বি শে ষ র চ না
সম্পর্ক মণ্ডল
দুই বাংলার চড়ক সংক্রান্তির আচার ও নববর্ষ
এমনিতেই চৈত্রমাস হল রুক্ষ মাস, এই সময় মানুষের বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। আগেকার দিনে সাধারণ মানুষ বাড়ির উঠোনে বসে পাটের দড়ি পাকাত অথবা মুখে লোকগান গাইত। রাঢ়দেশের মানুষ এই সময় পালা বোলান বা পরী বোলানের মহড়া করত গাজনের জন্য, কিন্তু পূর্ববঙ্গের চৈত্র মাসের নিয়ম কানুন ছিল কিছুটা আলাদা। রাঢ়বঙ্গের গাজনে চড়ক সংক্রান্তি মানে বিকেলে সারা গ্রামে শিবদোলা প্রদক্ষিণ করে, মেলা বসে এবং সারা বাংলাতেই চড়ক সংক্রান্তির বিকেলে সঙ বের হয়।
জমিদার, ধনীদের ব্যঙ্গ করে অথবা সাধারণ সমাজ জীবনের ধারণাকে সঙের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করাটাই হল সঙ শিল্পীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বছরের শেষ দিনটিকে পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের মা-কাকিমারা পালন করত ছাতুব্রত হিসাবে। উত্তর রাঢ়বঙ্গেও আমরা ছেলেবেলায় সকালে স্নান করে ছাতু-গুড় দিয়ে মুড়ি খেতাম। দুপুরে সন্ন্যাসীদের ভেঙে আনা নিমের পাতা নিয়ে বাড়িতে হত ভাতের সঙ্গে আম-ডাল, লাল শাক, বেগুন-নিমপাতা ভাজা, ইঁচড়ের তরকারি, তেঁতুল দিয়ে গুড়-অম্বল, বেগুন-পটল-ঢ্যাঁড়শ ভাজা এবং পায়েস। মনে করা হয়, মরসুমি শাকসবজির মাধ্যমে ইমিউনিটি বুস্ট করার জন্য এসব খাবার প্রথা শুরু হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে ইঁচড়ের তরকারি সঙ্গে নিমপাতা ভাজা, আম-ডাল, ডাটা, পায়েস থাকলেও শাক হিসাবে তারা গিমিশাককে বেশি প্রাধান্য দিত। পূর্ববঙ্গের এদিন বোন-দিদিরা ভাইদের সামনে ছাতু উড়িয়ে ভাইদের শত্রুদের বিনাশের প্রার্থনা করত, এ প্রথা আজও টিকে আছে ‘ভাইছাতু’ প্রথা নামে।
এছাড়াও বছরের শেষ দিনে ঘরে ঘরে পালিত হত ‘ধর্ম্মঘট ব্রত’। আজও নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে টিকে আছে সে প্রথা। ধম্ম মানে বুদ্ধদেবকে কেন্দ্র করে যে প্রথা শুরু হয়েছিল, সেই প্রথা আজ বিষ্ণু হিসাবে ধর্ম্মঘট পূজিত হয় সিংহাসনে। এই বাংলার গাজনে চড়কের গুরুত্ব কম কিন্তু পূর্ববঙ্গে গাজনের চেয়ে চড়কের গুরুত্ব বেশি। পূর্ববঙ্গে বৌদ্ধদের আধিক্য বেশি থাকার কারণেই চড়কের প্রভাব বেশি।
জানা যায়, বৌদ্ধধর্মের প্রভাব যখন ম্লান হয়ে যায়, তখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন, বিশেষত পূর্ববঙ্গে ও উত্তরবঙ্গে। তেমনই কয়েক জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আশ্রয় নিয়েছিলেন এই বাংলায় এবং পরে তাঁরা হিন্দুত্ব গ্রহণ করেন। ফলে হিন্দু ধর্মে মিশে যায় কিছু বৌদ্ধ তন্ত্রমন্ত্রের সাধন। এই তান্ত্রিক ক্রিয়া থেকেই পরবর্তী কালে উদ্ভব চড়ক পূজার। চড়ক পূজায় যোগদানকারী সন্ন্যাসীরা তান্ত্রিক সাধনা অভ্যাসের ফলে নিজেদের শারীরিক কষ্টবোধের ঊর্ধ্বে যান, তার ফলে চড়কের মেলায় নানা রকম শারীরিক কষ্ট স্বীকারে তারাই অগ্রণী হয়ে ওঠেন। পরে এই বৌদ্ধ সাধনপদ্ধতিগুলি শিবের গাজনে যোগ হয়ে যায়।
জমিদাররা প্রজাদের খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন স্থির করেছিলেন ৩০ চৈত্র। মরা মাসে এমনিতেই মানুষের হাতে টাকা পয়সা কম থাকত। তার উপর ফি বছর খরা, বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়। খাজনা দেওয়ার জ্বালায় বহু প্রান্তিক চাষি বাধ্য হত আত্মহত্যা করতেও। এটা ছিল জমিদার-মহাজন ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত ফাঁদ, যেখানে প্রতিটি মানুষ পা দিতে বাধ্য হত। অভাবের তাড়নায় হোক বা নিত্যপ্রয়োজনে দায়ে পড়ে এই তিন শ্রেণীর কাছে তারা যেত এবং সর্বস্ব খুইয়ে ঘরে ফিরত। প্রয়োজনে মহাজনরা পাইক পাঠিয়ে আদায় করতেন তাঁদের সমস্ত সুদ-আসল।
লেখক আখতার উল আলম পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে পেয়েছিলেন এই নিষ্ঠুরতার বর্ণনাগুলো। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বরিশালের জমিদাররা তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যদিও চড়ক সংক্রান্তিতে বড়শি ফোঁড়া বা বাণ ফোঁড়া ছিল প্রথমে অপেক্ষাকৃত নীচ সম্প্রদায়ের প্রথা। ব্রাহ্মণরা অংশগ্রহণ করতেন না। কিন্তু খাজনা আদায় করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাশ হওয়ার জমিদাররা এই প্রথার বাজেভাবে ব্যবহার করতে থাকেন। ১৮০০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় এটা চলেছিল। এর মধ্যে ১৮৬৫ সালে ইংরেজরা এই প্রথা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল এর নিষ্ঠুরতা দেখে (বাণ ফোঁড়া, বড়শি ফোঁড়া ইত্যাদি)।
যদিও বাংলাতে এই প্রথা শুরু হয়েছিল ১৪৮৫ সালে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের আমলে। তখন তাঁদের রাজপরিবারেই এই প্রথা পালন করা হত। পরে তা ছড়িয়ে যায় পূর্ববঙ্গের সমস্ত প্রদেশে।
কয়েকজন জমিদার ছিলেন আরও এগিয়ে। তাঁরা আবার প্রজাদের জমিদার বাড়িতে আকৃষ্ট করার জন্য জমিদার বাড়ির চত্বরে কবিগান, লাঠিখেলা এবং হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করতেন। কারণ এই সময় সমস্ত প্রজাদের আসতেই হত এখানে খাজনা দেওয়ার জন্য। জমিদারবাড়ি থেকেই আগেই ঘোষণা করা হত যে, সাল তামামির খাজনা সবটা শোধ করলে আলাদা করে কোনো সুদ লাগবে না। তাই দলে দলে মানুষ সেখানে উপস্থিত হত এবং এই সুযোগে জমিদাররা বছরে একবারই মাত্র তাঁদের মুখমণ্ডলটি নিয়ে প্রজাদের সামনে সগৌরবে দর্শন দিতেন।
আর যারা খাজনা দিতে পারত না? তাঁদের কী হত? ফসল খারাপ হলে তাদের মাফ করে দেওয়া হত? সে ইতিহাস পাওয়া যায় না। পূর্ববঙ্গের জমিদাররা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের নিয়ে লেঠেল দল তৈরি করেন। সেই দলের ভয়ে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। সেই লেঠেল দল গোটা জমিদারি এলাকায় প্রজাদের শাসিয়ে বেড়াত। পাশাপাশি, প্রায়ই ৩০ চৈত্রের মধ্যে পুরো খাজনা জমা দিতে বাধ্য করত।
আসলে, এই কবিগানের আয়োজন বা লাঠিখেলা সবই ছিল প্রজাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্মোহনের জন্য বিনোদন। সাতদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজনের উদ্দেশ্যই ছিল খাজনা আদায়ের একটি কৌশল। এর সঙ্গে যোগ করা হয় ধর্মীয় আবরণকে। পূর্ববঙ্গে যিনি লোকপাল (শিব) নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁকেই এই অনুষ্ঠানের প্রধান দেবতা হিসাবে পূজা করা শুরু হয়। এর আরেকটি কারণ ছিল কৃষিদেবতা হিসাবে লোকপালের লৌকিক খ্যাতি অথচ পশ্চিমবঙ্গের মূল শিবের গাজনের সঙ্গে তার কোনো মিলই ছিল না। তাই লাঠিখেলা, কবিগান থেকে ঢাকের বাজনা বাজতে শুরু করলেই প্রজাদের কাছে দুটি রাস্তা খোলা থাকত। হয় মহাজনের কাছে গিয়ে ঘটিবাটি বন্ধক দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা, না হয় পাইক-লেঠেলদের হাতে বন্দি হয়ে মোটা বড়শির সূচালো ফলায় গিয়ে ঝুলে পড়া। এবং চড়কের বিকালে রক্তাক্ত পিঠে চিৎকার করতে করতে জমিদার আর সাধারণ মানুষদের বিনোদন দেওয়া।
আবার এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ ভয়ে সিঁটিয়েও যেত। তাদের পরোক্ষভাবে এটাই বোঝানো হত যে, খাজনা দেওয়া বাকি থাকলে তাদের অবস্থাও এরকম হতে পারে। এতে খুশি হয়ে জমিদারমশাইরা পাঁঠাবলি দিতেন, মেলার আয়োজন করতেন, আড়ং বসাতেন। সমগ্র অংশে জমিদারদের গলায় গলা মিলিয়ে সাহায্য করতেন সাহাশুঁড়ি, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা।
চড়ক পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ, কৃষক শ্রেণী কেউই বৈশাখী নববর্ষের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। কারণ, ৩০ চৈত্রের ভয় তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। বরং বৈশাখী নববর্ষকে তৎকালীন সময়ে অনেকেই ব্যঙ্গের চোখে দেখতেন। পণ্ডিত যোগশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধি তাঁর ‘পূজা-পার্বণ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘কয়েক বৎসর হইতে পূর্ববঙ্গে ও কলিকাতায় কেহ কেহ পয়লা বৈশাখে নববর্ষোৎসবের করিতেছে। তাহারা ভুলিতেছে বিজয়া দশমীই আমাদের নববর্ষারম্ভ। বৎসরে দুটি নববর্ষোৎসব হইতে পারে না। পয়লা বৈশাখে বণিকরা নূতন খাতা করে৷ তাহারা ক্রেতাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া ধার আদায় করে৷ ইহার সহিত সমাজের কোনো সম্পর্ক নাই৷ নববর্ষে প্রবেশের নববস্ত্র পরিধানদির একটা লক্ষণও নাই।’ যোগেশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধির মতে, বিজয়া দশমীই আমাদের আসল নববর্ষ। আবার অনেকের মতে, অঘ্রাণ মাসই নববর্ষের মাস। কিন্তু কোনোভাবেই বৈশাখী নববর্ষ আমাদের আদি নববর্ষের সূচনালগ্ন ছিল না।