Skip to main content

Hello Testing

ফি চা র  স্টো রি

গৌতম মণ্ডল

goutam

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: জীবন, দর্শন ও তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার

বিজ্ঞান বা সাহিত্যের মতো মানবিক বিদ্যার (Humanities) মৌলিক ক্ষেত্রগুলোর জন্য কোনো নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় না ঠিকই কিন্তু হলবার্গ পুরস্কারটিকেই বিশ্বজুড়ে “মানবিক বিদ্যার নোবেল” (Nobel equivalent for humanities) হিসেবে গণ্য করা হয়। এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে মানবিক বিদ্যার মধ্যে ঠিক কোন কোন বিদ্যায়তনিক শাখাগুলো অন্তর্ভুক্ত? মানবিক বিদ্যা হল মূলত কলা ও মানবিক বিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন এবং ধর্মতত্ত্ব (Theology)। এইসব বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে মৌলিক এবং যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার হল হলবার্গ পুরস্কার।

       নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন অগ্ৰগণ্য বুদ্ধিজীবীকে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে মৌলিক ভাবনার জন্য হলবার্গ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ছয় কোটি টাকা। ড্যানিশ-নরওয়েজিয়ান লেখক, দার্শনিক, নাট্যকার এবং ইতিহাসবিদ লুডভিগ হলবার্গের (১৬৮৪-১৭৫৭) নামে ২০০৪ সাল থেকে নরওয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ এই পুরস্কার চালু করেছে। এর আগে এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন জুলিয়া ক্রিস্তেভা, ফ্রেডরিক জেমিসন, ইয়ান হ্যাকিং, ব্রুনো লাটুর, স্টিফেন গ্লিন ব্লাট, মার্থা নুসবম, আশিল এমবেম্বের মতো প্রখ্যাত হিউম্যানিস্ট-ব্যক্তিত্বরা।

       গতবছর এই পুরস্কার পেয়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২)। শুধু বাঙালি হিসেবে নয়, সমগ্ৰ এশিয়া মহাদেশের মধ্যে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক হলেন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারের প্রথম ও একমাত্র প্রাপক। গত ৫ জুন নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে নরওয়ের যুবরাজ প্রিন্স হাকন গায়ত্রীর হাতে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার তুলে দেন।

বাবা ডা. পরেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং বিদূষী মা শিবানী চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে গায়ত্রী বেড়ে ওঠেন কলকাতার বালিগঞ্জের বাড়িতে।‌ গায়ত্রী কলকাতার সেন্ট জনস ডায়োসেসান স্কুল ফর গার্লস‌ এবং লেডি ব্র্যাবোন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। ওই কলেজের ইংরেজি ও সংস্কৃতের অধ্যাপক সুকুমারী ভট্টাচার্যের স্নেহ ও সান্নিধ্যের স্পর্শে তাঁর জ্ঞানপিপাসা ক্রমশ বেড়ে ওঠে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী গায়ত্রী স্নাতক স্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। শুধুমাত্র সিলেবাসের গতানুগতিক পড়াশোনা নয়, বিদ্যাচর্চার প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে তিনি ছিলেন সমান উৎসাহী । কলেজে পড়াকালীন তিনি বিভিন্ন বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন এবং প্রায় প্রতিটিতে, বলা বাহুল্য, প্রথম স্থান অধিকার করতেন। তাঁকে এই সব ব্যাপারে সব চাইতে যিনি উৎসাহিত করতেন, তিনি অধ্যাপক তাড়কনাথ সেন।   

     কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াচলাকালীন তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে ধারদেনা করে চলে যান সোজা আমেরিকায়। সেখানের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথমে ইংরেজিতে ও পরে তুলনামূলক সাহিত্যে ভর্তি হন। তিনি বিখ্যাত অধ্যাপক পল ডি মানের অধীনে ইয়েটসের কবিতার উপরে গবেষণা করেন। ইয়েটসকে নিয়ে তাঁর একটি স্বতন্ত্র বইও রয়েছে। “Myself Must I Remake : The Life and Poetry of W B Yeats” । বইটি ইয়েটসের কবিতার অনুরাগী ও গবেষকদের মধ্যে বিপুলভাবে সমাদৃতও হয়।

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ১৯৬৫ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আইওয়া ছাড়াও তিনি পড়িয়েছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, পিটুসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়সহ  বিশ্বের বেশ কিছু প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়ে। সারা বিশ্বের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি লিট উপাধি দিয়েছে। যদিও মনীষার জগতের উজ্জ্বল তারকা গায়ত্রী নিজেকে আজও ‘ছাত্রর ভৃত্য’ নামে পরিচয় দিতে অধিক পছন্দ করেন। ১৯৯১ সাল থেকে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিকার অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। বর্তমানে, ২০০৭ সাল থেকে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের “University Professor in the Humanities” শীর্ষক শীর্ষ পদে রয়েছেন।‌

     গায়ত্রী চক্রবর্তী ফরাসি ও জার্মানসহ আরও কয়েকটি বিদেশি ভাষা খুব কম বয়সে রপ্ত করেন। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ও Deconstruction তত্ত্বের প্রবক্তা জাক দেরিদার “দ্য লা গ্ৰামাতোলজি” বইটি মূল ফরাসিভাষা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁর অনূদিত এই বই দেরিদার চিন্তাজগৎকে বিশ্বের মননশীল পাঠকের পৌঁছে দেয়। “অফ গ্ৰামাটোলজি” (১৯৭৬) শীর্ষক বইটিতে তিনি যে দীর্ঘ এবং অনুসন্ধানী ভূমিকাটি লেখেন তা সম্পর্কে সারস্বত মহলে বলা হয়ে থাকে, এটি গ্ৰন্থভূমিকার Self reflexivity -র একটি নতুন এবং ব্যতিক্রমী মানদণ্ড সূচিত করেছে ।

     গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহর (১৯২৩-২০২৩) সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গ্ৰুপের একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি। কিন্তু গুহর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েও তিনি কোথাও কোথাও তাঁর বিরোধীতা করেছেন। “Can the Subaltarn Speak?” (১৯৮৮) শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন প্রকৃতপক্ষেই কি আমরা সাব-অল্টার্ন বা স্বর-বঞ্চিতদের কথা শুনতে পাই? এই গ্রন্থে রয়েছে সাব-অলটার্নদের কথাসহ প্যাট্রিমোনিয়াল রাষ্ট্র, ফেমিনিজম এবং ডিকনস্ট্রাকশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন করে ভাবার উপাদান। আসলে তিনি দেরিদার অবিনির্মাণ তত্ত্ব, মার্কসবাদ, নারীবাদ এবং উত্তর-উপনিবেশবাদের সাহায্যে সারাজীবন ধরে খুঁজতে চেয়েছেন সাব অলটার্নদের হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরকে। কিন্তু শুধুমাত্র এই খোঁজার মধ্যেই, বলা বাহুল্য, তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরকে কীভাবে পুনরুজ্জীবন ঘটানো যায়, মননের আলোয় এবং ব্যবহারিক জীবনে, ভেবেছেন তাও।

    ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত স্পিভাকের ‘Selected Subaltarn Studies’ গ্ৰন্থটি সম্পর্কে টয়েনবি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী “চিন্তার জগতে গায়ত্রীর তাৎপর্য” শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, “আমার মনে আছে, গায়ত্রী তখন তিনটে জিনিস করার চেষ্টা করে এসেছেন। তা হল মার্ক্সবাদ, ফেমিনিজম এবং ডিকনস্ট্রাকশন– এই তিনটি ধারাকে এক জায়গায় আনা। সত্যি বলতে কী এই ডিকনস্ট্রাকশন বিষয়টির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল গায়ত্রীর সঙ্গে আলাপের সূত্রেই।”

   উপনিবেশ চলে যাওয়ার পরেও কীভাবে উপনিবেশবাদ (Post colonialism ) আমাদের চিন্তা ও চেতনায় থেকে যায় তা তিনি বিভিন্ন নিবন্ধে ও বইয়ে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। Post Structuralism তত্ত্ব নিয়েও তিনি বিস্তর কাজ ও লেখালেখি করেছেন। এইসব লেখা আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল সমাদরও পেয়েছে। সাহিত্যতত্ত্ব, নারীবাদ, রাজনীতি এবং নন্দনতত্ত্ব নিয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনার আশ্চর্য প্রকাশ দেখা যায় যে গ্ৰন্থে সেটি হল :  “In other Words : Essays in Cultural Politics,” অপরপক্ষে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনার মেধাবী প্রকাশ ঘটেছে “Death of a Decipline” গ্ৰন্থে।  

     হিউম্যানিটিজ বা মানবিকবিদ্যাই যে বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে ন্যায় ও অধিকাররক্ষার ক্ষেত্রে একমাত্র আলোকবর্তিকা হতে পারে, তা তিনি তাত্ত্বিক জায়গা থেকে বিশ্লেষণ করে দ্বিধাহীনভাবে দেখিয়েছেন “An Esthetic Education in the Era of Globalisation” গ্ৰন্থে। বলা বাহুল্য, তিনিই একমাত্র ভারতীয় যিনি ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুবিদিত কিয়াটো পুরস্কার পান। ফেলো অফ ব্রিটিশ একাডেমি হন ২০২১ সালে।

    সাহিত্যতত্ত্ব, মানবিকবিদ্যা ও নন্দনতত্ত্বের নিরন্তর চর্চা ছাড়াও গায়ত্রী চক্রবর্তী বাংলাভাষার বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প ও উপন্যাস ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে মহাশ্বেতা দেবী ও রামপ্রসাদ সেনের অনেক রচনা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং সেইসব লেখা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক অনূদিত মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্পের সংকলন “Breast Stories”- জন্য ১৯৯৭ সালে স্পিভাক অনুবাদ বিভাগে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন।

তবে বিগত শতাব্দীর পাঁচের দশকের বিশিষ্ট কবি বিনয় মজুমদার এবং তাঁকে ঘিরে যে মিথ ছড়িয়ে আছে, তা নিয়ে একটা সংশয়ের জায়গা রয়েছে বলেই মনে হয় । বিনয় মজুমদারের ভাষ্য-অনুযায়ী গায়ত্রী চক্রবর্তীর বাবা জনার্দন চক্রবর্তী ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের হোস্টেলের সুপার । হোস্টেলে থাকাকালীন তিনি গায়ত্রীর প্রেমে পড়েন । যদিও মনের গভীরে থাকা প্রেম তিনি প্রেমিকাকে কোনোদিনই ব্যক্ত করতে পারেননি। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বাবা পরেশচন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন একজন ডাক্তার। গায়ত্রীর কথানুযায়ী Solidly Metropolitan Middle-class এর প্রতিনিধি তাঁর বাবা অবিভক্ত বাংলার ঢাকা শহরে একটি ধর্ষণের মামলায় মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজী না হওয়ায় তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। এরপরই তাঁরা সপরিবারে ঢাকা থেকে কলকাতা চলে আসেন। অপ্রাসঙ্গিক হবে, তবু যেহেতু কথাটা উঠেছে সেহেতু ব্যাপারটার নিষ্পত্তি দরকার। কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া কাব্যগ্রন্থ “ফিরে এসো চাকা”-র যে চাকা তা বিনয় মজুমদারের ভাষ্য অনুযায়ী এসেছে চক্র বা চক্রবর্তী থেকে। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে এক ধাঁধা। কারণ, এই চক্রবর্তী গায়ত্রী চক্রবর্তী ঠিকই, কিন্তু তিনি কি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক? তা যদি হন তাহলে তাঁর বাবার নাম জনার্দন চক্রবর্তী হল কীভাবে?

      ফিরে আসি এবার মূল প্রসঙ্গে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় থেকে নিরন্তর ইংরেজিতে সাহিত্য সমালোচনা, গবেষণা ও একজন সৃষ্টিশীল তাত্ত্বিকের কাজ করে গেলেও তিনি কখনই ভুলে যাননি মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষাকে। বাংলা ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কিছু নিবন্ধ।‌ বাংলা ভাষায় তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে। ‘অপর: লেখা ও রেখার সংকলন’। প্রকাশিত হয়েছে বক্তৃতার সংকলন ‘গণতন্ত্রের রহস্য’, ‘চিন্তার দুর্দশা’ এবং ‘যুক্তি ও কল্পনাশক্তি’। বাংলা ভাষার টানেই এই চিন্তাবিদ এই বয়সেও নিয়মিত আসেন কলকাতায়। সারস্বত সমাজে বক্তৃতা দেন। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন। এই বয়সেও তিনি চলে যান প্রান্তিক জনপদে‌ নিজের হাতে গড়ে তোলা হতদরিদ্রদের স্কুলগুলোতে। একটাসময় এইসব স্কুলগুলোতে শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিলেন না । গায়ত্রী চক্রবর্তীর মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিদূষী তাত্ত্বিক প্রকৃতির খোলা মাঠে শৌচকর্ম করতে দ্বিধা করতেন না।

    আসলে শুধুমাত্র উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবনার ডোমেইনে তাত্ত্বিক ও সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে নয়, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও বিহারের প্রত্যন্ত গ্ৰামে কিছুটা বিকল্প ধারার শিক্ষা প্রসারের ব্যাপারেও তিনি অগ্ৰগণ্য ভূমিকা গ্ৰহণ করেছেন। প্রান্তিক জনপদের শিশু এবং Landless Illiterate মানুষদের গতানুগতিক প্রথার বাইরে গিয়ে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলাই গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের উদ্দেশ্য।

    আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শুরু করে মাঝে আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পর তিনি ১৯৯১ সাল থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। বর্তমানে, ২০০৭ সাল থেকে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের “University Professor in the Humanities” শীর্ষক শীর্ষ পদে থেকে ৮৪ বছর বয়সেও ক্লান্তিহীনভাবে বিশ্বব্যাপী জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছেন। একজন প্রকৃত চিন্তা-উদ্দীপকের মতো শেখাচ্ছেন কাকে বলে Practice of Learning?

তবে হলবার্গ পুরস্কারও গায়ত্রী চক্রবর্তীর স্পিভাকের ভিতরে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। তিনি আজও নিজেকে মার্ক্সীয় নারীবাদী অবিনার্মিক হিসেবে ভাবতেই সম্ভবত অধিক পছন্দ করেন। পুরস্কার পাওয়ার অব্যবহিত পরে তিনি ফিরে এসেছেন স্বদেশে এবং এসেই চলে গেছেন নিজের তৈরি করা পাঠশালাগুলোয়, যেখানে আদিবাসীসহ সাবঅল্টার্ন ছেলেমেয়ারা তো বটেই, এমনকী প্রত্যন্ত জনপদের বয়স্করাও সম্পূর্ণ বিনা খরচে কিছুটা ভিন্ন ধারায় শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

   দীর্ঘদিন ধরে প্যালেস্টাইনের শিশু, নারীসহ সমস্ত মানুষের উপর নিরবচ্ছিন্নভাবে আমেরিকার মদতে ইজরায়েল যে  গণহত্যা চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে বারবার সোচ্চার হয়েছেন। শুধু তাই নয়, সমগ্ৰ বিশ্বে যেখানে যেখানে রাষ্ট্র দ্বারা মানবতা আক্রান্ত হয়েছেন সেখানেই তিনি প্রতিবাদ করেছেন। বাদ যায়নি ভারতবর্ষও। ভারতের নয়া ফ্যাসিজম ও ধর্মান্ধতা যে ভারতের চরিত্রকেই ধ্বংস করতে চলেছে সে বিষয়ে তিনি দ্বিধাহীনভাবে মতামত প্রকাশ করেছেন। তবে এইরকম মানবিকতাবাদী এবং বিশ্ববন্দিত তাত্ত্বিকের একটা ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করে।

     বাংলাদেশের কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এই মানুষটির মেধা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘এবাদতনামা’-কে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। তবে তাঁর কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ একটা সন্দেহের জায়গা ছিলই। আছেও। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের পরে তাঁর যে ভূমিকা তাতে মোটামুটি পরিস্কার হয়ে যায় আসলে তিনি কোন পক্ষের মানুষ। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। এহেন একজন মানুষের আমন্ত্রণে গতবারও বাংলাদেশে গিয়ে লালন মেলায় প্রকাশ্য মঞ্চে মজহারের হয়ে যেসব প্রশস্তিকথা বলেছিলেন তা বিস্ময় উদ্রেক করবার পক্ষে যথেষ্ট।

           তবে এই কাণ্ডর অভিঘাত প্রশমিত হয়ে যায় যখন দেখি বাংলাসহ সারা বিশ্বের বৌদ্ধিক মানুষের পাশাপাশি হলবার্গ পুরস্কার পাওয়ার অব্যবহিত পরেই পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির প্রধান প্রশান্ত রক্ষিত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন : “পুরস্কারটা ওঁর অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল নোবেলের সমকক্ষ হলবার্গ পুরস্কার নয় ওর নোবেলই পাওয়া উচিত। প্রান্তিক মানুষজন, বিশেষত শিশু ও মহিলাদের জন্য তিনি যা করেছেন– তা হয়তো অনেকেই জানেন না, কিন্তু আমরা জানি। পুরুলিয়ার শবর জনজাতি জানে। তাদের শিক্ষার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন গায়ত্রীদি।”

     এই স্বীকৃতি আমার মনে হয় হলবার্গ পুরস্কারের গরিমা থেকে কোনো অংশে কম নেই।

2 Responses

  1. আহ্ দারুন লিখেছেন গৌতম। এই লেখাটি দরকার ছিলো।

  2. যখন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ও তাঁর বই পত্র সম্বন্ধে আগ্রহী হোলাম তখন এই লেখাটা সামনে এলো। সুতরাং পড়ে নিলাম এবং খুশি হোলাম। ওনার লেখা আরও পড়তে চাই। সন্ধান দিলে ভালো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *