প্র ব ন্ধ

রা জী ব &nbsp চ ক্র ব র্তী

rajib2

ভাস্কর চক্রবর্তী: ‘বেদনাবিশ্বাসী’ নাকি ‘বেদনাবিনাশী’ এক নাম!

“আমার জীবনের প্রতিটি চেষ্টাই বোধহয় মৃত্যু থেকে শুধু জীবনের দিকে যাওয়ার।”

–ভাস্কর চক্রবর্তী

কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর মৃত্যুর এই দীর্ঘ প্রায় কুড়ি বছর পর কবিকে ও তাঁর লেখনীকে আলোচনার উন্মুখতায় তুলে এনে তাকে বিশ্লেষণের চেষ্টা (ইচ্ছা) কার্যকারী রূপ পেল। হঠাৎ গতকাল রাতে এই প্রজন্মের এক তরুণ কবির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার পড়তে পড়তে, যাতে একাধিকবার ভাস্করের লেখনিকে আক্রমণ করার চেষ্টা হয়েছে। ভাস্করের সাবলীল ভাষাসারল্য, মৃত্যুুচেতনা যে ঘোরের সৃষ্টি করে, তাকে আক্রমণ করা হয়েছে বারবার। প্রসঙ্গত গ্যাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেসের ‘Monologue of Isabel Watching It Rain in Mocondo’ গল্পের থেকে একটি কথা তুলে ধরে আমরা আামাদের আলোচনার প্রবেশের চেষ্টা করব, তা এরকম “…all around us a silence stretched out, a tranquility, a misterious and deep beautitude, very much like death.” এখানে মূল হয়ে উঠে এসেছে মৃত্যু, নৈঃশব্দ।

ভাস্করের কবিতা প্রসঙ্গে আলোচনায় আমরা প্রবশ করলে শুধু মৃত্যুচেতনা খুঁজে পাব না, খুঁজে  পাব একটা সুবিমল সময়– যা কবির কাব্য সম্পদ। অর্থাৎ কবিতা মুখে করে নিয়ে আসে একটা এমন পটচিত্র, যেখানে কিছু কোলাজ থাকে সময়ের বিভিন্ন পর্বের। ক্রান্তিকালে বসে তিনি কবিতা লিখবেন তাঁর হাত থেকে যেমন বেড়িয়ে আসবে শানিত অস্ত্রের মত প্রতিবাদী স্বর, তেমনি আপাত স্হবিরতায় আসবে সুবিনীত প্রণয়- বিচ্ছেদ বেদনা। এই স্বাভাবিক। ভাস্কর ছিলেন ইতিহাসের এক উত্তরণ পর্বের কবি। তাঁর লেখনিতে সেই উত্তরণের ছবি স্পষ্ট। যদিও অনেকেই মনে করেন যে, কবিতার/কাব্যের মূল্যায়ণে সৃষ্টিকালের তথা সৃষ্টির তাৎপর্যের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা নিসপ্রয়োজন । এই ব্যাখ্যায় কাব্য বা সাহিত্যমূল্য লঘু হয়,কিন্তু আমরা কেউই বোধহয় সম্পূর্ণ বিষয়ীধর্মীতার দিকে যেতে পারি না; অর্থাৎ সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার মনন তাঁর সমাজ -রাজনীতি-নৈতিক বোধ প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে এসেই পড়ে। এক্ষেত্রে হয়ত পরমহংস হওয়াটাই কাম্য। কিন্তু এই উদ্ভাস সবক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। অন্তত কবির সার্বিক কৃতিত্ব খুঁড়ে দেখতে হলে তো এই কালপর্বের ছাপ তাতে পড়েই।

গতশতকের শেষার্ধে বিশ্ব একদিকে বিদ্ধস্ত হয়েছিল একের পর এক ঘটনার ঘনঘটায়। একদিকে চলছিল দেশের ওপর নতুন আধিপত্য,  কূটরাজনীতি, আবার তাদের পাল্টা মুক্তির লড়াই- যার ঢেউ এসে আন্দোলিত করেছে ভারতীয় বা বঙ্গিয় সমাজকে। এই তরঙ্গ কিন্তু সাহিত্যেও তার ছটা হয়ে আগুন জ্বালিয়েছে সাহিত্যকর্মকেও। পুরনো রাজনীতির খোল-নলচে বদল হচ্ছে, বদলাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভাষার প্রহরা। নতুন করে সাহিত্য তৈরি হচ্ছে। এলিটদের তক্তোপোষ থেকে গড়িয়ে নীচে পড়ে  কবিতা হাঁটছে,আছাড় খাচ্ছে আবার সাবলীল হয়ে হাঁটছে,বেড়ে উঠছে। গণনাট্য আন্দোলন তাদের কবিতায় জোটবাঁধার যে সম্মিলিত আহ্বান জানিয়েছে তা সত্যিই “কালা হাতির সাদা মাহুত” কে কতটা চিনিয়ে দিতে পেরেছিল তাতে সন্দেহ থাকলেও কবিতার ভাষায় যে নতুনত্ব যে র‍্যাডিকাল চৈতন্যের বীজ বপন করেছে তাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

এরপর জোয়ারের জলে যেন ভেসে যায় বাংলা সাহিত্য। যার একেবারে সামনের সারিতেই র‍য়েছেন কৃত্তিবাস গোষ্ঠী, এসেছে হাংরি ‘আন্দোলন’। আধুনিক থেকে পরা-আধুনিকের দিকে যাত্রা করেছে সাহিত্য। কান্না-হাসির দোলদোলানো এই পৌষ- ফাগুনের পালায় উচ্ছাস- দাপটে যখন ঢেকেগেছে বাংলা  কবিতার অঙ্গন, সেই ঝোড়ো রাস্তায়  নিভৃতে একক চেতনা শরীর থেকে “ঘটনাহীন মস্ত ঘটনাহীন তোমার জীবন” – এর এক হতাশ মধ্যেবিত্তের আয়না-মহলকে নির্মমভাবে কবিতায় তুলে আনার মধ্যেদিয়ে যাঁরা হাটার জন্য নতুন পথ নিয়েছিলেন ভাস্কর তাঁদের পুরোধা।

নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ যা উত্তাল সত্তরের একেবারে গোঁড়ায় প্রকাশ পেয়েছিল( ১৯৭১) তা হল ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,। প্রথম সাক্ষরেই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন কবি। অগোছালো নি:সঙ্গ এই একাকি মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্বকারির নিজস্ব পরিচয় তিনি দিলেন “আমাদের স্বর্গ নই, রাস্তায় কোনো মৃতদেহ দেখলেই আলোর জন্য অন্য কোথাও ছুটে যাবো- এক ভিড় অন্ধকারে, সারাদিন আজ ঘুরে বেড়িয়েছি ”… অব্যর্থ এক ক্রান্তিকাল ক্লান্তিকাল ধরা দিচ্ছে, যেমন দিচ্ছে তার কিছু করতে না পারার তীব্র হতাশা। লিখছেন “- প্রতি সন্ধ্যায় কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে- আমি চুপ করে বসে থাকি -”। কিন্তু এই হতাশাই কি কবির বৈচিত্রহীনতার সাক্ষর হতে পারে? এই একই অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল জীবনানন্দকেও। সামাজিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে তিনিও নাকি ‘বেদনাবিলাস’-এর কবিতা লিখেছেন। এর উত্তরে কবি শঙ্খ ঘোষ এক প্রবন্ধে জানান। “যা-কিছু মহৎ তা আজ শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হয়ে গেছে বলে জানালেও, সেটা কোনো অবিশ্বাসের উচ্চারণ নয়,সেও একটা প্রতিবাদের ভাষা। কবিতায় প্রতিবাদকে আমাদের বুঝতে হয় কবির বেদনাবোধের ধরণটা থেকে, তার বাইরের শব্দগুলোর কাঠামো থেকে নয়।” তবে জীবনানন্দের ভাষার সাথে ভাস্করের ভাষাক্ষেপনের তুলনা অবশ্য আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। যে রূপকথার ব্যবহার জীবনানন্দ করেছেন, তাঁর সেই আঙ্গিক ভাস্কর অবলম্বন করেন নি, করেছেন একেবারে সহজ সরল আটপৌরে, এক হাটুরে নাগরিক ভাষা। আর এই ব্যবহারই পাঠককে অবিরাম আকৃষ্ট মোহগ্রস্ত করেছে নিজের দিকে। এখানেই তিনি অনন্য।

দ্বিতীয় যে কথাটি বলা উচিত উত্তর হিসাবে তা হল বেদনাও যে বিলাসের বস্তু হয়, রমনীয় ও মোহনীয় হয় এই বোধও তো আমরা তুঙ্গমাত্রায় বাংলা সাহিত্যে (কবিতায়) যে তিনজনের লেখায় অবিরাম সার্থকরূপে পাই তার অন্যতম হিসাবে ভাস্করের নাম নির্দিধায় উচ্চারিত হতেই পারে। ভাস্করের এক সাক্ষাৎকারে পাই তাঁকে প্রভাবিত করেছেন গ্রিসের ইয়াগনিস রিটসস তাঁর ‘papermade’ কবিতায়(১৯৭১)। মাত্র তিন লাইনের এই কবিতাটি কত সরাসরি উত্তর হয়ে উঠে আসছে তার নমুনা হল—❝বমি-বমি এই ভাবটা/ অসুখ নয় কোনো। /এটা একটা উত্তর। ❞ভাস্করের নিজের কথনে উল্লিখিত এই কবিতাটি থেকেই স্পষ্ট সারা বিশ্বের বিভিন্ন কবিতায় বেদনা যে দ্যোতক হতে পারে বিরুদ্ধ চেতনার তার সফল প্রতিফলনই তাঁর যাবতীয় কবিতায় করে পড়েছে। হতাশাদীর্ণ এক ক্ষীয়মায় সমাজে লালিত কবিতায়, বিশেষত যদিতাকে ‘আত্মজৈবনিক’ বলে চিহ্নিত করাই যায়, তাতে যদি ফুল-খেলবার আলাপি নান্দনিক চকোলেটের মোড়ক আর নকল তবকে ভাববিলাসিতায় জারিত করে উপস্থাপন না করা হয়– তাকে যদি নিভৃতচারী হয়ে আজীবন আপ্তোচ্চারণ করে যেতে হয় চারিদিকে ঘটমান বিষয়ের মরমিয়া স্রোতের কথা তাহলে হয়ত তা ভাস্করের কবিতারই আকার নেয়। তিনি কখনই সস্তার রঞ্জিত অক্ষর সাজিয়ে তুলে ধান্দাবাজী করেন নি- তাঁর বিশ্বাসই তাঁর লেখায়  প্রকাশিত। ‘শয়নযান’ নামে একটি গদ্যে তিনি তাই লিখেছেন “আমার লেখালেখি, তবুও সুমন্ত, স্তব্ধতা ছাড়া আর কিছু নয়। হেরেই গেলাম হয়তো। বাহান্ন চলছে। কোনো স্বীকৃতিই জুটল না।” এই আপ্তবেদনা স্বাভাবিক, কারণ তিনি নিভৃতচারী ; স্তাবক্তায় বা গুচ্ছ গুচ্ছ লেখার মাধ্যমে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাননি খুব বেশি। আর এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতাও তিনি অবলম্বন করতেন। লিখেছেন তাই “ মহান হতে চাওয়ার একটা ধান্দা শুধু মাঝে মধ্যে আমাকে পেয়ে বসে। আমার এই গোলমেলে ইচ্ছেটাকে এবার একটু ছেঁটে দিতে হবে।” প্রসঙ্গত ভাস্করের গোটা জীবনটা বোধহয় একারণে দুটি গদ্যছাড়া সম্পূর্ণ কবিতা আশ্রিত। কারণ নির্লিপ্ততা ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন আজীবন তিনি। আর এখানেই ‘ What is Literature’ প্রবন্ধে জাঁ-পল  সার্ত্র-এর একটি কথা স্মরণে আসে, যেখানে তিনি কবিতাকে ‘ স্বয়ং সম্পূর্ণ ও ‘স্বমৃদ্ধ ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ গদ্যের মত কবিতাকে দিয়ে যা-ইচ্ছে তাই বলিয়ে নেওয়ার জায়গা নেই। কিম্বা মনে পড়ছে ইতালির বিখ্যাত কবি ইউজেনিও মনতালের গদ্যগ্রন্থ ‘ poet in our Time’ এ লিখিত তাঁর মন্তব্য।

“Poetry differs from prose because it only refers to itself ; can only be explained in its own context, on its own terms.” এই বৈশিক চেতনার ধারকই ছিলেন হয়ত বাংলা ভাষারি কবি ভাস্কর।

একাত্তরে (১৯৭১) প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সুদীর্ঘ দশ বছর পর (১৯৮১) প্রকাশ পায় ভাস্করের পরবর্তী গ্রন্থকাব্য ‘এসো, সুসংবাদ এসো।’ প্রায় ৬ বছর ধরে তিনি গেঁথে তুলেছেন এর কবিতাগুলি। এগুলি সবকটিই রচিত হয়েছে ১৯৭২ থেকে ৭৮ এর মধ্যে। তিনি ওই কালবেলাকে ছুঁয়ে  ছুঁয়ে বরাহনগর থেকে সিঁথি হয়ে গ্যালিফস্ট্রিট শ্যমবাজার বাগবাজার কলেজস্ট্রিট শিয়ালদহ বা দক্ষিণে চলে গিয়েছেন,হেঁটেছেন বি.টি. রোড ধরে। এইসবই তো তাঁর কবিতায়। আর কবিতায় ঘোরে ফেরে সমকাল রাজনীতি,মৃত্যু,কাটামুন্ডু, নিষিদ্ধ ইশতিহার। শিক্ষিত বেকার যুবকের বাউন্ডুলেপনা যা কবির দৃষ্টিতে ক্রমাগত ধরা পড়েছে। তিনি আহ্বান করেছেন কোনো সুসংবাদ, যার সত্যিই বড় অভাব। কোনো এক ইউরোপীয় কবি যেমন বলেছিলেন আমাদের চারিদিকে এত এত না পাওয়া, যার থেকে তীব্র হতাশা–কবি তাকেই তাঁর  কাব্যের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। তাই তিনি স্বপ্ন দেখেন, লেখেন নিজস্ব অক্ষর। কিন্তু এই স্বপ্ন ভাস্করকে কোনো তুরীয় স্তরে নিয়ে যায় নি, তিনি চলেছেন মানুষের তৈরি রাস্তায়, এক পাশ দিয়ে নিভৃতে। তিনি লিখেছেন–

“দিনগুলো, কেমন চাকার মতো, / অযথা আমাকে / পিষে যায়…। / বাস থেকে নেমে মনে হলো / বিদেশেই আছি। তবু / কে ওই মেয়েটি? / আমাদের / ঘরের মেয়ের মতো মনে হয়। / হয়তো মিনুর বোন হবে। এসো, / সুসংবাদ এসো- / আর কোনো ইচ্ছে নেই, শুধু ওই / মেয়েটির সঙ্গে যেন / আমাদের / তরুণ কবির বিয়ে হয়।”

আর্টের দশকেই তিন বছর অন্তর তাঁর আরও তিনটি গ্রন্থকাব্য প্রকাশ পায়। ‘আবার রাস্তায়’ (১৯৮৩), ‘দেবতার সঙ্গে’(১৯৮৬), এবং ‘আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে’(১৯৮৯)। এর মধ্যে সাতের দশকের রক্তক্ষয়ী রাজনীতির স্মৃতি তিনি আওড়েছেন দশ বছর পরে লেখা তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘আকাশ অংশত মঘলা থাকবে’-তে। দিনবদলের স্বপ্ন দেখা ছেলেদের মৃত্যু কবিকে নাড়িয়েছে বারবার– সমকালে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় কবিতার বর্ণনা তাই অনেকটাই চটকদারীত্বের মত। আজকাল যেকোনো ঘটনার ওপরই তাৎক্ষনিকতায় হয়ত কবি হিসাবে খ্যাতি আসে, সামরিক দায়মুক্তির প্রশান্তিও আসে, কিন্তু তাতে কোনো গভীরতা নেই। ভাস্করের মনন যে দ্রাঘিমা নির্মান করে তাতে বসত করত তাঁর স্হৈর্য্য, তাঁকে আমরণ সেই বসতঘর থেকে সরিয়ে দিতে পারে নি। প্রশ্ন তুলেছেন— “ভালোবাসা, রাজারহাটের তিন বেডরুমের মোলায়েম / ফ্ল্যাট নাকি কোনো? / শাদা কোনো টাটা সুমো?” এই চেতনা থেকেই  তিনি এপার বাংলার নকশাল আন্দোলন ও ওপার বাংলার ভাষা আন্দোলন ও ওপার বাংলার ভাষা আন্দোলন তথা স্বাধীনতা(বাংলাদেশ) যুদ্ধের স্মৃতিকে হয়ত দীর্ঘকাল পরও তুলে ধরেছেন কবিতায়, যা আকছাড় কোনো রাজনৈতিক কবির কবিতাতেও পরবর্তী কালে আমরা সেভাবে পাই নি। প্রসঙ্গত ইংরেজকবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর কবিতা রচনা করতেন মননে, লিপিবদ্ধ করতেন; পরবর্তী কোনো সময়ে, নিজস্ব অবসরমত। সহজাত সংকেত ভাস্কর লিখে যান নিজস্ব ‘এপিটাফ’। ‘দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে/ জন্মাতে দেখেছি”- একি শুধুই মৃত্যুচেতনা, শুধুই ‘বেদনা বিলাস’। বরং বিপরিত, মৃত্যুকে উতরে যাওয়ার এক প্রঞ্জা। মনে পড়ে যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি তুলনীয় কবিতার কথা— “এখন অনেক রাত বিছানা পেয়েছে / শান্তিনিস্তব্ধতা/ এখন ভেবো না কোনো কথা/ এখন শুনো না কোনো স্বর/ নির্জন ঘর/ রক্তাক্ত হৃদয় মুছে/ ঘুমের ভিতর/ রজনীগন্ধার মত  মুদে থাকে।”

এক কবিতার পৃথিবী নির্মান করতে চেয়েছিলেন কবি “জিরাফের ভাষায়”। ‘স্থিরচিত্র’ কবিতায় যেমন এক দূরবর্তী আলস্যঘেরা দূর্লঙ্ঘ স্বপ্নকে জীবন বৃক্ষ করেফেলে ছিলেন তাঁর  চেতনায় তাই ধরা পড়েছে -যেমন “গাছ আর/ গাছের ছায়ার নীচে দড়ির খাটিয়া/ আমাদের তৃতীয় পৃথিবী”। এই জগৎ কোনো বন্ধনে, প্রস্থেটিক ভাবনায় আবদ্ধ নেই— তাই লক্ষনীয় কোনোরকম ছেদ-চিহ্নের অব্যবহার। অর্থাৎ তীব্র এক রাজনীতি বোধ এই কবিতার প্রোটাগনিস্ট উপাদান। প্রকৃত অর্থে শান্তগাছের হাতছানিতেই তিনি খুঁজে পেলেন ‘ তৃতীয় পৃথিবী ’ কে- বিশ্বরাজনীতির কারবারি – দের মেকি বিশ্বব্যবস্থার বিন্যাসকে তিনি নস্যাৎও করে দিলেন। জটিলতা হীন, শব্দের জমকজরাহীন এক ‘আশাবরী’ তিনি গেয়ে শোনালেন তাঁর পাঠককে ; আর তাতে এমন কিছু নয় সামান্য একটু বেচেঁ থাকার জন্য যতটা প্রয়োজন তার মধ্যেই ছিল তাঁর কাব্যিক চাহিদা।যেমন আমরা দেখতে পারি তাঁর ‘বিজ্ঞাপন’ কবিতাটি। কী দিলেন তিনি এখানে—

“ছেলেটি অফিস থেকে মেয়েটি কলেজ থেকে এলো আর বিদ্যুৎ চমকালো/ সিনেমায় যেতে চায় ওরা?/ অন্তরঙ্গ হতে চায় কাফে দ্য মনিকোয়?/ – কালো মেয়েটিও আর আমাকে পাত্তাই দেয় না/ জানিয়েছে; যেখানে উনুন, ধোঁয়া, দারিদ্র সেখানে -/ যে কোনো চাকরি চাই, সাত কি আটশো মাসে- দুপুরে টিফিন”। কি মনে পড়ছে পাঠক?  আর এক মধ্যযুগের কবি রামপ্রসাদ সেন তাঁর  আরাধ্যার কাছে কি এমনই একটি সরল সাধারণ পার্থনা করেন নিই—

“চাইনা মাগো রাজা হতে/ দুবেলা দুমুঠো পাই যেন মা।” এই নুন্যতম পার্থনাই যুগে–যুগান্তরে কবিদের কালিকচেতনায়। তাঁদের মাটির কাছে নিয়ে এসেছে। সেই ধারাতেই হয়ত রামপ্রসাদ থেকে ভাস্কর বা সুব্রত চক্রবর্তীরা ভ্রমণ করেছেন। এই স্পর্শসুখ না পেলে কেনই বা কবিতার তদগত প্রাসঙ্গিকতা প্রয়োজন আর?

ভাস্কর তাঁর লেখনিতে যে অমর চিত্রকথা সৃষ্টি করে গিয়েছেন, তার বৈচিত্র বর্ণনায় আমরা দুটি কবিতার কথা উল্লেখ করতে চাই, একটি তাঁর ‘ ছোটো বোন’ নামে কবিতা, যেখানে যেন তাঁর ভাবনায় সরাসরি সেটে বসেছে এক ফ্র‍য়েডিয় মন:স্তত্ব। সেটি হল—

আমি কি পাহারা দেব

ছোটো বোন ঘুমায় যখন

 

দুপুরে, আকাশ নীল

শরীরের শান্ত কলরব

 

আমি কি ঘুমোব পাশে

ছোটো বোন ঘুমায় যখন

 

লক্ষনীয় এখানেও কোনো ছেদচিহ্ন ব্যবহৃত হয় নি কবিতার শেষে। মনোলোকের সুপ্ত বাসনা যেন প্রকাশিত হচ্ছে এই ছেদ চিহ্নের অভাবে। অন্যএকটি কবিতায় ঠিক নিজেকে উল্টে তিনি যেন পালন করতে তৎপর সমস্ত বৈধ দায়িত্ব- তিনি অনেক বেশি বিনীত। কবিতার নাম ‘ হে জীবন।’ কেমন সেটি–

 

ছুঁয়ে যাই মা-র পা দু’খানি

ছুঁয়ে যাই পিতার দু’হাত।

ছুঁয়ে যাই তোমার দু’চোখ

ছুঁয়ে যাই হারমোনিয়াম

ছুঁয়ে যাই ব্যর্থ এ জীবন

হে জীবন তোমাকে প্রণাম।

 

হতাশায় মৃত্যুচেতনায় আক্রান্ত নন কবি– এই দুটি কবিতায় তার বীক্ষণ তিনি রেখেছেন।আবার পারিপার্শ্বিক অনিশ্চয়তায় নিজ কন্যা সোনাঝুরির প্রতি স্বাভাবিক মমত্ববোধেই তিনি লিখলেন ‘সোনাঝুরির জন্য আরও একটা’ মনখারাপের কবিতা–

 

আমি দূর থেকে দেখছিলাম

ছেঁড়া একটা জামা পরে মেয়েটি বাজার করছে।

 

মা হয়তো পাঠিয়েছে বাজারে। টাকা পয়সা কম

মনে হলো, মুঠো শক্ত করে ধরলো একবার বাজারের

থলিটা।

ঘাম মুছলো।

 

নীচের ঠোঁটটা একবার কামড়ে ধরলো কি দাঁত দিয়ে?

আমাদের সোনাঝুরি না? আরে কতবড়ো হয়ে গেছে!

কেমন আছো সোনাঝুরি? কেমন আছো?

 

এই চেতনা বাবা হিসাবে যথোচিত; কিন্তু এর মধ্যেকার প্যাথোজ কবিতাকে এক বিপুল উচ্চতায় নিয়ে পৌছিয়েছে যেখানে ‘ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ’ সাবলিল আর্তির তান এক মহৎ বেদনায় বাঁধা পড়েছে। এই সমস্তটা নিয়েই  তো কবিতা— কবি জীবন। আর এই বিচিত্র কবিতা যাপনের ঘাত বয়েছে তাঁর নিজস্ব ধারায় যাকে তিনি অনর্গল নিজের হাতে বুনেছেন। তিনি নিজেকে হয়ত আজীবন পাল্টাননি… এক অপ্রমেয় সফরে তিনি চলেছেন নদী থেকে সাগর কিম্বা মহাসাগরে তা যতই উত্তাল হোক— বয়া নিজে ধরেরেখে তিনি পারি জমিয়েছেন। তবে এই এই যাত্রা নি:সন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ— কষ্টসাধ্য ; নিজেই বলেছেন—

কী ভাবো আমাকে তুমি? কালের পুতুল?

বাঘের মুখের মধ্যে বসে আমি

     তিন খাতা চার খাতা 

                  কবিতা লিখিনি?

 

হ্যাঁ, সমস্ত যণ্ত্রণা দারিদ্র একাকিত্ব অমানুষিক লোভ–দ্বেষ ইত্যাদি যাবতীয় বামনত্বকে তুচ্ছ করে তিনি লিখেছেন তাঁর গাথা। সহজ কথা, জীবনগাথাকে প্রকাশ করতে গলাবাজি বা কোনো জাকজমকের কি আদৌ প্রয়োজন হয়। সবার অলক্ষেই তো ফুল ফোটে– ইশতিহার তৈরি হয়– হাতে হাতে বিলিও হয়। তাই যেন করেছেন ভাস্কর। জাগুলিয়া বা নোনা চন্দনপুকুরে লিফলেট বিলি করছেন–প্রস্তুত করেছেন কবিতার মানবজমিন।

তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জিরাফের ভাষা’ (২০০৫)-তে তিনি যা উচ্চারণ করেছেন তাতেও পূর্ববৎ যন্ত্রণা ছিল বটে তবে এখানে পাই ব্যাধির বিরুদ্ধে তাঁর বেঁচে থাকার অদম্য লড়াই যা ঠেলে বেড়িয়ে এসেছে কলমে। তাই শেষের উচ্চারণে ‘ জীবনের জন্য মণ্ত্রপাঠ  হয়ত এভাবেই করেছেন—

এইসব সারেগামা পেরিয়ে তোমার কাছে দু-ঘন্টা

বসতে ইচ্ছা করে।

আমার তৃতীয় চোখ হারিয়ে  গিয়েছে।

সিড়ি দিয়ে যে উঠে আসছে আজ আমি তার মুখও দেখিনি।

তোমাকে দু:খিত করা আমার জীবনধর্ম নয়

চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, না হলে তো,

                                  আরেকটু থাকতাম।