মু ক্ত গ দ্য
মি ঠু   ঘো ষ
উমাপতি পণ্ডিতের সংসার
উমাপতি পণ্ডিত পেশায় ডাক্তার ছিলেন। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ছিল তাঁর বসবাস, অনেক সম্পত্তি আর বড়ো বাড়িখানি ছিল তার আভিজাত্যের প্রতীক— বাড়ির নাম ছিল ‘পণ্ডিত ভিলা’। অনেক কষ্ট করেই সেই সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ছিলেন তিনি। তাই অর্থের মর্ম তিনি বুঝতেন।
স্বল্প ব্যয় করতেন আর বাদবাকি টুকু তুলে রাখতেন ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য। স্ত্রী, সাত-পুত্র আর দুই-কন্যা নিয়ে তাঁর ভরা সংসার ছিল। তাই আয় মন্দ না হলেও হিসাব করেই তাঁকে চলতে হত। সখ হলেও যখন তখন তিনি সখের জিনিস ক্রয় করতেন না। সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া কিছু ক্রয় করতে তাঁর বিবেকে বাধত। তবে তিনি খাওয়া দাওয়ার কোনো কষ্ট স্ত্রী ও সন্তানদের কোনোদিন বুঝতে দেননি। শুধু বসন-ভূষনের সৌখিনতা তিনি পছন্দ করতেন না। উনার বিশ্বাস ছিল অযথা অর্থের অপচয় সংসারের ক্ষতির কারণ। তাই তিনি কখনোই অর্থের অপচয় করতেন না। বরং যতটুকু পারতেন সাশ্রয় করারই চেষ্টা করতেন সবসময়। এভাবেই ভালো মন্দে দিন চলে যচ্ছিল ডাক্তার উমাপতি পণ্ডিতের। চারদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। এবার একটা হেস্তনেস্ত না হলেই নয়। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ফুঁসছে গোটা বাংলা— গোটা দেশ। কিছুটা তাঁরাও যেন ভীত। ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চলছে দেশীয় নেতাদের। বিনিদ্র রাত কাটছে গান্ধীজি, জওহরলাল নেহেরুদের। নানান গুজব। সবই কানে আসছে উমাপতি পণ্ডিতের। এই বাংলা নাকি ভাগ হয়ে যাবে দুই ভাগে। পশ্চিম ভাগ অন্তর্ভুক্ত হবে ভারতের আর পূর্ব ভাগ নিয়ে জন্ম হবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের।
এমতাবস্থায় একদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাক এল খুড়তুতো শালার বিয়েতে। তিনি স্ত্রীকে বাচ্চাদের সাথে একখানি সোনার কানের দুল কিনে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন চারদিনের জন্য। সামর্থ্য থাকলেও গলার হার দেবার সাহস করলেন না পয়সা খরচ হওয়ার ভয়ে। আর ঠিক সেই সময়ই দেশ ভাগের কথা শোনা গেল চারিদিকে। কালবিলম্ব না করে তখুনি উমাপতি পণ্ডিত স্ত্রী ও পুত্রদের ফিরিয়ে আনলেন বাড়িতে। ভালো করে সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন দেশ ভাগের পর কী কী হতে পারে।
কিছুদিন পরই যা শোনা যাচ্ছিল তা বাস্তবে পরিণত হল। ঘোষণা হল দেশ ভাগের। দেশ ভাগের শর্তে ব্রিটিশরাজ রাজি হল স্বাধীনতা দিতে। উমাপতি পণ্ডিত রোজকার মতো প্রাতঃভ্রমণে বের হয়ে শুনলেন সেই কথা। বাড়ির পাশেই একটি পুকুরের ধারে মাছ ধরার জন্য অপেক্ষারত কিছু জেলেরা উদ্বিগ্ন মুখে বলাবলি করছিল সেই সব নিয়ে— ‘জীবন খুবই কঠিন সমুদ্রের মতো, মাঝেমাঝেই ঢেউ তোলে কখন গিয়ে কোথায় ঠেকবে কে জানে।’
প্রাতঃভ্রমণ বন্ধ রেখেই তখনি বাড়ি ফিরে এলেন উমাপতি পণ্ডিত। আর হাঁটবার সাহস হল না তাঁর। দ্রুত বেগে পা চালালেন বাড়ির দিকে। বাড়ির দাওয়ায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে সবাইকে এক জায়গায় ডাকলেন। কিছুক্ষণ বাদে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলে বড়ো ছেলেকে বললেন, আজ অনেক মাছ যেন সে বাজার থেকে নিয়ে আসে। তারপর একটু থেমে বিষণ্ণ ধরা কণ্ঠে বললেন, ‘তোমরা যারা এখানে থাকতে চাও থাক আর যারা ভারতে চলে যেতে চাও চলে যাও। ওইখানে নিরাপদে থাকবে। কালকেই তোমরা চলে যাবে কারণ দেশ ভাগের গন্ডগোল শুরু হয়ে গিয়েছে।’ কথাগুলো বলে উমাপতি পণ্ডিত মাথা নীচু করিয়া চুপ করে বসে থাকলেন।
ঠিক হল উমাপতি পণ্ডিতের বড়ো ছেলে নিজের এক ছেলে, এক মেয়ে আর ছোটো দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পরের দিনই ভারতের উদ্দ্যেশে রওনা দেবে আর উমাপতি পণ্ডিত স্ত্রী ও বাকিদের নিয়ে থেকে যাবেন বাড়িতেই। সেই মতো পরদিন ভোরের আলো ভালো করে ফোঁটার আগেই বড়ো ছেলে নিজের ছেলে-মেয়ে আর ছোটো দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিল এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে।
বেশ কদিন পর উমাপতি পণ্ডিতের বড়ো ছেলে যখন সবাইকে নিয়ে এপারে এসে এক আত্মীয়র বাড়িতে উঠলেন তখন তাদের পরণের কাপড়টুকু আর নিজেদের প্রাণখানি ছাড়া কিছুই সঙ্গে ছিল না। নিশ্চিত জীবন ছেড়ে শুরু হল এক অনিশ্চিত জীবনের লড়াই। আর ওপারে ভাঙা মন আর হৃদয় নিয়ে অনিশ্চিত শঙ্কার জীবন কাটাতে লাগলেন হিসেবী, মিতব্যয়ী, বিষয়ী উমাপতি পণ্ডিত।
বাংলাকে ভেঙে দু-টুকরো করে দেশ স্বাধীন হল। উমাপতি পণ্ডিত এখন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা আর তিন ছেলে ভারতের বাসিন্দা। মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া। কতদিন দেখেননি উমাপতি পণ্ডিত তাঁর তিন ছেলেকে আর নাতি-নাতনিদের। আর কি কোনোদিনও দেখবেন তাদের মুখ।
এদিকে উমাপতি পণ্ডিতের বড়ো ছেলে কিছুদিন পর একটি কাজ জুটিয়ে নিয়ে কোনোরকমে সামাল দেন পরিস্থিতি। ছোটো ছেলেও কিছুদিন পর যোগ দেয় ভারতীয় সেনা বাহিনীতে। কপালের ফেরে দেশের প্রহরাতেই প্রাণ যায় তার। না ছেলে-নাতি-নাতনিদের সাথে আর দেখা হয়নি উমাপতি পণ্ডিতের।