সি নে দু নি য়া
অভিষেক ঘোষ
টিন ও টিনা: বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধূসর পাণ্ডুলিপি
কে তিনি? মানুষের পাপের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ, ঝুলন্ত এক ঈশ্বর! বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে সেই ঈশ্বরেরই সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নেয় নারী-পুরুষ। তারপর? ভুলে যায় ঈশ্বরকে, ভুলে যায় তাদের অঙ্গীকার। এ তো জানা কথা… কিন্তু! হ্যাঁ, একটা কিন্তু নিয়েই এই ছবি। দ্বিধার গ্লানিময় অনিশ্চয়তা ভালো? নাকি ঢোঁক গেলা অবদমনের বুকে কান্না-ভেজা বিশ্বাসের নিশ্চয়তা? কিন্তু! তবু একটা কিন্তু থেকে যায়… এই দেখুন না… লোলা সন্তান-সম্ভবা, হওয়ার কথা যমজ; কোনোটিই বাঁচল না। লোলা বিরস-বদনে ছয়টি মাস কাটিয়ে দিল! ওই যে… ‘ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ?’ অবশেষে এক ছয়’শ বছরের পুরোনো গথিক কনভেন্টে গিয়ে দত্তক নিল দু’টি বিচিত্র ব্লন্ড ছেলে-মেয়েকে, তারাও যমজ! এ কি তবে ঈশ্বরের অদৃশ্য হস্তক্ষেপ! এই যে খটকা, এইগুলো এই ছবিতে ভারি মধুর… কাহিনির বুনন, ক্যারেক্টার বিল্ড-আপ, টেনশন্, সাসপেন্স – সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো স্লো-বার্ন, হরর থ্রিলার এই ছবি।
আবার দেখুন নার্সিং হোম জানিয়েছিল, লোলা আর কখনও ‘মা’ হতে পারবে না! তাদের দাম্পত্যের ভিতটাও নড়ে গেছিল। দুই যমজ এল হাতে বাইবেল নিয়ে আর অমনি মিরাকল্… লোলা আবার ‘মা’ হতে চলেছে! কিন্তু… মিরাকল্ ঘটাতে গেলে কিছুক্ষণ শ্বাসরোধ (আক্ষরিক অর্থেই) তো বনতা হ্যায়! ফিল্মের চরিত্রদেরও, দর্শকদেরও… এই ভরসাতেই যে দর্শক ভয় পেতে, উত্তেজনায় দাঁতে নখ কাটতে ভালোই বাসেন। আর এ’রকম তাৎক্ষণিক রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার তাড়নায় ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, যমজ বাচ্চাদুটোর মতো লোলা (অভিনয়ে মিলেনা স্মিট) – অ্যাডলফো (অভিনয়ে হাইমে লরেন্তে) -ও খুব একটা স্বাভাবিক নয়। বাচ্চাদু’টি যেমন তাদের সমবয়সীদের সাথে একেবারেই মিশতে পারে না, লোলা-অ্যাডলফো-ও কিন্তু সামাজিক মেলামেশাটা একেবারেই পারে না, তাদেরও কোনো সোশ্যাল্ লাইফ্ নেই। কিন্তু, না… ফিল্মটা দেখতে দেখতে সে-কথা আপনার মনে পড়বে না। বাইবেলে যা বলে, সেই কথামৃতে ভরসা করে, মৃত পশুর আত্মা শুদ্ধ করে, তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে টিন ও টিনার মর্মান্তিক অপচেষ্টা, তাদের ব্যর্থতা, কান্না এবং তার জন্য আত্মনির্যাতন… এসব আপনাকে নাড়িয়ে দেবে, দিতে বাধ্য… কিন্তু, পরিচালক তাঁর ‘Debut feature’-এ কোথাও কোনো কিছু স্পষ্ট করেন নি। সর্বত্রই একটা ধোঁয়াশা বজায় রেখেছেন তিনি, ফলে আপনাকেও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে হবে এবং আপনার ঈশ্বরানুগত্য ও সমাজবীক্ষার পরীক্ষা চলবে, চলতেই থাকবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না আপনি দেখবেন ধ্বংসের এক অবর্ণনীয় শূন্যতার ওপারে টিন ও টিনার লঘু দুই কাঁধে হাত রেখে, স্বামীর শেষকৃত্যে কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে লোলা! লোলার স্বামী অ্যাডলফো আগুনে ঝলসে গেছে, যেমন ঝলসে গিয়েছিল যমজদের প্রিয় বাইবেল। কিন্তু তার মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? ঈশ্বর না প্রকৃতি? টিন ও টিনা, নাকি নিছকই ঝড়-বৃষ্টির রাতে এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নিছকই একটা বজ্রাঘাত? নিয়তি নাকি ন্যায়-বিচায়? জাগতিক পাপের প্রতিবিধান, নাকি অলৌকিক পুণ্যের হাতছানি!
এই ছবির কাহিনিতে রয়েছে এক মা। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা ও ‘মেডিকেল মিরাকল্’-এ আবার মা হওয়ার পর সেই সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ; লোলার কৃশকায়া, শুকনো মুখ… এই সবই আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারে পোলানস্কির ‘Rosemary’s Baby’ -র কথা। অ্যাডলফোর সংলাপে আমরা জানি লোলার পড়াশোনাও কনভেন্টে, সুতরাং বিব্লিক্যাল রেফারেন্স বুঝতে তার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাদের বাড়িতে আসা দুটি ছেলে-মেয়ে ঠিক কতটা অদ্ভুত ও বিপজ্জনক, সেটা সে বুঝতে পারে নি। প্রথম ডিনারের সময় টিন ও টিনা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। যীশুর মাথার কাঁটার মুকুট পরিয়ে দিল পালক-পিতার মাথায় আর লোলার গলায় পরিয়ে দিল একখানা হোলি লকেট। সেই শুরু… তারপর থেকে তাদের বিবিধ আচরণ সিনেমার পোকাদের মনে উসকে দেবে The Omen (1976) থেকে শুরু করে Orphan (2009), Goodnight Mommy (2014) ইত্যাদি অনেক চেনা সিনেমার রেফারেন্স। দুই ভাই-বোনের খেলা, মজা, দুষ্টুমি আর বিপজ্জনক শয়তানির মধ্যে ছবির নির্মাতারা এত সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত এক লাইন টেনে দেন, যা পুরো কাহিনিকেই করে তোলে কিছুটা অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত। এতে কোনো কোনো দর্শকের সমস্যা হতে পারে। আমার ক্ষেত্রে এই রহস্যময় ধূসরতাই ছিল আদতে আকর্ষণীয়। লোলার সংকল্প ও সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা, বারবার পিছু হটা ও আবার বিশ্বাসের জমি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা – লোলার মানসিক দ্বিধার জায়গাগুলোই বাইবেলের নানা রেফারেন্স, দুই খুদের শয়তানি ও অ্যাডলফোর উদাসীনতার মধ্যে সেতুর কাজ করে। দর্শকও বোধহয় ছবিটা দেখতে দেখতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন যে, কার পক্ষ নেওয়া উচিত? দুই খুদে যমজের, নাকি অসহায়া, পঙ্গু জননী লোলার! লোলা ঠিক কীভাবে শৈশবে তার একটা পা হারিয়েছিল, সেই ব্যাখ্যাটা অবশ্য খুবই আপত্তিকর, বিশ্বাসযোগ্য নয় একেবারেই… এটা ভিস্যুয়ালি দেখালে বরং আরও ভালো হত।
গোটা ফিল্ম জুড়ে এমন বহু বিষয়েই নির্মাতারা নিরুত্তর থেকেছেন, যাতে হয়তো এক শ্রেণির দর্শক বিরক্ত হবেন। কিন্তু এটাই আসলে এই ছবির শক্তিও বটে! মায়ের হাতে কামড়ে দিয়েছিল বলেই কি যমজরা কুকুরটাকে মারল? তাহলে ওদের বলা গল্পটা কি মিথ্যে? ওদের শিশুসুলভ সারল্য আর নিষ্পাপ বোকামিটাই সত্য, নাকি নির্বিকার ধূর্ত শয়তানিটা? কনভেন্টের একটি দৃশ্যে যখন ঝড়-বৃষ্টির রাতে মাদার সুপিরিয়র ডর্মিটরিতে উপস্থিত সমস্ত বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন, তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়, আর যাই হোক ওইটা সুশিক্ষা নয়। যদি প্রতিভাবান অথচ মানসিক বিকারগ্রস্থ কোনো বাচ্চা ওই ভাষণের প্রতিটি অক্ষরকে ধ্রুব সত্য জ্ঞান করে নিজেরাই ঐশ্বরিক সুবিচারের বন্দোবস্ত করতে চায়, তবে পুড়তেই পারে কারো নশ্বর শরীর বা আস্ত একটা ঘর! অ্যাডলফো ওদের বাইবেলে অগ্নি সংযোগ করেছিল রাগের মাথায়, তখনই আমরা সংকেত পেয়েছিলাম ওর সাথে ভয়ঙ্কর কিছু হবে… কিন্তু তার ভিস্যুয়ালস্ আমাদের কল্পনাকেও ছাপিয়ে যায় সিনেমায়। আসলে বর্ণনাধর্মীতার চেনা পথ ছেড়ে এই ছবিতে পরিচালক হেঁটেছেন সংকেতধর্মীতার অন্ধকারাচ্ছন্ন আঁকা-বাঁকা পথে। সঙ্গীত-আয়োজন ও অন্যান্য প্রকৌশলগত বিভাগের সুনিপুণ সঙ্গতে পরিচালকের সেই স্বপ্ন হয়ে উঠেছে আরো জীবন্ত।
‘অরিজিনাল সিন্’ ও সেইন্ট অগাস্টিন এই ছবির প্লটে আরো এক ধূসর জায়গা! ঈশ্বর ও ঐশ্বরিক নির্দেশের বিকৃতি, অপপ্রয়োগ মনুষ্য জাতির মজ্জায়। টিন ও টিনা তো আর তার ব্যতিক্রম নয়। ভয়াবহ শুধু এই যে, লোলার ‘মিরাকল্’ চাইল্ডটিকে তারা গোপনে ব্যাপটাইজ করার জন্য যে খ্যাপামি শুরু করে, সেটার বর্ণনা… ওই দৃশ্যটি যে সাসপেন্স তৈরি করতে পেরেছে, তা সত্যিই দুর্লভ আজকাল। লোলা তার প্রথম সন্তানের অপমৃত্যুতে ধর্মীয় সান্ত্বনার হাত ছেড়ে দিয়েছিল, টিন ও টিনা যেন এক আশ্চর্য প্রহসনের মধ্যে দিয়ে তার ভিতরে আবারো ধর্মীয় উন্মাদনার নিরুপায় জানালাটা খুলে দেয়। এইখানেই চরম ট্র্যাজেডির মধ্যেও ছবিটি ভিন্নমাত্রা পায় ভাবনার স্বাতন্ত্র্যে। ধর্মবিশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতা এই ছবিতে হয়ে ওঠে অবিশ্বাসের সঙ্গে এক ভীতিপ্রদ সহবাস। কিন্তু এইখানেই এই ছবির ভাবনাগত প্যারডক্স যে, ভগবান যীশু বলে গিয়েছেন, ‘ক্ষমা কোরো সবে’, বলে গিয়েছেন ‘ভালোবেসো’! তাই জননী লোলা অবশেষে সব হারানোর পঙ্কিল বেদনা ও অনর্গল চোখের জল চুপচাপ সয়ে, টিন ও টিনাকে পাশে ডেকে নেয়… এক কথায় একজন ক্যাথলিকের উচিত কাজই সে করে। কিন্তু… ক্যামেরায় তার মুখের অভিব্যক্তি কী বলে? নিশ্চয়তা, নির্ভরতা নাকি ত্রাস! বলাই বাহুল্য, এর পর লোলা ও তার তিন সন্তানদের নিয়ে এই সিনেমার একটি রোমহর্ষক সিক্যুয়েল হতেই পারে।
Film: Tin & Tina (2023)
Director: Rubin Stein
Cast: Milena Smit, Jaime Lorente, Carlos González Morollón, Anastasia Russo, Teresa Rabal.
Cinematography: Alejandro Espadero
Edit: Nacho Ruiz Capillas
Music: Jocelyn Pook
Language: Spanish.