ক্যা ন ভা স
বন্ধুরা! প্রথমেই বলি, আমি খুব সামান্য একজন ছবি আঁকিয়ে। সেই সঙ্গে মন যেমন চায় তেমন কিছু ভাস্কর্য নির্মাণের কাজও করে থাকি। এই কলাম লিখতে গিয়ে যদি কোথাও নিজের শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটে যায়, সুধী পাঠক আশাকরি তাকে আমার ধৃষ্টতা না-ভেবে বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেই গ্রহণ করবেন।
কলাম শুরু করার পক্ষে বিষয় নির্বাচন খুব জরুরি একখানা ব্যাপার। আরও জরুরি, তা যেন কখনোই গুরুগম্ভীর আর তথ্যের কচকচিতে ভারাক্রান্ত হয়ে না-দাঁড়ায়। তথ্য অবশ্যই থাকবে। তবে তা যেন নিপুণভাবে বুনে দেওয়া যায় লেখার শরীরে।
আজ পৃথিবীতে ছবি আঁকার শুরুর দিকের কথা। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সেই ঊষালগ্ন। সেই প্রাচীন প্রস্তরযুগ, যখন আদিম মানুষ ছিল আদতে গুহাবাসী। তখনও সম্ভবত আগুনের খোঁজ পায়নি আমাদের পূর্বপুরুষ। আবিষ্কার হয়নি চাকা। ধাতুর আবিষ্কার তখনও ভাবীকালের গর্ভে। বুনো জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। মারো, নইলে নিজে মরো। ততদিনে বাঁচার তাগিদে আদিম মানুষ শিকার করতে শিখেছে। পশুর কাঁচা মাংস আর বনবাদাড়ের ফলমূল দিয়ে মিটিয়ে নিচ্ছে খিদে। নকল করতে শিখছে পশু-পাখির ডাক। নিজেদের মধ্যে ভাব-বিনিময় করছে আকার-ইঙ্গিতে। একটু একটু করে দুর্বোধ্য সাংকেতিক শব্দে শিখে নিচ্ছে সংযোগের ভাষা। আর দৈনন্দিন ঘটনা , অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে রাখছে পাথরের দেয়ালে, গুহাগাত্রে। কীভাবে? তখনও তো তারা অক্ষর আবিষ্কার করেনি! তারা লিখে রাখছে ছবি। এঁকে রাখছে সমকাল। ছবিতে ধরে রাখছে নিজেকে। ধরে রাখছে সমকালীন জীবন, জীবজন্তু, চারপাশের জগৎ। এটা না-জেনেই, যে তাদের উত্তরপুরুষ এক-না-একদিন ঠিক টেনেহিঁচড়ে বার করবে সেই সময়ের পাথুরে দলিল।
আদিম যুগের গুহাচিত্র হল পৃথিবীর প্রাচীন চিত্রকলা। এইসব গুহাচিত্র তৎকালীন মানুষদের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, চিন্তাধারা আর সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। কী ধরনের ছবি আঁকত সেই যুগের মানুষ? মূলত পশুর ছবি। যেমন- বুনো মহিষ, বাইসন, হরিণ, ঘোড়া, ম্যামথ। এছাড়া খুব কম হলেও পাওয়া যায় মানুষের অবয়ব। কোনও কোনও গুহাচিত্রে ফুটে আছে হাতের ছাপ। যা দেখে আদিম গুহামানবদের শরীরের একখানা ধারণা পাওয়া যায়। তারা পাথরের গায়ে ফুটিয়ে তুলেছে শিকারের ছবি। নানা রকম প্রতীকচিহ্ন, আর জ্যামিতিক নকশা। এইসব ছবি আঁকতে ব্যবহার হত প্রাকৃতিক উপাদান থেকে পাওয়া নানা ধরনের রং। কয়লা থেকে কালো, গেরুয়া মাটি থেকে হলুদ , হেমাটাইট থেকে লালরং, ফলের খোসা, গাছের আঠা, খনিজ উপকরণ থেকে পাওয়া নানা রঙে সেজে উঠত ছবি। আর তুলি?গাছের আঁশ অথবা পশুর লোম কিংবা আঙুল ঘষে ঘষে আঁকা হত পাথরের গায়ে। এইসব ছবি বিশ্লেষণ করে আদিম গুহামানবদের জীবনযাপন , শিকার ধরা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক অবস্থার মোটামুটি একখানা ধারণা করতে পারেন গবেষকরা। তাঁদের মতে গুহাচিত্রের শুরুয়াত প্যালিওলিথিক যুগে। যাকে প্রাচীন প্রস্তরযুগ (Old Stone Age) বলা যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গুহাচিত্রের মধ্যে ফ্রান্সের লাস্কো গুহা, স্পেনের আলতামিরা গুহা, ফ্রান্সের শোভে গুহা, ভারতের ভীমবেটকা শৈলাশ্রয়, ইন্দোনেশিয়ার মারোস গুহা অতি প্রাচীন। এই গুহাগুলির দেয়াল মূলত চুনাপাথরের। আর আমরা জানি, যে চুনাপাথর অন্য পাথরের তুলনায় মসৃণ আর নরম হওয়ায় গুহার দেওয়ালে আঁকার সুবিধে হয়। তাই ধারালো শক্ত পাথর দিয়ে খোদাই করেও নানা ছবি এঁকেছে গুহামানবেরা।
আলতামিরা গুহার কথা কম-বেশি আমরা সবাই জানি। প্রায় ছত্রিশ হাজার বছরের পুরনো, স্পেনের কান্তাব্রিয়া অঞ্চলের এই বিখ্যাত গুহা দেখতে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে ছুটে আসে গবেষক পর্যটক আর ইতিহাসবিদরা। ১৮৬৮ সালে মোদেস্তো কুয়েভাস প্রথম গুহাটি খুঁজে পান। আরও কিছুকাল পরে মার্সেলিনো সান্স দে সাউতোলা গুহাচিত্রগুলো আবিষ্কার করেন। এটাই প্রথম, যেখানে রঙবেরঙের প্রাণীর ছবি দেখতে পাওয়া যায়। যার মধ্যে অন্যতম বাইসন। যা লাল, হলুদ আর কালো রঙে আঁকা। আগেই বলেছি, এই রঙগুলো সবই প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করত আদিম গুহাবাসীরা। খুঁটিয়ে দেখলে ছবিগুলোতে প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি, পরিচয় বহনকারী প্রতীক, দৈনন্দিন কাজকর্ম হদিশ মেলে। এখান থেকেই সৃজনশীল শিল্পকর্মের পা-ফেলা শুরু।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুগ যুগ ধরে এত ঝড়-ঝঞ্ঝা ভূমিক্ষয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেরিয়েও ছবিগুলো টিকে রইল কীভাবে? অন্যতম কারণ, চুনাপাথর নরম আর মসৃণ হওয়ায় খোদাই কাজের সুবিধে। এরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ক্যালাসাইট আবরণ তৈরি করেছে। যা গুহাচিত্র সংরক্ষণে সহায়ক হয়েছে। চুনাপাথরের শোষণ ক্ষমতা বেশি। ছিদ্রযুক্ত গঠনের দরুন ছবি দীর্ঘদিন টিকে থাকে। এই পাথর অতিরিক্ত আদ্রর্তা শুষে নিয়ে বাইরে বের করে দেয়। ফলে গুহার ভেতরের শুষ্ক আবহাওয়া ছবিগুলোকে প্রকৃতির আঘাত থেকে রক্ষা করেছে। আবার এমনও হয়েছে, পাথরের উপরের আস্তরণ খসে পড়ে ভেতরের আরও প্রাচীন কোনও স্তর থেকে গুহাচিত্র বেরিয়ে এসেছে। চুনাপাথরের ফাটল কোনও কোনও ছবিকে ত্রিমাত্রিক আকার দিয়েছে। আলতামিরার গুহাবাসীরা কীভাবে শিকার ধরত, কীভাবে খেত, কীভাবে যুদ্ধ করত পশুদের সঙ্গে ছবিগুলো থেকে জানা যায় অনেক কিছু। তেমনই অলঙ্কার পরা কিছু প্রাণীর ছবি পাওয়া যায়, যা হয়তো তাদের দেবতা বা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হতে পারে। তারা যে দলবেঁধে থাকত, যাদুবিদ্যা জানত, তাও বোঝা যায় গুহাচিত্র দেখে। মোটকথা, মানব জাতির ছবি আঁকার সূচনা আলতামিরা আর তারই মতো প্রাচীন প্রস্তরযুগের গুহাচিত্র। যা শুধুমাত্র ছবি নয়, ছিল সেই আদিম মানবজাতির ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। ছিল সেই আদিম পৃথিবীর একমাত্র প্রামাণ্য দলিল।
আমরা, ভাবীকালের শিল্পীরা আমাদেরই আদিপুরুষের যুগসঞ্চিত সেই মহাসৃজনের সামনে বিহ্বল বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে পারি!
ক্রমশ