এরপর খরার মরসুম আসবে, এখনও বাতাসে ভাসছে মাঝিগান, জিরাশাইল ধানের শীষে জলতরঙ্গ বাজিয়ে যায় খেয়ালী ফড়িংয়ের ডানা। ওদিকে হরিমতী মাদুর বোনে একমনে। যে বর্ষায় তার ঘর ভেসেছিল, সে বছরই গ্রামের লোক দল বেঁধে দেখতে গেছিলো কিভাবে বান এলে নদীর চড়ায় আগুন ফুটে বেরোচ্ছে। টগবগ করে ফুটছে নদীর জল, ধোঁয়া উঠছে হাওয়ায়। জলার দিকের পাড়টায় তখন লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলো দুটো রাজহাঁস। সেই দিনই হরিমতী তার ভিটেয় একটা আকন্দ গাছের চারা বসিয়েছিল। হরিমতী এখন রাজহাঁসদুটোর ডিম খেতে খেতে তাদের সাথেই সুখ দুঃখের গল্প করে কোথায় মেলা বসলো, কোথায় ফসল এলো উপচে প’ড়ে, কোথায় রাস্তায় মোরাম পড়লো । রোদের কথা, মেঘের কথা, পালকের কথা– হরিমতীর ভেসে যাওয়া ঘর এখন কাজী ফুলের মালা। হরিমতীর চোখ এখন কালচে মাটির ঢেলা। হরিমতীর শরীর এখন পুণ্যস্নান। রাজহাঁসেদের কাছে হরিমতী নদীর ঢেউয়ের গল্পকথা শোনে, এপার ভাঙার গল্প, ওপার গড়ার গল্প গল্প শুনতে শুনতে হরিমতী একটু করে পুড়তে থাকে। হরিমতী পুড়তে থাকে আর শুনতে থাকে। হরিমতী পুড়তে পুড়তে শুনতে থাকে সারারাত নদীর জলের শব্দ শোনে, এপার ওপার ছলাৎ ছলাৎ… তারপর ভোর হলে শামুক খোল পাখি হয়ে উড়ে যায়। শামুক পেলে ঠোঁট দিয়ে খোলোক ভাঙে, শামুক গিলে খায়, হরিমতীর ঠোঁটে লেগে থাকে শামুকের শুকনো রক্ত। হরিমতীর শুকনো ঠোঁট যেন আসন্ন খরার মরসুম।
আলপথের গান
ঘুমন্ত আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তেষ্টা পেলে খুলে বসি পর্ণমোচী অরণ্যের প্লেটোনিক প্রেমের কবিতা। নীল রোদে একলা আউরে যাই স্বেদবাষ্পের অধরা শব্দমালা। পুরুষালি সবুজ ঘাসে ছড়ানো থাকে সদ্যোজাত হেমন্তের ধান। ঋতু বদলের সাথে সাথে পাহাড়তলীর মেঘেরাও এক এক করে দেশান্তরী হয়ে পড়ে। তবু ওই যে মেয়েটা তিন ক্রোশ পথ পেরিয়ে রোজ জল আনতে যায়– মাটির নোনা রস শুকিয়ে এলে কলসি কাঁখে সেও তার বহু যুগের গান গাইতে গাইতে ফিরে আসে। আহা, কি মিষ্টি গলা তার। আমি তাকে গোল্লাছুটের মত ছুঁয়ে ফেলার আগেই সে আমায় বলে ওঠে ‘ধরো’। তারপর একছুটে পালাতে থাকে– যেমন করে সোনালী সৈকতের কাছে এসেও ছোঁয়াচ এড়িয়ে পালিয়ে যায় মৃৎকলসী ঢেউ । আমারও আর কখনো ধরা হয়ে ওঠেনা তাকে। সে কিসের গান গায়… কেন গায়… সেসব গুচ্ছমূল কথা কিছুই জানা নেই আমার । শুধু জানি এক অনির্বচনীয় সর্বাঙ্গ জড়িয়ে আছে তার সেই পালক দিনের গানে, শরীরে লেপ্টে থাকা ঘুমন্ত রাত পোশাকের মত। তার মুখচ্ছবি জুড়ে ঘুমিয়ে থাকে জোৎস্না আলপথ। প্রাচীন আলপথ নিশ্ছিদ্র রাত জুড়ে স্বপ্ন দেখে ভোরের আলোয় মারানবুরু শুয়ে আছে রুখাশুখা ধূলামাঠের সমস্ত আওতা জুড়ে।
জেগে ওঠার পর সে আলপথ আমাকে হাবেভাবে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় একটি প্রেমের কবিতার আয়ু বড় জোর কিছু নিভৃত আনমন দিন ।।।