ফি চা র স্টো রি
কিশোর ঘোষ
ফুটবল প্রকৃতিযাপন, মেসি-রোনাল্ডো কৃষক, দূষণে অপমৃত্যু হবে?
‘কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভ’রে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;
কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস— তেম্নি সুঘ্রাণ—
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে।’
জীবনানন্দ দাশের এই কবিতা নাকি দুর্বোধ্য! বোঝো! আমরা যারা সকালে, বিকেলে ফুটবল খেলতে খেলতে, মাঠেঘাটে ফুটবলের মতো গড়াতে গড়াতে বড় হয়েছি, খেলা শেষে জার্সি পেতে মাঠকেই ঘাসের পালঙ্ক করেছি ক্লান্তিতে এবং চিৎ হয়ে শুয়ে দেখেছি অনন্ত আকাশে ধ্রুবতারা উজ্জ্বলতর হচ্ছে, অতএব সন্ধে গভীর হয়ে রাত নামব নামব, এবার বাড়ি না ফিরলেই নয়, নচেত মা ঠ্যাঙাবে। এই আমাদের সারা গায়ে তো ঘাম আর ঘাসের গন্ধই! সাদা কেডসে, জামায়, প্যান্টে পাড়ার মাঠের অসংখ্য ‘চুমু’। এক কাচাতে ছাড়ত না সেই অবুঝ সবুজ ভালোবাসা!
না-না, আমরা অধিকাংশই মেসি-রোনাল্ডো, এমনকী কৃশানু-বিকাশ, বাইচুং-ছেত্রীও হতে পারিনি। তবে একটা জিনিস টের পেয়েছে অন্তর্যামী— ফুটবল খেলাটা আসলে বাউল ধুলো-মাটি, ফকির রোদ-বৃষ্টিতে ভরা প্রকৃতিকে উদযাপন। যতই কোটি টাকার মালিক হোন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মহাতারকারা, দিনের শেষে তাঁরাও মেঠো মানুষ। ফুটবল-কৃষক। ফসলের ধরণটাই কেবল আলাদা। দুর্ভাগ্যের হল, ২০২৬-এর বিশ্বকাপে এসে সেই খেলাতেও লেগেছে উষ্ণায়ণের অভিশাপ!
নচেত নব্বই মিনিটের খেলায় ১৫ মিনিটের বিরতি, মোটের উপর এই ছিল বিশ্বফুটবলের গত একশো বছরের নিয়ম। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপ সাক্ষী, আরও বার দুয়েক ‘ডিহাইড্রেশন ব্রেক’ দিতেই হচ্ছে। যাতে করে তীব্র গরম ও প্রবল আর্দ্রতায় খেলোয়াড়রা অসুস্থ হয়ে না পড়েন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশ শঙ্কিত— ক্রমশ বদ্ধ এসি ঘরে ঢুকে পড়া দূষণের পৃথিবী থেকে ফুটবল খেলাটাই না উঠে যায়! অথবা বিকল্প উপায়?
১৯৯০। ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সিদ্ধান্তে দেশে মুক্ত বাণিজ্যের পালে হাওয়া। সেই নয়ের দশকে আমেরিকার আটলান্টাজাত ঠান্ডা পানীয় কোকাকোলার একটি বিজ্ঞাপনে দেখানো হত দূরদর্শনে। বিজ্ঞাপনের কন্টেট ছিল এরকম— মার্কিনমুলুকের গ্রীষ্ম। উরিব্বাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রা। দরদর করে ঘামছেন সাদা চামড়া সাহেবের দল। ওই ‘তীব্র গরম’ থেকে মুক্তি পেতে ঢকঢক শব্দে চিলড কোকাকোলা পান করছেন তাঁরা। এবং স্বস্তি। যে মার্কিনীরা নয়ের দশকে ২০ ডিগ্রি গরমে ঘামত, ২০২৬-এর গ্রীষ্মে তারাই গড়ে ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার মুখোমুখি।
এ কি চিনা ড্রাগনের চক্রান্ত! আগুনে হলকায় দিশাহারা শিকাগো থেকে কানসাস সিটি, মায়ামি থেকে আটলান্টা। এই শহরগুলিতে ৪০ ডিগ্রি ছাপিয়ে গিয়েছে পারদ। যে কাঠফাটা রোদে হাঁটাও বেদনার, এমনকী পদে পদে হিট-স্ট্রোকের হাতছানি। সেখানে নব্বই মিনিট ছুটে বেড়াতে হচ্ছে ইয়ামাল, হ্যারি কেন, রোমেল লুকাকুদের। অতএব, প্রতি অর্ধে একটি করে ‘ডিহাইড্রেশন ব্রেক’ ছাড়া অসম্ভব। কারণ ফুটবল-শ্রমিকরাও দিনের শেষে মানুষ, হাঁড়িকাঠে চড়ানো গ্ল্যাডিয়েটর তো নয়। কী বুঝছেন?
অনুরোধ করি বোঝার চেষ্টা করুন—এই বিশ্বকাপটা আসলে এক জটিল-কুটিল প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ফুটবলপ্রেমী বিশ্ববাসীকে। প্রশ্ন হল, যে ফুটবল ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। যে খেলা সবুজ ধুলো-হাওয়ায়, রোদ-বৃষ্টিতে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি দেয় একজন খেলোয়াড়কেই শুধু নয়, গ্যালারিতে বসে সেই প্রশান্তি ধার করেন হাজার হাজার দর্শক, এমনকী টিভির সামনে বসা কোটি কোটি ফুটবল ভক্তও অজান্তে উপভোগ করেন ঘাস-মাটির ওই আটপৌরে যাপন। আজকের দূষণের পৃথিবী সেই মেঠো তথা শিকড়ের অস্তিত্বকেই বেজায় চ্যালেঞ্জ করছে। এই অবস্থায় আর্জেন্টিনা-মিশর খেলা যেখানে হল, সেই আটলান্টার মতো সব স্টেডিয়ামকে এসি-ইন্ডোর করা সম্ভব? মূল প্রশ্ন হল, ঘাস লাগবে না? প্রকৃতিজাত ঘাস?
জেনে রাখুন, এবারের বিশ্বকাপের মোট ১০৪টি ম্যাচ যে সবুজ গালিচার ওপর হচ্ছে, তা নিখুঁত রাখতে বিশেষজ্ঞরা আট বছর ধরে মাইলের পর মাইলজুড়ে ঘাস চাষ করেছেন, জল দিয়েছেন, কেটেছেন এবং স্পাইক জুতা দিয়ে পিষে পরীক্ষা করেছেন। ফিফার অনুরোধে এই ঘাসবিশেষজ্ঞ বা টার্ফগ্রাস বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে রয়েছেন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির অধ্যাপক জন সোরোচান। যারা ভাবছেন, বাইরে মরুভূমির মতো গরম থাকুক না, ছাদযুক্ত এসি ডোম স্টেডিয়ামে খেলা চলবে, কতকটা যেন তাঁদেরকেই উত্তর দিয়েছেন জন। বলেছেন, ‘ছাদযুক্ত ডোম স্টেডিয়াম নিয়ে আমি চিন্তিত। কারণ, বাইরে সূর্য উঠবে ঠিকই, কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে তো রোদ পৌঁছোবে না। আর উদ্ভিদের বেঁচে থাকার ও বৃদ্ধির জন্য আলো, বিশেষত সূর্যালোক সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্পষ্ট– সবুজ প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে ফুটবল সম্ভব নয়। এ হল আদিম, অনন্ত পৃথিবীকে উদযাপনের দুরন্ত খেলা। কংক্রিট পৃথিবীর বিরুদ্ধে নিঃশব্দ বিপ্লব। এখনই দূষণে ইতি টানতে না পারলে ঘাস, মাটির এই খেলারও অপমৃত্যু হবে। অতএব, জীবনানন্দের ‘ঘাস’ কবিতাটি মোটেই দুর্বোধ্য নয়, জানে মেসি-রোনাল্ডোদের মতো মেঠো মানুষের অন্তর্যামী।
‘আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে-গেলাসে পান করি,
এই ঘাসের শরীর ছানি– চোখে চোখ ঘষি,
ঘাসের পাখনায় আমার পালক,
ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার
শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।’