সি নে  দু নি য়া

অভিষেক ঘোষ

abhishek_ghosh

মনি কাউলের 'আষাঢ় কা এক দিন': ফিরে দেখা

হিন্দি সাহিত্যে ‘নয়ি কহানি’ সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন, মোহন রাকেশ (১৯২৫ – ১৯৭২)। বলা হয়ে থাকে, প্রথম আধুনিক হিন্দি নাটক তাঁরই লেখা। ১৯৫৮ সালে ‘সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার’ জিতে নিয়েছিল তাঁর ‘আষাঢ় কা এক দিন’ নাটকটি। বহুবার মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি, সমান্তরাল চলচ্চিত্রে ভারতের খ্যাতিমান পরিচালক মনি কাউলের হাতে নাটকটি চলচ্চিত্ররূপ পায়। ১৯৬৯ সালে ‘উসকি রোটি’-র হাত ধরে প্রথম সাফল্যের পর পরিচালক মনি ততদিনে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। ঘটনাচক্রে চলচ্চিত্রে ভারতীয় নবতরঙ্গে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা ‘উসকি রোটি’-ও ছিল সাহিত্যিক মোহন রাকেশেরই একটি ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত। ১৯৭১ সালে মনি-র দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম হিসেবে নির্মিত হয় ‘আষাঢ় কা এক দিন’ (ইংরেজি-তে : ‘One Day Before the Rainy Season’)।

গল্পটা এরকম– এক পার্বত্য উপত্যকায় কোনো এক ক্ষুদ্র পল্লির একটি কুটিরে যুবতী মল্লিকা (অভিনয়ে রেখা সাবনিস) থাকে, তার মা অম্বিকার সাথে। ‘ঋতুসংহার’-এর স্রষ্টা, কবি কালিদাস (অভিনয়ে অরুণ খোপকার) সেই পল্লিতেই নিজের কাব্য-সাধনায় মগ্ন। কিন্তু কালিদাস তখন আঞ্চলিক কবি, তাঁর সামনে সুযোগ আসে রাজ-আনুকুল্য উজ্জয়িনী নগরে সভাকবি হিসেবে যোগদান করার। কিন্তু তাহলে যে এই অপরূপ হিমালয়, এই প্রসন্ন প্রকৃতির সান্নিধ্য, নিজের কাব্যপ্রেরণা তথা কবি-মানসী মল্লিকা-কে ছেড়ে যেতে হবে! তবু যেতে হয়। কালিদাস লব্ধপ্রতিষ্ঠ হলেন, কিন্তু মল্লিকা? তার কী হবে? সে কি বাধ্য হয়ে গ্রহণ করবে অসহনীয় বিলোম (অভিনয়ে ওম শিবপুরী)-কেই? মল্লিকার সেই মর্মভেদী দৃষ্টির সামনে যখন এসে উপস্থিত হবে কালিদাসের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী প্রিয়াঙ্গুমঞ্জরি, তখন কেমন অভিঘাত তৈরি হবে মল্লিকার মধ্যে? বিলোমের সন্তানের মা হিসেবে মল্লিকা-কে যখন দেখবে কালিদাস, আর বিপরীত ভাবনায় দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর যখন কালিদাস-কে দেখবে মল্লিকা, তখন উভয়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে? এই হল সিনেমার দ্বন্দ্বমুখর কাহিনি। কে. কে. মহাজনের স্ট্যাটিক ক্যামেরায়, অনুচ্চ স্বরে সংলাপ বিনিময় ও স্থির, শান্ত অভিব্যক্তি-বিনিময়ে এরই চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছেন সন্তসুলভ মনি কাউল। যেভাবে আষাঢ়ের কৃষ্ণ মেঘ তার বিরাট কলেবরে সচল ছায়াবিস্তার করে সবুজ বনানীতে, সেভাবেই চরিত্রগুলির দৃষ্টিপাতে কীভাবে উত্তাপ-বিনিময় হতে পারে তাই যেন মনি-র ক্যামেরা বুঝে নিতে চেয়েছে। এমনকী সঙ্গীতায়োজনেরও প্রয়োজন হয় নি তেমন, নামমাত্র মৃদঙ্গ ছাড়া। ব্রেঁস (Robert Bresson)-র দর্শনের এমন সাফল্যমন্ডিত প্রয়োগ, সংলাপের সহজ অনাড়ম্বর এমন প্রকাশ, দেখতে ও শুনতে পাওয়া, এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। শিশুর অঙ্গ-সঞ্চালনে ছবির শুরু, আর শেষে শিশুর ক্রন্দন ছাপিয়ে শোনা যায় মল্লিকার আহ্বান ‘কালিদাস’!

‘মেঘদূত’ কাব্যে মহাকবি কালিদাস লিখেছিলেন, “আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুং…”! আষাঢ় মাসের প্রথম দিনটিতে, বিরহকাতর যক্ষ মেঘকে দূত করে কৈলাসে পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়ার কাছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মেঘদূত’ কবিতায় অনবদ্য ভাষায় কালিদাসের সেই সৃষ্টি স্মরণ করেছিলেন,

‘কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে

কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে

লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক

বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে

সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত করে।

সেদিন সে উজ্জয়িনী প্রাসাদশিখরে

কী না জানি ঘনঘটা, বিদ্যুৎ-উৎসব,

উদ্দামপবনবেগ, গুরুগুরু রব।…’

(‘মেঘদূত’ কবিতা: ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থ)।

প্রসঙ্গত পদ্য এল বটে, কিন্তু মনি কাউলের চলচ্চিত্রে নাটকের সংলাপের যাবতীয় অক্ষরমালা এক্কেবারে অভাবিতরূপে উঠে এসেছে। সে যেন এক অলৌকিক ঘটনা। ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না! এখানেই প্রশ্ন আসে, মনি কাউলের সিনেমা কি আর্ট হাউস সিনেমা? হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে। তাঁর ছবি কি নিষ্প্রাণ? নাহ্। কেবল প্রাণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা, ও তা অনুভব করার ধৈর্য্য থাকা চাই। ভারতীয় ছবি বলতে আমরা যা বুঝি বা, বলা ভালো ছোটো থেকে আমাদের যা বোঝানো হয়েছে, মনি কাউলের সিনেমা তার প্রতিটি ইঞ্চিকে প্রত্যাখ্যান করে। একটু ভিন্নতর অভিজ্ঞতা (যা হামেশাই মেলে), আর সম্পূর্ণ পৃথক একটা অভিজ্ঞতা (কদাচিৎ যার দেখা মেলে) – এ-দুটো ও যে পৃথক অনুভব হতে পারে, এই ছবি তার প্রমাণ। এর নাড়িতেই গোলমাল! এর রক্তেই ভিন্ন শ্বেত/লোহিত-কণিকা আছে যেন!

ধরা যাক ছবিরই একটি দৃশ্য: অভিসার সেরে, বৃষ্টি ভিজে, যুবতী মেয়ে মল্লিকা ঘরে ঢুকেছে। তার প্রতি পদক্ষেপে বিগতযৌবনা মা অম্বিকার স্বাভাবিক ক্ষোভ, বিরক্তি, এমনকি ঈর্ষাজাত শ্লেষ সাপের ফণার মতো উদ্যত হয়ে আছে। কিন্তু তারা উভয়েই যখন সংলাপ বলে, তাতে নামমাত্র অভিব্যক্তি, স্বরক্ষেপনে বিন্দুমাত্র ভাবোচ্ছ্বাস থাকে না। সংলাপে এই নির্বিকার, নিরাবেগ, নিস্পন্দতার শৈলী প্রথম প্রথম আশ্চর্য করে বৈকি। কিন্তু যত সময় যায়, ধৈর্যশীল দর্শক ততই অনুভব করে, এ এক পৃথক ভুবন। সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন কালিদাসের সময়টিকে সিনেমায় তুলে আনার ক্ষেত্রেও এ এক আশ্চর্য পন্থা। এই সিনেমায় কোনো কিছুই মন ভোলাতে তৎপর নয়। পার্বত্য হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অথবা, সেকালের নারী-পুরুষের সাজ-পোশাক (বিশেষত প্রিয়াঙ্গুমঞ্জরির সৌন্দর্যহীনতা, বেশভূষার বৈভবহীনতা এর প্রমাণ) অথবা সংলাপের নাটকীয় উত্থান-পতন,  সঙ্গীতায়োজনে উদ্দীপন বিভাব – কোনোটাই কোনোভাবে মন জিতে নেওয়ার বাড়তি চেষ্টা করে না। অর্থাৎ সত্য যা আছে, তোমার সামনেই আছে। সত্যই শিল্প, কারণ তাই শিব ও সুন্দর। এ জিনিস হাতের মোয়া নয় যে, আমি-আপনি চাইলেই ওরকম ক্রাফট্ তৈরি করতে পারব! এই ছবি তাই মন ভোলায় না, মন জয় করে।

তাও বলব, ছবিতে নাটকীয়তা আছে, প্রাথমিকভাবে তা চরিত্রগুলির আগু-পিছু বুঝতে না পারার কারণবশত এক অদ্ভুত রহস্যময়তা, ঘটনার অপ্রকাশিত গোপন চলনে তৈরি হওয়া বিস্ময় (যেমন মল্লিকার কবে, কীভাবে সন্তান হল, তা জানানোই হয় না!), আবার সেই সঙ্গে সঙ্গে পরস্পর বিপরীত নৈতিকতা-বিশিষ্ট চরিত্র-সমাবেশ – এই নাট্যলক্ষণগুলি এই চলচ্চিত্রে একধরণের আবেদন আনে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো নাট্যবৈশিষ্টযুক্ত হল এ ছবির সংলাপ। ভাবগাম্ভীর্যে, গভীরতায়, অমোঘ তাৎপর্যে, আবার ইঙ্গিতধর্মীতায় এই ছবির সংলাপ এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, ছবির শরীরে আয়োজনগত অলংকারহীনতার স্বাভাবিক অভাবটুকু তা অক্লেশে ঢেকে দেয়। এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ, যখন উজ্জয়িনী থেকে দুই রাজ-কর্মচারী আসে মল্লিকার জীর্ণ গৃহে এবং নিজেদের মধ্যে নির্বোধের মতো তর্কাতর্কি করে গৃহসজ্জা বিষয়ে, তখন তাদের বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা ছাড়াও, অভিনয়গত উপাদানের অভাব সত্ত্বেও, অসম্ভব সুন্দর ও স্বাদু হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এ যে কী জিনিস, তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।

ছবিতে কালিদাসের প্রর্ত্যাবর্তনের পর দার্শনিক উপলব্ধির ঘনঘটা কিছুটা হলেও সিনেমার এতক্ষণের সুস্থিতি কিছুটা নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় – এ হল ক্ষণিক দুর্বলতা। তখনই প্রথম পরিচালকের প্রয়োজন হয় ইনডোর শট্ ছেড়ে বাইরের আলোয় যাওয়ার, সেই সময়েই কেবলমাত্র ক্যামেরা মল্লিকার ঘরের বাইরে শট্ নেয়, আর এভাবেই ছবিতে ভারসাম্যও রক্ষিত হয়। বিস্ময়করভাবে এই ছবি মোহন রাকেশের মঞ্চনির্ভর হিন্দি নাটকটিকে অবলীলায় কালজয়ী সিনেম্যাটিক স্থাপত্যে পরিণত করে প্রায় – আর কীভাবে বোঝাবো, জানি না! বিলোম-এর চরিত্রে ওম শিবপুরী ছাড়া এই ছবিতে আর কেউই প্রায় কিছুমাত্র অভিনয় করেন নি, শুধু চাপা ও সংযত ‘বিহেভ’ করেছেন। অম্বিকার চরিত্রে যিনি অনবদ্য সংযত অভিনয় করেছেন, তাঁকেও ভারি ভালো লাগে। ড্রামাটিক চলচ্চিত্র, অথচ কারো অভিনয় ড্রামাটিক নয়, এ ভারি অদ্ভুত ঘটনা! ছবিতে অভিনয়ে বাড়াবাড়ির প্রয়োজন-ও হয় নি। বাতাস না বইলেও যে বাতাসে শ্বাস নেওয়া যায়, অন্তত কোনো অসুবিধা হয় না, বরং অকারণ বায়ুপ্রবাহে এরপর বিরক্তিই আসে, এই ছবি তার প্রমাণ। আপনাকে প্রণাম মনি কাউল।

ফিল্ম: আষাঢ় কা এক দিন (১৯৭১)

পরিচালক: মনি কাউল

ক্যামেরা: কে. কে. মহাজন

সঙ্গীত: জয়দেব ভার্মা

অভিনয়ে: রেখা সবনিস, ওম শিবপুরি, অরুণ বসন্ত খোপকার, অরুণা ইরানি প্রমুখ

ভাষা: হিন্দি

আরও পড়ুন...