গ ল্প
পৃথা গাঙ্গুলি
‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে’
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েই মিলি দেখল, আকাশের কোণে জড়ো হয়েছে কালো ছায়ার দল— বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঘমল্লার। যেন দমকা আগমনের মহড়ার সাজ। ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি খেলে গেল মিলির। চট করে মোবাইল হাতে নিয়ে ছোট্ট একটা টেক্সট করল রাহুলকে— ‘প্রিন্সেপঘাট যাচ্ছি।’
কিন্তু রাহুলের অফিস ছুটি হতে তো এখনো ঘন্টা তিনেক। কী করা যায় এই সময়টা? সামনেই একটা পার্ক আছে। এই পার্কের সামনে দিয়েই লাইব্রেরিতে যেতে হয়। সেখানেই ঢুকে পড়ে মিলি। দশ টাকার ঝালমুড়ি কিনে নিয়ে একটা বেঞ্চে বসে পড়ে। প্রিয় লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘দমকা হাওয়া’ বইটা বের করে ব্যাগ থেকে। আজই তুলেছে লাইব্রেরি থেকে। দু’ঘণ্টায় অনেকটা পড়া হয়ে যাবে। সময়টাও কেটে যাবে অনায়াসে।
হ্যাঁ ছোটো থেকেই বই পড়তে খুব ভালোবাসে মিলি। সুযোগ পেলেই যেখানে সেখানে বই খুলে বসা মিলির একটা অভ্যাস। কিন্তু কিছুতেই আজ মন লাগছে না। বেশ হাওয়া দিচ্ছে আজ। এই হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যাবে না তো মেঘমল্লারকে? কে জানে— এই বছর এখনও একটাও কালবৈশাখীর দেখা মেলেনি। উফ, মানুষের সাথে সাথে প্রকৃতিও কেমন বদলে যাচ্ছে! যাচ্ছেতাই সব…!
দমকা হাওয়ায় শাড়ির আঁচলটা মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে। বেশ লাগছে মিলির। বেশ মিষ্টি একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ছে মনের গোপনে। রাহুলকে খুব ইচ্ছে করছে কাছে পেতে। আদুরে আবেগগুলো গুটিসুটি মেরে আরও কাছে চলে আসছে। নিজেক শাসন করে মিলি। মাতাল হাওয়ায় যেন নেশা লেগে যাচ্ছে তার। মনের পাখিটাও ভীষণভাবে ছটফট করতে শুরু করেছে, চাইছে এক্ষুনি উড়ে যেতে, কোনো এক অচিনপুরের ভাঙা বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায়… ওহ্, কতদিন যাওয়া হয়নি। রাহুলকে বলতে হবে একটা ছুটির দিন দেখে সেখান থেকে একবার ঘুরে আসার কথা।
‘দিদি, পাস দ্য বল…’
ভাবনায় ছেদ পড়তেই হকচকিয়ে উঠল মিলি। দেখল পায়ের কাছে একটা বল পড়ে আছে। কিছুটা দূরে ব্লু প্যান্ট আর ইয়েলো টি-শার্ট পরা বছর চোদ্দোর একটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বলছে বলটা দিতে। নীচু হয়ে বলটা হাতে তুলে নিতে নিতে কী যেন একটা ভাবতে থাকল মিলি। একটা চেনা কিছুকে খোঁজার চেষ্টা করছে সে যেন!
ছেলেটা এগিয়ে এসে, মিলির হাত থেকে বলটা নিয়ে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে চলে গেল। কিন্তু সেদিকে আর মন নেই মিলির। মিলির মন পড়ে আছে ছেলেটার পরনের কস্টিউমের দিকে— ব্লু প্যান্ট আর ইয়েলো টি-শার্ট। বড্ড চেনা…!
হ্যাঁ, রাহুলও ঠিক এই ধরনের একটা পোশাক পরেই নামত খেলার মাঠে, বিকেলের শেষে, গোধূলিবেলায়। মিলি তখন একটু বড়ো, সদ্য ডে সেকশনে উঠেছে। মফস্বল শহর। স্কুল ফিরতি সে টিউশনে যেত যদুমাস্টারের বাড়ি। তার যাওয়ার সময় যেন ইচ্ছে করেই বলটা মাঠের বাইরে পাঠাত রাহুল। আর মিলি বলটা টুক করে তুলে পাস দিত। খাওয়া ঘুমের মতো এটিও ওদের একরকমের অভ্যাস হয়ে উঠেছিল। তারপর একসঙ্গে স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে তারা দু’জনেই ঠাঁই নিয়েছিল এই শহরটায়। দু’জনেই মোটামুটি একটা ভদ্রস্থ চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল।
মিলির আজ অফ ডে। না, বই পড়তে আজ আর ভালো লাগছে না। মোবাইলটা দেখল মিলি। হোয়াটসঅ্যাপে রাহুলকে করা ম্যাসেজটার কোনো রিপ্লাই নেই। রাহুল না যাক, আজ সে একাই যাবে প্রিন্সেপঘাটে। মোবাইল খুলে, উবের বুক করে প্রিন্সেপঘাটের লোকেশন দিয়ে দিল মিলি।
২
প্রিন্সেপঘাটের পরিবেশটাই আজ আলাদা। না, হাওয়ার দাপট উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেনি মেঘমল্লারকে। বরং অভিমানী মেঘ আরও গাঢ় হয়েছে গঙ্গার উপর। প্রচন্ড হাওয়ার তালে খেই হারিয়েছে গাছেরা। মিলির সারা গায়ে-মুখে উড়ে এল কত ঝরাপাতা। ক্ষয়ে যাওয়া শুকনো পাতাগুলো ছিন্নপত্রের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। অদ্ভুত এক ভালোলাগার আবেশ জড়িয়ে ধরল মিলিকে।
ঝোড়ো আবহাওয়ার জন্যই চারপাশটা আজ বোধহয় এত ফাঁকা। তাও বৃষ্টিবিলাসী কিছু কপোত-কপোতী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদিক ওদিক। একদম ফাঁকা একটা জায়গা দেখে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসে পড়ল সে। মেঘের ঘনঘটায় আলো কমে এলেও এখনও পুরো নিভে যায়নি। দূরের নৌকাগুলো দেখা যাচ্ছে। মাঝিমল্লারদের গান ভেসে আসছে। কি মিষ্টি সেই সুর। ভারি অবাক লাগে মিলির। পোড় খাওয়া কঠিন জীবনেও কত সুর থেকে যায়। গুনগন করে সুরটা গাওয়ার সাথে সাথেই হিমেল বাতাস এসে লাগল মিলির মুখে।
টুপটাপ বৃষ্টি কানে কানে বলে দিয়ে গেল আমি এসে গেছি। আধ খাওয়া চায়ের কাপটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শিশুর মতো দু’হাত দিয়ে আলিঙ্গন করল সে বৃষ্টিকে। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ভিজতে থাকল। সিক্ত হতে থাকল অন্তরে-বাহিরে। ক’দিন ধরেই তীব্র দহনে দগ্ধ হচ্ছিল সে। মেয়েরা ভালোবাসা বুঝতে যেমন সময় নেয়, আবার অবহেলাটা তারা যেন কিন্তু খুব সহজেই ধরে ফেলে। আর হ্যাঁ, একবার কাউকে তারা ভালবাসলে নিজেকে উজাড় করে দেয়।
পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট— ঠিক কতক্ষণ এভাবে একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে মিলির খেয়াল নেই। হঠাৎই পিছন থেকে ভেসে আসা একটা কণ্ঠস্বরে ঘোর কেটে যায় মিলির।
‘নে, তোয়ালেটা নে, মাথাটা মুছে নে এবার, ঠান্ডা লেগে যাবে তো… কী হয়েছে তোর? সেই কখন থেকে পেছন পেছন আসছি, কোনো দিকে খেয়ালই নেই! ফোনটাও সাইলেন্ট করে রেখেছিস… দেখ কতগুলো ফোন আর মেসেজ করেছি।’
‘আরে থাম, কোথায় যাচ্ছিস আবার? বৃষ্টি বাড়ছে তো…’
এবার চকিতে পেছন ঘুরে তাকায় মিলি। রাহুল? কোথায় রাহুল!! অন্য একটি ছেলে তার প্রেমিকাকে ডাকতে ডাকতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। একটু দূরে মেয়েটিকেও চোখে পড়ে। ছেলেটি দৌড়োতে দৌড়োতে এসে মেয়েটির মাথায় ছাতা ধরে। হুঁশ ফেরে মিলির। একরাশ অভিমানে চোখে জল এসে যায়।
মোবাইলটা ব্যাগ থেকে বের করে সময় দেখে। অনেকটা রাত হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতেই হবে এবার। শান্ত করে নিজেকে। উবের বুক করে আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ায় বড়ো রাস্তায়। গাড়িতে উঠে বৃষ্টিভেজা কলকাতাকে দেখতে থাকে সে। গাড়িতে এফ এমে বাজতে থাকে অঞ্জন দত্তের গান—
‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে
থাকবে না সাথে কোনও ছাতা,
শুধু দেখা হয়ে যাবে মাঝ রাস্তায়
ভিজে যাবে চটি, জামা, মাথা,
থাকবে না রাস্তায় গাড়িঘোড়া
দোকানপাট সব বন্ধ,
শুধু তোমার আমার হৃদয়ে
ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ’…
৩
প্রতি বছরই আজকের এই দিনটায় প্রিন্সেপ ঘাটে আসে মিলি। তার আর রাহুলের কাটানো ভীষণ আপন মুহূর্তগুলো যে এখানেই রয়ে গেছে! কোভিডে রাহুল চলে যাবার পরেও রাহুলের নাম্বারে নিয়মিত মেসেজ করে মিলি। নিজের মতো গল্প করে রাহুলের সঙ্গে। প্রতি মুহূর্তে সে অনুভব করে তাকে।