গ ল্প
অতনু টিকাইৎ
রাস্তা
বেশ কিছু দিন ধরে লক্ষ্য করছি একটা লোক আমার পিছু নিয়েছে। আমি যেখানেই যাচ্ছি লোকটা পিছু নিতে নিতে সেখানেই গিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে সে আমার বাড়ির ঠিকানাও খুঁজে ফেলেছে। অবস্থা বেগতিক বুঝে আমি আজ দুই দিন হলো বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছি না। এমনকি ছাদেও যাচ্ছি না। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি লোকটা আমায় রাস্তাঘাট, অফিস চত্বর, চা-চক্রটিতে খুঁজে না পেয়ে আমার বাড়ির আশেপাশেই কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। খুব সম্ভবতঃ এখন সে আমার বেডরুমের জানালাটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। আমি গত দুই দিন ধরে বাড়ির জানালাগুলিও খুলে রাখা বন্ধ করে দিয়েছি।
লোকটা কে? কী চাইছে? কীইবা পাওয়ার থাকতে পারে তার আমার কাছে?
তাহলে কি বিশুদা? বিশুদা জানতে পেরে লোকটাকে আমার পিছনে লাগিয়েছে? কিন্তু বিশুদা জানতে পারলে সবার প্রথম তো আমার কাছেই ছুটে আসতো! দীর্ঘশ্বাস ফেলত। কিছু সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হনহনিয়ে চলে যেত কিংবা যেত না। খুব বোঝাতো।
তবে কি পিয়ালীর বাড়ির কেউ? তারা কোত্থেকে পেলো খবরটা? সত্য কি না জানতেই এই রাস্তা ধরেছে? তারা কী করার কথা ভাবছে এখন?
আসলে সিদ্ধান্তটা আমায় একদিন না একদিন নিতেই হতো। সহজে যে তারা আমার পিছু ছাড়বে না, এ কথা তো জানাই ছিল। সেই মতো একটা রাস্তা আমি বানিয়েও রেখেছি। আমার অনুরোধ মতো কোম্পানি আমাকে তিন বছরের জন্য এখান থেকে তাদের সবথেকে দূরের একটা ইন্টেরিয়র এলাকায় পোষ্টিং দেবে বলেছে।
আচ্ছা মানুষ মানুষের জন্য ঠিক কত দিন অপেক্ষা করে থাকতে পারে? মানুষকে ভুলে যেতে মানুষের ঠিক কতদিন সময় লাগার কথা? সবকিছুর মতো অনুভূতিরও একটা এক্সপায়রি ডেট থাকে নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই থাকে। বাবার মৃত্যুর পর মা তো ধীরে ধীরে এখন প্রায় ভুলেই গেছে। আর কাঁদে না। মা কি সত্যিই এখন আর কাঁদে না!
তবে কারোর জন্যই কারোর জীবন আটকে থাকে না নির্ঘাত। তারপরেও কেন যে একটা চাপা আতঙ্ক কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না! গতকাল রাতেও তো সবদিক থেকে ভেবে দেখেছি, কিছু করেই তারা আমায় আটকে রাখতে পারবে না।
সন্দেহের বশে মানুষ খুন করা যেতে পারে কিন্তু আইনে শাস্তি দেওয়া কখনোই নয়। তবুও যে কেন কয়েকদিন ধরে নিজেকে কিছুতেই স্থির রাখতে পারছি না। ডাক্তারকেও সমস্তটা খুলে বলতে পারছি না। ঘুমের ওষুধ খেয়ে খেয়ে নার্ভগুলো আমার আরো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শরীরে বড়সড় একটা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আমি তিন বছরের জন্য তাই এসব কিছুর থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কে একজন বলেছেন বেশ কথাটা, আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড।
এখন মনেহয়, কেন যে পরিচয় হতে গেছিল বিশুদার সঙ্গে! কেন যে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে গেছিলাম লোকটার সাথে! তবে আসলেই কি না বাড়িয়ে উপায় ছিল তখন!
বাবা সদ্য মারা গেছেন, মা অসুস্থ, আত্মীয়-পরিজনরা দূরত্ব নিচ্ছেন, এমন একটা টলমল সময় বিশুদা পাশে না দাঁড়ালে…! মানুষটা আমার জন্য অনেক করেছে।
এই দেখুন বিশুদাকে নিয়ে সেই থেকে এত কথা বলে যাচ্ছি অথচ মানুষটার পরিচয়টাই এখনও আপনাদের জানানো হয়নি। আসলে আমার মাথাটাই গেছে। এক কথা বলতে গিয়ে আরেক কথা বলে ফেলি আজকাল। বিশুদা আমার পাড়ার দাদা। লাল পার্টি করে। আমার বাবাও লাল পার্টি করত। বাবা মারা যাওয়ার পর বিশুদাই একজনকে বলে কয়ে কারখানার সুপারভাইজারির কাজে আমায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বিশুদার উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। প্রথমদিনই সে আমায় জানিয়ে দিয়েছিল। কাজের পাশাপাশি কারখানায় তাদের টলমল খেতে থাকা শ্রমিক সংগঠনটিকে সামলাতে হবে।
কারখানাটিতে ঢুকে সেইমতো নেতা হয়ে উঠছিলাম বটে, কিন্তু লেনিন- মার্কসরা আমার স্বপ্নে কখনোই আসতেন না।
সত্যি কথা বলতে কী, আমি কারখানাটির থেকে পালানোর পথ খুঁজতাম। কারখানা, পার্টি অফিস হয়ে রাতে বাড়ি ফিরে পড়াশোনা করতাম। ইন্টারভিউ দিতাম। বিশুদা জানতো না।
তবে পিয়ালী সব জানতো। পিয়ালীও চাইতো আমি এসব থেকে বেরিয়ে আসি। বিয়ে করি। একটা সংসার হোক আমাদের। তবে বিয়ে করার তাড়া আমার ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পর কথা বলার একটা বন্ধু হিসেবে যেভাবে পিয়ালী আমায় সময় দিয়েছে, সবকিছুতে পাশে থেকেছে, আমি তার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু তাই বলে পিয়ালীকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
পিয়ালীকে ঠিক কবে থেকে আমি অপছন্দ করা শুরু করলাম! অপছন্দ কি? নাকি ভয়!
সম্ভবতঃ সেই দিন থেকে… যেদিন সে আমায় জানিয়েছিল বাড়িতে তার বিয়ের জন্য ছেলে দেখা চলছে। আমি আমাদের বিয়ের বিষয়ে কী ভাবছি?
সত্যি কথা বলতে আমি তার সাথে আমার বিয়ের কথা ভাবিনি কখনো। ভালোবাসি কথাটিও তো আমরা বলিনি কেউ কাউকে। তাহলে পিয়ালী ঠিক কবে থেকে এমনটা ভাবা শুরু করলো!
সিনেমা হলে তার হাতে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকার মুহূর্তটি থেকে? সেই দিন খুব একা লাগছিল। মা আনমনে রান্না করতে গিয়ে ভাতের হাঁড়ি উল্টে ফেলেছিল। মা সেই সময় সারাক্ষন আনমনা থাকত।
নাকি যে বার শান্তিনিকেতন থেকে তার জন্য পছন্দ করে কানের দুল এনে দিয়েছিলাম!
এছাড়া এমন আর কী কথা বলেছি তাকে! এমন কী কী ঘটেছে আমাদের ভিতর যার কারণে তার মনে এমন ভাবনা আসা খুব স্বাভাবিক ছিল!
আসলে এমন একটা সময়ে পিয়ালী আমার জীবনে এসেছিল, তখন যে কেউ আমার সাথে কথা বললে আমার তাকে আপন লাগত। সব কথা জানাতে ইচ্ছে করতো। বলতে ইচ্ছে করতো, আরেকটু থাক না প্লিজ!
যেখানে যেটুকু মাটি পেয়েছি গাছের মতো আঁকড়ে ধরেছি।
বাড়িতে স্থির হয়ে বেশি সময় থাকতে পারতাম না। মায়ের চোখ দেখতাম সারাক্ষণ ভিজে আছে। সারাক্ষণ চুপ করে থাকত মা। সারাদিন এখানে ওখানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। তারপর বিশুদা। তারপর কারখানা। দিনভর কাজে ব্যস্ত থাকতে পারার একটা বন্দোবস্ত। মা’ও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমার খাবার তৈরিতে। বাড়ি কখন ফিরবো, বাইরে কিছু অঘটন ঘটল নাকি… ইত্যাদি নানান চিন্তায় মায়ের বেলা কেটে যেতে লাগলো।
কারখানা ছেড়ে, সংগঠন ছেড়ে কর্পোরেট কোম্পানির চাকরিতে জয়েন করছি খবরে বিশুদার সাথে সম্পর্কটা যে আমার খারাপ হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। বেশি বেতনের দিকে এগোলে কাজটি যেমনই হোক, কারোর কিছু বলার থাকে না। এ এক সুবিধা।
আসলে বিশুদার হাবভাবে বোঝার উপায় থাকে না মানুষটার মনে কী চলছে। কিন্তু সে বোঝে আমি টের পাই। একারণেই আমি চাই না মানুষটার সাথে আমার এখন দেখা হোক। আমার মনের ভিতর একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বিশুদা চাইছে আমার নতুন চাকরিটা খেয়ে ফেলতে। এর কারণ অবশ্যই আমার সারাক্ষণ বেশি ভাবতে থাকা মন অথবা হতে পারে স্বপ্নে লেনিন- মার্কসরা না এলেও পার্টির ভিতরে আমার সংগঠক হিসেবে সুনাম, আমার প্রয়োজনীয়তা। বিশুদা দেখা হলেই পিঠে হাত রেখে বলতো কথাটা, এই সময় তোদের মত মেধাবী ইয়ং ছেলেদের পার্টিতে বেশি বেশি করে দরকার। এত সহজে দরকারি মানুষটা ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাবে, কেন জানি না কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না। বিশুদা নিশ্চিত কিছু একটা ফন্দি আঁটছে।
তবে এইসব ফন্দি ফিকির এঁটে কাওকে আটকে রাখার মেয়ে পিয়ালী ছিল না। সেদিন যখন তার প্রশ্নের উত্তরে আমি আমতা আমতা করে হলেও বুঝিয়ে দিতে পারছি, ঠিক আছে বলে সেই যে বাড়ির পথ ধরলো মেয়েটা আর কোনোরকম যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন। তারই মাঝে একদিন এক বন্ধুর থেকে খবর পেলাম, পিয়ালীকে দেখতে ছেলে আসছে। পিয়ালীর নির্দেশেই কি সেই বন্ধু তার বিয়ের খবর জানিয়েছিল আমায়! পিয়ালী কাছেই ছিল? পিয়ালী আমার থেকে কি একটা দীর্ঘশ্বাস আশা করেছিল! দীর্ঘশ্বাসটি পেলে পিয়ালী কী করার কথা ভেবে রেখেছিল!
সত্যি কথা বলতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম। যদি কখনো সে আমার সামনে এসে জামার কলার ধরে বলে বসে, কোন্ অধিকারে সেদিন হল ঘরে…? কিংবা এত এত রাত ফোনে তাকে জাগিয়ে রেখেছিলাম কোন অধিকারে?
আচ্ছা বন্ধুত্বের অধিকার ঠিক কতটুকু? একসাথে পাশের মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতেও ভয় করবে এখন।
একারণেই আমি এতদিন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম। নিজের থেকেও… আসলে তার অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। যেমন উত্তর দিতে পারি না বিশুদাকে, ছুটির দিনগুলোতেও কেন গিয়ে তাদের মিছিলে পা মেলাই না এখন আর।
এমন অনেক প্রশ্ন থাকে যেগুলির উত্তর আসলে একটা সময় পর দুই পক্ষেরই জানা হয়ে যায়। পিয়ালীও সেকারণেই সেদিন প্রত্যুত্তরে কিছু না বলেই চলে গেছিল! যেন কিছুই হয়নি। যেন মেঘ করেছিল, বৃষ্টি দেখে অবাক হলো না কেউ। পিয়ালী বিষ খেয়েছে। আজ তিন দিন হলো। এতগুলো ঘুমের ওষুধ মেয়েটা পেলো কোত্থেকে?
খবরটা পেয়ে একবার দৌড়ে হাসপাতালে তার বিছানার পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে করেছিল। পিয়ালী আমার জন্য যা যা করেছে আমি….! আসলে আমি আর কোনোভাবেই চাইছিলাম না পিয়ালীর মতো করে আর কেউ কোনোভাবে ভেবে বসুক আমাদের ভালোবাসা ছিল। আচ্ছা, আমাদের সত্যিই ভালোবাসা ছিল? আমার মনে হচ্ছে প্রশ্নটাকে একটু ঘুরিয়ে করে দেখলে সুবিধা হয়। ভালোবাসা কি সত্যিই ছিল না আমাদের? পিয়ালী এতটাই অবুঝ! নাকি আমি মানতে চাইছি না! আমি কেন মানতে চাইছি না? ঠিক কবে থেকে আমি চাইছি না মানতে!তার শ্বেতী রোগটা ধরা পড়ার পর থেকে নাকি অফিস কলিগ অপর্ণা মুখার্জি পাত্তা দিয়ে বসলো যেদিন! নাকি তারও পরে, অপর্ণাকে হারানোর ভয় পেলাম হঠাৎ!
একটা রিল্যাক্স জীবন চাইছি, ব্যাস। খুব কি বেশি চেয়ে ফেলা হচ্ছে আমার? কিন্তু এই লোকটা….! বিশুদার তো কিছুতেই জেনে ফেলার কথা নয়! পিয়ালীর বাড়ির কেউ?
লোকটা এরইমধ্যে আমার বেডরুমের জানালা ভেদ করে সোজা বিছানায় এসে দেখি বসে পড়েছে আর আমি এখনও নিজেকে লুকিয়ে ফেলার জায়গা খুঁজে চলেছি …