Skip to main content

Hello Testing

উ প ন্যা স ।  পর্ব ৬

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

এই বাঁচার কথা চিন্তা করতে করতে সন্ধ্যা রাতে আসে। সজনে গাছের ডালপালা পাতারা সব অন্ধকারে কেমন গভীর কালো হয়ে ওঠে। দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন রাতের খাবারের জন্য ডাইনিং রুমের দিকে এগোয়।

শেষ দশ বছর ওকালতির শেষে দেবেন্দ্র মল্লবর্ধনের ছিল এক রুটিন। ভালোভাবে কিভাবে বাঁচা যায়! দরকারে রাতে হালকা খাওয়া! একটু ছাদে পায়চারি করা! ভোরে সূর্য ওঠার আগেই শরীর গরম করা ইত্যাদি। বিছানায় গড়িয়ে গড়িয়ে যেন মরতে না হয়। ব্যাধি যেন শরীরে বাসা না বাঁধে। আজকাল শুধু শরীরের চিন্তাতেই মন বেশি ব্যস্ত থাকে। এমনকি ওকালতি করার সময়ও শরীরের কথা মনে হয়। দিন দিন বাঁচার চিন্তাটা যেন মাকড়সার জালের মতো শরীর মনকে জড়িয়ে ধরে। এমনভাবে জড়িয়ে ধরে যে সর্বদা সেই জাল থেকে কীভাবে বেরানো যায় সেই চিন্তাতেই দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন কাবু। একদিন ভোর রাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় শরীরের কথা চিন্তা করতে করতেই মাটিতে পড়ে যান। পাশের ঘর থেকে দৌড়ে ছেলে সুরেশ মল্লবর্ধন ছুটে বাথরুমে এসে কীভাবে যেন পাঁজাকোলা করে বিছানায় শুয়ে দেয়। বেলা হলে ডাক্তার এসে ব্যথার ওষুধ দেয়। প্রেসার মাপে। পালস মাপে। যাবার সময় ডাক্তার বলে মাথায় চোট লাগেনি রক্ষে। তা না হলে কোমায় চলে যেতে পারত।

এই দুর্ঘটনার পর দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন আর কোনোদিন পায়ে চটি পড়ে বাথরুমে ঢোকে না। খালি পায়ে পা টিপে টিপে বাথরুমে যায়। আর চেষ্টা রাখা হয় বাথরুম সম্পূর্ণ শুকনো যেন থাকে। বয়স হলে কি মানুষ শরীর নিয়ে বেশি চিন্তা করে! সবাই কি একই পথের পথিক। বহু মানুষ আছে কর্কট রোগ জানা সত্ত্বেও ধূমপান ছাড়ে না। দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন ঠিক এর উলটো। বাথরুমে পড়ে যাবার পর আরও সাবধানি হয়ে ওঠে। মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সাবধানের কোনো মার নেই। নিয়মিত শরীরের কথা ভেবে প্রতি বছর গরমের সময় পাহাড়ে যাওয়া পাহাড়ি বাতাস শরীর মনে লাগানো অথবা শীতের আগে সমুদ্রে যাওয়া নোনা হাওয়ায় শরীর যাতে জীবাণুমুক্ত থাকে সেইসব দিকে খেয়াল রেখে নিজেকে সুস্থ রাখাই ওকালতির বাইরে প্রধান কাজ। মনের ওপর শরীরের চিন্তা ছাড়া আর অন্য কোনো চিন্তা নেই। ছেলে সুরেশ যথেষ্ট বড়ো। বিবাহিত। সেও ওকালতি করে দাঁড়িয়ে গেছে।

একটু দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঝলমলে রোদে সোনালি চূড়াদল কেমন দীপ্ত। দেবেন্দ্র মল্লবর্ধনের এই দৃশ্য প্রিয়তম। কারণ এই দীপ্ত তেজী ভাবটাই দেবেন্দ্রকে বাঁচার রসদ জোগায়। চোখে এনে দেয় জীবনের ভালোবাসা। ছুটন্ত ঘোড়ার গতি। ফলে যখনই প্রতিবছর পাহাড়ে আসে দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন এই সোনামন হোটলে ওঠে। উঠবেই। কারণ এই হোটেলের বারান্দা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে অত্যন্ত নিটোল পবিত্র শোভাময় মনে হয়। সোনালি রোদে চূড়াগুলি থেকে আলো যখন ঠিকরে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে তার গতি অত্যন্ত তীব্র। আকর্ষণীয়। বেঁচে থাকতে ভালো লাগে। এই উজ্জ্বল চূড়াদল দেখতে দেখতে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। শরীরের জন্য কোনো চিন্তাই থাকে না। মুক্ত চিন্তায় শুধু উপভোগ কর কাঞ্চনজঙ্ঘার শোভা চূড়া দল দলের রূপালি রেখা সৌন্দর্যের বিভৎসতা।

কিন্তু ফি বছর এইসব দৃশ্য থেকে চোখ জোড়া যখন সরে আসে বাড়িতে তখনই জেগে ওঠে মগজে বাঁচার কুচিন্তা। মানে শেষ জীবনটা যেন বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে না কাটাতে হয়। ছেলে সুরেশের বোঝা হয়ে না দাঁড়াতে হয়। বাঁচার দুশ্চিন্তাতেই শরীর যেন ক্রমাগত ক্ষয় হতে শুরু করে। সঙ্গে ক্ষরণ। কথামালা। ক্ষয়ের জন্য কত নিজের সঙ্গে নিজের কথা! সেই কথা যেন শেষই হয় না। ওকালতির শেষে বিকালে বারান্দায় বসে কোল্ড কফি খেতে খেতে অথবা রাতের খাওয়ার শেষে ছাদে মৃদু পায়চারি করতে করতে বা নক্ষত্র খচিত আকাশ দেখতে দেখতে বাঁচা নিয়েই কত কথা নিজের সঙ্গে। কবে শেষ হবে এই দুশ্চিন্তা! ক্ষয় অথবা ক্ষরণ! কিংবা এই কথামালা!

পিতৃদেবের বায়না অনুযায়ী সুরেশ মল্লবর্ধন পিতৃদেবকে নিয়ে লাক্ষাদ্বীপ একবার ঘুরতে আসে। সঙ্গে সহধর্মিনী অর্চনা মল্লবর্ধন। দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন জীবনে তো কতই সমুদ্র দেখে! হালকা নীল জল। ঘন নীল জল। শান্ত ঢেউ। অশান্ত ঢেউ। কত কী! কোভালোম বিচের মতো আর কোনো এমন শান্ত বিচ মনে আসে না। সেই বিচের ধারে বসলে জীবনও কেমন শান্ত শান্ত মনে হয়। মনে হয় জীবনে অশান্তি দুশ্চিন্তা বলে কোনো কিছু থাকতে পারে না। এই শান্ত সমুদ্রের সামনে বসলে ক্ষয় বলে কোনো রোগ মনে আসে না। ক্ষরণ তো দূরের কথা! দেবেন্দ্র ক্ষয় ও ক্ষরণকে আটকাতে তাই সর্বদাই বেছে নেয় ভ্রমণ। জানে ভ্রমণে এলে মন ভালো থাকবেই।  আর মন ভালো থাকার জন্য সমুদ্র-পাহাড়-অরণ্য অত্যন্ত জরুরী। বয়স হলেও বয়স যেন সমুদ্রের কাছে, পাহাড়ের কাছে, অরণ্যের কাছে এসে হার মানে। তিন প্রকৃতির ভিন্ন গভীরতার জন্য তাদের রূপ ও সৌন্দর্যের জন্য বয়স এখানে এসে থেমে যায়। বাড়ে না। মন সতেজ হয়ে ওঠে। বুড়ো হয় না। শরীরের চামড়া টানটান থাকে। কুঁচকে যায় না। চোখ জোড়ার তারা চকচক করে। ফ্যাকাশে হয় না। কানের ফুটো কত জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় প্রকৃতির কোনো শব্দ দ্বিগুণ জোরে কানে প্রবেশ করে। শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে না।

লাক্ষাদীপের একটি হোম স্টের বারান্দায় বসে দেবেন্দ্র ঈষৎ সাদা বালি বালিয়াড়ির ছোটো ছোটো টিলায় চোখ বোলাতে বোলাতে বালি পথে নামে। বালি পথ চলে যায় সমুদ্রের ধারে। দেবেন্দ্রও সেই পথ ধরে চলে আসে সমুদ্রের কিনারায়। চোখ জোড়ায় ভেসে ওঠে ময়ূরকণ্ঠি রঙা ফিরোজা কালারের সমুদ্রের পরিষ্কার টলটলে জল। দেবেন্দ্র কিনারায় এসে বালিতে বসে থাকে। পা জোড়া ফিরোজা রঙের জলে ডুবিয়ে দু-চোখে সমুদ্রের উপরিতল হালকা ঢেউমালা দেখতে দেখতে কেমন হারিয়ে যায়। বালিতে বসে প্রবাল দ্বীপের কথা ভাবে। চিরকাল ওকালতির জন্য ভূগোলে কখনও মন দেননি। ফলে প্রবালদ্বীপ কীভাবে সৃষ্টি হয়, কত গভীরতা হয় জলের উপর এই দ্বীপ কতখানি ভেসে থাকে বা কতখানি ডুবে থাকে এই রহস্য দেবেন্দ্র মল্লবর্ধনের কাছে চিরকাল অজানাই থেকে যেতে বাধ্য। অজানা থাকলেও প্রবাল দ্বীপে ঘুরতে আসাটাই মূল উদ্দেশ্যে। প্রবাল দ্বীপের সমুদ্র দেখার ইচ্ছা বহুবছরের। শিশু বয়সে পিতৃদেবের কাছে প্রবাল দ্বীপের গল্প শুনতে। দুপুরে ঘুমোনোর সময় পিতৃদেব প্রবালদ্বীপের রহস্য শোনায়। কিভাবে ছোটো ছোটো জীবন্ত প্রবালেরা একসঙ্গে ঘন হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র পোকার মতো এই সব প্রবালেরা মারা গেলে সমুদ্রের নীচে বছরের পর বছর জমতে থাকে। পোকাগুলির খোলস জমতে জমতে শক্ত হয়ে ওঠে। সেই শক্ত ভিতের ওপর তৈরি হয় আরও শক্ত ভিত। এক সময় সেই শক্ত ভিত সমুদ্রের উপরিতলে ভেসে ওঠে। ভেসে নির্জন দ্বীপ তৈরি হয়। দ্বীপগুলিতে প্রাণের চিহ্ন ফুটে ওঠে। মানুষের যাতায়াত বাড়ে।

নব্বই বছর বয়সে দেবেন্দ্র মল্লবর্ধনের আরেকবার ঘন জঙ্গল যাওয়ার বাসনা জাগে। সেই বাসনার জন্য নিজেকে প্রাণপণ তৈরিও করতে থাকেন। নব্বই বছরে এসে দৃষ্টি বেশ ক্ষীণ। শরীরের চামড়া ঝুলে পাকিয়ে খাওয়ার উপক্রম। সকালের কথা বিকালে মনে থাকে না। বিকালের কথা রাতে মনে থাকে না। খাইয়ে দেওয়ার জন্য লোক আছে। সেই লোক ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যায়। জামা পালটায়। পায়জামা পালটায়। ব্রাশ করিয়ে দেয়। তবুও বিছানায় এইভাবে শুয়ে শুয়ে দিনরাত ঘোড়ার মতো বাঁচতে চায়। শরীরে সব কিছুই যখন বিছানায় এলানো মন তখনও ঘোরে চারিদিকে। পাহাড়ে-সমুদ্র-জঙ্গলে। মনকে সবসময় বোঝায় জীবনে কখনও কাতরে যেন বিছানায় জীবন না কাটে। অথচ দীর্ঘ জীবনটি সত্যি সত্যিই দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন ঘোড়ার মতোই কাটায়। এখনও বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার স্বপ্ন দেখে। বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টার জন্য শরীর মন দিন দিন ক্ষয় হতে থাকে। ক্ষরণের চিহ্ন জোড়া চোখে দেখলেই টের পাওয়া যায়। অসহায় মুমূর্ষু দৃষ্টি সকাল বিকাল জানলার বাইরে কী যেন খুঁজে চলে।

হয়তো এই বার্ধক্যজনিত রোগেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রবালদ্বীপের কথা কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা ভাবে। ভাবে ছত্তিশগড়ের বস্তারের সেই ঘন জঙ্গল। যে বন জঙ্গলে জীবনে দশবার যায়। উঁচু উঁচু শাল গাছের হাওয়া শরীর মনে মাখতে মাখতে দিব্যি সময় কেটে যায়। ইন্দ্রাবতীর ধারে বসে মাছেদের খেলা দেখে মহুয়ার ডালে ডালে কত বিচিত্র নাম না জানা পাখি। ইন্দ্রাবতী নদীর মিষ্টি ঠান্ডা বাতাসে জীবন যেন থমকে যায়। শরীর মন অবাধ্য বালকের মতো লাফালাফি করে। এইসব জায়গায় এলে বার্ধক্য কখনও আসতেই পারে না। তুড়ি মেরে বার্ধক্যকে আটকে  রাখা যায়। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। সে এগোয়। বুড়ো হয়। শরীর যাতে অক্ষত থাকে সেইজন্য কত দুশ্চিন্তা, কত ব্যায়াম, কত ঘোরাঘুরি, কত ওষুধপত্র, কত খাদ্যতালিকা। যাতে অসহায় ভাবে বিছানায় কাতরে যেন জীবন না কাটে।

তবুও এত শত চিন্তা, এত শত ভাবনার পরও দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন বিছানায় কাতরাতে থাকে। দৃষ্টি ক্ষীণ হলেও এখনও সে ঘোড়ার মতো বাঁচতে চায়। মনটা এখনও তার সবুজ।

চলবে

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *