প্র ব ন্ধ

কৌশিক ব্যানার্জী

kaushik

ফিরে দেখা: রবীন্দ্রসংগীতের ‘রবিনহুড’ বা ‘পিকাসো’ পীযুষকান্তি সরকার

নব্বই-এর দশকের প্রথমার্ধে এক বর্ষণস্নাত সকালে বারাকপুরের ‘সুকান্ত সদন’ পেক্ষাগৃহে বাল্যবন্ধু স্নেহেন্দু ঘোষের সঙ্গে হাজির হলাম রবীন্দ্রসংগীতের এক অনুষ্ঠান দেখার উদ্দেশ্যে। সেই সময়ে এইজাতীয় প্রচুর অনুষ্ঠানে প্রায় সারা মাসই জমজমাট থাকত বারাকপুরের ‘সুকান্ত সদন’। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অনুষ্ঠান দেখতে টিকিট বা আমন্ত্রণপত্র ইতিমধ্যে যারা সংগ্রহ করেছেন তারা বাদেও ভিড় করে আছেন বহু উৎসাহী মানুষ। উদ্দেশ্য কোনোভাবে যদি মিলে যায় একটি টিকিট। যাকে বলে পেক্ষাগৃহ চত্ত্বর একেবারে লোকেলোকারণ্য। ভিড় সামলাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে নিরাপত্তা কর্মীরা। আমাদের আমন্ত্রণপত্র আগে সংগ্রহ করে রেখেছিল আমার বন্ধুটি। না থাকতে পেরে স্নেহেন্দুকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম, ‘কার অনুষ্ঠান দেখাতে আমাকে নিয়ে এসেছিস রে?’ স্নেহেন্দু হেঁয়ালি করে বলল, ‘পিকাসো’। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘পিকাসো? উনি তো একজন চিত্রশিল্পী!’ স্নেহেন্দু সহাস্যে বলল, ‘ইনিও শিল্পী। তবে ইনি শব্দের মাধ্যমে বাতাসে চিত্রকল্প তৈরি করেন।’ আমার অবাক হওয়ার বোধহয় আরও বাকি ছিল। ততক্ষণে আমি ও আমার বন্ধুটি দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে পেক্ষাগৃহের ভেতরে। পর্দা উঠতে দেখলাম ঋষিতুল্য এক দীর্ঘদেহী পুরুষ দাঁড়িয়ে গাইতে শুরু করলেন,

কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও, শেষে দাও মুছে।

ও হে চঞ্চল, বেলা না যেতে খেলা কেন তব যায় ঘুচে।

প্রথম কথা সেই সময়ে প্রচুর রবীন্দ্রসংগীতের আসরে শ্রোতা হিসাবে উপস্থিত থাকলেও গায়ককে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন করতে এই প্রথমবার দেখলাম আর আরও চমকিত হলাম শিল্পীর যন্ত্রানুসঙ্গ দেখে। ওনার সঙ্গে গিটারে সঙ্গত করছিলেন ওনার পুত্র পুস্পল সরকার আর তবলায় বিপ্লব মন্ডল। পরবর্তী প্রায় আড়াই ঘণ্টা সমস্ত দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন তাঁর অসামান্য কণ্ঠ ও অনবদ্য বাচনভঙ্গি দিয়ে। প্রত্যেকটি গানের শুরুতে গান প্রসঙ্গে কথা বলে, আবৃত্তি করে গানের অর্থ শ্রোতাদের বুঝিয়ে দিতে লাগলেন তিনি। সেদিন সত্যিকারের এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালার মতো রবিঠাকুরের গানের ডালি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের ‘রবিনহুড’ বা ‘পিকাসো’ পীযুষকান্তি সরকার। সেই শুরু। সেদিনের সেই ঘোর যেন আজ প্রায় তিরিশ বছর পরেও কাটল না! তাঁর প্রথা ভাঙা গায়কী, গানের আগে গানের মাঝে কথায় কথায় শ্রোতাদের সঙ্গে রবিঠাকুরের গানের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন, যন্ত্রানুসঙ্গের ব্যবহার— এক কথায় রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে এক নবযুগের জন্ম দেয়। ফল স্বরূপ যা হওয়ার ছিল তাই হল— তাঁকে নিয়ে শুরু একের পর এক বিতর্ক।

      পীযুষকান্তি সরকারের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৩১ শে অক্টোবর মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। মুর্শিদাবাদে জন্ম হলেও পীযুষবাবু বেড়ে ওঠা হাওড়া জেলার ফুলেশ্বরে এক সম্ভ্রান্ত যৌথ পরিবারে। পিতা হিমাংশু কুমার সরকার ছিলেন ব্যাংকশাল কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবি। কাকা আচার্য যদুনাথ সরকার ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক। মা স্মৃতিলেখাদেবী সাধারণ গৃহবধূ হলেও রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি ছিলেন গভীর অনুরক্তা। পিতৃদেব হিমাংশুবাবুও আইন ব্যবসার পাশাপাশি ছিলেন ইংরাজী সাহিত্য এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের একজন সমঝদার ব্যক্তি। সেইসঙ্গে ফুলেশ্বরে যেখানে পীযুষবাবু বেড়ে ওঠেন তার সন্নিকটেই ছিল কানোরিয়া জুট মিল, গ্লাডলো জুট মিল এবং হনুমান কটন মিল। তৎকালীন সময়ে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ম্যানেজাররা ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। ফলে ছোটবেলায় এই সব প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ম্যানেজারদের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে মেলা-মেশা করার সুবাদে পাশ্চাত্য সংগীতের বিভিন্ন দিগন্ত খুব সহজেই উন্মোচিত হয়ে যায় পীযুষবাবুর সামনে। পক্ষান্তরে, সেই সময় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় মার্গ ও ধ্রুপদী সংগীতের আসর বসত। একটু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল ওই সব আসরে শুরু হল পীযূষবাবুর যাতায়াত। এই সব আসরে ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান, ওস্তাদ আমির খান, পন্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী প্রমুখদের গান শুনে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের সাগরে অবগাহনের সুযোগ হাতছাড়া করেননি পীযুষবাবু। এই সময়েই সুযোগ ঘটে সংগীত গুরু নিদানবন্ধু বন্দোপাধ্যায়ের কাছে দীর্ঘদিন ধ্রুপদী সংগীত শেখার। বিশিস্ট টপ্পা ও ধ্রুপদী অঙ্গের পথিকৃৎ কালিপদ পাঠকের সঙ্গও তাকে ঋদ্ধ করেছে বাল্যকালেই। মেধাবী পীযুষবাবু উলুবেড়িয়া কলেজে ইন্টার মিডিয়েটে আর্টস পড়ার পরে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইংরাজী ভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৫৮ সালে। এই বিদ্যাসাগর কলেজে থাকাকালীন ১৯৫৬ সালে ‘All India Inter University’ যুব-উৎসবে পীযুষবাবু অংশগ্রহণ করেন এবং রবীন্দ্র সংগীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিদ্যাসাগর কলেজে ছাত্রাবস্থা শেষ হলে তিনি উলুবেড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাহানগর উচ্চ বিদ্যালয়ে  দীর্ঘদিন ইংরাজী বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।

     প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের প্রগাঢ় জ্ঞান এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার ফলে যে গভীরতা পীযুষবাবুর মধ্যে তৈরি হয় তার মাধ্যমেই তিনি বুঝেছিলেন যে, রবীন্দ্রসংগীত হল এমন এক বিরলতম সংগীত যার মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের বিভিন্ন ধারা এসে মিশেছে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে। আর তাই দেবব্রত বিশ্বাসের প্রয়াণের পরে যখন তরুণ প্রজন্ম রবীন্দ্রসংগীতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল ঠিক তখনই পীযুষকান্তি সরকারের রবীন্দ্রসংগীতের ‘রবিনহুড’ রূপে উত্থান। আশির দশকের প্রথমার্ধে এক অভিনব উপস্থাপনা নিয়ে হাজির হন পীযুষকান্তি সরকার। যেমন ছিল তার মন্ত্রসজ্জা, তেমনই ছিল যন্ত্রানুসঙ্গ আর মাঝে ‘মৌনী তাপস’ পীযুষবাবু। অনেক বিশুদ্ধবাদী নাক সিটকে ছিলেন সেই সময়। কিন্তু পীযুষবাবুকে আটকানো যায়নি। বহু স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন যে অনেকটা দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে মিল আছে গায়কীর। কিন্তু পরবর্তীকালে পীযুষবাবু এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ‘একথা সত্য যে গলার texture-এ  দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে অসম্ভব মিল থাকলেও সেটা এসেছে অচেতন ভাবে। কিন্তু সচেতন ভাবে আমি ওনার থেকে শ্বাস গ্রহণ এবং শ্বাস ত্যাগের প্রক্রিয়া ও উচ্চারণশৈলী গ্রহণ করেছি।’ আর ইংরাজী সাহিত্যের ছাত্র হওয়ায় শব্দের মধ্যে কোথায় জোড় দিতে হবে অর্থাৎ Scansion প্রক্রিয়া ছিল পীযুষবাবুর সহজাত।

        অনেকেই সেই সময় বলেছিলেন যে পীযুষবাবু স্বরলিপি মানেন না। কিন্তু এমন একটিও উদাহরণ পাওয়া যাবে না যেখানে তিনি স্বরলিপি মানেননি। বরং এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বরলিপি মেনেও শুধুমাত্র যন্ত্রানুসঙ্গের বৈচিত্রে, উপস্থাপনা করার অভিনবত্বে রবীন্দ্রসংগীতের এক অন্য দিগন্ত পীযুষবাবু উন্মোচন করে দিয়ে যান। তাঁর একটি সেট টিম ছিল যেখানে গিটার বাজাতেন তার পুত্র পুস্পল সরকার যিনি নিজে পাশ্চাত্য গিটারে ট্রিনিটি কলেজের প্রাক্তনী এবং পিয়ানো বাজাতেন শংকর চ্যাটার্জি যিনি আবার পিয়ানোতে রয়্যাল কলেজের কৃতি, আর তবলাতে সঙ্গত করতেন ডঃ সোমেন ঘোষ অথবা বিশ্বনাথ দে। ফলে পীযুষকান্তি সরকারের LIVE অনুষ্ঠান মানেই ছিল এক মার-মার কাট-কাট ব্যাপার। প্রত্যেক গানের শুরুতে গানটিকে তিনি সুন্দর করে আবৃত্তি করে গানটির মানে ও ভাব দর্শক-শ্রোতাদের বুঝিয়ে দিতেন। তারপর গানটি কোন রাগাশ্রিত তার উপরে আলাপ করতেন তারপর মূল গানে প্রবেশ করতেন। আর সে যে কি স্বর্গীয় অনুভূতি তা যারা পীযুষবাবুর LIVE অনুষ্ঠান দেখেননি তাদের বোঝানো যাবে না। আর অনুষ্ঠান শেষে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটা ‘আহা কি দেখিলাম! জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিবো না।’ আসলে পীযুষবাবুর মূল প্রয়াস ছিল রবীন্দ্রসংগীতকে শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবর্গের মধ্যে Esoteric বা গুপ্তভাবে না রেখে Mass বা সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আর তাই শব্দের মাধ্যমে দৃশ্যকল্প রচনা করতে তিনি পিছপা হননি কখনও। একটি গানের উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোধগম্য হবে—

এসেছিলে তবু আসো নাই জানায়ে গেলে

সমুখের পথ দিয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে।।

তোমার সে উদাসীনতা সত্য কিনা জানি না সে,

চঞ্চল চরণ গেল ঘাসে ঘাসে বেদনা মেলে।।

তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল

শ্যামল বনান্ত ভূমি করে ছলো ছল।।

এই গানটিতে ‘বিন্দু বিন্দু ঝরে জল’ স্বরক্ষেপনের জাদুকরী স্পর্শে পীযুষবাবু এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতেন যে শ্রোতারা নিজেদের চোখের সামনে বিন্দু বিন্দু জলকণা ঝরে পড়া সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম হতেন। আর এই স্বরক্ষেপন ব্যবস্থাকে নিখুঁত করার জন্য পীযুষবাবু বিদেশ থেকে নিয়ে আসেন অত্যাধুনিক হেডফোন যুক্ত ‘ল্যাপেল’ মাইক্রোফোন কারণ সেই সময় সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না।

       রবীন্দ্রসংগীতে কথা এবং সুরের মিলন বোঝাবার জন্য ১৯৮৫ সালের শেষের দিকে রবীন্দ্রসদনে এক অভিনব অনুষ্ঠান করেন পীযুষবাবু। সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক অম্লান দত্ত। এই অনুষ্ঠানে পীযুষবাবু ১২টির মতো গান গেয়েছিলেন আর অধ্যাপক অম্লান দত্ত প্রতিটি গানের কথা ধরে ধরে কথা ও সুরের নৈকট্য বুঝিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানের পরেই পীযুষবাবুকে নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘পিকাসো’। আসলে পীযুষবাবুর নামের আদ্যক্ষর নিয়ে উলুবেড়িয়া কলেজে ইন্টার মিডিয়েট আর্টস পড়ার সময় সহপাঠী চিত্রশিল্পী মুরারী বোস পীযুষবাবুর এই ‘পিকাসো’ নামকরণ করেন যা এই আট এবং নয়ের দশকে এসে অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই অনুষ্ঠানের পরে পীযুষবাবুকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর থেকে শিশির মঞ্চ, নজরুল মঞ্চ, রবীন্দ্রসদন প্রভৃতি প্রেক্ষাগৃহে এত একক অনুষ্ঠান করেছেন পীযুষবাবু যা তৎকালীন সময়ে আর কোনো শিল্পীই করেননি। নব্বই দশকের শেষের দিকে রবীন্দ্রসদনে ‘ক্যালকাটা পুলিশ সার্জেন্টস ইনস্টিটিউট’-এর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসে পীযুষবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় যে ভাবে মাতিয়ে দিয়ে যান তার কথা আজও ক্লাবের প্রবীণ সদস্যদের মুখে মুখে ফেরে। কাউকেই ফেরাতেন না পীযুষবাবু। একবার এক বাড়ির গাড়ি বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান করায় তার ভক্তদের একাংশ বিরোধিতা করলে তিনি বলেন যে রবীন্দ্রসংগীতকে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে চাইলে গায়ককে নিজস্ব অহংবোধ ঝেড়ে ফেলতে হবে। তাই শ্রোতাদের অনুরোধে একদিনে তিন-চারটে অনুষ্ঠান করতেও তিনি পিছপা হতেন না।

১৯৯৪ সালে পীযুষবাবু ১২ টি গান রেকর্ড করেন একটি সংস্থা থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর মধ্যে ৮টি গান বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড অনুমোদন করেননি। যদিও পরবর্তীকালে পীযুষবাবুর প্রায় পাঁচটি অ্যালবাম অনুমোদন পায় যার মধ্যে তাঁর ‘গানের খেয়া’ বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং অ্যালবামটি ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ শিরোপা অর্জন করে।

প্লে ব্যাক আর্টিস্ট হিসাবে পীযুষবাবু গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং সদ্য প্রয়াত রাজা মৈত্রের ‘নয়নতারা’ ছবিতে কাজ করেন। অনেকেরই অজানা যে ডঃ শুভ জোয়ারদারের কথায় ও পীযুষবাবুর নিজের সুরে একটি গণসংগীতের অ্যালবামও HMV থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

নিজে গান গাওয়ার পাশাপাশি পীযুষবাবু বরাবরই তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের তুলে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তাঁর ৪২ নং খেলাত বাবু লেনের বাড়ি ছাড়াও বহু জায়গায় পীযুষবাবু গান শেখাতেন। ‘আগুন পাখি’ নচিকেতাকে পীযুষবাবুই প্রথম বলেন যে তাঁর কণ্ঠ আন্তর্জাতিক মানের। নচিকেতা যা পরবর্তীতে বহু সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে রবীন্দ্রসংগীতের খ্যাতনামা শিল্পী শ্রাবনী সেনকেও ভীষণ স্নেহ করতেন পীযুষবাবু। একবার গলা খারাপের অছিলায় নিজে না গেয়ে নবাগতা শ্রাবনী সেনকে একটি অনুষ্ঠানে গান গাইবার সুযোগ করে দেন, যা পরবর্তীতে শ্রাবনীদেবী বহু জায়গায় স্বীকার করেছেন।

      রবীন্দ্র সংগীত ছাড়াও খেয়াল, টপ্পা, কাজরী, চৈতি, গণসংগীত প্রভৃতিও অনায়াস দক্ষতায় গাইতেন পীযুষবাবু। তরুণ প্রজন্মের আইকন প্রথাভাঙা এই শিল্পী প্রয়াত হন ২০০১ সালের ৩০শে জুলাই। কিন্তু পীযুষবাবুর গায়কী এবং স্টাইল জীবিত আছে আজও। হলফ করে এ কথা বলা যেতে পারে যে দেবব্রত বিশ্বাসের পরে এত আলোকিত (enlightened) রবীন্দ্রসংগীত আর কেউ পরিবেশন করেননি। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের দমকা বাতাসে রবীন্দ্রসংগীতকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্নসন্ধানী মানুষটির অকাল প্রয়াণের পরে দু-দশক কেটে গিয়েছে। কিন্তু ‘পিকাসো’ যেভাবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন তা যে আবহমানকালের সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

 

তথ্য সূত্র: রবীন্দ্র সংগীতের রবিনহুড— পীযূষ কান্তি সরকার

সোনার বাংলা প্রকাশন