আমাদের তো নির্দিষ্ট ইয়ুথ হস্টেল ছাড়া গতি নেই। কারণ ওই পয়সাটুকু থাকলে আরও কিছু দেখা যায়, আরও একটা শহর। যাই হোক, টিকিট কেটে স্টেশনের বাইরে এসে বৃষ্টি মাখা ফ্রাঙ্কফুর্ট, অস্পষ্ট আকাশ-ছোঁয়া, অদ্ভুত-অদ্ভুত বাড়ি, কোনওটি অর্ধ-নলাকার, কোনওটি শিসকাটা পেন্সিলের মতো, দেখে ভালই লাগল। আমরা ৪৬ নম্বর বাসে করে নদী পার হয়ে ইয়ুথ হস্টেলের দরজায় এসে নামলাম। Main নদীর ধারে হস্টেলটি, এক নজরে চেনার কথা নয়। সাধারণভাবে হস্টেলগুলির মাথায় পতাকার চিহ্ন থাকে। এই ইয়ুথ হস্টেলটিতে কোনও চিহ্ন নেই। জার্মান ভাষায় অবশ্য কী সব লেখা আছে, অন্য ভাষী মানুষেরা কেমনভাবে বুঝবে তা জানি না। Frankensteiner Platz স্টপে নেমে পড়লাম। ওই দেশে অজানা মানুষের পক্ষে যে কোনও স্টপে বাস বা ট্রাম থেকে নামা কোনও অসুবিধেই নয়। যাত্রীদের সামনে ইলেকট্রনিক বোর্ডে স্টপ আসার আগে তার নাম লেখা হয়ে যায়। যাই হোক, ইয়ুথ হস্টেলে পৌঁছলাম। ১৯৯৬-এর কথা, তখন ২৮ ডয়েস মার্কে থাকা এবং প্রাতঃরাশ। সাধারণত ইয়ুখ হস্টেলগুলিতে রান্নার সুবন্দোবস্ত থাকে, কিন্তু এই হস্টেলটিতে ছিল না। অতএব প্রাতঃরাশ ছাড়া অন্য খাবারগুলির জন্য দোকানই ভরসা, দেখে-শুনে বাজেট মতো কিনে নেওয়া ছাড়া উপায়-ই বা কী!
মাইন নদীর দুই পাশে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি গড়ে উঠেছে। নদীর ধারটি সুন্দরভাবে বাঁধানো, ঘাসের পাশে বসার চেয়ার, রাস্তায় মানুষজন কেউ হাঁটে, কেউ ছোটে, কেউ সাইকেলে বেড়ায়, নদীতে বোটিং করার সুবন্দোবস্ত আছে। ওপরের ধাপে রাস্তা বাস চলাচলের জন্য, পাশে ঘর-বাড়ি, ইয়ুথ হস্টেল, সারি-সারি মিউজিয়াম।
যদিও প্রতিদিন ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর নতুন করে তৈরি হচ্ছে, দৈর্ঘ্যে এবং নকশায় বদলে যাচ্ছে, আজকের শহরকে পাঁচ বছর বাদে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, তবুও ফ্রাঙ্কফুর্টেরও নিজস্ব কিছু অতীত ইতিহাস রয়েছে। মাইন নদীর ওপর একটি সরু ব্রিজ থেকে এই শহরের নামের উৎপত্তি। ফ্রাঙ্করা আসার বহু আগেই এখানে বসতি শুরু হয়েছে। পুবদিকের বন্দর তৈরির সময় থেকেই প্রস্তরযুগের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। রোমানরা একটি ব্রিজ ও একটি দুর্গ বানিয়েছিল প্রথম খৃস্টাব্দে। তারপর থেকে অনেকে, শেষমেষ ফাঙ্করা বসতি শুরু করে।
১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলার সূচনা হয়। এখন আন্তর্জাতিক শারদমেলা হয় শহরের মেলা প্রাঙ্গণে। ১৩৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বসন্তেও মেলা আরম্ভ হয়। ১৪০৫ খৃস্টাব্দে দুটি দোকান Romer এবং Goldener Schwan কে নিয়ে টাউন হল তৈরি হয়, ক্রমে বিস্তৃত হয়। ১৬০০ খৃস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফুর্টে মুদ্রা তৈরির দায়িত্ব আসে, তখনই জার্মান এক্সচেঞ্জ স্থাপিত হয়। ধীরে-ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা হয় এবং অনেক ব্যাঙ্ক তৈরী হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহরের প্রাণকেন্দ্রটি বিমান-আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট নতুন করে গড়া হল সিমেন্ট আর কাচ দিয়ে, যা সাধারণত অন্য ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরগুলিতে হয়নি। পুরোনো দিনের স্থাপত্যের নিদর্শন দেখাতে পাওয়া যায় কাঠের বাড়িগুলোয় এবং চারটি ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মিনারে।
সকালবেলায় ইয়ুথ হস্টেলে মালপত্র রেখে রাস্তায় নেমে পড়লাম। ইয়ুথ হস্টেলে থাকলে নদীর দক্ষিণ ধার ধরে-ধরে মিউজিয়ামগুলি প্রথমে দেখে নেওয়া ভাল। সাত সাতটি মিউজিয়াম। প্রথমে অ্যাপ্লায়েড আর্টসের মিউজিয়াম, মার্কিন স্থপতি রিচার্ড মেয়র নকশা করেছিলেন। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্টস ১৯৭৮-এ পুরস্কৃত করেছিল এই বাড়িটিকে। মূল বাড়িটি কৌণিক, খুবই আলোময়, সংশ্লিষ্ট অন্য বাড়িটিতে ইউরোপ এশিয়ার মধ্যযুগ থেকে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ হাজার কারিগরির নমুনা রয়েছে। মিউজিয়ামের সংলগ্ন কফির দোকানে মানুষেরা খুবই ভিড় করে বসে রোদ পোহায়। এরপরে যে মিউজিয়ামটি সেটি মানবজাতি তত্ত্ব সংক্রান্ত। এই মিউজিয়ামটির ১৯৪৪ খৃস্টাব্দে বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখানে রিসেপশানে যে মেয়েটি বসেছিল তার হাতে রোটরিং কলম দেখে খুবই কৌতূহলী হয়ে পড়েছিলাম। জার্মানির এই কলমণ্ডলি দেশে আমার খুবই কাজে লাগে (তখনও অটোক্যাডের ব্যবহার আরম্ভ হয়নি আমাদের অফিসে)। দামে সস্তা হলে কেনা যেতে পারে ভেবে দোকানের নাম-ঠিকানা জেনে নিলাম। যদিও সে আমাদের যা বোঝাল আমরা কিছুই বুঝলাম না। অবশ্য সে নাম-ঠিকানা একটি কাগজে লিখে দিল। বলা বাহুল্য, ওর লিখে দেওয়া সেই দোকানটি খুবই বড়। সেই দোকানে এবং আরও অন্য দোকানে ওই কলমের খোঁজ করে জানতে পারলাম কলকাতার চেয়ে পাঁচগুণ দাম বেশি। এই বিষয়টিতে আমি এত আশ্চর্য হলাম, যদিও দোকানীরা আমার কথা শুনে বিশ্বাস করলো না মোটেই, অবিশ্বাসী ভঙ্গিমাতে তাকিয়ে রইল।
ক্রমশ…