স্বা স্থ্য

ডঃ সংহিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

sanhita

জ্বর অথবা ফ্লু : কিছু জরুরি তথ্য

এই শীতের পড়ন্ত বেলায়, অকারণ মন খারাপের আবহে লিখতে বসে মাথা টিপটিপ করছিল। ক্রমশঃ সেই উপসর্গ! কয়েকটি হাঁচি আর গলা ব্যাথার সমভিব্যহারে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সমস্ত শরীরে অসহ্য যন্ত্রনার সঙ্গে জ্বরের আগমনের সূচনা করল। চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ কথা হচ্ছিল আপাত নিরীহ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ঋতুকালীন সংক্রমণ প্রসঙ্গে।

জানলে আশ্চর্য লাগবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে পৃথিবীতে বছরে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বছরে এক বিলিয়ান, যার মধ্যে ৩ থেকে ৫ মিলিয়ান সংক্রমণ জনিত গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হন।

বছরে দুই থেকে সাত লক্ষ্য মৃত্যু হয় এই রোগে! পরিসংখ্যান চমকে দিলেও এই মৃত্যুর বেশীর ভাগ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের চেয়ে কম বয়স্ক অপুষ্ট শিশু, বৃদ্ধ, প্রসূতি, অথবা এইচ আইভি এইডস রোগী, ক্যানসার কেমোথেরাপি চলাকালীন দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষের মধ্যে।

একনজরে ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক—

মাথা ও শরীরে যন্ত্রনা, হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়া, গলা ব্যাথা, জ্বর এইসব এই রোগের সাধারণ উপসর্গ। এই রোগ ভয়ংকর সংক্রামক।

ভাইরাস ঘটিত এই রোগের কতগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট আছে, সে বিষয়ে কিছু বলার আগে ভাইরাসটির পরিচয় দিই।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস চার রকমের— এ, বি, সি এবং ডি নামে এদের চিহ্নিত করা হয়। তার মধ্যে এ এবং বি এই ধরনের ফ্লু জাতীয় রোগ সংক্রমণের জন্য এমনকি মহামারি সৃষ্টির জন্য কুখ্যাত ।

এর সংক্রমণ হাঁচি-কাশি ও নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে দ্রুত ঘটে তাই হাঁচি বা কাশির সময় প্রত্যেকবার রোগীর নাক মুখ ঢেকে নেওয়া উচিত। রোগীর কাছাকাছি না যাওয়াই ভাল। রোগটি সংক্রমণের প্রথম চার দিনের মধ্যেই তার লক্ষণ প্রকাশ করে।

মিউটেশানের ফলে এ টাইপের মধ্যে H1N1 (এইচ-ওয়ান এন-ওয়ান) নামে যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিগত কয়েক বছরে ঘটেছে সেটি বর্তমান ফ্লু জাতীয় জ্বরের জন্য দায়ী। ট্রপিকাল দেশগুলিতে সারা বছর এই রোগের প্রকোপ ঘটতে দেখা যায় ।

ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি বর্তমানে সারস কোভি টু, প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা, রায়নো ভাইরাস ইত্যাদিও একই রকম লক্ষণযুক্ত রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী, এবং আমাদের পরিবেশে উপস্থিত আছে।

চিকিৎসার বিষয়ে এই রোগে উপসর্গের জন্য ওষুধ দেওয়া ছাড়া চিকিৎসকের তেমন কিছু করনীয় নেই। অর্থাৎ জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ছয় বা আট ঘন্টা বাদে বাদে খাবার খেয়ে খাওয়া, গরম জলে মাথা ঢেকে ভাপ নেওয়া, ভিটামিন সি যুক্ত খাবার অর্থাৎ লেবু জাতীয় ফল, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদি খাওয়া, প্রয়োজনে নাকে স্যালাইন ড্রপ ব্যবহার করা, নুন দেওয়া গরম জলে গার্গল করা, বাড়ির বাইরে না গিয়ে পূর্ণ বিশ্রাম এবং প্রচুর জল পান করা জরুরি। এই রোগে এন্টিবায়োটিকের কোন ভূমিকা নেই। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বর্তমানে ডেঙ্গু জাতীয় জ্বরের প্রাদুর্ভাব যথেষ্ট থাকার কারণে, প্যারাসিটামলের সঙ্গে অন্য কোন ওষুধ মেশানো কম্বিনেশান ড্রাগ না খাওয়াই উচিত। রোগটি ফ্লু না হয়ে ডেঙ্গু হলে এতে ভয়ংকর ক্ষতি হতে পারে। ষাট বছরের বা তার বেশী বয়স্ক এবং পাঁচের নিচে শিশুদের, প্রসূতি নারীর, বা অন্যান্য অসুখের দরুণ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা মানুষের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তিও করা যেতে পারে, কারণ এই আপাত নিরীহ রোগে এদের নিউমোনিয়া জাতীয় ফুসফুসের সংক্রমণে জটিলতার সৃষ্টি হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে ।

ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন বা টিকা ইনজেকশান এবং নাকের স্প্রে আকারে পাওয়া যায়। এই টিকার প্রতিরোধের মেয়াদ এক বছর কারণ ভাইরাস প্রত্যেক বছর মিউটেট করে বা ভোল পাল্টায়। পঞ্চাশোর্ধ মানুষের এই টিকা নিলে প্রতি বছর এই রোগের সম্ভাবনা থাকে না। শিশুদেরও টিকা দেওয়া হয়। এই রোগ মানুষের বারবার হতে পারে।

সাধারণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রোগির সান্নিধ্যে না যাওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়া, ব্যবহৃত নাক বা মুখ মোছার টিসু যেখানে সেখানে না ফেলা, কাশি ও হাঁচির সময় রুমাল ব্যবহার করা এগুলি পালনীয়। চোখ নাক বা মুখে বারবার হাত না দেওয়া এগুলি অভ্যেস করা বাঞ্ছনীয়।

রোগ হলে, নিরাময় হতে এক সপ্তাহ লাগে। এর পর দুর্বলতা কাটতে আরও সপ্তাহ খানেক লাগতে পারে।

[TheChamp-FB-Comments style="background-color:#fff;"]