ফি চা র

সব্যসাচী সরকার

sabyada

বইয়ের এই ঝর্ণাধারায়...

‘চল এ বার প্লিজ, প্রায় ন’টা বাজছে! এ বার বাবা বাওয়াল দেবে!’ বছর পঁচিশের স্লিভলেস বেগুনি শাড়ির গলায় অনুনয়। মায়াবি দুটো চোখে পাশাপাশি ভেসে আছে আদুরে অধিকারবোধ আর আবেদন।

উল্কোউস্কো চুল আর দাড়িওলা যুবক সঙ্গীর গায়ে নীল পাঞ্জাবি। পরনে জিন্স। চোখে উদাসীন তারুণ্যের রুক্ষতা। হাতে বইয়ের প্যাকেট। সামান্য বিরক্ত সে, ‘দাঁড়া না, কানের কাছে প্যানপ্যান করছিস কেন? একদিন দেরি হলে হবে। এখনও দুটো বই তুলতে পারিনি। একবার নয় নম্বর গেটের দিকে যেতেই হবে।’

‘উফফ! সে তো একেবারে করুণাময়ীর দিকে। আবার এতটা হাঁটবি?’

‘হাঁট না একটু।’ মেয়েটির কোমল হাত ধরে একটু জোরেই টানল যুবক।

‘যাচ্ছি, তার আগে একটা সেল্ফি তুলি চল। কী সুন্দর সাজিয়েছে এই স্টলটা!’

বান্ধবীর অনুরোধ কোন পুরুষই বা পারে উপেক্ষা করতে? বইমেলা চত্বরে ররিবারের শেষ আধ ঘণ্টায় তাই পটাপট সেল্ফি। কাঁধে হাত রেখে, ঘনিষ্ঠ হয়ে। একে অন্যের গন্ধ মেখে। মাইকে বাজছে ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়…’। শেষ সন্ধেয় আশ্চর্য ঝর্ণাধারায় ভাসছে মেলা।

বিশাল এই চত্বরে কোথাও হয়তো গুনগুনিয়ে ঘরে আসছে ভ্রমর, ফুটছে প্রেমের নতুন ফুল। কোথাও আবার কি প্রেম পালাল না ফুড়ুৎ করে? না হলে ফুড স্টলের পিছনে একাকী দাঁড়িয়ে বছর কুড়ির টি-শার্ট কেন ছলছল চোখে ফোনে বলে উঠবে, ‘তুই আমার সঙ্গে এটা করতে পারলি?’

কে তার সঙ্গে কী করেছে, জানা হয় না। কিন্তু ওই ছেলেটির চোখের জ্যামিতিতে যন্ত্রণা আর স্বপ্নভঙ্গ। ওকে একলা রেখো না ঠাকুর, ভাঙা মন নিয়ে ও কী ভাবে ফিরবে মেলা থেকে? 

মুক্তমঞ্চ ছিল না এ বার, ছবি আঁকিয়েরাও ব্রাত্য। তরুণ শিল্পীর সামনে ছোটো টুলে বসে কোনও কাজলনয়না এলোচুলে প্রতিকৃতি আঁকাচ্ছে, এ ছবি এ বার দেখেনি বইমেলা। তাতে কী? ডিজিট্যাল এই যুগে প্রযুক্তির চোখরাঙানি আছে, কিন্তু কম্পিউটার স্ক্রিন, কিন্ডল বা ই-বুকস এখনও কেড়ে নিতে পারেনি কাগজে ছাপা বই আর কালো অক্ষরকে। সুবিধেও কি হয়নি? মানিব্যাগে একগাদা টাকা নিয়ে ঘোরার ব্যাপার নেই। শুধু গুগল পে থাকলেই হল। স্ক্যানারে স্ক্যান করলেই হল। নামী-দামি প্রকাশকদের স্টলে উপচে পড়েছে ভিড়, বাইরে সাপের মতো লাইন গিয়েছে এঁকেবেঁকে। গিল্ড অফিসের সামনে দেজ পাবলিশিংয়ের বিশাল স্টলের সামনে বসেছে লেখকদের আড্ডা। ওই ভিড়েও সেখানে বসে সই দিতে দিতে অক্লান্ত একানব্বইয়ের তরুণ শঙ্কর। ওই ভিড়ে হারিয়ে গেলেন প্রচেতদা, প্রচেত গুপ্ত। কোথাও আবার ভ্রাতৃপ্রতিম স্মরণজিতের গল্পপাঠ শোনার জন্য স্টলের বাইরে শুধুই কালো মাথা। লোকে কান পেতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে। কে বলল, এ যুগে লেখকদের জনপ্রিয়তা নেই? বাউন্সার নিয়ে ঘুরলে বা ‘আমাকে দেখুন’ বলে ফেসবুকে রোজ বই সই করার ছবি না দিলেও বহু লেখকের পাঠক আছেন। জানতে হয়, খুঁজে নিতে হয়। নিভৃতে, একান্তে একাকী পাঠক ঠিক খুঁজে নেন প্রিয় লেখক বা লেখিকাকে।

কিন্তু ছোটো-বড়ো-মাঝারি-কুচো-মেজো, প্রবীণ বা তরুণ, সব প্রকাশকই সাজিয়েছেন নানা রকমের পশরা। সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার। টেবল সাজিয়ে নিজেদের পত্রিকা আর বইয়ের সম্ভার নিয়ে প্রতিদিন কাঁধে ঝোলা নিয়ে মেলায় ঢুকে পড়া। একটা টেবল, গা ঘেঁষাঘেষি করে বসা। বসার জন্য একটামাত্র চেয়ার। তাতে কী? স্টলে স্টলে ক্লান্তিহীন সব চোখমুখ। আড্ডা-গান-কবিতা যাপন-গল্পপাঠ। মুড়ি চিবোতে চিবোতে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাঠকের অপেক্ষায় বসে থাকা। বড় মমতায়, বড় ভালোবাসায় আর যত্নে সাজানো একের পর এক বই। যারা এই মেলায় মাত্র কয়েকদিন আগে জন্মেছে। কালো কালো সব বাংলা অক্ষর। যদি কেউ উল্টে-পাল্টে দেখে, মায়ায় জড়িয়ে তুলে নেয় হাতে। তার পরে যদি কেনে! পাঠকের হাতে পড়া মানেই জন্ম সার্থক।

কত কত চেনামুখের সঙ্গে ঠিক একবার না একবার দেখা হয়ে যায়। আবার কত লোকের সঙ্গে দেখা হবে হবে করেও হল না। কেউ বন্ধু, কেউ বন্ধু নয়। কেউ চেনা, কেউ অচেনা। কিন্তু হাজারে হাজারে মানুষ, কাতারে কাতারে মানুষ। চটি বই, গিটার বাজিয়ে গান, পাঁপড়ি চাট, নতুন শাড়ি। 

কে শুধু ফিশফ্রাই খেয়ে চলে গেল, তাতে কী এসে গেল? যার ইচ্ছে হবে খাবে, যার ইচ্ছে হবে সে বই কিনবে। এই মেলায় কোনও চোখরাঙানি নেই। বরং অনেক বেশি আছে দীর্ঘশ্বাস। পকেটের টানে বহু বই মেলায় রেখে আসার দীর্ঘশ্বাস। শেষ এক ঘণ্টায় যেন আরও মায়াবি হয়ে ওঠে মেলা। সুখ-দুঃখ-আনন্দ-যন্ত্রণা, কতরকমের কষ্ট পেরিয়ে আসে ওই ১২ দিন। পার্ক স্ট্রিটের ধুলো পেরিয়ে বাইপাসের মিলনমেলা, সেখান থেকে সল্টলেকের করুণাময়ী। মেলার বয়স বেড়েছে, কিন্তু এখনও নতুন বইয়ের গন্ধ একই রকম রোম্যান্টিক থেকে গিয়েছে। যেমন একইরকম থেকে গিয়েছে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশকেদের ক্লান্তিহীন পরিশ্রম আর উৎসাহ।     

ঢং ঢং ঢং। ঠিক রান ন’টায় বাজতে শুরু করল ঘণ্টা। ঠিক প্রতিবার যেমন বাজে আর বুকের ভেতর শুরু হয় একটা মোচড়। এত এত বই এখনও স্টলে, এদের কী হবে? কোথায় যাবে এরা?

বেশির ভাগই পাড়ি দেবে কলেজ স্ট্রিটে, আবার কিছুদিনের মধ্যে বেরোতে হবে। কোনও জেলা বইমেলা বা ছোটো মেলার জন্য। বাঁধাবুঁধির পালা শুরু বিভিন্ন স্টলে, চলছে গুছোনো। ডেকরেটরের বিল মেটাতে হবে। কত আদর মাখানো ছোটো ছোটো স্টল। কোথাও নিপুণ শিল্পীর হাতের ছোঁয়া, কোথাও বা অপটু হাতে সামান্য এঁকেবেঁকে গিয়েছে তুলির আঁচড়। মেলার মাঠ ফাঁকা হয়ে আসছে। যে বিশাল গেটগুলো দিয়ে এতদিন গাড়ি ঢোকার প্রবেশাধিকার ছিল না, সেগুলো হাট করে খোলা। সেখান দিয়ে ঢুকে পড়ছে একটার পর একটা ছোটো মিনি টেম্পো। কেউ কেউ বলে আবার ছোটো হাতি।

এরই মধ্যে ভিড় ঠেলে গেটের দিকে হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে ওই যুবক-যুবতী। দুজনেই হাসিমুখ, থার্টি টু অল আউট। মেলা ভাঙছে তো কী, ‘বসন্ত এসে গেছে!’