উ প ন্যা স । পর্ব ৮
তীর্থঙ্কর নন্দী
ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা
পর্ণালি চায় না সেই ক্ষত থেকে যেন দু-জনে ক্ষয়ে না যায়। কেননা শরীরে ক্ষয় দেখা দিলে ক্ষরণও আসতে বাধ্য। আর সেই ক্ষরণ শুরু হলে তার হামলাও আসতে বাধ্য।
রাত বেশ ঘন। বাইরে ঝিন ঝিন বৃষ্টি। তিন চারটে ছোট ছোট কালো পোকা জানলার বাইরের কাঁচে ওপরে ওঠে আর পড়ে নি। আবার ওঠার চেষ্টা চালায়। নিচে পড়ে যায়। পর্ণালি এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ডান হাত দিয়ে ঈর্ষর গালে হাত রাখে। হাত গাল থেকে বুকে নেমে আসে। বুক থেকে কাঁধে চলে যায়। ঈর্ষ বুঝে নেয় পর্ণালির বাসনা। নিজের বাঁ হাতে পর্ণালির স্তনযুগল আলতো করে ধরে। হালকা চাপতে শুরু করে। জোড়া ঠোঁটে স্তনযুগলের নোনতা স্বাদ শরীর মনে শিরা উপশিরায় সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে যায়। সে বোঝে নারীর শরীর কত মিষ্টি রোমাঞ্চকর পরিণত হতে পারে। এই পরিণত স্বাদ বহুদিনের অপেক্ষা। জানিয়ে রাখা ভালবাসা। নারীকে ভালবাসার বন্ধনে অনেক কাছ থেকে হাত দিয়ে মুখ দিয়ে ঠোঁটজোড়া দিয়ে জিব্বা দিয়ে শরীরের স্বাদ নেওয়ার ভিতর দিয়ে প্রেমকে আরও পোস্ত করে তোলা। শুধুই মনের কাছাকাছি নয়। পারলে দুটি শরীর যাতে ডুবে নিয়ে একটি শরীরের রূপ নেয় সেই চেষ্টাতেও আপ্রাণ মন দেওয়া। তবেই পর্ণালির কাছে ঈর্ষর কাছে প্রেমের সংঙ্ঘা পূর্ণতা পায়। শারীরিক আনন্দ মজা ছাড়া শুধুই প্রেম ভালবাসার অর্থ একদমই বেমানান দু-জনের কাছে।
পর্ণালি আরও কাছে টানে ঈর্ষকে। ঈর্ষও আরও কাছে আসে। অনেক কাছে। যেন পর্ণালির শরীরে প্রবেশ করে যায়। পর্ণালির ঠোঁটজোড়া হালকা লাল থেকে ঘন লাল হয়ে ওঠে। চোখের তারাদ্বয়। গোলাকার হয়ে বিছানায় খেলার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। ঈর্ষও পাগলের মতন পর্ণালিকে জড়িয়ে ধরে। খুব ইচ্ছা হয় খেলাটি যেন ভালভাবে শেষ হয়। আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে ভাল খেলোয়াড় হিসাবে তুলে ধরতে। কিন্তু ঈর্ষ বুঝতে পারে সে একটু এই বিষয়ে দুর্বল। নিজের দুর্বলতা ঢাকার জন্য পর্ণালির শরীর থেকে বিছানায় নেমে যায়। জানলায় কাঁচে তখনও সারা রাত তিন চারটে কালো পোকা ওপরে ঠিক মতন উঠতে না পেরে বার বার নিচে নেমে যায়। পর্ণালি চোখ জোড়া দিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। এক সময় রাত ভোরে এসে নামে। ভোর সকাল দশটায় চলে আসে। পর্ণালি একটু মনমড়া হয়ে বিছানায় এলিয়ে থাকে। ব্রেকফার্স্টে যেন মন নেই।
ঠিক একবছর বাদে মানে রবিবার তেইশে অক্টোবর ২০২৩ সালে পর্ণালি আর ঈর্ষ আসে রংপুতে। ঝাড়গ্রামের পর পর্ণালি ঠিক করে আরেকবার ঈর্ষকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা। দ্বিতীয়বারের এই ঘুরতে যাওয়ার চেষ্টা পর্ণালি। কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রথমবার ঈর্ষকে নিয়ে সে পূর্ণ তৃপ্তি পায় না। এই অতৃপ্তির পিছনে পর্ণালির দুটি প্রধান কারণ কাজ করে। এক হয়ত বেশি ঘোরাঘুরির জন্য ঈর্ষ সেই রাতে ক্লান্ত থাকে ছিল। মুখে যদিও কিছু বলেনি। তাছাড়া ছেলেরা যদি কোনও কারণে এক বিশেষ রাতে সঙ্গিনীকে পুরোপুরি তৃপ্তি দিতে না পারে তাদের লজ্জা সেই রাতে ভীষণভাবে কুঁচকে দেয়। পৌরুষে থাপ্পর খায়। কোনও পুরুষই সেই ব্যর্থ রাত ভুলতে পারে না। একধরনের কালো রঙের হীনমন্যতায় পুরো রাতটি কেটে যায়। রাত ভোরে এসে থেমে পড়ে। ফলে ঈর্ষকে নিয়ে কোনও ঝুঁকিই নিতে চায় না। পর্ণালি। কেননা পর্ণালি মনে করে জীবনে প্রথম প্রেম প্রথম ভালবাসার মানুষটিকে নিয়েই সাধারণ জীবন থেকে কাটাতে পারে। পর্ণালি একদমই সম্পর্ক ভেঙে অন্য কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার মেয়ে নয়।
ফলে মংপু নির্বাচনেও পর্ণালির এক সুনির্দিষ্ট প্ল্যান থাকে। ঝাড়গ্রাম অপেক্ষাকৃত গরম জায়গা। ঝাড়গ্রামে সারাদিন ঘোরাঘুরিতে ঈর্ষ হয়ত যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে শরীরে ক্লান্তি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই যেনি ইরাও তেমন মাথা চাড়া দেয় না। মন ভাল না থাকলে হয়ত শরীরও ভাল লাগে না। এইসব ভাল না লাগলে মনে যৌন তৃষ্ণাও যেও ঠিকভাবে আসে না সেইজন্য মংপু যৌনতৃষ্ণাও যেও ঠিকভাবে আসে না। মংপু হল আদর্শ জায়গা মনভোলান পাহাড়ি এক নিরিবিলি ছোট গ্রাম। দার্জিলিং শহর থেকে তিরিশ কি.মি. দূরে। কার্শিয়াং এর কাছে। রবীন্দ্রনাথ শেষ জন্মদিনটি এইখানেই পালন করে। এইখানে রবীন্দ্রনাথের বাড়িও আছে। জন্মদিন কবিতাটি এইখানেই লেখা হয়। ফলে রাবিন্দ্রীক এক আমেজ আছে। আর রাবিন্দ্রীক আমেজে মানে তার কবিতা গানে সময়ই প্রেম প্রেম এক বাসনা আসে। মংপুতে পর্ণালি সেইজন্যই আসে যাতে ভাঙার শরীর ক্লান্ত না হয়। প্রেম যেন সবসময় মনের আনাচে কানাচে উঁকি মারে। শরীরে প্রেম প্রেম ভাব এলেই শরীর সুস্থলাগে। ল্যাপটপে হালকা কোনও প্রেমের মিউজিক বাজলেই সেই শরীরে রাতে যৌনতৃষ্ণা আসতে বাধ্য। পর্ণালি সব হিসাব করেই ঈর্ষকে নিয়ে মংপুতে ঘুরতে আসে।
চব্বিশে অক্টোবর সকালে ঘুম থেকে উঠেই হোম স্টে তে বেশ সুগন্ধযুক্ত কালো চা পান করে দুজনে হাটি হাটি পা পা করে পাহাড়ের ঢালে নেমে যায়। ছোটো মাঝারি সিনকোনা জঙ্গলের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে মন উদাস হয়। কেনকে ভারি লম্বাটে মাথা সিনকোনার পাতা ছিঁড়ে আঙুলে আঁচড় মেরে পর্ণালি গন্ধ শোঁকে। সাদা গোলাপি ফলের বাহার দেখতে দেখতে প্রায় সবাটাই কেটে যায়। ঈর্ষ জানে এই গাছর ছাল বেশ দামি। এর ছাল দিয়েই ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরী হয়। ঈর্ষ কয়েকটি গাছের শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে পর্ণালিকে নিয়ে হেঁটে প্রায় বারোটার সময় হোম স্টে-তে দিয়ে আসে। ফিরে দুজনে আবার সুগন্ধযুক্ত কালো চা নিয়ে বসে গল্প শুরু করে।
গল্পে উঠে আসে মংপুর মনোরম আবহাওয়া। চকচকে রোদ। সিনকোনার মহহারি গোলাপি সাদা ফুল বাহার। উঁচু নিচু পাহাড়ি পথে। দূরে পাহাড়ের পিঠে অন্য পাহার। কখনও রোদ মুছে যাওয়া ঝাঁপসা পাহার রেখা। পাহাড়ের পাশে অন্য পাহাড়ের ছায়ার মতন পাহার চিত্রমালা। ত্রিভুজাকৃতি স্থির পাহাড়চিত্র চোখে বেশ আরাম দেয়। একটি টানা লম্বা আয়নার সামনে পর্ণালি এখন ভাবে বসে গল্প করে যে নিজের শরীরের বাঁ দিকটি কাচে ভেসে থাকে। আর অন্যদিকে ঈর্ষর শরীরের ডানদিকের অংশ। যেখানে চোখে ভাসে ঈর্ষর ডান হাত ডান কাঁধ ডান চোখ ডান ঠোঁটের কোণা। গল্প ঈর্ষই বেশি করে। পর্ণালি চায়ে চুমুক দিতে শুধু খেয়াল করে ঈর্ষর চোখ কান গলা ভুরু কাঁপেনি ইত্যাদি। বোঝার চেষ্টা করে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঈর্ষরের মেজাজটি। কালো চায়ে চুমুক দিতে দিতে এমনভাবে প্রকৃতির বর্ণনাগুলি দেয় যেন মনে হয় ঈর্ষ ভালই তৃপ্তি পায়। পর্ণালির কাছে ঈর্ষর এই তৃপ্তি বুঝে নেওয়া আজ রাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেননা পর্ণালি চায় ঈর্ষ যেমন একজন নির্ভরশীল প্রেমিক তেমনি একজন নির্ভরশীল দায়িত্বপূর্ণ পুরুষও হয়ে উঠুক। পর্ণালি মাঝে মাঝে নিজেকে লম্বা আয়নায় চোখ বুলিয়ে নেয়। বুঝে নিতে চায় সে ঈর্ষকে নিয়ে ভিতরে ভিতরে যে এতসব ভেবে চলে সেই ভাবনাকে চিহ্ন কি তার চেহারায় কখনও ধরা পড়ে! অন্তত বর্হিপ্রকাশে! ঈর্ষ কি বুঝতে পারে সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে পর্ণালি কি কি নিয়ে চিন্তা করে!
২৬শে অক্টোবর। মংপু থেকে পর্ণালি ঈর্ষ আসে কলকাতায়। শিয়ালদহ থেকে হাওড়ায় যেতে প্রায় রাত দশটা বেজে যায়। দুজনে উবর ধরে হাওড়ায় এসে শ্রীরামপুরে নামে প্রায় এগারোটায়। সেই রাতেই পর্ণালির সঙ্গে ঈর্ষর শেষ কথা। শেষ বলতে পর্ণালি আর ঈর্ষর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ ঈর্ষ মংপুর সুন্দর মিষ্টি আবহাওয়া এবং রাবিন্দ্রীক পরিবেশেও পর্ণালিকে ন্যূনতম তৃপ্ত করতে পারেনি। অথচ পর্ণালি তার ব্যাপক প্রথম পুরুষের কাছে যেমন প্রেম আদর ভালবাসা কর্তব্যবোধ দায়িত্বশীলতায় বোধ প্রশ্নাকের বোধ যেমন ভাবে একশ ভাগ পেয়ে আসে সেখানেও নিত্য দিনের রুহিনের ভিতর যৌন তৃষ্ণাও আসে। অথচ পর্ণালি মংপুতে দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। ঈর্ষকে সামুদ্রিকভাবে কাছে পেতে পারে না। এই অপূর্ণ জীবন নিয়ে পর্ণালি কেন সারা জীবন কাটাবে! সেও মা হতে চায়! সংসার চায়! স্নেহ চায়! পরিপূর্ণ এক পরিবার চায়। কিন্তু জীবেন যদি শূন্যতা আসে! পর্ণালি ঈর্ষকে হারাতে চায় না। প্রথম প্রেম বলেই কি! হয়ত! পর্ণালি ত প্রেম বিক্রি করতে জন্মায়নি। তার কাছে প্রেম পবিত্র। অত্যন্ত শুদ্ধ। পুজো হিসাবে গণ্য। আজ একজনের সঙ্গে প্রেম করলাম কাল ব্রেক করে আবার দ্বিতীয় জনের সঙ্গে সম্পর্ক করলাম পর্ণালি এইসবে একদমই বিশ্বাস করে না। বন্ধুরা তাকে অনেক সময় সেকেলে আখ্যাও দেয় কিন্তু পর্ণালি এইসব কথায় পাত্তাই দেয় নি। দেয় না। পর্ণালি নিজেকে অত্যন্ত প্র্যাকটিকাল মনে করে। তার কাছে প্রেম যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি যুক্তিওযুক্ত। তা না হলে ঝাড়গ্রাম বা মংপুতে গর্ভনিরোধক পিল আনতো না। সে জানে আবেগের বসে কোনও অযৌক্তিক কাজই মূর্খামির সমান। আর সেই মূর্খামির জন্য বাবা মাকে বিপদে ফেলতে পারে না।
শোনা যায় পর্ণালি ঈর্ষর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অথচ ঈর্ষও পর্ণালিকে অত্যন্ত ভালবাসে। তার কাছেও এটি প্রথম প্রেম। কিন্তু দুর্ভাগবশত এখন দু-জন দু-মেরুতে বসবাস করে। শ্রীরামপুরের স্টেশনে দেখা হলেও দু-জন দু-দিকে চোখ সরিয়ে নেয়। পর্ণালি প্রথম প্রেমেই হোঁচট খেয়ে মনের ভিতর তার এক শূন্যতা তৈরী হয়। পর্ণালিও এখন বয়স পয়ত্রিশ। আজও অবিবাহিত। অভ্র সেন স্বরা সেন মেয়ের বয়সের জন্য চিন্তিত। কবে মেয়ে বিয়ে করবে! দুজনেই ক্ষয়ে ‘ক্লান্ত’ ক্ষরণ হয়েই চলে। কারোর ক্ষরণ কমে না।