অ নু বা দ

ভাষান্তর: বাসুদেব দাস

basudev

সমীর তাঁতীর কবিতা: মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ

কবি পরিচিতি-১৯৫৫ সনে গোলাঘাট জেলার বিহরা চা বাগিচার মিকিরাচাঙে কবি সমীর তাঁতীর জন্ম হয়। অসম সরকারের পর্যটন বিভাগের অবসর প্রাপ্ত কর্মচারী। সমীর তাঁতী একইসঙ্গে কবি, অনুবাদক, গদ্য লেখক। যুদ্ধভূমির কবিতা, শোকাকুল উপত্যকা, সেউজীয়া উৎসব, এই আন্ধার এই পোহরর তন্ময়তা, কদম ফুলার রাতি, শুনিছানে সেই মাত ইত্যাদি তাঁর কাব্যগ্রন্থ। ‘ফৰিংবোরে বাটর কথা জানে’ (ফড়িংগুলি পথের কথা জানে) কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।কবিতাগুলি মূল অসমিয়া ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন বাসুদেব দাস 

সেনাধ্যক্ষের কবিতা

যখন যুদ্ধের ভয়ে কোনো মানুষ ঘরের ভেতরে

            প্রাচীন কোনো শিলামূর্তির মতো নির্বাক স্থির

আমি তখন যেতে থাকি যুদ্ধভূমির দিকে

 

আমার যুদ্ধের সাজ দেখে অভিবাদন করে নক্ষত্রমণ্ডলী

রাত আর দিন

আমার দুইপাশে দাঁড়িয়ে থাকে কী পরম নির্ভয়তায়

 

আমার পায়ের শব্দে জেগে উঠে আশা,বেড়ে উঠে দুর্বার সাহস,

প্লাবনের মতো পার ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে

আমার যুদ্ধের কবিতা

 

আমার আগমনে পুরুষরা খুঁজে পায় উপায়ের মতো যুদ্ধের নতুন কৌশল

আমার প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করে থাকা উলঙ্গ শিশুদের আমি আঁকড়ে ধরে চুম্বন করি

আমার কপালে তিলক এঁকে নারীরা কামনা করে আমার আন্তরিক বিজয় শুভেচ্ছা

 

আমি যেতে থাকি আর যেতে থাকি গীতের লহরীর মতো প্রতিটি শহরের

হৃদয় ভেদ করে প্রতিটি সুপ্ত জাতির স্নায়ুর মধ্য দিয়ে

রুটি আর ঘরের দাবিতে

 

আমার আগমনের খবর পেয়ে,

সময় খুলে দেয় আমার জন্য সমস্ত রুদ্ধ দুয়ার 

 

যুদ্ধের ঋতু

 ছায়া কোথায় পথিক 

 ছায়া

 

 যুদ্ধের উত্তাপে ফেটে যায় মাটি ।দেখি বলে কারও দেখতে পারিনা মুখ

 নদী-নালয় জ্বলে আগুন। রাখি বলে কোথাও রাখতে পারি না পদক্ষেপ

 

 বাতাস কোথায় পথিক

 বাতাস

 হাহাকার। মাটির বুকে হাহাকার

 আকাশের বুকে হাহাকার। জোরে নিশ্বাস নিতে পারি না

 

জল জল

জল

 ছটফট করে হৃদয়। জলের সন্ধানে উড়ে যায় আহত চাতক পাখি

মানুষ কোন দিকে যায়, কোন দিকে ? ডাইনে না বাঁয়ে

 অসহায় মানুষ

 

 যুদ্ধের নেশায়

 আমি দাঁড়িয়ে আছি

 কালহীন একটি উলঙ্গ মানুষ 

 

আমাকে দেখে গাছগুলি খুলে রাখল  পুনরায় একবার  পুরোনো পোশাক

 আঃ  আমার সামনে এখন তরোয়াল খুলে খেলা করে

 

 ভয়ানক

 যুদ্ধের ঋতু



অমিতাভ  আলোর কন্ঠ খোল

অমিতাভ  আলোর কন্ঠ খোল।প্রজ্ঞার প্লাবন নামুক

এখানে ভীষণ অন্ধকার। মানুষগুলি উদ্ভাসিত হোক

 

 আলোর কন্ঠ খোল অমিতাভ ।কন্ঠ খোল অনাবিল আলোর

 সত্যিই এখানে ভীষণ অন্ধকার। ভয়াবহ শ্বাসরোধী অন্ধকার

 অন্ধকারে যে পৃথিবীর কিছুই দেখা যায় না। এই আকাশ এই পৃথিবী

 পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ

 মানুষের মহত্বম সৃষ্টি

 সৃষ্টির মহানুভবতা

 রূপ, রস, মাধুর্য কিছুই দেখা যায় না।

 

আলোর কন্ঠ খোল অমিতাভ। কণ্ঠ খোল এক  অখন্ড চেতনার

 বিস্তীর্ণ হোক মনের সংকীর্ণ দিগন্ত।বর্ধিত হোক জিজ্ঞাসার শ্যামল বৃক্ষ

গাছের ছায়ায় তৃপ্ত হোক চিন্তার পর্যটক। আলোকিত হৃদয় হোক 

নারীর প্রতি প্রেম, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা

 শিশুদের প্রতি তৎকালীন দায়িত্ব

 চিন্তাশীল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি কমরেডের হাত

 

 শান্তি? শান্তি কোথায়?শান্তির গান গাওয়া পাখিটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে

 পড়ে আছে নীল অরণ্যে

 অহিংসা?অহিংসা কোথায়?অহিংসা রাজঘাটের নির্জনতায় শুয়ে আছে একা একা

 গণতন্ত্র ? গণতন্ত্রও  নেই ।নিরাপত্তাহীন গণতন্ত্র এখন আতঙ্কিত

 আজ খোঁজার অপরাধে মুখগুলি সন্ত্রস্ত, হাতগুলি রক্তাক্ত 

 

আলোর কন্ঠ খোল অমিতাভ।কন্ঠ খোল এক পিঙ্গল প্রত্যয়ের 

যে প্রত্যয়ে ফিরে পাব বর্ষার প্রাচুর্য ভরা প্রেম, বসন্তের সবুজ নিমন্ত্রণ 

এভাবেই ফিরিয়ে আনব পথভ্রষ্ট আজকের মানুষকে।

গড়ে তুলব নিষ্পেষিত মানুষের মহান ঐক্য

 

 যে ঐক্য হবে ……অন্ধকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ

 সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দুর্দম প্রতিরোধ 

আর অনৈক্যের বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম।


খাদ্যের অভাবে  মৃত শিশুগুলি

খাদ্যের অভাবে মৃত শিশুগুলি রাতের অন্ধকারে হাসে

 ওদের হাসির আলোড়নে কেঁপে যায় রাতের গম্বুজ

 

সারারাত পুলিশ

তৃষ্ণার্ত হয়ে খুঁজে বেড়ায় রাতের অপরাধীকে

 

টেলেক্সে আসে খবর 

নিভিয়ে সমস্ত আলোক স্তম্ভ ছেড়ে দাও শহরকে রাতের নদীতে

 

সমগ্র এলাকা জুড়ে ভয় 

একটা শীতল সরীসৃপের মতো বেড়ায় রাতের উলঙ্গ নারীর বুকে

 

গলিত শিশুগুলি চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে

নামজাদা দৈনিক খবরের খবর

ওদের হাসির গন্ধে বেরিয়ে আসতে চায় পেটের নাড়িভুঁরি গুলি

 

দেখে হিম হয়ে যায় মুখ 

ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে দ্বাদশীর কোমল জোৎস্না 

 

শুকনো গাছের ডালে বসে প্যাঁচাগুলি জিজ্ঞেস করে

কি নাম তোমাদের কি নাম

 

নিচের কবর থেকে খিলখিল করে জবাব আসে

ইথিওপিয়া

 

তৃতীয় বিশ্ব 

 

চুপ আদালত চলছে

 

(আমি এই পবিত্র ধর্মের নামে শপথ করে বলছি আমি যা বলব সত্যি বলব  সবকিছু সত্যি বলব, সত্য ছাড়া অন্য কিছুই বলব না…)

 

 চুপ আদালত চলছে

মহামান্য বিচারপতি, দেখতে দেখতে  এক কুড়ি  সতেরো বছরে পা

দেখুন তো একবার এই দেহের ভেতরের ছবি

এক কুড়ি ষোলো বছরের শেষে এক কুড়ি ষোলোটা চাবুকের দাগ। আর অপরাধ??

 চুপ আদালত চলছে।

 

হুজুর, এবার আমার কথাও শুনুন-ভারতবর্ষ নামের এই নারী

কেবল এক রাতের সুখের জন্য বারবার খুলেছে শাড়ি। ইউর অনার স্বীকার করছি আমি

নিজস্ব ধর্ম ছেড়ে পাপের পথে পা রেখেছি।      কিন্তু কেন??

 

চুপ আদালত চলছে

 

মহামান্য বিচারপতি, মেনে নিয়েছি শান্তির প্লাবন নেমেছে দেশে

 তাই যুবক-যুবতিরা হাসছে মনের সুখে

 ঠিকই প্রতিটি সকালের শেষে সন্ধ্যাবেলা খুঁড়ছে প্রতিদিন কবর। আচ্ছা কীসের খবর??

 

চুপ আদালত চলছে

 

হুজুর, একবার আমার কথাও…

আরও পড়ুন...