সি নে দু নি য়া
ভা স্ক র   ম জু ম দা র
'জগ্গি': ভারতীয় সিনেমা-শিল্পের একটি যুগান্তকারী কাজ
শীতকাল এসে পড়েছে। রবিশস্যের রোপণ শুরু হবার আগে অতএব ফসল পোড়ানোর কাজ। ভোরবেলা জগ্গি নিজের জমির খড়বিচালিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এমনিতেই ঘন কুয়াশা মাখামাখি সকাল। খড়পোড়ানো ধোঁয়ায় চারিদিক আরও ঢেকে যাচ্ছে। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। জগ্গি কেবল ঠাহর করতে পারে কেউ একজন সাইকেল চালিয়ে দূরে একটা জমিতে এল। খানিকক্ষণ একটা মরাগাছের সামনে দাঁড়াল। তারপর কোথা থেকে একটা দড়ি জোগাড় করে আনল সে। জগ্গি দেখছে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই গাছে উঠে দড়ি লাগিয়ে নিজের গলায় দড়ির প্রান্ত বেঁধে ঝুলে পড়ল সেই লোকটা। আরে! কী হল! কী হল! জগ্গি ছুটল সেদিকে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। পালি নামের পরিচিত লোকটা আত্মহত্যা করে ফেলল জগ্গির চোখের সামনে প্রায়। জগ্গি কিছুই করতে পারল না। সে পালির ঝোলা পা দুটো ওপরে তুলতে চাইছে। সে গাছে উঠে দড়িটা ছিঁড়তে চাইছে। সে নিজের ভাষায় চিৎকার করছে, ‘কোই হ্যা গা? কোই হ্যা গা?’ (কেউ কোথাও আছো?) কিন্তু কেউ তো নেই। সব শুনশান সেই ভোরে। জগ্গি একটা চিঠি পাচ্ছে পালির জামার পকেট থেকে। পালি মরল কেন? পালির লোকসান হয়ে গেছে। সে ফসলের দাম পায়নি। পালি আত্মহত্যা করল তাই। কিন্তু তার চেয়েও দুঃখের ব্যাপার, পালির আত্মহননের সব চেয়ে জোরালো কারণ- তার বউ অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করছে!
হায় রে অননুগত্য! পুরুষের তবে নিজের পৌরুষ উপলব্ধি করতে স্বামীভক্ত স্ত্রী চাই? আর কী চাই? আর চাই একটি উত্থিত লিঙ্গ! কেন? কারণ পুরুষতন্ত্র পুরুষকেই তো বুঝিয়েছে যে উত্থিত লিঙ্গ ছাড়া পৌরুষের অভিজ্ঞান বলে আর কিছু নেই। জগ্গিই যেমন। গ্রামীণ পাঞ্জাবের কোনও এক নির্বিবাদী তরুণ সে। মা-বাবার বাধ্য। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। বাড়ির ক্ষেতে কাজ করে, গরু-মহিষকে খাবার দেয়, সকাল-বিকাল গবাদি পশুগুলির দুধ দোয়ায়, রুটি সব্জি খায় আর পুলিশে কাজ করা পিতা তার, প্রতি রাতে যখন বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরে এই জগ্গিই বাবার জুতো খুলিয়ে দেয়, উর্দি ছাড়িয়ে দেয় আর পাঁজাকোলা করে ঠিকঠাক খাটিয়ায় শুইয়ে দেয় বাবাকে। জগ্গির মত লক্ষ্মীছেলে আর হয় না। ছেলেদের স্কুলে ওই তরুণ বয়সে টিফিনের সময় জগ্গির বন্ধুবান্ধবরা বয়সের দোষের সব কথা বলে। নারী শরীরের কথা, নিজেদের শরীর আবিষ্কারের কথা আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হস্তমৈথুনের। শিশু যখন তরুণ হয়ে ওঠে তখন সে তা শরীর দিয়েই বুঝতে পারে। ‘লওড়া খাড়া হো রাহা হ্যায় কী নহি!’ বন্ধুরা জগ্গির অনেক আগেই নিজেদের শরীর, শরীরের সুখের জায়গাগুলো খুঁজে পেয়ে গেছে। জগ্গি অতএব সেদিকে পা বাড়ায়।
পাঞ্জাব-হরিয়ানার সিনেমা আমরা এত বছর যা জানতাম সেই উচ্চস্বরের, নাচে-গানে ভরা, সেই ঢিশুম-ঢিশুম, সেই মাত্রাছাড়া প্রেমকাহিনীর চড়ারঙ আর সেই এক বিষাক্ত পৌরুষের উদযাপন- আনমোল সিদ্ধু’র ‘জগ্গি’ (নির্মাণ: ২০২১) আমাদের সেসব পুরনো ধারণা ভেঙে দেয়। এ যেন পাঞ্জাবী সিনেমার এক নবতরঙ্গ। জগ্গি ক্রমাগত তার লিঙ্গ ধরে টানাটানি করে যাচ্ছে- বাথরুমে, ঘরে, গোয়ালে, কখনও কন্ডোম-প্যাকেটের গায়ে, ম্যাগাজিনের পাতায় নারী শরীর দেখে, কখনও ভিডিও চালিয়ে কিন্তু কিছুতেই শক্ত হতে পারছে না সে- ভারতবর্ষের সিনেমা-শিল্পের ইতিহাসে কারুণ্যের এমন দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর বোধ হয় আগে এমনভাবে দেখা যায়নি। তবে ট্রাজেডির এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু। জগ্গি তার এই ধ্বজভঙ্গের কথা যখন ক্লাসের এক বন্ধুকে বলে ফেলছে তখন আরও নতুন বিপদ ঘনিয়ে আসছে। বিপদ কেন? বিপদ এইজন্য যে পরিচালক আমাদের দেখাচ্ছে গ্রামীণ পাঞ্জাবে তরুণদের মধ্যেও সেই বিষাক্ত পৌরুষ আনাগোনা করে যেখানে ধ্বজভঙ্গ পুরুষ মানে পুরুষই নয়। আর পুরুষ নয় মানে সে সমকামী আর সমকামী মানেই তার পায়ুর অধিকার সকলের! জগ্গিরও এমন হয়। সহপাঠী বন্ধু, বন্ধুবর্গ, উঁচুক্লাসের দাদারা, স্কুলের দারোয়ান- সকলেই জগ্গির পায়ু গমন করতে চায়। এখানে ‘না’ বলার জায়গা নেই। না হলে সে যে সমকামী তা গোটা গ্রাম জানিয়ে দেওয়া হবে! দিনের পর দিন স্কুলের বাথরুমে, ব্রিজের নিচে, ক্ষেতখামারে, এবাড়ি-ওবাড়ির ছাদে, স্নানের চৌবাচ্চায় ক্রমাগত জগ্গির ধর্ষণ চলে! আর প্রতি ধর্ষণের পর জগ্গির যে ওই গোঙানিভরা কান্না তা দর্শকের মন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে যায়। বলা বাহুল্য, জগ্গি এর পর স্কুলছুট হতে বাধ্য হয়। পড়াশোনা ছেড়ে সে ক্ষেতের কাজে লেগে পড়ে।
জগ্গি পাল্টে যায়। বড় বড় চুলের হাসিমুখ তরুণটি ঝিরি করে চুল কেটে ফেলে। গোঁফ-দাড়ি বাড়ায় আর তার উজ্জ্বল, সরল মুখটায় নেমে আসে যাবতীয় অন্ধকার। সে কথা বলতে, হাসতে ভুলে যায়। সে যে অতীত ছেড়ে পালাতে চায়, যা ভুলে ক্ষেত-খামারের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়, সেই অতীত তাকে ছাড়ে না। ওই উঁচুক্লাসের দাদা দু’টো- সরবা (হরমনদীপ সিং) আর শিন্ডা (গৌরব কুমার)- জগ্গির পিছু নেয়। দিনের পর দিন তার জমিতে হাজির হয় আর জবরদস্তি করে। দর্শকের মনে হতে পারে জগ্গি কী তবে ধর্ষণ উপভোগ করে? বেশ জোরালো বাঁধা তবে দেয় না কেন সে? পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবনা থেকে অনেক সময় এমন ধারণা প্রথিত করা হয় যে ধর্ষিত বোধ হয় ধর্ষণ উপভোগ করে। কিন্তু এ-ধারণা সর্বৈব মিথ্যা। কেউ ততটাও বাঁধা দিচ্ছে না মানে সে পারছে না। এখানেই তার অসহায়তা। জগ্গি- যার ধ্বজভঙ্গ, যে এসব ব্যাপার পরিবারের কারও সঙ্গে আলোচনা করতে পারে না, বন্ধুদের নিজের তথাকথিত ‘অস্বাভাবিকতা’র কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে যার জীবনে হেনস্থা-হিংসার অভিশাপ নেমে এসেছে, তার প্রতিহত করবার আর কী শক্তি বেঁচে থাকতে পারে? এমনকি জগ্গির ক্ষেতে কাজ করে জনমজুর যে রাজু (অঙ্কুশ শুক্লা) সেও তার ওপর চড়াও হতে চায়! জগ্গির জীবন জুড়ে দুঃখের হেমন্তকাল চলতে থাকে। কিন্তু সেই জীবনে কী বসন্ত নেই? আসে না? আসে। পরিচালক সেদিকে আমাদের নিয়ে যান যখন জগ্গির বিয়ের সম্বন্ধ হয় রমণ (জসকিরত বাজওয়া) বলে মেয়েটির সঙ্গে।
‘জগ্গি’ সিনেমার সব থেকে বড় সম্পদ তার ক্যামেরা। এমনিতেই আনমোল সিদ্ধু’র ছবির কলাকুশলীর দল বেশ ছোট। এখানে মূল অভিনেতা ফোলির কাজ করেছেন, পরিচালক সম্পাদনার কাজ করেছেন আবার চিত্রপরিচালক (পরদীপ তানিয়া) প্রযোজনা করেছেন কিছু অংশ। একজন অভিনেতা কাস্টিং করেছেন, সহকারী পরিচালকের কাজ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। প্রকৃত ‘ইন্ডি’ ফিল্ম বলতে যা বোঝায় ‘জগ্গি’ তাই-ই। কিন্তু গ্রামীণ পাঞ্জাবের এত অপূর্ব ছবি সারা বছরের বিভিন্ন সময়ের যে তা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। পরিচালনা, সম্পাদনা কোথাও এতটুকু বাড়তি নয়। রমণের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হলে জগ্গি প্রথমটায় রাজি থাকে না। কিন্তু রমণের সরলতা, নিখুঁত বিশ্বাস কোথাও জগ্গিকে নাড়া দিয়ে যায়। জগ্গি জানে তার লিঙ্গ উত্থিত হয় না। কিন্তু ওই যে মেলায় দেখা করা, সেই যে চা-সিঙাড়া খাওয়া কিংবা নাগরদোলায় চড়বার সময় হাতে-হাত- জগ্গিকে এগুলো অচেনা আনন্দ দেয়। সে লিঙ্গোত্থানের জন্য আয়ুর্বেদিক জড়িবুটি খায়। কিন্তু আত্মবিশ্বাস যে তার ফিরে আসতে চায় না। সব থেকে বড় কথা রমণকে কী তার পরিবার শান্তি দেবে? রমণ যদি জগ্গির অতীত জেনে যায়? তবে এখানে পরিচালক কাহিনীর একটি অপূর্ব বাঁক তৈরি করেছেন। রমণও নিজের পরিবারে যৌন হেনস্থার শিকার কিন্তু সে-কথা সে জগ্গিকে অনায়াসে বলতে পারে। কিন্তু জগ্গি যে হেনস্থা-হিংসা এমনকি প্রাত্যহিক ধর্ষণের শিকার সে-সব তো সে কখনও রমণকে বলতে পারবে না। সে যে পুরুষ! পুরুষের এমন কথা বলতে নেই। চেপে রাখতে হয়। জগ্গি কখনওই রমণকে বলতে পারবে না যে প্রতি রাতে সৎনাম চাচা (আক্স মেহরাজ) তার মায়ের (হরমিত জস্সি) সঙ্গে শারীরিক সম্ভোগ করতে আসে- খাটিয়ার তলায় একাধিক ব্যবহৃত কন্ডোম পাওয়া যায়। কিংবা প্রতি রাতে জগ্গির মা প্রেমিককে আহ্বান করতে নিজের স্বামী-পুত্রের খাবারেই ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়! অথবা সরবা আর শিন্ডা বলে রেখেছে যেহেতু জগ্গি বিয়ের পর রমণকে শারিরীকভাবে খুশি করতে পারবে না তাই রমণও হয়তো জগ্গির মায়ের মতই সরবা আর শিন্ডেকে ডাকবে। আর সৎনাম চাচাই যে রমণকে উপভোগ করবে না কে বলতে পারে? জগ্গি ক্রমশ দুঃস্বপ্নে তলিয়ে যেতে থাকে। সেখান থেকে কী সে বেরোতে পারে? তার জীবনে বসন্ত ফেরে কী আর?
‘জগ্গি’ ভারতীয় সিনেমা-শিল্পের একটি যুগান্তকারী কাজ। গ্রামীণ ভারতও যে সামাজিক কত ভয়াবহতা, মানবিক সম্পর্কের কত জটিলতা বহন করতে পারে সেসব ‘জগ্গি’ না দেখলে হয়তো আমাদের অনেকটাই অজানা থেকে যেত। জগ্গি চরিত্রে রমণীশ চৌধুরীর অভিনয় ভালোরকম প্রশংসার দাবী রাখে।