক্ট রিপোর্ট নয়, আজকের সকালটা বেঁচে থাকার উৎসব। কোনো অ্যালগরিদম তাকে আর দিকনির্দেশনা দেবে না, সে নিজেই নিজের পথ খুঁজে নেবেধুলোবালিতে, ভিড়ে, আর অগোছালো এই জীবনের অনিয়মিত ছন্দে।

One Response

  1. Nice story…
    Related to our current life. Everyone like a Machine in the city to earn money but forget his own life happiness.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *