প্র চ্ছ দ কা হি নি
কৌশিক ব্যানার্জী
প্রবাদপ্রতিম সুরকার অজয় দাসের ১২ তম প্রয়াণ বার্ষিকীতে আমাদের নিবেদন
'গুন গুন করে মন ভ্রমরা যে ওই...'
সংস্কৃতিমনস্ক জাতি হিসাবে বাঙালির খ্যাতি ভুবনজোড়া। সাহিত্য, শিল্প, নৃত্যকলা, সংগীত বাঙালির মনকে সমৃদ্ধ করেছে যুগ যুগ ধরে। শাস্ত্রীয় সংগীত ও বেসিক গানের পাশাপাশি বাংলা ছায়াছবির গানও বাঙালিকে আনন্দিত করছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। বাংলা ছায়াছবিতে সর্বপ্রথম গানের ব্যবহার হয় ১৯৩৫ সালে ‘ভাগ্যচক্র’ চলচ্চিত্রে। ক্রমশ চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে সংগীতের ব্যবহার একান্ত আবশ্যিক হয়ে ওঠে। ফলে ছায়াছবির উৎকর্ষ বিধানের জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীর পাশাপাশি গীতিকার-সুরকারদের গুরুত্বও ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
পরবর্তীকালে সেই ষাটের দশকে থেকেই বাংলা সিনেমা বা ছায়াছবির গানের অভিমুখ বদলাতে থাকে একঝাঁক তরুণের হাত ধরে। সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখের উদ্যোগে বাংলা গান কালোয়াতির প্যাঁচ-পয়জার থেকে বেরিয়ে হয়ে ওঠে মূলতঃ মেলোডি এবং কথা ভিত্তিক। তালের বৈচিত্র থাকলেও তা ছিল প্রচ্ছন্ন। ফলে গান শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শ্রোতাদের মনে দীর্ঘ সময় ধরে সুরের আবেশ থেকে যেত। সেই সময় সলিল, সুধীন, নচিকেতা, অভিজিৎ, অনল প্রমুখের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুরকার হিসেবে বাংলা গানের জগতে নিজের জায়গা করে নেওয়া খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু নিজস্ব মেলোডির উপর ভিত্তি করে এই দুরুহ কাজটাই অবলীলায় করেছিলেন যে সংগীত পরিচালক তাঁর নাম অজয় দাস। আজও একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে অজয় দাসই ছিলেন বাংলা মেলোডিয়াস গানের এক ‘মিসিং লিঙ্ক’। প্রধানতঃ অজয় দাসের হাত ধরেই আশির দশকে উত্তম পরবর্তী যুগে বিপন্ন বাংলা ছায়াছবির গান নতুন করে জেগে উঠেছিল।
অজয় দাস এবং তাঁর ভাই পরবর্তীকালে বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক সুখেন দাস জন্মেছিলেন এক ধনী পরিবারে, যাদের কলকাতার বুকে ছিল পাঁচ-পাঁচটি বাড়ি। ঠাকুরদা শ্রীনাথ দাসের নামে ছিল আস্ত একটা রাস্তা। কিন্তু অজয় দাসের বাবা ছিলেন আত্মভোলা প্রকৃতির মানুষ। এক ব্যবসায়িক পার্টনারের চক্রান্তে পুরো পরিবার নিয়ে তাকে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হয়। আর অজয় দাস এবং সুখেন দাসের আশ্রয় হয় এক অনাথ আশ্রমে। এই অনাথ আশ্রমে থাকাকালীনই অজয় দাস প্রতিজ্ঞা করেন যে বড়ো হয়ে সব অপমানের জবাব দেবেন। আর তিনি তা দিয়েও ছিলেন গানের মাধ্যমে।
ছোটো থেকেই সুরের অমোঘ টান অজয় দাসকে এক অদ্ভুত মাদকতয় ডুবিয়ে রাখত। একটু বড়ো হতেই শুরু হয় বিভিন্ন নাটকে সুরারোপ করা। এভাবেই আলাপ হয় জনৈক প্রযোজকের সঙ্গে। অজয়বাবুর সুর শুনে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যদি কোনোদিন তিনি পুনরায় চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করেন তাহলে অজয়বাবুকে সুরকার হিসাবে সুযোগ দেবেন। কিন্তু এরকম তো অনেকেই বলেন তাই বিশেষ আমল দেননি অজয়বাবু। হঠাৎ বেশ কয়েক বছর পর সেই প্রযোজক এসে হাজির হলেন সঙ্গে অনুরোধ কম পয়সায় কাজ করে দিতে হবে। কারণ বাজেট কম থাকায় ইচ্ছা থাকলেও কোনো নামী সুরকারকে তিনি নিতে পারছেন না। আর এই সুযোগের অপেক্ষাতেই যেন ছিলেন অজয় বাবু। সালটা ১৯৬৯ আর ছবিটি ছিল ‘পান্না হিরে চুনি’। এই ছবিতে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অজয় দাসের সুরে শ্যামল মিত্রর গাওয়া—
‘যেমন শ্রীরাধা কাঁদে শ্যামের অনুরাগী
তেমন করে কাঁদি আমি পথেরই লাগি।’
গানটি অনুরাগী মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, সবাই বুঝতে পারেন যে এমন একজন সুরকার এসে গেছেন যিনি বাংলা আধুনিক গানকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। বস্তুত এই গানের পরে অজয় দাসকেও আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর ১৯৭১ সালে রবি ঘোষ এবং চিন্ময় রায়ের পরিচালনায় ‘সাধু যুধিষ্ঠিরের কড়চা’ ছবিতে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অজয় দাস প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে গাওয়ান একটি ব্যালাড—
‘একদিন সেই রাজপুত্তুর অনেক অনেক দূরে
পক্ষীরাজে পাড়ি দিল হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে
মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে
পৌঁছে গেল রূপকথারই দেশে’
এই গানটি শুনলেই বুঝতে পারা যায় যে গানটি তৈরি হয়েছে চিরন্তন বাংলা গানের ঘরানা মেনে। কিন্তু সুরকারের স্বকীয়তাও এখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলা গানের ঘরানা অর্থাৎ কথা ভিত্তিক মেলোডি নির্ভর বাংলা গান যার রেশ গান শেষ হয়ে যাওয়ার বহুক্ষণ পর পর্যন্ত শ্রোতাদের মনে রয়ে যায়।
এরপর অজয় দাসের সুরের জাদু দেখা যায় ১৯৭৮ সালে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনী নিয়ে নির্মিত ‘চারমূর্তি’ ছবিতে। এই ছবিতে মোট চারটি গান আছে যার প্রত্যেকটি সুখশ্রাব্য। বিশেষভাবে উল্লেখ্য অংশুমান রায়ের গাওয়া— ‘ঘচাং ফু: খাব তোকে’ গানটি। ট্রাইবাল ডান্স ধরনের চিত্রায়নের সঙ্গে প্রিন্টার টনিক স্কেলের প্রয়োগ গানটিকে এক কথায় অনন্য করেছে। আর এই ছবিতেই শিবদস বন্দোপাধ্যায়ের লেখা এবং মান্নাদের গাওয়া—
‘ভারত আমার ভারত বর্ষ
স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো
তোমাকে আমার লাগিয়া জনম
ধন্য হয়েছি ধন্য গো’
গানটি তো দেশাত্মবোধক গান হিসেবে আজ প্রায় ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। যদিও প্রথমে এই গান তৈরির কথাই ছিল না। ছবিতে টেনিদার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিশিষ্ট অভিনেতা চিন্ময় রায়। কথা ছিল হারমোনিয়াম নিয়ে চিন্ময় রায় একটি প্যারোডি গান গাইবেন। তাই অজয়বাবু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বঙ্গে আমার জননী আমার’ গানের আদলে গানটির সুরারোপ করেন এবং ছবিতে ব্যবহৃত হয়। ছবি রিলিজের পর গানটি জনপ্রিয়তা তো পেয়েছেই, ক্রমে পেয়েছে অমরত্ব।
১৯৭১ সালে পীযূষ গাঙ্গুলীর পরিচালনায় ‘অর্চনা’ ছবির সংগীত তৈরির সময় একটি গান নিয়ে প্রযোজকের সঙ্গে অজয়বাবুর মতান্তর দেখা দিল। গানটি হল…
‘দূর আকাশে তোমার সুর খুঁজে পেলাম
এই বুকেতে আমি তা বেঁধে নিলাম
দুয়ারে এসে তোমারি আলোয় আমার
এ নয়ন মেলে দিলাম’
প্রযোজকের ইচ্ছা ছিল আরতি মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গানটি গাওয়ানোর কিন্তু অজয়বাবু অন্য ভাবনা ভেবেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল বনশ্রী সেনগুপ্তকে দিয়ে গানটি গাওয়ানোর। কিন্তু প্রযোজক রাজি নন। অজয়ববু তখন বললেন যে বনশ্রী সেনগুপ্তর কন্ঠে যদি গানটি হিট না হয় তাহলে গান তৈরির সমস্ত খরচ বহন করবেন তিনি নিজে। কিন্তু ফিল্ম রিলিজের পরে দেখা যায় গানটি সুপার ডুপার হিট এবং এই গানের মাধ্যমে বাংলা ছায়াছবির জগতে বনশ্রী সেনগুপ্ত নামে একজন গায়িকার আবির্ভাব ঘটল।
তারপর ১৯৭৯ সালের সুখেন দাসের পরিচালনায় রিলিজ করে ‘সুনয়নী’। এই ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন অজয়বাবু। উত্তম কুমার, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, কালি বন্দ্যোপাধ্যায়, শকুন্তলা বড়ুয়া অভিনয় করেন এই ছবিতে। এই ছবির গান তৈরির সময় সুখেনবাবু এবং অজয়বাবুর ইচ্ছা ছিল একজন নবাগতাকে দিয়ে নায়িকার লিপে গান গাওয়ানোর। কিন্তু যে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় প্রস্তাব যায় প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কিন্তু রেডিও রেকর্ডিং-এর জন্য আগে থেকে কথা দিয়ে দেওয়ায় প্রতিমা দেবীও রাজি হলেন না। অবশেষে দুই ভাই ঠিক করলেন আশা ভোঁসলেকে দিয়ে গান গাওয়াবেন। এক্ষেত্রে আশা ভোঁসলের কাছে তাদের পৌঁছোতে সহায়তা করেন সলিল চৌধুরী। বাধ্য ছাত্রীর মত আশা ভোঁসলে অজয়বাবুর সামনে বসে গান তুললেন এবং যথা সময় রেকর্ডিং হল সমীর ঘোষের লেখা এক কালজয়ী গান—
‘জানি না কেন যে আলো নেই
দু-চোখে কেন যে ভাষা নেই
আলোর জোয়ার কবে যে আবার
আসবে ভাসবে মনে কি?’
কিন্তু এত কিছুর পরেও একথা বললে অতুক্তি হবে না যে অজয় দাসের সঙ্গীত জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ১৯৮১ সাল। এই বছরেই মুক্তি পেল সুখেন দাস পরিচালিত ছবি ‘প্রতিশোধ’। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছবিটি সুপারহিট। কিন্তু তার থেকেও বেশি হিট অজয় দাসের সুরে কিশোর কুমারের গান। এর আগে কিশোর কুমার বাংলা ছবিতে গান গেয়েছেন হয় রাহুল দেব বর্মনের সুরে নয় তো বড় ব্যানারের ছবিতে, যেমন- আনন্দ আশ্রম, অমানুষ, অনুসন্ধান ইত্যাদি। শক্তি সামন্তর তুলনায় সুখেন দাস অথবা রাহুল দেব বর্মন বা শ্যামল মিত্রর তুলনায় সংগীত পরিচালক হিসেবে অজয় দাসের সে সময় সেরকম নাম-ডাক ছিল না। কিন্তু কীভাবে সেই অসাধ্য সাধন সম্ভব হল? উত্তর জানতে গেলে একটু পিছনে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রসঙ্গত রত্না চ্যাটার্জি ছিলেন ‘প্রতিশোধ’ ছবির প্রযোজক। ছবিটি তৈরির কিছুদিন আগে একদিন ছবির পরিচালক সুখেন দাসের বাড়িতে ছবিটি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন রত্না চ্যাটার্জি, গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সংগীত পরিচালক অজয় দাস। এই আলোচনা চলাকালীনই সুখেন দাস অজয়বাবুকে বলেন ‘ছোড়দা এবার কিন্তু কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়াতে হবে।’ কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? এক্ষেত্রে সুখেন দাসের প্রস্তাব মত কিশোর কুমারের আইডল কে এলো সায়গল সাহেবের গায়কী মনে রেখে একটি ক্যাসেটের দু-প্রান্তে দুটি গান রেকর্ড করেন অজয় দাস আর তা কিশোর কুমারের কাছে পৌঁছে দেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। গান দুটি শুনে অজয় বাবুকে ডেট দিয়ে দেন কিশোর কুমার। পুলকবাবুর কথায় প্রথম গানটি ছিল—
‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই
আমি যে ছিলাম এই গ্রামেতেই
এই মাটিতে জন্ম আমার
তাইতো ফিরে এলাম আবার
অনেক চেনা অনেক জানা
তোমাদের কাছেতেই।’
পুলকবাবুর কথায় দ্বিতীয় গানটি হল—
‘আজ মিলন তিথির পূর্ণিমা চাঁদ
মোছায় অন্ধকার
ওরে গান গেয়ে যা
যা সুর দিয়ে যা
অনেক দিনের হারানো সুখ
পেলাম যে এবার।’
মজার কথা এই গানটি গাওয়ার আগে কিশোর কুমার বারংবার ‘হারানো সুখ’-এর বদলে ‘হারানো গুড়’ বলছিলেন। কিন্তু জীবন্ত কিংবদন্তি কিশোর কুমারকে সে কথা বলবেন কে? এক্ষেত্রেও মুশকিল আসান হিসেবে হাজির হলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলকবাবু ভুলের ব্যাপারে কিশোর কুমারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিশোর কুমার বলে উঠলেন— ‘আসলে গানটি গাইতে গিয়ে উত্তম কুমারের “হারানো সুর”-এর কথা বারবার আমার মনে আসছে। উত্তমবাবুকে আমার প্রণাম জানান।’
অবশেষে ফাইনাল টেকের সময় কিশোর কুমার ‘হারানো সুখ’ উচ্চারণ করলেন। এই দুটি গানের পরে অজয় দাস কিশোর কুমারের মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নিলেন। এই জুটির জয়যাত্রা বজায় ছিল কিশোর কুমারের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।
‘প্রতিশোধ’ রিলিজ করবার ঠিক দু-বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৮৩ সালে সুখেন দাসের পরিচালনায় ‘জীবন মরণ’ ছবিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা এবং অজয় দাসের সুরে কিশোর কুমার আবার তিনটি গান রেকর্ড করেন। তিনটি গান তিন রকম স্বাদের। এবং তিনটি গানই পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনটি গানেই একটি বিষয় ছিল কমন তা হল মেলোডি। অসাধারণ সুখশ্রাব্য তিনটি গান শুনলেই বোঝা পরিষ্কার যায় যে এ সুর অন্য কোনো সুরকারের নয়, এসুর একদম অজয়বাবুর স্বাক্ষর যুক্ত অর্থাৎ সিগনেচার টিউন।
কিশোর কুমারের গাওয়া প্রথম গানটি ছিল—
‘ওপারে থাকবো আমি
তুমি রইবে এপারে
শুধু আমার দুচোখ ভরে
দেখবো তোমারে।
পড়বে যখন মালা আর চন্দন
ওই রাঙা জেলি আর ফুল রাখি বন্ধন
মিলন রাতের প্রদীপ হয়ে আমি
জ্বলবো বাসরে।’
এই গানটিকে কিশোরকুমার নিজস্ব গায়ন শৈলী দিয়ে যেভাবে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তার পাশাপাশি একথাও সত্য যে অজয় বাবুর তৈরি সুরে শ্রোতার হৃদয়ও সিক্ত হবে।
এই ছবিতে এই দ্বিতীয় গানটি ছিল—
‘আমার এ কন্ঠ ভরে
বাজে গো যে সুরবাহার
সবই যে তোমারি গান
যত সুর সবই তোমার
যত গান সবই তোমার।
নিজেকে লুকিয়ে রেখে
নয়নের আড়ালে থেকে
তুমি যে মৌণ মনে এনে দাও ক্ষণে ক্ষণে
ভাষা আর সুরেরি জোয়ার।’
এই গানে এক চিরন্তন প্রেমিকের আত্মনিবেদনের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার সঙ্গে গোপনে নিজের মিল খুঁজে পায়নি এমন বাঙালি বিরল।
এই ছবিরই তৃতীয় গানটি হল—
‘কি উপহার সাজিয়ে দেবো
গান আছে তাই শুনিয়ে যাব
অনন্ত আমারি গান
দুরন্ত আমারই প্রাণ
এইতো উপহার
এই আকাশের সূর্য তারা
ছড়ানো আমারি গান
এই বাতাসে যাওয়া আশায়
ছড়ানো অমারি গান
সুর আমার সবুজ শাখার
ফুলেরি বাহার
এইতো উপহার।’
এত মিষ্টি মধুর সুরে এমন উপহার একমাত্র অজয়বাবুর পক্ষেই বোধ হয় শ্রোতাদের দেওয়া সম্ভব। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সংযত উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে কিশোর কুমারও গানটিকে এক অসম্ভব উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
পুলক-অজয়-কিশোর— এই ত্রয়ের ম্যাজিক লক্ষ্য করা যায় ১৯৮৫ সালে নির্মিত ‘মিলন তিথি’ ছবিতে। এই ছবির পরিচালকও ছিলেন সুখেন দাস। সত্যি কথা বলতে কি এই সময় বাংলা ছবির প্রধান ইউ.এস.পি. ছিল মেলোডির রাজা অজয় দাসের সুরে করা কালো জয়ী সব গান। আর এই সব গান কিশোর কুমার নিজের গায়কী দিয়ে অমর করে রেখে গেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—
‘সুখেও কেঁদে ওঠে মন
এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়
জলে ভরে দুনয়ন।’
কিংবা
‘আর তো নয় বেশি দিন
মিলবো এবার দুজনে
এক মনে এক প্রাণে।’
‘মিলন তিথি’ ছবিতেই ক্রিসমাস ক্যারোলের ধাঁচে অজয় দাস আশা ভোঁসলেকে দিয়ে গাওয়ান—
‘চুপি চুপি কেন এলে?
এতদিন কোথায় ছিলে?
কোন কথা না বলে
চলো যাই দূরে চলে।’
এই গানটিও শ্রোতাদের কাছে ভীষণভাবে আদ্রিত হয়। আর ‘প্রতিশোধ’ ছবিতে অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর কণ্ঠে—
‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা
আর কি আমি চাই,
নাই বা পেলাম পান্না চুনি
দুঃখ আমার কিছু নাই।’
গানটি রিলিজের ৪৪ বছর পরেও, আজও ভাইফোঁটা উৎসবের সঙ্গে আপামর বাঙালির মনে সম্পৃক্ত হয়ে আছে।
এরপর ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অমরকন্টক’ ছবির গান রেকর্ড করতে পুনরায় এলেন কিশোর কুমার। এই ছবিতে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের কথায় সুরারোপ করলেন অজয়বাবু। রেকর্ডিং-এর দিন অত্যন্ত সিরিয়াস মুডে কিশোর কুমার রেকর্ড করলেন—
‘এই তো জীবন
হিংসা, বিবাদ , লোভ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ
চিতাতেই সব শেষ
কেন দিশারে চুমুক তবে বিষয়ের বিষে
সবই তো ধুলোয় যাবে মিশে
থাকবে না গায়ে তোর
ঝলমলে দামি এই বেশ।
চিতাতেই সব শেষ।
সাধের ওই দেহটাই
এক মুঠো সাদা ছাই হবে
সবই তো পিছে পড়ে রবে
ঢুকে যাবে সময়ের হিসেব-নিকেশ
চিতাতেই সব শেষ।’
গান রেকর্ডিং শেষ করে প্রাপ্য পারিশ্রমিক নিয়ে স্টুডিও ছাড়লেন কিশোর কুমার। এর ঠিক পরের দিন দুপুরে স্টুডিওতে গানের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট সংক্রান্ত কিছু কাজ করেছিলেন অজয় দাস। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন অমরকন্টক ছবির গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। হঠাৎ সেখানে হাজির হলেন কিশোর কুমার। এই সময় কিশোর কুমার উপস্থিত হওয়ায় সবাই অবাক হয়ে নিজেদের মুখ চাওয়-চাওয়ি করতে লাগলেন। সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে কিশোর কুমার আগের দিন গান গাওয়ার জন্য যে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন তা ফিরিয়ে দিলেন। মনে রাখতে হবে ১৯৮৫-৮৬ সালে দশ হাজার টাকা নিতান্ত কম টাকা ছিল না। টাকা ফেরত দিয়ে কিশোরকুমার বললেন, ‘গতকাল আমি গানটি গাওয়ার পরে রাতে ঘুমাতে পারিনি। কি সব কথা লিখেছেন গৌরীবাবু আর কি সুর করেছেন অজয় বাবু। আমায় মাফ করবেন আপনারা এ গান গেয়ে আমি টাকা নিতে পারব না। তাই টাকা ফিরিয়ে দিতে এলাম।’
এই ঘটনার ঠিক দু-দিন পরে এই অমরকন্টক ছবির জন্যেই কিশোর কুমার রেকর্ড করে—
‘তুমি মা আমাকে পৃথিবীর এই আলো দেখিয়েছিলে
তোমারই আলোর এই
আমাকে শীতল তুমি করে দিলে
মাগো তোমার স্নেহ মা গঙ্গা হয়ে
ওই অমৃত ধারাতে যায় যে বয়ে
মাগো হিমালয় হয়ে
তুমি শিয়রে থাকো
কত ঝড়ের আঘাত
থেকে বাঁচিয়ে রাখো
ওগো মমতাময়ী
তুমি দুহাত মিলে
আয় বাঁচা বলে
কলে টেনে নিলে।’
সত্যি কথা বলতে কি মাতৃ বন্দনা আর এরকম সুখশ্রাব্য ‘ode’ বা প্রশস্তি মূলক গীতি-কবিতার উদাহরণ বাংলা আধুনিক গান বা ছায়াছবি জগতে খুব একটা দেখা যায় না।
মানুষের মনে জমানো ব্যথা বেদনাকে যে কি অসাধারণ মুন্সিয়ানায় গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায় তার উদাহরণ ১৯৮৩ সালের মুক্ত প্রাপ্ত পারাবত প্রিয়া ছবিটি। এই ছবিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অজয় বাবু অসামান্য সুরারোপ করে কিশোর কুমার কে দিয়ে এমন একটি গান গাওয়ান যা ‘Sad Song’ হিসাবে বাংলা ছবির জগতে একটি ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছ—
‘অনেক জমানো ব্যথা বেদনা
কি করে গান হল জানিনা
দিনে দিনে যাকে আমি সয়েছি,
বুকে রয়েছি
সেই কি এই গানের প্রেরণা?
কি করে গান হল জানি না।’
বিশিষ্ট অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃতুর পরে ১৯৮৬ সালে মুক্তি পেল ‘অনুরাগের ছোঁয়া’। তাপস-মহুয়া জুটির সাড়া ফেলে দেওয়া এই ছবিতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কথা ও অজয় দাসের সুরে ইতিহাস সৃষ্টি করল মহুয়ার লিপে কোকিলকন্ঠী লতা মাঙ্গেশকর গান—
‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও
আমি চিরদিন তোমারি তো থাকবো
তুমি আমার আমি তোমার
এ মনে কি আছে পারো যদি বুঝে নাও।’
অজয় দাসের সুরে লতা মাঙ্গেশকরের একমাত্র গান এই ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ ছবিতেই আর সুরের জাদুকর অজয় দাসের ছোঁয়ায় গানটি সুপার ডুপার হিট। সত্যি কথা বলতে কি এই ছবির প্রত্যেকটি গানই সুপারহিট। এই ছবিতে কিশোর পুত্র অমিত কুমারের জন্য অজয়বাবুর সৃষ্টি করেন—
‘যা পেয়েছি আমি তা চাই না
যা চেয়েছি কেন তা পাই না
ছেঁড়া ছেঁড়া ছেঁড়া ফুলে গাঁথা মালা
ফুলে পুরনো কে কেন ভুলে যাই না।’
অমিত কুমারের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলস্টোন হিসেবে এই গানটিকে গণ্য করা হয়।
এই ছবিতেই অজয় দাস অমিত কুমার এবং আশা ভোঁসলের জন্য এমন এক অপূর্ব সুর সৃষ্টি করেন যা পরবর্তীকালে বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকাদের মনের কথায় পরিণত হয়—
‘গুন গুন করে মন ভ্রমরা যে ওই
তবুও এই আমি তোমার কি নই
মানো কি না মানো জানো কি না জানো
গানে গানে কানে কানে কি যে কথা কই
ফুল দিল বুক ভরা সৌরভ
পাখি দিল কাকলির গৌরব
আমাদের ভালোবাসা
স্বপ্নে যে বাঁধে বাসা
একই প্রাণে মিশে এক হই
কানে কানে সেই কথা কই।’
এই ছবিটিতেই অজয়বাবু আশা ভোঁসলেকে দিয়ে এমন একটি গান গাওয়ান যা ছবি রিলিজের চারদশক পরেও বিভিন্ন পুজো প্যান্ডেলে বেজে চলেছে সমান ভাবে—
‘এ মন আমার হারিয়ে যায় কোন খানে
কেউ জানে না শুধু আমার মন জানে
আজকে শুধু হারিয়ে যাওয়ার দিন
আকাশ বলে আয়রে ছুটে আয় ছুটে
ফুল বলে তুই আমার মধু নিয়ে লুটে
মিষ্টি পাখির গান যায় যে ভোরে প্রাণ
বাজে বাঁশি পাইন পাতায় ও ওই’
সত্যি বলতে কি এত বিভিন্ন ধারার সুর অজয়বাবু আমাদের উপহার দিয়েছেন তা ভাবলেই অবাক হতে হয়। আরঅ অবাক লাগে যে গানগুলো প্রত্যেকটি অদ্ভুত মেলোডিয়াস। যেমন ১৯৭৮ সালে সুখেন দাসের পরিচালনা রিলিজ হয় ‘সিংহ দুয়ার’ ছবিটি। এই ছবিতে অজয় দাস আরাতি মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গাওয়ান—
‘বেঁধেছি প্রাণের ডোরে রেখেছি হৃদয় ভরে
সাধ হয় মনের রঙে সাজাই তোমায় নতুন করে
তুমি যে মোর গগনে জোছনা সব লগনে
আমি যে চন্দ্রমুখী চাঁদকে রাখি বুকে ধরে
ফাগুনের মন্ত্র পড়ে আনো যে বসন্তরে
সাধ হয় সে ফুল তুলে সাজাই তোমার চরণ তলে।’
সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের লিপে চিত্রায়িত গানটি যেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভাব-ভালোবাসার এক চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ।
এই ছবিতেই অজয় দাসের সুরে মান্না দে গেয়েছিলেন তিনটি অসাধারণ গান তিনটি গান আবার সুরের দিক থেকে তিন রকম। পুলকবাবুর কথায় প্রথম গানটি—
‘গলা ছেড়ে গান গেয়ে যাই টুকটুকে বউ আনবে আমার ভাই
মা আমার পায়ের উপর পাটি রেখে সংসার
সাজিয়ে দেবে হাসিমুখে।
এলোমেলো আর এলোমেলো আর কোন কিছু থাকবে না যে ভাই।’
এটি হল এমন একটি গান যেখানে গানের মধ্যে নাটকীয়তা কীভাবে তুলে ধরতে হয় তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
দ্বিতীয় গানটি হল—
‘ও দয়াল
বলবো কারে ভালোবাসার জন
কাছের মানুষ পর হয়ে যায়
যার সুখেতে সুখ ভুলেছি
ভাবিনি কি পেয়েছি
পিছন ফিরে দেখলো না সে’
আবার পুরোপুরি, ভাটিয়ালি সুরের আদলে তৈরি আরেকটি গান। গানটি মান্না দে গেয়েওছেন অসাধারন যাকে বলে ঢেলে গাওয়া। মান্না দের ভয়েস মড্যুলেশনে অন্তরের কষ্ট যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে।
আর তৃতীয় গানটি আবার Sad Song, আর তা যে কতটা সুখশ্রাব্য হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ—
‘তাকিয়ে কেন দেখলি নারে তুই থাকতে সময় আহা রক্ত কমল উঠলো ফুটে শুধু শুধুই। চোখের জলে এমন আপন হলো কত আপন বুকের রতন উজার করে দিয়েছে সব নেয়নি কিছুই যে জন পরের ব্যথা নিজের করে জ্বালালো দ্বীপ সাগরে ঘরে জীবন পাড়ের এই চরাচর তার কাছে এক বিদেশ বিভুই।’
১৯৮৭ সালে রজত দাসের পরিচালনায় ‘পাপ পুণ্য’ ছবিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কথায় অজয় দাস কিশোর কুমার এবং আশা ভোঁসলের জন্য তৈরি করেন আরেক দুর্দান্ত সুর—
‘ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কি
ভালোবাসা হলো নিঃশ্বাস এ দেহের
নিঃশ্বাস ছাড়া মানুষ কখনো বাঁচে কি
যেভাবেই হোক তাই ভালবসা পেতে চাই
তার এতটুকু কণা আছে গো তোমার কাছে কি
এ যে গো হীরের হার একবার মেলে যার
কভু হীরার অভাব মেটে তার ভাঙ্গা কাঁচে কি?’
গানটি ডুয়েট নয়। ‘পাপ পুণ্য’ ছবির দুটি আলাদা আলাদা সিকোয়েন্স কিশোর কুমার এবং আশা ভোঁসলে গানটি গেয়েছেন এবং কি আশ্চর্য দুটি উপস্থাপনাই একই রকম সুখশ্রাব্য।
আবার ‘অমরকন্টক’ ছায়াছবিতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় আশা ভোঁসলের জন্য একটি প্রার্থনা সংগীতে অসাধারণ সুরারোপ করেন অজয়বাবু—
‘অন্ধকারে আলো দিতে
পুজোর প্রদীপ হয়ে জ্বলো
নিজের কথা ভুলে গিয়ে
মানুষেরই কথা বল
জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’
আবার ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অভিমান’ ছবিতে শিবরঞ্জনী রাগের উপর মহুয়া রায়চৌধুরীর লিপে একটি নাচের সিকোয়েন্সের জন্য অজয়বাবু তৈরি করেন এক অপূর্ব সুর যা কানে এলেই বোঝা যায় গানের সিকোয়েন্সের দৃশ্যায়নের জন্যই এই সুর সৃষ্টি—
‘এ আমার অগ্নিপরীক্ষা!
নিয়তির কাছে আমি হারবো কিনা
বাজো সুর সিঙ্গার
বাজো বীণা, বাজো বীণা
দিকে দিকে ওঠে একি ঝড়
দুলে ওঠে সাজানো এ ঘর
মরণের কন্ঠ থেকে আজ,
জীবনের মালা আজ কাড়বো কিনা।’
আবার সুজিত গুহর পরিচালনায় এই ‘অভিমান’ ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর লিপেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অজয়বাবু সুর করেন এমন একটি গানের যেটি শুনলেই মনে হয় হারানো সাথীকে বহুদিন পরে খুঁজে পেলাম। আর আশা ভোঁসলে গেয়েছেনও অসাধারণ, একদম সংযত আবেগে—
‘তুমি যে আমার এ কথাটি বলি যতবার
ভালো লাগে ভালো লাগে, কেন ততবার
যতবারই রাখি তোমার নয়নে এই আঁখি
ততবারই যেন স্বপ্নেরই রঙে একি ছবি আম আকি
আমি যে তোমারই ওগো হার মনে মনে হই দুজনের
তুমি যে আমার।’
শুধুমাত্র সুরকার হিসাবেই নয় গীতিকার হিসাবেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন অজয় বাবু। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মান অভিমান’ ছবির কথা। এই ছবিতে অজয়বাবুর কথা ও সুরে এক শিশুশিল্পীর লিপে আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে যে গানটি খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে সেটি হল—
‘আমার ময়ূরপঙ্খী তরী এনেছি এবার কুলায়
কে যাবি আয় আয় রে
আমার আকাশে তলে
সোনার স্বপন দোলে
কখনো কখনো মেঘে মেঘে আসে
সাহসা বর্ষা আশা ও দূরাশা
কখনো বর্ষা আশা ও দুরাশা
থাকি তবু ভরসায় রে।’
এ কথা বলাই যেতে পারে যে এই স্বল্প পরিসরে অজয় দাসের মতো গুণী মানুষের কৃতিত্বকে বিচার করা এক প্রকার অসম্ভব। আর অজয়বাবুর ছিলেন এমন একজন সুরস্রষ্টা যিনি কোনো অবস্থাতেই মেলোডি থেকে দূরে সরে যাননি। একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে কিশোর কুমারকে বাংলা ছবির গানে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন অজয় দাস।
অজয় দাস চিরকালই কাজ করে গিয়েছেন কলকাতায়। এই শহরে বসেই তিনি তাঁর সুরারোপিত গানের মাধ্যমে আসমুদ্র হিমাচলের সমস্ত বাঙালিকে আন্দোলিত করে গেছেন। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে অজয় দাসের হাত ধরেই আশির দশকে বিপন্ন বাংলা ছায়াছবির গান নতুন করে জেগে উঠেছিল। নচিকেতা ঘোষ, সুধিন দাশগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সলিল চৌধুরীর পরে অজয়বাবুর মতো কোনো সুরকার এত হিট বাংলা ছবির গান দর্শকদের উপহার দিতে পারেননি। ছবির গানের বাইরে আধুনিক বাংলা গানেও সন্ধ্যা আরতি, মান্না সহ অনেকের হিট গানের জনক ছিলেন এই অজয়বাবু। তাই একথা জোর দিয়ে বলে দেওয়া যায় যে ‘চিতাতেই সব শেষ হয়ে যায় না’… মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তাঁর সৃষ্টি। তাঁর সুরারোপ করা গানগুলো তৈরির ৪০-৫০ বছর পরেও পাল্লা দিয়ে সমস্ত পুজো প্যান্ডেলগুলোতে বাজছে এবং বিশ্বাস তা বাজবে আজ থেকে আরও ৫০ বছর পরেও। এই প্রবাদপ্রতিম সুরকারের প্রয়াণ ঘটে ২০১৩ সালের ১৪ই এপ্রিল।