Hello Testing

ভ্র ম ণ

ফাল্গুনী ঘোষ

falguni

ভূ-স্বর্গের ডাকে । পর্ব ২ । জয় মাতা দি

জয় মাতা দি

ভারী মন নিয়ে পাঞ্জাবের হোটেল থেকে চেক আউট করেছিলাম। কোনো জায়গার সাথে এত্ত অল্প সময়ে নাড়ি নক্ষত্রের টান গড়ে ওঠা সম্ভবপর না হলেও চিনচিনে বুক নিয়ে অমৃতসর স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা শুরু হল। শুনলাম পায়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথার জন্য সেই ট্রেন গজগমনে আসছেন। অগত্যা স্টেশন চত্বরে ফটফটে আকাশের তলায় হাত-পা ছড়িয়ে চাঁদের হাট বসল। চাঁদের হাট সহযাত্রীদের ক্লান্তি, বিরক্তিভরা কোঁচকানো ভ্রুর সাথে উড়ে আসা ব্যঙ্গবাণে তা মাছের হাটে অচিরেই পরিণত হল। বেশ মালুম পেলাম রাতটি আক্ষরিক অর্থে ‘কোজাগরী’ হয়ে উঠতে চলেছে। এরপর গজেন্দ্রগামিনীর দেখা মিলল। ‘জলদি’, ‘ইধার আও’, ‘উপর মে সিট হ্যায়’, ‘তাড়াতাড়ি আয়’— ইত্যাদি শব্দের মিছিল পেরিয়ে নিজ নিজ বার্থ দখল করতেই গাইডকাকুর নির্দেশ– ‘যা পারেন তিন চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নিন।’ অর্থাৎ আমার আশেপাশের বার্থের হিন্দীভাষীদের নিয়ে গবেষণা করার মতো সময় নেই। সুতরাং…।

        অমৃতসর থেকে জম্মুর সম্পূর্ণ জার্নিটা যেহেতু চার পাঁচ ঘন্টার তাই সাধারণ কুপেতেই সবার সিট ছিল। খোলা জানলা দিয়ে শিরশিরে জমাট বাতাস বাধ্য করল তখনই হালকা পাতলা চাদর জড়াতে। অথচ অমৃতসরে কি ধুন্ধুমার গরম ছিল, মে জুন মাসে সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই চোখের পাতা জ্বালা করলেও ঘুমোতে মন চাইল না। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ট্রেনের ছুটে চলার তালে দু-পাশের প্রকৃতির ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার দিকে চোখ ছুটে চলল। কোথাও ঢালু জমি, ছোটো ছোটো গুল্ম ঝোপ, জমির ঢালে জল বয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্বরূপ নুড়ি পাথরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাঝে মাঝে ছোটো মাঝারি উচ্চতার টিলা। কিন্তু পাহাড় কই! এ তো আমার বাড়ির পাশের সুরিচুয়া, বড়পাহাড়ির মতো এলাকা। তফাৎ শুধু মাটির রঙে। আমার বীরভূম লাল মাটির দেশ আর এখানে সাদা নয়তো উজ্জ্বল শ্লেট রং-এর ছোঁয়া মাটিতে। তাহলে যে শুনেছিলাম বৈষ্ণ দেবীর মন্দির পাহাড়ের চূড়োয়। মনে প্রশ্নরা গিজগিজ করতে থাকল জম্মু স্টেশনে পা রাখতে রাখতে।

        স্টেশন থেকে কাটরামুখী বাস ছোটার তালে তালে টিলার উচ্চতা, জঙ্গলের ঘনত্ব দুই-ই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। লোহার রেলিং ঘেরা রাস্তার পাঁকে পাকে যে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে তা জম্মু শহরটির ছোটো হয়ে যাওয়া তেই মালুম পড়ছিল। যেতে যেতে তন্দ্রা ছিঁড়ে যাওয়ার মত ‘টানেল’, ‘টানেল’ চীৎকারে বাস মুখর হয়ে উঠল। আশেপাশে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা চোর ডাকাতের দল সশস্ত্রে যদি ঘিরে ধরে টানেলের দুদিকের মুখে বা দুয়েকটা পাহাড়ি ভূত পেত্নী। তো নির্ঘাত হৃদযন্ত্রের চাপে কিছু কিছু মানুষ পরকালবাসী হবেন। টিমটিমে আলোয় নিজেদের মুখ চেনা যায় না। পর পর বেশ কয়েকটা ঘুটঘুটেশ্বরের রাজত্ব পেরিয়ে বাসের গতি কমে এল। যদিও যাত্রাপথের চমকে খিদে তেষ্টা মাথায় উঠেছিল, সামনে পাঞ্জাবি ধাবার খুশবুতে মনে হল ছুঁচোগুলো হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে।

    আলু গোবিওয়ালা নান কুলচা আর স্পেশাল আনারদানা চাটনি কাঁচা পেঁয়াজ সহযোগে। নান কুলচা ওভি মাকখন মারকে। এরা বাটার না দিয়ে খাবার খেতেই পারে না। ‘মাখন ছোড়কে’ বলে খাবারের অর্ডার দিলেও কুলচার উপর পাবেন এক কিউব বাটার। প্রশ্ন চিহ্নসহ তাকালেই ততোধিক ভ্রু কুঁচকে উত্তর পাবেন ‘মাকখন দিয়া হি কাঁহা!’ হয়ত পাহাড়ি রাস্তার পরিশ্রমে প্রবল এনার্জির জোগান হিসেবে মাখন, কুলচা জাতীয় খাবার গুলি খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পেটরোগা বাঙালির কি পোষায়? ধাবার একপাশে বিক্রি হওয়া ফ্রুট সালাড চাখতে চাখতে একটা শসার দাম কুড়ি টাকা শুনে চোখ কপালে উঠতে দেখে ভেসে এল উত্তর- ‘বহুত মেহেঙ্গা হ্যায় না! ইধার নেহি হোতা! আপলোগ বেঙ্গল কা হো না! বেঙ্গলসে ইয়ে চীজ লানা পড়তা হ্যায়! এই জোলো স্বাদের নিতান্ত হেলাফেলার বঙ্গদেশীয় ফসলের কি কদর! সাধে কি বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।

        ঘন্টা তিনেকের বাসযাত্রার ক্লান্তিতে কাটরার হোটেলে ঢুকে গরম জলে স্নান করে পেটে চাট্টি পড়তেই চোখ টেনে আসতে লাগল। কিন্তু বৈষ্ণ মাতা দর্শনে যারা হেঁটে ত্রিকূট পাহাড়ে চড়বেন তাদেরকে তো সন্ধ্যে থেকেই হাঁটা লাগাতে হবে। আমার প্রেশার সুগারে ভোগা মা তো অত হাঁটতে পারবে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় হোটেলের জানলা থেকে ত্রিকূট পাহাড়টিকে দেখতে দেখতে ভাবনার সমুদ্রে ডুবে গেলাম। মহালক্ষ্মী, মহাকালী আর মহাসরস্বতীর মিলিত রূপ এই বৈষ্ণ দেবী। ত্রিকূট পাহাড়ে তাঁর অবস্থান। বৈষ্ণ দেবী দর্শনে যেতে হন্টন ছাড়াও ঘোড়া(পনি), পালকি(ডুলি) বা হেলিকপ্টার সার্ভিসের সাহায্য নেওয়া যায়।

        অগত্যা ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে এলেন গাইড কাকু আর হোটেল ম্যানেজার। এদের বদান্যতায় সেই রকমই এক এজেন্টের আগমন ঘটল হোটেলে। আমি তো মিনিট দশেক সেই এজেন্টকে হাঁ করে দেখে চলেছি। এজেন্ট নাকি আধুনিক পোষাকে রাজপুত্র! পশ্চিমবঙ্গে কোনো (কোম্পানীর নয়) নিজ উদ্যোগে এজেন্ট মানেই খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা গালভরতি দাড়ি, ক্ষয়াটে চাউনি, খোয়ানো জুতোর মালিকটির কেবল গছানোর ধান্দা। কিন্তু এই লাল টুকটুকে সুদর্শন এজেন্টের হাসি হাসি চোখ আর মিষ্টি মধুর ব্যবহার রীতিমতো সম্মোহনের মায়াজাল বিস্তার করবে। আপনার পকেটে রেস্ত থাকে তো নিজ গরজে আপনি এই এজেন্টকে যোগাযোগ করবেন। যেরকম আমরা তিনটি পরিবার মিলে করলাম। যাই হোক সেদিন বাকি সহযাত্রীরা হেঁটে পড়েছে মাতারানির উদ্দেশ্যে, আর আমরা সাকুল্যে কয়েকটি প্রাণী উদ্দেশ্যহীন। সেকারণে সন্ধ্যে নামার সাথে সাথে ত্রিকূট পাহাড়কে আলোর মালায় সেজে উঠতে দেখার অনবদ্য অভিজ্ঞতা লাভ হল। 

        আধা জাগরণ আধা ঘুমের ধোঁয়াশা ছিঁড়ে ‘কুঁকুরু কুঁ’ ডাকে তেড়েফুঁড়ে উঠল মন। না না, মোরগ মুরগী ভাবার কারণ নেই, ডিজিটাল যুগ কিনা! ভোর চারটেতে গরম জলের ধারায় শরীরের আড় ভাঙতে না ভাঙতেই হাজির সেই রাজপুত্তুর। আহা এজেন্ট কয় যাহারে! ‘যাত্রী পরচি’ বানানোর অফিসিয়াল খুঁটিনাটি সেরে লাইনবন্দী ঘোড়ার সামনে দাঁড়ানো। জীবনে ঘোড়া অনেকবারই দেখেছি, কিন্তু এইরকম তেজী, নরম, কর্কশ, মোলায়েম নানান পরিচয় ও আকৃতির ঘোড়া দেখে মন বেশ থমকে গেল। আমি তো আর রাজপুত্রী হয়ে জম্মায় নি রে বাবা! নিদেনপক্ষে ইংরেজ আমলের লেডি। এই পাহাড়ি রাস্তায় ঘোড়া ছুটবে টগবগিয়ে, আর আমি ঘোড়ার পিঠে! বয়স্ক মায়ের কথাটা তাহলে একবার ভাবুন! আমাদের ছ’জনের টিমে কাকু, কাকীমা, জেঠ্যু জেঠিমার দলে আমিই শুধু ‘হংসমধ্যে বক যথা!’ আমার মুখে নিরুপায় হয়ে তাই দেঁতো হাসি ঝোলাতেই হল।

        কিন্তু ওকি দেখি! চিরিদিনের ঘোমটা টানা বাঙালি গৃহবধূরা আজ দলে দলে চুড়িদার পাজামাতে সজ্জিতা। পোশাকের সাথে সাথে মনের ভারও তাদের হালকা হয়ে উঠেছে দেখলাম। আমার এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁরা অশ্বারোহী। প্রত্যেকটা ঘোড়ার সাথে একটা করে সহিস। আমার কপালে জুটলো তাজা ছটফটে ঘুড়ী। সে মহিলা আবার মাঝে মাঝে হালকা চালে দৌড় বা নেচে নেয়। সব শুনে মনে হল এর থেকে হাঁটা ছিল ভালো। আর রাজপুত্ররূপী এজেন্ট সেই যে মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে, তাতে এক বাঙালি ললনার চোখে ভীতি দেখলে সে যে সমগ্র বাঙালি নারীদের লজ্জা, সে অস্বীকার করার নয়। সুতরাং ঘোড়াযাত্রা শুরু হল। প্রথমে ভয়ে ভয়ে ঘোড়ার রাশটি প্রাণপণ আঁকড়ে থাকলেও সেই দুলকি চালে শরীর অভ্যস্ত হতেই মন আর চোখ ছুটে গেল দুপাশের দৃশ্যে। ঘন সবুজের চাদর মোড়া পাহাড়ের দুর্ভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। হিমেল হাওয়ায় হেমন্তের অনুভূতি। সারারাত হেঁটে ক্লান্ত কোনও যাত্রী পথের পাশে পা ছড়িয়ে ঝিমোচ্ছে। স্থানীয় কিশোর গরম তেলে জলের মালিশ দিচ্ছে উদরপূর্তির আশায়। সে খাড়াই রাস্তার দুপাশে অগুনতি ঝুলন্ত দোকান খাবার ও ধর্মীয় পসরা নিয়ে। এদের ঈশ্বরসাধনার মূল মন্ত্রই হল— “আরামসে চলো! সামালকে চলো! খাতে খাতে চলো!” উপোসী হয়ে দন্ডী কাটা এই প্রকৃতি ও পরিবেশে পোষানোর নয়।

        যেহেতু সারারাত পূণ্যার্থীদের সমাগম তাই পাহাড় তার সম্পূর্ণ সত্তা নিয়ে জাগছে তাতো বলা যায় না। তবে কোথাও আড়মোড়া ভাঙছে তো কোথাও ঝিমুচ্ছে। হঠাত ঘোড়া দুলকি চাল ছেড়ে নাচতে শুরু করল। আমার মনের প্রশান্তি যে আমার ঘোড়ার দিকে ট্রান্সফার হয়ে তাকে আনন্দে উজ্জীবিত করে তুলবে কে জানত! ‘ওরে বাবা! বাঁচাও!’ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলেও সহিসের জন্য বাকি গালিগালাজ গুলো মনে মনেই সমাপ্ত করলাম। কিন্তু কোথায় কি! আমার চীৎকার সার! ওদিকে ঘোড়া ছেড়ে সহিস বাকিদের সাথে ‘ডোগরী’ ভাষায় আলাপে মশগুল। আমার চীৎকার শুনে সে কি সমবেত হাসি! “জলদি আইয়ে। আ কর থামাইয়ে!”— আমার মুখ নিঃসৃত এই রাগমিশ্রিত চোস্ত হিন্দীও তাদের জোরালো হাসির বড় কারণ ছিল বোধহয়। কারণ এরা যে বাংলাটা বেশ বোঝে তা মালুম হয়েছিল শ্রীনগরের ডাল লেকে। সে গপ্পের জন্য অবশ্য আপনাদের ধৈর্য রাখতে হবে। যাকগে সহিসের হাতের সিপিসিপে বেতের বাড়ি আর ‘চল কুড়ি! ধিককিত ধিককিত’—এই ধমকে আবার ঘোড়া দুলকি চালে ফিরল, আমার জানে জান এল।

        ঘোড়া, ব্যাটারিচালিত টোটো এইসব অধ্যায় পেরিয়ে মাতারানীর ভোগ কিনে ‘লাইন লাগাও’। মূলমন্দিরের কিছু আগে থেকে সেই বিপুল জনস্রোত। নিজের পায়ে দু’পা আর স্রোতের টানে দশ পা এগিয়ে যাবেনই, পিছোনোর সম্ভাবনা নেই পাক্কা। এই কায়দার মাঝে এজেন্টের ‘চালাকি ন চলিষ্যতি’। ত্থুত্থুড়ে দাদু, টগবগে জোয়ান, ছটফটে উচ্চিংড়ি বাচ্চা, হাঁসফাঁসে হিন্দিভাষী বহুরানী সব্বার মুখে নাড়া –“জোরসে বোলো জয় মাতা দি!” “ফিরসে বোলো জয় মাতাদি!” আমার মত নাস্তিকের মুখ দিয়েও দু-একবার বেরিয়েছিল বৈকি। তবে গুহাবাসিনী বৈষ্ণদেবীর কাছে পৌঁছানোর রোমাঞ্চ মার্বেল, টাইলস মোড়া সিঁড়ি নষ্ট করে দিয়েছে। সেই শিকড়বাকড় ঝোলা, নুড়ি পাথরে পিচ্ছিল অন্ধকার গুহার বন্ধ দরজার মুখে বিষণ্ণ মন ঠোক্কর খেতে থাকল। এইবার সময় পেয়েছি কিছু মিথ কপচানোর। তাছাড়া দেবীমহিমা দু-চার কথা না কইলে নয়, পাপ পূণ্যের একটা ব্যাপার আছে। দেবী এখানে পিন্ডি রূপে ধরা দিয়েছেন। মহালক্ষ্মী, মহাকালী, মহাসরস্বতী রূপে অধিষ্ঠাত্রী বৈষ্ণদেবী ভীষণ জাগ্রত। পিন্ডিরূপিনী দেবীর চরণতল থেকে নিঃসৃত জলস্রোত চরণগঙ্গা নামে পরিচিত, যা পান করলে রোগমুক্তি হয়। এটাই জনশ্রুতি।

        এই গুহাগুলি কী করে তৈরী হল তা আজও কুয়াশায় ঘেরা কুহেলিকা। মোট তিনটি গুহার মধ্যে শুধুমাত্র একটি গুহাই জনসাধারণের জন্য খোলা থাকে বাকি গুলো বিভিন্ন সময়েই বন্ধ। মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকালে অর্জুন এই মহাদেবীর উল্লেখ করেন, যিনি যম্বু (জম্মু ও কাশ্মীর) পর্বতে অবস্থান করেন। ত্রিদেবী। মন্দির স্থপতিদের দাবী, প্রায় ৭০০ বছর আগে স্থানীয় কোনও পুরোহিতকে কন্যা রূপে মা দেখা দেন, আর স্বপ্নে এক দুর্গম গুহা পথের নির্দেশ দেন। ত্রিকূট পাহাড়ের সেই চূড়োয় যাত্রা করলে ব্রাহ্মণ গিয়ে তিনটি পাথরের শিলা পান। দেবী তখন তাকে তাঁর স্বরূপ দেখান। তখন থেকেই বৈষ্ণদেবীর পুজো প্রচলিত হয়। এই সব তথ্যের ঠিক ভুল বিচারে বসার ভুল করলে হতাশ হবেন কারণ আমার সব ঐ ‘এজান্টায় নমঃ।’ বকতে বকতে এবার জিভ তালু সব শুকিয়েও এসেছে তাছাড়া।

        পুজো, ভোগের থালি, পবিত্র জল এদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেটে ছুঁচোর দৌড় দুশ থেকে চারশ মিটারে পরিণত হচ্ছে দেখে মন্দির থেকে বেরিয়ে আলু পরাঠা, ছোলে বাটোরা(সব নিরামিষ্যি) যা যা গোগ্রাসে ঢোকে থলিতে ঠুসা হল। নাহলে এইসব বুড়োবুড়িদের নিয়ে আবার ঘোড়দৌড় করতে হবে হেলিপক্টার স্টেশনে। ফট- ফট- ফট… গোঁ গোঁ আওয়াজে কান ফাটিয়ে লাল কালোর কনট্রাস্টে দুটি কপ্টারের চরকিবাজি চলছে ‘সঞ্জিছট’ এরোড্রামে। কাটরা থেকে সঞ্জিছট তিন-চার মিনিটের উড়ানের চক্কর। কপ্টারযানে সওয়ারি হওয়ার এই প্রথম অভিজ্ঞতা। রীতিমতো হুকোমুখো হ্যাংলার হাঁ নিয়ে ধুলোর ঝড় গিলছি। এক ট্রিপে ছ’জন। ওজনের মাপজোপ করে দুই কাকু কাকীমা অন্য দলে ভিড়লেন। মাথার উপরে মাঝ দুপুরের চড়া রোদ্দুর, আর এরোড্রামের চারদিকে ছবি তোলার কড়া নিষেধ। প্লাস্টার চটে যাওয়া লাল-হলুদ রাস্তাপথের নির্দেশের মুখে দাঁড়িয়ে মোবাইলে লুকোচুরি খেলতে খেলতে যথাস্থানে ডাক এল।

        এবার আমাদের নম্বর। আমার জায়গা হল সামনে। চালকের আসনের পাশে চৌকি চেপে (পড়ুন সিট চেপে) কষে আমাকে বেঁধে দেওয়া হল। মন তখন ফুরফুরে। পাখির মতো আকাশে চক্কর কাটতে কাটতে নীচেটা দেখব। আহা! গোঁত্তা খেয়ে একবার আকাশে উড়ুক। ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে কাঁচের ফটফটে জানলা। পায়ের নীচে একটু এগিয়ে ইঞ্জিনের কাছে ইঞ্চিখানেক ফাঁকা জায়গা। আশ মিটিয়ে দেখে নেব! এই তো ডানা মেলেছে। কিন্তু পেটের তলার দিকটা হালকা লাগছে কেন! পা কি ছেড়ে গেল নাকি! অনুভব করছি না তো! আর পায়ের নীচের ঐ ফাঁক থেকে ঘন সবুজ পেল্লাই পাথরের স্তুপগুলো ওরকম কটকটে চোখে চাইছে কেন! হে মাতারানী, আমি না করলেও মা তো মন দিয়ে পুজো করেছে। জয় মাতা দি!

        হোটেলে ফিরে আলুপোস্ত কলাইয়ের ডাল ভাত খেয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লুম। আলসে কুঁড়ে, আড্ডাবাজ বাঙালি হয়েই জীবন সার্থক বাপু। বিকেলে অন্যান্য সহযাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাত পা মেলে  হোটেলে বা হোটেলের সামনের সারিবাঁধা দোকানপাট থেকে ‘মাতারানীর’ রেপ্লিকা ব্যাগে পুরে কাটাচ্ছিল। আর আমি ব্যাগ সামলাতে সামলাতে সুইজারল্যান্ডের দিবাস্বপ্নে বিভোর হচ্ছিলাম। আরে আমাদের ভারতের সুইজারল্যান্ড। 

ক্রমশ