ভ্র ম ণ
ফাল্গুনী ঘোষ
ভূ-স্বর্গের ডাকে । পর্ব ৪ । স্বর্গীয় উপত্যকা
স্বর্গীয় উপত্যকা ৬
অচেনা মানুষদের সঙ্গে প্রথম দৃষ্টি বিনিময়ে কাশ্মীরিদের দুরকম চাউনি চোখে পড়েছে মূলত— কৌতূহলী চাউনি। দ্বিতীয়ত, সন্দেহপূর্ণ চাউনি। নাহলে যে হোটেলে চাররাতের আসন গেড়ে বসলাম সেখানেই হাই-ফাই দৌড়ে ওয়াই ফাই সংযোগ করতে গিয়েই চাউনির হোঁচট। সে কৌতূহল ও সন্দেহের যুগলবন্দীশে একটাই কাতরানি ছিটকে এল–
“ঘরমে খবর দেনা হ্যায়! সামকো উও যো হাদসা হুয়া অবন্তীপোরাকে আশপাস… অগর উনকো খবর নেহি মিলেগে তো টেনসনমে রহেঙ্গে ঘরমে সবলোগ।“
হোটেল মালিকের অশেষ করুনায় ঘরের লোককে আশ্বাসের বন্যায় ভাসিয়ে …”ওসব জঙ্গী হামলার কথা কিছুই জানি না” সব চিন্তাকে নস্যাৎ করে, কাশ্মিরকে এত ছোট জায়গা ভাবার অজ্ঞানতাকে তাচ্ছিল্যে হাসিয়ে দমবন্ধ অবস্থায় বিছানা নিলাম।
সকালে চায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি ঝকঝকে রোদ্দুরে হোটেলের লনে দাদাদিদিদের গুলবাগিচায় গুলজার পর্ব শুরু হয়েছে। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে তো! আহা! হুড়মুড় করে ট্রলি ব্যাগের কোণে মুখ লুকিয়ে থাকা সোয়েটার শালের সদব্যবহার শুরু হল সোৎসাহে। গতকালকের অনন্তনাগ- অবন্তীপোরা মিশনে কে কতটা সাহসী ছিল সেই অবস্থা জাহির করার ‘লেগ পুলিং’ রসের উপুড় হয়ে গুলবাগিচাকে চ্যাটচ্যাটে করে তুললো। এদিকে চা পর্ব শেষ হয়ে সকালের পাতেও তখন রসের লুকোচুরি। পরোটা, আলুর দম—কিন্তু দেশি মুরগীর ডিম কোত্থুকে এলো! সাদা রঙের অথচ স্ফটিকাকৃতি! পাঁচ সাত না ভেবে কামড় দিয়েই বুঝলাম আকার আকৃতি রঙে ঢঙে ভুললে সবসময় চলে না। গামলাভর্তি রসে হাবুডুবু খাওয়া, হাতে ধরে কনুই পর্যন্ত রস গড়িয়ে আসা রসগোল্লাই তো এতদিন খেয়েছি। কিন্তু এর ধরণই আলাদা। এরকম শুকনো সাকনা ক্রিস্টাল সুগার গ্লোব রসগোল্লা জীবনে প্রথম দেখলাম বাপু! পরে গুগলিয়ে জেনেছিলাম ‘নাবাদ নৌত’ (naabad nout) ধরণের মিষ্টি। তফাৎ একটাই মাপে রসগোল্লার মতো। এর বেশি কিছু জানা নেই। আমার অজ্ঞানতাকে মাপ করে দেবেন যেন ।
যাকগে কাশ্মিরের প্রথম দিনের প্রথম ভাগের মিশন—জলবিহার। আহ্লাদে গলে জল সব। ছোটো মিনি বাস হোটেল থেকে দু-তিন ধাপে সবাইকে লেকের ঘাটে ঢেলে দিল। মাঝিদের হাতে ‘এ দেহ সমর্পিলু’ শুধু হাতে তিল তুলসী’র বদলি হিসেবে পার্সে টং টং করে টঙ্কা বাজতে থাকল।
দৈর্ঘ্যে- প্রস্থে সাতে তিনে হাত মিলিয়ে এই লেক কাশ্মীরের জুয়েল। ছয় কিলোমিটার সর্বাধিক গভীরতার হ্রদটিতে সোনার কাঠি, রূপোর কাঠির (সোনা লাঙ্ক, রূপা লাঙ্ক—দুটি দ্বীপ) ছোঁয়া পড়লেই জলপরীর কথকতা নিবিড় হয়ে ওঠে। জল সাম্রাজ্যের তিনটি ভাগে রয়েছে গাগরিবাল, লাকুত ডাল, বড়া লেক। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অতি বড় চালাকদের প্রবাদ। হাঁ করা আমাদের জন্য উপহার আপাতত শিকারার মাঝিদের হুড়ো। কোনোমতে যদিবা ঝাঁপালাম শিকারার লক্ষ্যভেদে কিন্তু এরা তো ক্যারামের গুটির মতো ভাসমান শিকারাগুলিকে নিয়ে লোফালুফি করছে! জলে আমি চিরকালই বাঘের রানি।
“উরি বাবা! এ কি! ডুবে যাব তো!”—
নৌকা মাঝিদের আওতা ছেড়ে দৌড়ের মতলবে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাক ভলি কায়দায় শরীর (পিঠের বদলে পা) বেঁকিয়ে শিকারা আয়ত্তে এল যে ছেলেটির, তার ফ্যাকফেকে হাসির উত্তর পিত্তি চটকানোর জন্য যথেষ্ট—
“উরি বাবা! কিছু হোবে না! পোরবে না!”
প্রায় বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ কাশ্মিরি টানে। এক দাদা বৌদি পোলাপান নিয়ে একই নৌকার ভাগীদার হয়েছিলেন। পরস্পর চোখ চাওয়া চাওয়ি করে গায়ে একটা চিমটি কেটে নিলাম। এতক্ষণে! কাটরা পাহাড়ে ঘোড়ার সহিসের হাসির মর্মার্থ উদ্ধার হলো। এদিকে ডোগরি ভাষা কিচ্ছুটি বোঝার জো নেই। কি অসহায় অবস্থা!
স্বর্গীয় উপত্যকা ৭
মখমলী গদি আঁটা, ছত্রধারী শিকারায় পায়ের উপর পা তুলে রাজকীয় চালে যেই না লেকের শোভা দেখার মুড তৈরী হব হব ‘কেশর লিজিয়ে, সস্তে পড়েঙ্গে। “আরেক পাশে তখন ফুলওয়ালির শুভাগমন ঘটেছে। এই তো মাত্র দু-আড়াই ঘন্টা। জীবনের স্বাদ একটু চাখতে দাও বাপু। কিন্তু যিনি হালের কর্ণধার স্বয়ং জল ঢেলে দিলেন , কিছু কাশ্মিরি জবরজং পোশাক আশাক বের করে। সে কি চাপান উতোর।
“আরে শর্মিলা টাগুর আয়া এঁহি লেক পে। কাশ্মির কি কলি শুনা হ্যায় না! এঁহি পে শুটিং হুয়া উস ফিলিম কা। আপ ভি বাঙালি আছে! ইয়ে ড্রেস পেহেন কর ‘কাশ্মির কি কলি’ লাগোগে!”
ইসসস, এই মরচে ধরা কালো রঙে আর কাশ্মির কি কলি লাগতে হবে না! তোমাদের ব্যবসা চাই, ডাল লেক বাজারে তোমাদের পকেট গরম করব—এই আশ্বাসে ঝুলোঝুলির যবনিকা পতন হল!
দূরে পাহাড়ের চূড়া বেয়ে সোনালি রঙ গলে পড়ছে ‘ঝিলসি নীলে’। শাম্মিকাপুরের লিপে মহম্মদ রফি ঠিক কার রূপগান গেয়েছিলেন কে জানে! কি রূপ! রূপের খোলতাই। দুপাশে হাউসবোটের সারি দোকান বাজারকে পাশে ঠেলে এগিয়ে চলল শিকারা। যত এগোচ্ছি জলের রঙ পারের সবুজ চিনার উইলোকে ডেকে নিচ্ছে গভীরতায় ঘিরে।
“ও বন্ধুয়া কোন বন ধোওয়া ছাঁওলা নীলা পানি
গোসল করি হইলা তুমি সকল রঙের রানি।“
এ লেক শ্রীনগরকে উত্তর –পূর্বে বেড় দিয়ে আগলে রেখেছে। শেষ প্রান্তে ঝিলম এসে সখ্যতা করেছে জলপুরীর সাথে। শীতকালে অভিমানিনী এ রূপ জমে পাথরও হয় কখনও সখনও। মাঝে মধ্যে দূরে ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে। শুনলাম বিকেলের মিশনে নাকি সেগুলি আরও ভিন্ন রূপে ধরা দেবে।
কিন্তু শুধু রাজপথ আর দরবারে ঘোরাঘুরি করলে তো চলে না। হাতিশাল, ঘোড়াশাল, অন্দরমহল না দেখলে রানির গোঁসা হবেই।
“পিয়ার ফুলের বনে পিয়ার ভ্রমরা
পিয়া বিনে মধু না খায় ঘুরি বুলে তারা” – গোবিন্দদাস বোধহয় এরকম পদ্ম আর ওয়াটার লিলির বন দেখে এই মিনতি করেছেন। আর আমার মতো বেরসিক না হলে যে কোনও রসিকপ্রবর পদ্মাঘাতে ডুবে মরতেন নিঃসন্দেহ। এবার বাজারের দিকে এগোতেই হবে। তাছাড়া পকেট ভরানোর কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছে, বৃদ্ধ শিকারাওয়ালার দিকে দৃষ্টি পড়লেই। পর্যটনই তো এদের ভরসা! সুতরাং হোটেল, হাউসবোট, শাল, সোয়েটার শাক সবজি একেবারে জ্বলন্ত (পড়ুন ভরন্ত) বাজার। হাঁকডাক আছে কিন্তু হৈ হল্লা নেই। হাউসবোটের কারিকুরী অত্যাধুনিক সুশোভিত হোটেলের মতো।
সব ভালোর মাঝে একটাই বিষাদ প্রাণবন্ত অথচ ধৈর্যশীলা সৌন্দর্য ভাণ্ডার যেন কুষ্ঠরোগাক্রান্ত না হয়— তার প্রচেষ্টায় শ্যাওলা কাটা মেশিনকে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম যথেচ্ছ। তবে মানুষের উপভোগের জন্য হাউসবোট বাঁ হোটেলগুলোকে আরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পাঠ দিয়ে আমাদের ভালো আমরাই করতে পারি। সুযোগ পেয়ে একটু জ্ঞান ঝেড়ে দিলাম আর কি! দিদিমণি তো! এবার পেট চোঁ চাঁ দৌড়াচ্ছে হোটেলের দিকে। খাওয়া দাওয়ার পর বিকেলের ট্রিপে আপনাদের সাথে দেখা হবে। সবসময় খাওয়ার গল্প হাঁ করে গিললে আপনাদের পেট ব্যথা করবে যে।