অ নু বা দ
ভাষান্তর: বাসুদেব দাস
রুদ্রসিংহ মটকের কবিতা: মূল অসমিয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ
কবি পরিচিতি: ১৯৫৯ সনে জন্ম। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাহসী মানুহর হাতত’, ‘কবিতার পৃথিবী কত’, ‘ভালপোয়ার জলফাইরঙী পৃথিবী’, ‘আর্টগীল্ডত সন্ধ্যা’ এবং ‘শঙ্খবোর সারে আছে’। যোরহাট সাহিত্য সভার ‘বকুল বন বঁটা’ এবং অসম কবিসমাজ কর্তৃক অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী বঁটা দ্বারা সম্মানিত। স্টেট ব্যাংকের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
কবিতার ভালোবাসা
কী সবুজ হৃদয়ের এই আশা, ভোরের শিশিরের মতো
স্বচ্ছ,উজ্জ্বল
আশা যদি না থাকে বুকে,আমি হাতের
তালুতে তুলে নেব
জ্বলে যাওয়া আশার একমুঠো তামারঙের ছাই
আর যদি জীবনও না থাকে, আমি বুকে
তুলে নেব ধবধবে সাদা আমার কফিন
আর একদিন যদি কবিতাও না থাকে
এই পৃথিবীতে
আমি আমার হৃদয়ে ঢেকে রাখব অল্প কুয়াশা
আর কিছুটা
কবিতা রঙের আকাশের নিঃশ্বাস
যুদ্ধভূমিতে কবি
যুদ্ধভূমিতে না দাঁড়িয়ে কী যোদ্ধা হওয়া যায় কখনও
অথচ এভাবেই একের পরে এক, হয়তো বহু যুদ্ধই পার হয়ে গেছে ইতিহাসের
বুকের উপর দিয়ে
শব্দের সঙ্গে শব্দের, অনুভূতির সঙ্গে
স্পন্দিত অনুভবের এক একটি সজীব, বাস্তব চিত্রকল্পের প্রয়োজনে
তক্ষুণি তৈরি করে দিতে হয়েছে মুক্তা রঙের,সুন্দর এক একটি ক্যানভাস
আবার ক্যানভাসটা ধরে রাখার জন্যএক একটি মজবুত সোনালি ফ্রেম
পরে দেখা গেল, অনুভূতিগুলি সীমা না মেনে ক্যানভাস অতিক্রম করে
এসে আমার বুকের কাছটিতে ধাক্কা দিচ্ছে,
যেন সাগরের নীল জ্যোৎস্নার ঢেউ
আবার ক্যানভাসটা বন্দীত্বের গ্লানি বুক পেতে না নিয়ে,
ফ্রেমের সোনালি বাউন্ডারি
পার হয়ে
ঘোষণা করেছে দীপ্ত কণ্ঠে নিজের স্বাধীনতা
আর কী জান, ফ্রেমও টেনে হিঁচড়ে ছিড়তে চাইছে
ক্যানভাসের সঙ্গে থাকা কৃত্রিম প্রেমের অদৃশ্য শিকলটা
এই যে শব্দ, অনুভূতি, ক্যানভাস, সোনালি রঙের ফ্রেম,
প্রত্যেকেই কী অকুতোভয়!
দেখ, ওরা স্বাধীনতার খোঁজে কীভাবে বিদ্রোহ করছে
ফ্রেম এবং ক্যানভাসের ভেতরে-বাইরে
হ্যাঁ,স্বাধীনতার দু’পার উপচে পড়া রোদের খোঁজে যেভাবে
প্রতিজন যোদ্ধা মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে,বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধভূমির
অন্ধকারে
ঠিক সেভাবেই,মানুষ আর প্রিয় কবিতার স্বাধীনতার দাবিতে,কবি আজ দুঃসাহসী
যোদ্ধা বুকের রক্তাক্ত যুদ্ধ ভূমিতে
কবিতা আগুন-ইস্পাতের শিল্পায়ন
ক্ষুধার মতোই আদিম আমার কবিতার ইতিহাস
স্বঘোষিত ঈশ্বরদের ক্রুরতার বিরুদ্ধে
খুবই তেজস্ক্রিয়
আমার বুকের শব্দ-পরমাণু
খুবই পারমাণবিক আমার হৃদয়াবেগ
কল্পনা আমার প্রতিক্রিয়াশীল কবির হাতের বিলাসের
রক্তহীন নিছক শিল্প নয়
কবিতা আমার দুঃসময়ের অশ্রুর ফুল
অভিজ্ঞতার নিয়ারিতে ঘামের হাতুড়িতে গড়া
আগুন-ইস্পাতের শিল্পায়ন
প্রয়োজনে তা শিসের বুলেটের চেয়েও কঠিন, শক্তিশালী
মিসাইলের মতোই অগ্নিময়
ভয়াল
আমি কবি আগুনে পোড়া
সময়ের
আমার কবিতার লাল হৃদপিণ্ডের
গুমণ্ডমনির তালে তালে
বহু জনতার তুফান-হাত ছিনিয়ে আনবে
প্রভাতের রোদ-স্বপ্নময় বসস্ত উদ্ভাস
শস্য-উৎসবের দিন
টীকা
নিয়ারি- ধাতু পিটিয়ে তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত লোহার সরঞ্জাম।
কবির সমাধি ফলক
আজও বন্দি আমি জানালা বিহীন ব্যাংকের
আবদ্ধ ঘরে
রোদের কোনো অক্ষর নেই এখানে
কেবল ‘কোর ব্যাঙ্কিং’, গ্লোবালাইজেশন
আর লাভালাভের কোটি টাকার অংক ঢেকে রেখেছে
আমার সভ্যতার চোখের পাতা
বহুজাতিক কম্পিউটার ফ্যাক্স-ইন্টারনেটের ছন্দহীন
প্রেত-ছায়া স্বরলিপি, মোবাইল এবং দামী জুতোর
কৃত্রিম কোলাহল কেড়ে নিয়েছে আমার লাল
হৃদপিন্ডের সবুজ শ্বাস
আজ সবই হারিয়েছি,স্বপ্ন পাখির শিস নারীর প্রেম
হারিয়েছি কলম এবং হৃদয়ের যুদ্ধভূমি
আলোড়িত সূর্য এবং শস্যোজ্জ্বল কবিতার পথ
হরিণার মাংস বৈরী হওয়ার মতো
হাতের ঘড়িটাই আজ কাল হল আমার, যে
সাত শত্রুর মতো গোপনে নিরীক্ষণ করে আমার
প্রতিটি মুহূর্তের বোবা অস্থিরতা আমার মৃত্যু এবং আর্তনাদ
কখনও কখনও ভাবি,
পৃথিবীটা অভাবিতভাবে সংকীর্ণ, যেন
এস বি আইর স্ট্রং রুম, যেখানে ক্ষুদ্র একটা অক্সিজেন
সিলিন্ডার নিয়ে অসহায় আমি ছটফট করছি সারারাত
অসম্ভব একটি স্বপ্নের দরজা মুখে
কংক্রিট ভেঙ্গে অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে
চলে আসবি নাকি সাতটি তারা সাতটি পাগলা ঘোড়া
তারই উজ্জল চোখের কালো ঘোড়াটি
দৌড়ে চলে যাব আমি দূর-দূরান্তের সেই সবুজ ঘাসে
অথবা নিষিদ্ধ বনগোলাপের অবিন্যস্ত কোনো গহন অরণ্যে
আর যদি তা সম্ভব না হয়
কাল আমার অনিবার্য মৃত্যু হবে
পাখিগুলি গুনগুন করে সকালের গান আরম্ভ করার আগে আগে
উডহাউসের গল্প পড়ে ভালোলাগা আমার
উদাসী বন্ধুটি সেদিন সন্ধ্যার আড্ডায় বিষণ্ণ স্বরে বলেছিল
আমার সমাধি-ফলকে নাকি কালো অক্ষরে লেখা
থাকবে,-
‘তিনি ছিলেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে
ভাগ্যবান অথচ করুণার পাত্র
টাকার চেয়েও বসন্তের মতোই স্বাধীন,উজ্জল
শব্দগুলির গন্ধটা
তিনি অনেক বেশি ভালোবাসতেন।’
কবিতার সঙ্গে চিরকাল
কবিতা চোখের জলের নুন নয়
আমার কপালের ঝরেপড়া ঘাম, কাদা গন্ধমাখা আঙ্গুলের
একটা সোনালি ধানের মাঠ
শব্দের চেয়েও সুন্দর ভোরের ঘাসের অমূল্য শিশির
দুফোঁটা
কবিতা জানে,-লাল রক্তের উষ্ণতায় কীভাবে ধারণ করতে হয়
ভাষার কালিকা সংস্কৃতির জ্যোৎস্নাছায়া, ঐতিহ্যের শিকড়…
কবিতা আমার নিঃশ্বাসের অভিমান
কবিতা আমার চির হিল্লোলিত স্বাভিমান
কবিতা থাকলে বুকের ভেতরে-বাইরে
আমার মনে হয় দশটি মাটির প্রদীপ তিরবির করে জ্বলছে
মা আলগোছে লাগিয়ে যাওয়া ঘরের বারান্দায়
তুলসী-তলায়