মু ক্ত গ দ্য 

অয়ন ঘোষ

ayan

নিভু নিভু আলোয় দেখা অলীক সম্পর্ক

কিছু ডাকের ও দেখার কোনও মানে নেই। তার মানে এই নয় যে তাদের কোনও মূল্য নেই। আসলে মূল্য নির্ধারণ আমরা এই জীবনে যে মাপকাঠিতে করেছি, তাতে নিজের মূল্য ও অর্থ দেখে সে নিজেই লজ্জা পেয়েছে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেনি। যেমন ‘বড়োলোক’ শব্দের অর্থ আমরা করেছি টাকা-পয়সাওয়ালা লোককে নির্দেশ করতে কিন্তু আসলে হওয়া উচিত ছিল বড় মনের মানুষকে বোঝাতে। এই হয়েছে এক বিচ্ছিরি স্বভাব, আমার! আসলে কথায় না এসে কথার চারিদিকে গোল গোল ঘুরছি কেবল আর তোমাদের বিরক্ত করছি। আর বিরক্ত করব না। কথায় ফিরে আসছি।

দিন ঠিক হয়েছে বর্ধমান যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে আসতে হবে পরীক্ষার খাতা। এমনিতে বর্ধমান যেতে আমার ভালোই লাগে। কর্ড লাইনে বেশকিছু এমন স্টেশন আছে, যেগুলোর ওপর দিয়ে দুপুরবেলা গেলে মনে হয় সময় থেমে আছে ট্রেনের গতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। দুপা-শে যতদূর চোখ যায় ক্ষেতখামার গিয়ে মিশেছে দূর দিগন্তরেখায়। কাছে দূরে মাঝে মাঝে গাছপালার মিছিল। নীল আকাশ গা ধুয়ে নিচ্ছে নয়ানজুলির লাজুক জলে। ট্রেনের কামরাগুলোতেও সরল সাদাসিধে মানুষের ভিড়।

আজও তেমনই চলেছি। কিন্তু গোল বাঁধল বর্ধমান রাজের বাড়িতে পৌঁছে। আমার যে আপিসে কাজ, সেখানে গিয়ে দেখি বড়সড় তালা ঝুলছে। আমার শুরু হওয়ার আগেই তাদের কাজ সারা হয়ে গেছে। খবর ছিল বর্ধমান শহরে চলছে ছোটো পত্রিকার মেলা। অগত্যা গুটিগুটি পায়ে সেখানেই সেঁধিয়ে গেলাম। খাতার দুঃখ যদি বইয়ে ভোলা যায়! উপড়ি পাওনা বন্ধুদের নিরাভরণ সঙ্গ। সেসব মিটিয়ে ফিরতি ট্রেন ধরে গুড়াপ স্টেশনে যখন নামলাম তখন শেষ হেমন্তের ঝুপঝুপে অন্ধকার নেমে এসেছে। গাঁ-ঘরের স্টেশনগুলোতে এখনও আলোর আধিক্য নেই। তাই প্ল্যাটফর্মের বাঁ-দিকের গাছগুলোর পাতার সংসারে জোনাকি ফুলের মজলিস। পাশের গ্যারেজ থেকে বাইকটা নিয়ে জ্যাকেট মাফলার এঁটে চড়ে বসলাম। এখান থেকে দশঘড়া পর্যন্ত রাস্তাটাতে মাঝে মধ্যে ছোটোখাটো দোকান বাজার সমেত মোড় থাকলেও বেশ ফাঁকা ফাঁকা আর শুনশান। পথটা আমার বেশ লাগে। ভিড়ভাট্টা চিরকালই আমার অপছন্দের। 

নতুন শীতের হাওয়ার ঝাপট। পাশের সদ্য কেটে রাখা ধান ও আলুর জন্য চাষ দেওয়ায় মাটির গন্ধ। কালো পিচের ওপর বাইকের আলোর দখলদারি। সব মিলিয়ে ভালোই আসছিলাম। রাস্তার পাশে আধো অন্ধকার, ঘাস-আগাছায় ভরা জঙ্গুলে জায়গায় একটা গোলের আওয়াজ পেয়ে গতি কমিয়ে আনলাম। দেখি একটা টর্চের মৃদু আলো উঠছে নামছে। সাথে নিভু নিভু চিৎকার ও কান্নার শব্দ। খানিক দূরে ছোটো বাজার মতো একটা জায়গা। তার আলোর আভা যতটুকু এসে পড়েছে তাতে দেখি প্রায় প্রৌঢ় এক দম্পতি নিজেদের মধ্যে প্রায় হাতাহাতিতে মেতেছে। কৌতূহলে দাঁড়িয়ে গিয়ে শুধোলাম, ‘কত্তা এই সাঁঝের বেলায় ঝগড়া কেন করছ?’ উত্তর এল প্রৌঢ়ার থেকে, ‘দেখো না বাবা, এক পেট মদ গিলে, মিনসের রোজ এই নাটক! ঘরে যেতে কইছি, তা যাবে নি। ঝগড়া কি আর সাধে করি।’ আমি বলি, ‘ঘরে যাও, দু-জনে। কোথায় কি সাপখোপ আছে। বিপদ হতে কতক্ষন!’ সাথে সাথে মাটির সাথে বসত করার অভিজ্ঞতা থেকে মহিলা কন্ঠের আওয়াজ আসে, ‘তাও জানো না বাছা, বাতাসে হিমের গন্ধ পেলে তেনারা বেরোন না।‘’ তেনারা হল সাপ। বড়ো জোর লতা বলা যেতে পারে, সন্ধ্যার পরে ‘সাপ’ উচ্চারণ নৈব নৈব চঃ। আমি ভাবি কতো কি যে শেখার বাকি! এরই মধ্যে লোকটি ওই ছোটো টর্চ দিয়ে দু-ঘা বসিয়ে দিয়েছে মহিলাটির মাথায়। আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কিন্তু তারই মধ্যে বলছে, ‘হতচ্ছাড়া বুড়ো, ঘরে চল, দুটো খেয়ে আমায় উদ্ধার কর।’ আমি সুযোগ পেয়ে আবার বলি, ‘এই যে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছ, তুমিও দিতে পারছ না দু-ঘা। নেশা কেটে যাবে একেবারে।’ কান্নার মধ্যেই ফিক করে হেসে ফেলে বুড়ি, বলে, ‘তা আবার দিই না!’ বুড়ো এরই মধ্যে বসে পড়েছে মাটিতে। সে যাবে না ঘরে। আমিও আটকে গেছি এই মাটির পিরিতের মধ্যে। বুড়িকে শুধোই, ‘এতো মারধোর খাচ্ছ, তাও পড়ে আছ বল?’ খানিক চুপ থেকে উত্তর আসে ‘কোথায় যাব বল! সেই কবেকার কথা। তেরো বছরে ঘর করতে এসেছিলাম। অভ্যাস হয়ে গেছে। এর তখন এমন ভাঙা চেহারা ছিল না। আঠেরো বছরের জোয়ান মরদ। কার্তিক ঠাকুরের মতো এক মাথা চুল।’ বুড়ির চোখে যেন মরা জোৎস্নার বাণ ডেকেছে। ‘তবে হ্যাঁ, নেশা করলে মারে যেমন, ভালো থাকলে সোহাগও করে। আমার দোক্তা-চুন রোজ এনে দেয়! এমনিতে ভালো মানুষ। মদ ছাড়া অন্য নেশা নেই, গো।’ 

হঠাৎ করে ওদের এই ঝুটোপুটি আর ঝগড়া বলে মনে হয় না আমার। মনে হয় খুনসুটি। ক্লাসে, আলোচনা-চক্রে ফেমিনিস্ট থিয়োরি কপচানো বিদ্যেধরী আমি— কতো জটিল শব্দবন্ধে এসবের ব্যাখ্যা করতে শিখেছি— Patriarchy, chauvinism, male-domination, male-gaze আরও কত কী!! নিজেকে ভীষণ বোকা বোকা লাগে। এইসব থেকে কত দূরে, কত নির্ভার এই জীবন। সামান্য পান-দোক্তায় চাহিদা মিটে যায়, সোহাগ উথলে ওঠে। আমার ভাবনার ঘোর ভাঙতে দেখি, ঝগড়া মিটে গেছে। বুড়ো ছোট্ট টর্চের মৃদু আলো দেখিয়ে টলতে টলতে আগে চলেছে। পিছন থেকে তাকে আগলে নিয়ে যাচ্ছে বুড়ি। ওদের ছায়া দুটো রোগা আলোয় দুলছে, কাঁপছে। তৈরি হচ্ছে এক আবহমানের ছবি পৃথিবীর ক্যানভাসে।