মু ক্ত গ দ্য
শ্রাবণী মুখার্জী
হারায়ে খুঁজি
হলুদ রঙের পোস্টকার্ড কিংবা আকাশী নীল ইনল্যান্ড লেটার অথবা ডাকটিকিটের ছাপ দেওয়া খাম এখন জাদুঘরে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। আমরা কেউ আর এখন চিঠি লিখি না। আজকাল সবই ‘ইনস্ট্যান্ট’। আঙুলের ডগায় ইঁদুর দৌড়োচ্ছে। একটা টুংটাং শব্দ হল কি হল না, সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে পৌঁছে গেল খবর। এখন ই-মেল, এস-এম-এস আর হোয়াটস অ্যাপের যুগ। কার ধৈর্য আর চিঠি লেখার। পত্রসাহিত্য আজ অবলুপ্তির পথে। আর এই পত্রসাহিত্যের অবলুপ্তির কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে শব্দের বিন্যাস, ভাষার অঙ্গীকার, বাক্যের প্রসার— চিঠি লিখতে লিখতে এক সময় যা রপ্ত করা ছিল আমাদের সহজাত একটি পক্রিয়া। এই ডিজিট্যাল আই ফোনের যুগে ডিজিট্যাল আদব-কায়দায় লুকিয়ে যাচ্ছে অনুভবের চাদর। হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও ব্যাবহার। বাংলা লিখতেও ইংরাজি ফোনেটিকস্-এর ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ এখনকার প্রজন্ম। ভাবুন দিকি কাণ্ড! একেই কি বলে সভ্যতা?
আগেকার দিনের সেই হলুদ রঙের পোস্টকার্ড কিংবা আকাশী নীল ইনল্যান্ড লেটারগুলোর এক অপার মহিমা ছিল। তাতে শুধু খবর থাকত না, থাকত হাতের লেখার টান, ভালোবাসার ছোঁয়া, প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ, থাকত একটু ঘাম আর দু-এক ফোঁটা চোখের জলের ছোঁয়াও। পিয়ন কাকুর জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা থাকত। চিঠি এলেই মনের ভেতর ময়ূরের পেখম মেলে দেওয়া নৃত্য থাকত। আর থাকত নতুন বউ-এর নামে বিদেশে চাকুরিরত স্বামীর প্রেমের চিঠি এলে, লাল হয়ে যাওয়া গাল আর চোখের কোণে মরমে মরে যাওয়ার লজ্জাও। বিবাহের পূর্বে প্রেমিকের আসা প্রেমপত্র পিয়ন কাকুর হাত থেকে গুরুজনদের চোখ এড়িয়ে সরাসরি হস্তগত করারও ছিল নানাবিধ কলা-কৌশল। মনে পরে পঙ্কজ উদাসের সেই বিখ্যাত গান ‘চিঠি আয়ি হ্যায়…’? এখনকার এই ই-মেল বা হোয়াটসঅ্যাপে সেই স্বাদ পাওয়া কি সম্ভব? সেই অনুভূতির গভীরতাই বা এখন কোথায়?
চিঠি লেখা তখন ছিল একটা ব্যাপার বটে। পেন্সিল কামড়াতে কামড়াতে আমার মেজকাকা শুরু করতেন, ‘পরম কল্যাণীয়াসু’… তারপর বাড়ির বিড়ালটা কটা বাচ্চা প্রসব করল থেকে শুরু করে চালের দর কতটা বাড়ল, পাশের বাড়ির পুঁটি একটা বখাটে ছেলের পাল্লায় পড়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে— সব সবিস্তারে বর্ণনা করতেন। দীর্ঘ একমাস অপেক্ষার পর সেই চিঠি যখন আসত, সে এক উৎসব! পিয়ন হরিশদাকাকুকে মনে হত সাক্ষাৎ দেবদূত। চিঠির ভাঁজে ভাঁজে থাকত কত মায়া, কত উৎকণ্ঠা, কত রহস্য। সেই মায়া এখনকার ‘ব্লু-টিক’-এর চক্করে পড়ে খাবি খাচ্ছে।
আসলে আমরা তো এখন আর মনের কথা লিখি না, ‘টাইপ’ করি। ওই যে ছোট্ট একটা যন্ত্র হাতের মুঠোয় বন্দি করে বসে আছি, ওটাই আমাদের মনের সব অনুভূতি গ্রাস করে নিল। হাতের লেখাটা এখন আড়ষ্ট হয়ে গেছে। আর হৃদয় হয়ে গেছে হার্টসের ইমোজি! এককালে একটা চিঠির উত্তরের জন্য মানুষ চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত জানালার দিকে। সেই অপেক্ষায় যে আনন্দ, যে ব্যাকুলতা ছিল তা এখন কোথায়। চিঠির সাথে সাথে সেই সব অনুভূতিও আজ অবলুপ্তির পথে।
আজ খামগুলোর মুখ আঠা দিয়ে বন্ধ করার লোক নেই। ডাকবাক্সগুলো পাড়ায় পাড়ায় এখন নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন কোনো এক পরিত্যক্ত রাজপ্রাসাদের প্রহরী। পেটে তার ভীষণ খিদে, কিন্তু কেউ আর ভালোবেসে দুটো খাম কি একটা পোস্টকার্ডও তাকে খেতে দেয় না। আমরা এগোচ্ছি বটে, কিন্তু পেছনের ওই মায়ার টানটা কি চিরতরে হারিয়েই ফেললাম? জীবন এখন বড়ো বেশি ছোটো হয়ে গেছে। ছোটো ছোটো অনুভূতির ঠাঁই সেখানে নেই।
মেজকাকার কাছে বড়ো হয়েছি। তাঁর অনুপ্রেরণায় ডাইরি লিখি রোজ। লিখি চিঠির আকারে। কাব্যি করে চিঠি লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ঠিকানা? ঠিকানা পাই না কোনো। চিঠিরা ডাইরির পাতাতেই বন্দী হয়ে থাকে। চিঠির আশায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ডাকবাক্স-এর খালি পেটে কি পারি না একটা চিঠি খেতে দিতে?