প্র ব ন্ধ
প্রদীপ চক্রবর্তী
উনিশশতক: রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ও তাঁর কবিতা
মধ্য-চল্লিশে দাঁড়িয়ে আমি তখনই কবিতা পড়ি যখন আমার ব্যক্তি অনুভব, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, ভাবনা ও ধারণা এবং সবিশেষ কবিতার কাছে মানসিক প্রাপ্যের পারস্পরিক বিপরীত চাহিদা পূরণ হয় অর্থাৎ আমার বিভিন্ন সময়ে মনের কাব্যিক অবস্থা ও মানসিক প্রাপ্য-পূরণের মধ্যে যখন একটা স্পার্ক ও ভারসাম্য আনে কবিতা। কবিতা হয়ে ওঠে আমার বোধ, মেধা ও শিক্ষার ইচ্ছাপূরণ। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে দেবেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে আমার বোঝাপড়া কয়েক আলোকবর্ষের দূরত্বে বাঁধা। উনিশ শতকের কবিতার ইতিহাস আমায় ঋদ্ধ করে কিন্তু আমার কাঙ্ক্ষিত কাব্যরসের যোগান দেয় না সবসময়। তা-সত্ত্বেও ‘ভারবি প্রকাশনী’-র প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ কবিতা-গ্রন্থমালা সিরিজে দেবেন্দ্রনাথ সেনের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ যখন পড়ি, তখন ভালোলাগা-না লাগা নির্লিপ্তি এবং উদাসীনতা এই সমস্ত পরস্পর বিরোধী অনুভবে এক মিথস্ক্রিয়া প্রভাব ফেলে। সমসময় সব কবিতা নির্দ্বিধায় ভালো লাগে না, কখনো একঘেয়ে লাগে কিন্তু সমগ্র শ্রেষ্ঠ কবিতা বইটির পাঠান্তে, তাকে নতুনভাবে অনেক জায়গায় আবিষ্কার করা যায়। কবিশেখর কালিদাস রায়, ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমচন্দ্র ও যতীন্দ্রমোহন বাগচী, অক্ষয়কুমার বড়াল, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, করুনানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়েও বলা যায়, যে, রবীন্দ্রনাথের পর উনিশ শতকে প্রবাসী এই কবি সবচেয়ে প্রভাব ফেলেছিলেন তৎকালীন তরুণ কবি যশোপ্রার্থী ও পাঠকের মনে।
কবিতার বিষয়মুখীনতা যা আবহমান বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র, তার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা দেবেন্দ্রনাথের কবিতা। কাহিনীধর্মী গল্প লিখন যে খাঁটি কাব্যরসের অন্তরায়, তা প্রথম থেকে তিনি বুঝেছেন। তাঁর কবিতা মগ্ন চেতনার। মৌন প্রবাহে কখনো চঞ্চল কখনো খেয়ালী কখনও ব্যস্ত কখনও উদাসীন। পাহাড়ি ঝোরার মতো। শত সহস্র রঙবেরঙের পাথর টুকরোর ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে পথ করে নিয়ে যে, সারাবেলা, মেঘরৌদ্রের ভেতর দিয়ে ক্ষীনতনু-অতনুর স্পর্শে এক অলীক অথচ সত্যের গহন সবুজে ডুব দেয়, খাদের কিনারায় রহস্য-অতল হান্ডি খোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিশিষ্ট কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার, তাঁর আধুনিক বাংলা সাহিত্যগ্রন্থে, দেবেন্দ্রনাথ সেনের কবিতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, “তাঁহার প্রতিভা আত্ম-মুগ্ধ… আপনার অন্তরে যে স্পর্শ-মণি পাইয়াছেন তাহার স্পর্শে জগৎ ও জীবনকে সোনায় সোনা করিতে চাহিয়াছেন। তিনি পঞ্চেন্দ্রিয়ের পঞ্চ-প্রদীপ জ্বালিয়া অনাবিল প্রীতির মন্ত্রে সৌন্দর্য-লক্ষ্মীর আরাধনা করিয়াছেন। বিহারীলালের ধ্যান ছিল, দেবেন্দ্রনাথের কেবল আরতি। এই সৌন্দর্য মুগ্ধ কবির সৌন্দর্য-সাধনার একটি নতুন দিক ফুটিয়া উঠিয়াছে— নয়ন ও হৃদয়, এই দুই-এর পরিচর্যায় সর্বেন্দ্রিয়ের উল্লাসব্যঞ্জক এক নূতন কাব্যকলা উদ্ভব হইয়াছে…।’ পাঠক তার দু-একটা নমুনা পড়ুন—
১
শোভাময়ী সুনীল ঝুমকা, দোল প্রকৃতির কানে, তোর কাছে হারি মানে / বঙ্গবালা কানবালা সোনার পরিখা…
(ঝুমুকা… ফুলবালা, ১৮৮০)
২
চাহি না ‘আনার’- যেন অভিমানে ক্রুর, / আরক্তিম গণ্ড ওষ্ঠ ব্রজ-সুন্দরীর! / চাহিনাকো ‘সেউ’- যেন বিরহ-বিধুর / জানকীর চির-পাণ্ডু বদন-রুচির! / একটুকু রসে ভরা, চাহি না আঙুর, / সলজ্জ চুম্বন যেন বধূটির / চাহি না ‘গন্না’র স্বাদ! / কঠিনে মধুর / প্রগাঢ় আলাপ যেন প্রৌঢ়-দম্পতির।দাও মোরে সে জাতি সুবৃহৎ আতা,/
থাকিত যা নবাবের উদ্যানে ঝুলিয়া; / চঞ্চলা-বেগম কোনো হয়ে উল্লাসিতা/ ভাঙিত; সে স্পর্শে হর্যে যাইত ফাটিয়া!/ আহো কি বিচিত্র মৃত্যু! আনন্দে গুমরি,/ যেতে মরি রসিকার রসনা-উপরি!
(লক্ষ্মৌর আতা— অশোকগুচ্ছ, ১৯৯০)
আজ থেকে প্রায় ১১৬ বছর আগে লেখা, এই দ্বিতীয় কবিতাটা আমায় ফিদা করে দিয়েছে। তার সমকালীন কোনো কবি, ‘লক্ষ্মৌর আতা’-র মতো কি কোনো কবিতা লিখেছেন? বাংলা কবিতায় সেই সময় এই ভোজ্যরস কাব্যরসে পরিণত হওয়ার ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিরলই বটে। তাঁর কবিতার বিশিষ্ট পাঠক ও সমালোচক অমূলধন মুখোপাধ্যায়, যিনি তাঁর ‘আধুনিক সাহিত্য-জিজ্ঞাসা’-র অনেকাংশ জুড়ে কাজ করেছেন দেবেন্দ্রনাথ সেনের কবিতার ওপর। তিনিও মানবেন এই সত্য।
দুই
দেবেন্দ্রনাথ সেনের জন্ম ১৮৫৮ সালে। প্রবাসী। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর শহরে এক বৈদ্য-পরিবারে। পিতা লক্ষ্মীনারায়ণ সেন। তাঁদের আদি নিবাস হুগলি জেলার বলাগড় গ্রামে। পরে তাঁরা গাজিপুরে বসতি স্থাপন করেন। পিতার পাঁচ পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান দেবেন্দ্রনাথ। এবং তিনি উচ্চ শিক্ষিত। ১৮৭২ সালে প্রথম বিভাগে পাটনা কলেজ থেকে এন্ট্রান্স, ১৮৭৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. এবং ১৮৮৬ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। ১৮৯৩ সালে প্রাইভেটে ইংরেজিতে এম.এ. পাস।
১৮৯৪ সাল থেকে দেবেন্দ্রনাথ এলাহাবাদ হাইকোর্টে ওকালতি আরম্ভ করেন। পরে তাঁর একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর কলকাতায় এসে ১৯০০ সালে ‘শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা’ নামে বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করেন (পরবর্তীকালে নাম হয় কমলা হাইস্কুল)। বিদ্যালয়টির উন্নতিকল্পে অর্থসংগ্রহে একসময় তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
আশৈশব কবিতার ভক্ত। অল্প বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু। ১৮৮০-৮১ সালে গাজিপুরে অবস্থানকালে তাঁর তিনটি ছোটো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত- ‘ফুলবালা’, ‘ঊর্মিলা’ ও ‘নির্ঝরিণী’। পত্র-পত্রিকায় প্রশংসিত। দেবেন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন, ‘রবিবাবু কাব্যের “আঁখির মিলন” কবিতা তাঁর বড়োই ভালো লাগিয়াছে।’ ‘উর্মিলা’ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মত, ‘ইহাতে স্থানে-স্থানে কল্পনার খাঁটি রত্ন বসানো হইয়াছে।’
১৮৮৬-তে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত তাঁর দুটি কবিতা— ‘অদ্ভুত রোদন’ ও ‘অদ্ভুত সুখ’। যদিও সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য-পত্রে’ নিয়মিত কবিতা প্রকাশ, তাঁকে উনিশ শতকের তরুণ যশোপ্রার্থী কবিদের কাছে কবিখ্যাতি এনে দেয়। এই সময় তাঁর বহু রচনা- প্রদীপ, পুণ্য, জাহ্নবী, বাণী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র ও প্রবাসীতে প্রকাশিত। তিনি ‘কমলাকান্ত শর্মা’ ছদ্মনামেও এলাহবাদ থেকে প্রকাশিত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রবাসী’-তে কবিতা, কয়েকটি রসরচনা ও ‘কুম্ভীর’ নামে একটি গল্পও লেখেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত বঙ্গদর্শনে (বৈশাখ ১৩০৮), রবীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথ সেন সম্পর্কে লেখেন— ‘আমাদের প্রবাসী কবি শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ সেনের প্রেমাশ্রু জলে ইহার অভিষেক-কার্য সুসম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। প্রবাসীও ধন্য। প্রবাসী বাঙালি কবিও ধন্য। স্বর্গীয় কমলাকান্ত শর্মা লোকান্তর হইতে ইহলোকে এবং বঙ্গের বঙ্গদর্শন হইতে প্রবাসে গেলেন, এ ইন্দ্রজাল কে ঘটাইল? মায়াবী তাঁহার নাম গোপন করিয়া ফাঁকি দিতে পারিবেন না- কবির লেখনী ছাড়া এ যাদু আর কোথায়? যে কবি অশোকমঞ্জরী হইতে তাহার তরুলতা এবং বধূর ভূষণ- ঝংকার হইতে তাহার রহস্য- কথাটি চুরি করিয়া লইতে পারেন, তিনি যে রাতারাতি বঙ্গদর্শন হইতে তাহার কমলাকান্তটিকে হরণ করিয়া প্রবাসে পালাইবেন ইহাতে আশ্চর্য হই না। কিন্তু চোরকে যদি আমাদের বঙ্গদর্শনে বাঁধিতে পারি, তবেই তাঁহার উপযুক্ত শাস্তি হইবে।’ বিভিন্ন লেখক-কবিকে উদারভাবে সার্টিফিকেট দেবার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনেক শব্দ বানাতে হয়েছিল। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ সেন সম্পর্কে তাঁর এই প্রশস্তি সূচক বাক্যগুলি নিছক কথার কথা মনে হয় না।
তিন
দু-হাজার ষোলোয় বসে দেবেন্দ্রনাথ সেনের কবিতা পড়তে পড়তে আমার সাবলীল ভাবে কিছু কথা মাথায় এল। কবিতায় দৃশ্য ও শ্রাব্যগুণ— সাদাপাতার অবয়বে শব্দলেখা। শব্দ প্রস্তুত করা। শব্দ বিনির্মাণ করা। শব্দের নৈঃশব্দ্যকে ঘুঙুরের গোলার মতো কানের সুদুরে বাজিয়ে তোলা। তাঁর শব্দের নিখিল— তাঁর আবেগ তারল্যের বানভাসি অনিয়ন্ত্রিত প্রক্ষেপ আবার নিয়ন্ত্রক আয়ুর কলা-কৈবল্যবাদী প্রখর আলোচক সত্তার আত্মদংশন এবং ক্রমবিকাশের শৃঙ্খলায় তার রাশ টেনে ধরা। বিপরীত মুখ দ্বৈতসত্তার দ্বন্দ্ব ও আবিষ্কার। সাদা পাতায় শব্দ প্রস্তুত করা।
শব্দলেখা ও থামানো এবং অবশেষে সাদা পাতার গুরুত্ব বুঝে কবিতার শব্দ ব্যবহার আর না-ব্যবহারের তারতম্য। অশেষের সীমা ঠিক ক’রে গণ্ডী কেটে দেয়া কিংবা আত্মমগ্নতার ফল স্বরূপ তাকে নিয়ন্ত্রণ করার খেলা সবই ধীরে ধীরে আত্মস্থ ও নিবেদনে প্রয়োগ কুশল হয়ে উঠেছে দেবেন্দ্র’র কলম। সর্বশেষে দেবেন্দ্র-ভাষ! ও রহস্য- আকর…! যে বিরহ ও বাৎসল্যে কাঙাল ও তৃষিত অথচ একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে, ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী।
বস্তুজগতের কেন কয়েকটি স্তর আছে। যেগুলি জাগতিক। বাহ্য ইন্দ্রিয়জগত যাকে স্পর্শ করতে পারে। অথচ এই স্তর ভেদ ক’রে আরও অনেক সূক্ষ্ম স্তর আছে যেখানে বিদেহী অনুভবের চূড়ান্ত ‘আত্মার’ আত্মদর্শন ঘটে। যাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে কেবল ছোঁয়া যায় না। যাকে ছুঁতে হয় কাল্পনিক অভিজ্ঞতায়। প্রখর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই স্তর পেরিয়ে ধীরে ধীরে সেই, অশেষ কাল্পনিক অভিজ্ঞতার পথে যেতে চেয়েছেন দেবেন্দ্রনাথ। তৎকালে সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার গণ্ডির ভেতর দাঁড়িয়েই। পয়ার, প্রচলিত অক্ষর বা মাত্রাবৃত্তের চেনা সড়কে যেতে যেতেই তিনি কোথাও যেন আঁটসাঁট বাঁধুনির বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছেন তাঁর ইন্দ্রিয় অতিক্রান্ত সূক্ষ্ম কাব্যদর্শনকে। এটি তার মনন ও উপলব্ধিজাত নিসর্গ-দর্শন। যেখানে নিসর্গ ও নারী প্রথমে, পরে ক্রমবিকাশের মধ্যে দিয়ে বাৎসল্য ও শেষে ঈশ্বর প্রীতির মগ্ন তৃষ্ণা- একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে আত্মিক অভিজ্ঞতার অনুভবে।
এই অনুভবের ঢল পড়তে পড়তে নামলো কেন এভাবে তা আমার অজানা। পাঠক, কবির কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ঠ কবি ও সমালোচক মোহিতলাল কিভাবে তাঁর বয়ঃক্রম অনুসারে বিন্যস্ত করেছেন দেখা যাক- প্রথম পর্যায়: ‘ফুলবালা’ (১৮৮০) ‘ঊর্মিলা কাব্য’ (১৮৮১) ‘নির্ঝরিণী’ (১৮৮১)— এই তিন কাব্যে কবি রূপের পূজারী। এখানে তাঁর সৌন্দর্য-পিপাসা ধ্যানপ্রবণ নয়- কল্পনা বাধাবন্ধহীন আত্মকর্তৃত্বহীন। এই কবিতাগুলিতে সৌন্দর্যবোধের চেয়ে কবি হৃদয়ের অকৃত্রিম উল্লাস-আকুলতা— তাঁর ভবিষ্যৎ কবিত্বশক্তি সূচিত ক’রে।
মধ্য পর্যায়: (১৯০০ থেকে ১৯১২-র মধ্যে) অশোকগুচ্ছ, হরিমঙ্গল, পারিজাত গুচ্ছ, শেফালিগুচ্ছ, গোলাপগুচ্ছ। এখানকার কবিতাগুলিতে কবির সৌন্দর্য-সাধনা ও প্রেম-প্রীতি-কল্পনার বিস্তার। Sensation ও Emotion -ইন্দ্রিয় ও হৃদয় এই দুইয়ের গভীর মিলন। রূপাতিরিক্ত সূক্ষ্ম অনুভব এখানে তাঁর কল্পনার সঙ্গে জড়িত হয়ে মঙ্গলের বোধে উত্তীর্ণ। অন্তিম পর্যায় (১৯১২-১৯১৩-র মধ্যে বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ এইসময় প্রকাশিত।) জ্ঞানদা-মঙ্গল, অপূর্ব নৈবেদ্য, অপূর্ব শিশুমঙ্গল , শ্রীকৃষ্ণ-মঙ্গল, শ্যামা-মঙ্গল, অপূর্ব ব্রজাঙ্গনা, খ্রিস্ট মঙ্গল প্রমুখ। এই কাব্যগুলিতে কবির শেষ বয়সের আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও ভক্তি সমাহিত মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
চার
অভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়ে কল্পনার ভাণ্ডারে হাত রাখলে সেখানে কবির ভাষা সার্থক ব্যবহারের জন্য হয়ে ওঠে অব্যর্থ অস্ত্র। কিন্তু সনেটের কিছু কাব্য পরিণত বয়সে যে বৈদগ্ধ্য ও পরিণত মনের সার্থক ফলশ্রুতি হয়ে উঠেছিল দেবেন্দ্রনাথের কলমে, সেই মুন্সিয়ানা কিন্তু তাঁর সমগ্র কাব্যজগতের ক্রমবিকাশের পথে সমান ভাবে সার্থক হয়ে ওঠেনি। তাঁর কল্পনা-আত্মহারা। অসমান ও বিক্ষিপ্ত। এই অসমতা, কল্পনার অবন্ধনে, সিদ্ধ বাকবিভূতিতে পরিণত হয়নি। কেবল যেনতেন প্রকারে, রসোত্তীর্ণ করার প্রয়াসই কেবল মাত্র কবিতার একমাত্র শর্ত নয়। মোহিতলাল মজুমদারও বলেছেন এইকথা অন্যভাবে।- ‘মনে হয় তাঁহার কবিতাগুলি যেন আপনারাই আপনাদিগকে লিখিয়াছে। ভাবানুভূতির সারল্য, অতি সহজ সৌন্দর্যবোধ, বায়ুর স্পর্শমাত্র জলের হিল্লোল কম্পনে প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো কবি-হৃদয়ের বিক্ষেপ- তাঁহার রচনায় যেমন লক্ষ্য করা যায়, এমন আর কোথাও নয়।’
দেবেন্দ্রনাথের প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাগুলির রূপকর্ম অসাধারণ। কবি তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়-সচেতন। বিশেষভাবে তিনি গ্রীষ্ম ও দ্বিপ্রহরের কবি। তারই উগ্র চিত্র-অংকনে তাঁর স্বাভাবিক দক্ষতা। বৈশাখের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন নির্লিপ্ত রুদ্র সন্ন্যাসীকে। দেবেন্দ্রনাথ তার রুষ্ট রূপটি এঁকেছেন এই ভাবে- ‘রুদ্রের মুরতি ও যে! -একি সর্বনাশ! / ললাটে অনল হের ধক্-ধক্ জ্বলে।/ সর্বাঙ্গে বিভূতি-ভস্ম মাখি কুতূহলে। তপে মগ্ন-চিনিলে না বৈশাখ- দেবেরে?’… তাঁর কবিতায় প্রকৃতির উদ্বেল বর্ণবৈভব, কখনো কখনো আবার লঘু খেয়ালি কল্পনায় ও গুরু ভাবকল্পনার পরিণয়সাধনের ক্ষমতা বিস্ময়কর। বসন্তের উচ্ছ্বাস, বিভিন্ন ফুলের রূপ রঙও চরিত্রের স্বতন্ত্র বিশেষত্ব, কখনো বরনারী- দোলপূর্ণিমা- গোলাপ কিংশুক অশোকের রক্তও সমারোহ কিংবা বৃন্দাবনে মিলনরাত্রি সবই তাঁর অনুভূতির ছোঁয়ায় একান্তই দেবেন্দ্রনাথের জগতের জীবন্ত কাব্যিক চরিত্র হয়ে উঠেছে। আবারও মোহিতলাল মজুমদারের ভাষার কাছে যাচ্ছি- “দেবেন্দ্রনাথের কল্পনা যেন চৈত্র-বৈশাখের রৌদ্র-মদিরা পালে
বিভোর-অশোকের রক্তে, চম্পকের সৌরভে, গোলাপের রক্তরাগে মত্ত।’ মূলত উনিশ শতকের রোম্যান্টিক কবি হিসেবে বিশেষ ক’রে প্রেম-বিষয়ক রচনার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান প্রথমেই। তিনি রূপ-কাঙাল। তৃষিত চাতকের মতে নারীর রূপের আর্ত-ভিক্ষুক। তাঁর নিজেরই ভাষায়: ‘চিরদিন রূপের পূজারি আমি রূপের পূজারি / সারা সন্ধ্যা সারানিশি রূপ-বৃন্দাবনে / হিন্দোলায় দোলে নারী আনন্দে নেহারি।’ (‘অশোকগুচ্ছ’ (১৯০০)। তাঁর দর্পণ পার্শ্বে, যাদুকরী এতো যাদু শিখিলি কোথায়, দাও দাও একটি চুম্বন প্রভৃতি কবিতায় কীটসের রূপ- তৃষ্ণা-বিষয়ক প্রথমদিকের কবিতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
দেবেন্দ্রনাথ সেনের দক্ষ তুলির ছোঁয়ায়, আটপৌরে শাড়ি, কলা-পাতা, পানের বাটা, সিঁদুর কৌটা, চাবির গোছা, আলতার গুটি, চোটাগুড়, বঙ্গ বিধবা, শিশু, দৈনন্দিন মধ্যবিত্তের, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের দাম্পত্য প্রেমের অনেক খুঁটিনাটি, আকছার তুচ্ছাতিতুচ্ছ সাধারণ দিনানুপাতের মুহূর্ত তাঁর স্বকীয় মেজাজে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তো বলেই ফেলেছেন— ‘কবির ঘর-গৃহস্থালীর কথা, স্ত্রী-র কথা ছেলে-মেয়েদের কথা পড়িয়া তাঁহাকে যেন আমাদের নিতান্ত আত্মীয়ের মতো বোধ হয়।’ তাঁর প্রেমের কবিতার প্রকাশ দ্বিবিধ। একদিকে পিপাসা ও পিপাসা অতিক্রান্ত তৃপ্তি। বিরহের পরিবর্তে মিলন। ব্যথার পরিবর্তে সুখ। নারীর সৌন্দর্য- কল্পনার শান্ত সম্ভোগ। এ ধরনের কবিতাগুলো হলো- প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, সাঁজের প্রদীপ, চিরযৌবনা, অদ্ভুত অভিসার, আঁখির মিলন প্রভৃতি। অন্যদিকে দাম্পত্য-প্রেমের সাকার বিগ্রহ হিসেবে যে সমস্ত কবিতার পরিচয় আমরা পাই সেগুলো হলো কৌটার সিন্দুর, রানীর চুমো, খোকাবাবু, ডাকাত, শিশুর স্তন্যপান— ইত্যাদি।
দেবেন্দ্রনাথের ‘নারী-মঙ্গল’ কবিতায় নারীর রূপ-বন্দনা, তার প্রেম ও মাধুর্যের তত্ত্ব। পতি-অনুরাগিণী, সেবাময়ী, কল্যাণময়ী রূপে তিনি বঙ্গনারীকে বসিয়েছেন মহিমার আসনে: ‘এস সখী, আজি তোমা অভিষেক করি/ ধর ধর ছত্রদণ্ড, রাজরাজেশ্বরী’। এই স্ততিবাদ নারীত্বের পূর্ণ আদর্শের প্রতি। জগন্মাতার অংশরূপিনী তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘মাতা নারী, ধাত্রী নারী, ভয়হারা দেবতা রূপিনী / নারীই শৃঙ্খলা বিশ্বে, মিষ্টরস, সৌন্দর্য-আধার / নারীর মাহাত্ম্য মূঢ়! বুঝিলে না তাই হাহাকার / আজি বঙ্গে গৃহে গৃহে…।’
দেবেন্দ্রনাথের শিশু-সম্বন্ধীয় কবিতাগুলি এক অর্থে ব্যক্তিগত হয়েও সার্বজনীন। শিশুর অনন্ত সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ। শিশুর বিকাশ ভিন্ন, তবু মূলত তারা এক। তাঁর ভাষায়- ‘ওরা সবাই ঢালা এক ছাঁচে / ওরে ছেলেদের কি জাত আছে।’ বাঙালির সংসারে নবজাতকের বিশিষ্ট স্থান তাঁর ‘অপূর্ব নৈবেদ্য’ কাব্যে প্রকাশিত। শিশুসৃষ্ট জগৎ ও তার স্বপ্ন-আলেখ্য তাঁর ‘অপূর্ব শিশুমঙ্গল’ কাব্য। ‘শিশুর স্তন্যপান’ কবিতায় পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যের মধ্যে তারই শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন: ‘জননী উৎসঙ্গে শিশু দুগ্ধ খায় নীরবে; / গৃহখানি ভরে গেছে পারিজাত সৌরভে! / অনুপম অপরূপ! দেখিছ না? চুপচুপ! / দেখিছেন দেব সব এই দৃশ্য নীরবে।’ দেবেন্দ্রনাথের ‘মা’ কবিতাটির বিষয় মায়ের প্রতি শিশুর দুরন্ত আকর্ষণ।
পাঁচ
দেবেন্দ্রনাথ সেনের কবিতার রীতি-প্রকরণ ও গঠন সৌকর্যের দিকে যদি আমরা নজর দিই, তাহলে দেখবো সনেট রচনায় তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য। তাঁর সনেটে এক মিশ্র কলাকৃতি দেখা যায়। অষ্টকে পেত্রার্কীয় রীতির সঙ্গে ষটকে শেক্সপীয়রীয় রীতির সংযোগে অথবা চতুষ্কে পেত্রার্কীয় রীতি রেখে শেক্সপীয়রীয় রীতির অনুবর্তন তাঁর কাব্য রীতিতে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। এর ফলে তাঁর কবিতায় একটা নিজস্ব শব্দ-ঝংকার লাভ করেছিল। যেমন:
১
‘বসন্ত উৎসব হেথা নিশিদিন; অলির ঝঙ্কারে / মুখরিত-পুলকিত নিশিদিন কুসুমকানন।/ পূর্ণচন্দ্র হাসে হেথা নিশি-নিশি প্লাবিয়া-গগন: / মনানন্দে শিখাবৃন্দ নিত্য হেথা কলাপ প্রসারে; / বারোমাস ফোটে হেথা পারিজাত, শ্রীহরিচন্দন; / ভেসে যায় বনস্থলি কোকিলের আনন্দ-জোয়ারে।/ ভাব-গোপীবৃন্দ হেথা-সুখে করি হাত ধরাধরি, / গীতি-রাধিকার সাথে থাকে আহা লীলায় বিভোর।/ নিত্য হেথা-রাসোল্লাস; হৃদিপাত্রে ভরপুর ভারি, / পিয়ে-পিয়ে হয় সারা-মাতোয়ারা নয়ন-চকোর।’
(ব্রজেন্দ্র ডাকাত / পারিজাত-গুচ্ছ ১৯৯২)
২
‘বঞ্চক সমালোচক, তঞ্চক পশারি, / ‘যশ সোমরস’ বলি দেয় ধেনো পানি; / রঙিন আহ্বানে ভুলি, যত নর-নারী, / ভক্ষিছে গরলরাশি, বাখানি-বাখানি!’
যশ / পারিজাত-গুচ্ছ ১৯১২)
৩
‘চিত্রপাখা হতে দুটি কৃষ্ণরেণু ঝরি / পড়িল মল্লিকা-গর্ভে; ধবল সেঁউতি / রাজিল, একটি পীত কণিকা আহরি, / উধাও পতাকা হতে, চারু-প্রজাপতি!’
(প্রজাপতি / পারিজাতগুচ্ছ ১৯১২)
৪
‘হে নাথ, যে অতি তুচ্ছ মৃত্তিকার চুলার উপরে / চুয়ায় গোলাপজল, তাও হয় সুরভি, সুন্দর, / পশে গোলাপের বাস যবে তার অন্তর অন্তরে, / উথলিয়া উঠে তার স্তরে-স্তরে লাবণ্য-লহর!’
(শ্রীহরির প্রতি / অপূর্ব নৈবেদ্য ১৯১২)
দেবেন্দ্রনাথের কবিতায় অপূর্ব ধ্বনি-ঝংকার (Phrasal Music)। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই অক্ষরবৃত্ত পয়ার ছন্দে লেখা। গভীর হৃদয়াবেগের স্বতোৎসারিত ধ্বনি-মাধুর্যে সম্পৃক্ত- কেবল মাত্র মাত্রাবৃত্ত বা স্বরবৃত্তের পদবিন্যাসের থেকে উৎপন্ন নয় বলেই তাঁর কিছু কবিতায় এই
‘ফাইন এক্সসেস’ লক্ষ্য করা যায়। উপমা সর্বস্ব কাব্যকণিকার প্রবাহ দেখি বলেই যেন মনে হয় তাঁর কবিতার প্রাণ ভাবাবেগ। মেধাবী চেতনার প্রয়াস নয়। স্বভাব-সিদ্ধ স্ফূর্ততায় কেবল বহমান। বিশিষ্ট সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের কথায়, ‘বিহারীলাল থেকে এক নতুন ভাবসাধনা বাংলা-সাহিত্যে প্রবর্তিত, তার প্রধান লক্ষণ ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য- আর সেখানে থেকেই বাংলা-সাহিত্যে আধুনিকতার আরম্ভ। রবীন্দ্রনাথে এই সাধনা চরমোৎকর্ষ। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের সৌন্দর্য-পিপাসা-ততটা intelleactual নয় emotional। তাঁর এই ভাবোচ্ছ্বাস স্বতঃস্ফূর্ত প্রায় স্বভাবোক্তির মতো। তাই তাঁকে বলা হয়; স্বভাব-কবি। কিন্তু, তাঁর পানপাত্রে সামান্য জল ঢাললেও তাতে মধু মদিরায় পরিণত হয়।’
ছয়
কবির বস্তুজগতের অভিজ্ঞতা এবং কাল্পনিক অভিজ্ঞতা যখন ভাবনায় সঠিক ভাবে সম্পৃক্ত হয়, তখন ভাষার প্রসাদগুণ সাবলীল সহজতাকে আশ্রয় ক’রে। তখন ভাষা হয় সহজ, ভাবনার ব্যাপ্তি হ’য়ে ওঠে মুখ্য। কিন্তু যখন স্টাইল বড়ো হয়ে ওঠে, শব্দের ধ্বনিঝংকার, শব্দের উপযোগী প্রয়োগগুণের সিদ্ধি তখন ভাবনার ব্যাপ্তি হয় গৌণ, কবিতা হয় হাল্কা। আজকাল সমূহ কবিতা পাঠ করতে করতে আমার এটাই মনে হয়। আরেকটা দিক লক্ষ্য করি সেটা হলো ভাবনার ব্যাপ্তি ও তার বিমূর্ত অবয়বের সঠিক দেহভার অর্থাৎ কবিতা থেকে কবিতায়- উপযোগী শব্দ ও ভাষার ব্যবহার। এটা একটা বিরল ব্যাপার। খুব কমই দেখা যায়। সাহিত্যের ইতিহাস রূপরীতির ও ভাষাবদলের ইতিহাস। সেটা যেমন জনৈক ‘ঝরা পালকের’ কবিকে দেখে সেভাবে বোঝা যায় না অথচ অদ্ভুত ভাবে কয়েক বছরের ব্যবধানে একই কবির ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ পড়ে আপাদমস্তক চমকে উঠতে হয়।
এই অথচ-র মধ্যিখান দিয়েই আমরা দেখবো দেবেন্দ্রনাথ সেনকে। এই বাংলায় অনতি-অতীতের এই প্রভাবশালী কবি দীর্ঘদিন বিস্মৃত। তাঁর সৃষ্টিও সুলভ নয়। তাঁর লেখার ব্যাপ্তি-বৈচিত্র্য কিংবা প্রতিভা হয়ত শতাব্দী অতিক্রান্ত কোনো যুগন্ধর স্রষ্টার নয় একেবারেই। কিন্তু তাঁর লেখনীকে অস্বীকার করলে হাজার বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাসকে অস্বীকার করতে হয়।